#চেনা
#পর্ব_৬
ধীর পায়ে কিচেনের দিকে চলে গেলেন গার্গী দেবী| বড় ইচ্ছে তাঁর আলাপ করবেন সুকুমারীর সঙ্গে| একটা জীবনে অনেক উত্থান পতনের সাক্ষী থেকেছেন, তাই বোধহয় মানুষ চিনতে আর ভুল হয় না| কিচেনে ঢুকে নম্র স্বরে বললেন, আসতে পারি?
ঘুরে তাকালেন সুকুমারী| হাসলেন একটু, নিজের বাড়িতে আসার জন্য বুঝি অনুমতি লাগে বেয়ান? ঠান্ডা শরবত করি একটু, তেষ্টা মিটুক| বড্ড গরম পড়েছে আজ| আর সঙ্গে সামান্য একটু ভাজাভুজি, মনে হয় না আপনার খারাপ লাগবে|
ঈষৎ অবাক সুরে গার্গী বললেন, আপনি বুঝলেন কিভাবে আমি আপনার বৌমার মা?
এ প্রশ্ন আমায় করছেন বেয়ান? পাশাপাশি দাঁড়িয়ে কখনো দেখেন নি? আপনাদের মা-মেয়ের চেহারায় অসম্ভব মিল, দুজনের ভীষণ রকম সুন্দরী| যে একবার দেখবে, সেই বুঝে যাবে| নিজেকে খুব সুন্দরভাবে ধরে রেখেছেন বেয়ান, দেখে ভারী ভাল লাগছে| নিজেকে এভাবে ভালোবাসতে সবাই পারে না| এমনটাই থাকবেন চিরকাল|
হাসলেন গার্গী সরকার| বলা সহজ, কিন্তু সমাজের র ক্তচক্ষু উপেক্ষা করে ভাল থাকতে পারে ক’জন? আপনি পেরেছেন?
চেষ্টা করেছি| মহিলা হয়ে চায়ের দোকান বসছি, খদ্দেরদের সঙ্গে কথা বলছি, হাসছি… বাঁধা এসেছে অনেক, কিন্তু নিজেকে কিছুতেই হে রে যেতে দিই নি, আমি হে রে গেলে অভিজিতকেও যে হে রে যেতে হয়| চায়ের দোকানই আমাকে প্রথমবারের জন্য সাবলম্বনের স্বাদ দিয়েছিল, আজো সেই চায়ের দোকানই আমার আয়ের প্রাথমিক উৎস| আর রইল বাকি সমাজ সংসারের কথা| যে সমাজ বি পদের দিনে আমায় দু মুঠো ভাত দেয় না, আমার ঘরে আলো জ্বলল কিনা দেখতে আসে না… সেই সমাজে বসবাসকারী লোকজন আমায় ভাল বলল না মন্দ… তাতে সত্যিই কি কিছু আসে যায়? যে মানুষটা আজ আপনার গায়ে কা দা ছিটোচ্ছে সেই যদি দেখে ভবিষ্যতে আপনি একজন বড়মানুষ হয়েছেন, বড় চাকরি বাকরি করছেন, হেসে খেজুরে আলাপ জমাতে আসবে| সাহায্য চাইবে| জীবন বড় জটিল, এক চালিকাশক্তি কেবল ঈশ্বরের হাতে| যেমনটি তিনি চালাবেন, এই দুনিয়া তেমনভাবেই চলবে| তাঁর প্রতি ভরসা রেখে পায়ে পায়ে এগিয়ে চলেছি… অন্ধকার ঘিরে ধরলে তিনিই পথ দেখাবেন|
শরবতে হাল্কা করে চুমুক দিয়ে হাসলেন গার্গী| জানেন বেয়ান সোনাকে আমি সবসময় বলতাম, চেহারা, সাজপোশাকে কেবল আধুনিক হলেই নয়, মনের দিক থেকে যে মানুষ আধুনিক চিন্তাভাবনার অধিকারী সেই প্রকৃত আধুনিকতার অন্তর্নিহিত অর্থ অনুভব করতে পেরেছে| দেখে আমার ভাল লাগছে যে মেয়ে আমার এমন একজনকে শাশুড়ি মা হিসেবে পেয়েছে| আপনার সঙ্গে কথা বলে আমার সত্যি খুব ভাল লেগেছে|
শাশুড়ি মা কথাটা বলবেন না, হাসেন সুকুমারী|
কেন? একটু যেন অবাকই হন গার্গী|
আমি বিশ্বাস করি মা একজনই হন, যিনি জন্ম দেন…. কিংবা যিনি ছোট থেকে নিজের সন্তানের মতো লালন পালন করেন, উপযুক্ত মূল্যবোধের শিক্ষা দেন, আদরে শাসনে সন্তানকে একজন প্রকৃত মানুষ হিসেবে গড়ে তোলেন তিনিই মা| যারা বৈবাহিকী কিংবা অন্য কোনো সূত্র ধরে অন্য একজন প্রাপ্তবয়স্ক ছেলে বা মেয়ের সামনে দাঁড়িয়ে মাতৃত্বের দাবী জানায়, সেই দাবী যে কতখানি অযৌক্তিক, হাস্যকর আপনিও তা জানেন, আমিও| খুব বেশি হলে আমি সম্রাজ্ঞীর অসমবয়সী বন্ধু হয়ে উঠতে পারি, কিন্তু তার বেশি কিছুতেই নয়| আপনি সোনার মা, চিরদিন তাই থাকবেন|
বড় ভাল লাগছে আপনার সঙ্গে কথা বলতে| একদিন নিয়ে যাবেন আপনাদের গ্ৰামে, কংক্রিটের শহরে তো ছোট থেকে বুড়ো হলাম, হয়ত এভাবেই একদিন ডাক আসবে, চলে যেতে হবে| তার আগে একবার সবুজ বনানীর মাঝে লু কিয়ে থাকা প্রকৃতির স্বাদ উপভোগ করে আসি| দেখে আসি কোন বাতাসের গন্ধ মেখে মানুষের মন এতখানি উদার হয়?
নিশ্চয়ই, অমলিন হাসি ফোটে সুকুমারীর ঠোঁটে| আমার সঙ্গেই চলুন না কালকে… কিন্তু!
আবার কিন্তু কিসের?
আমি যে গ্ৰামের মধ্যে সামান্য একটা চায়ের দোকান চালাই বেয়ান| আপনাদের শহুরে আদব কায়দা, রুচিবোধ, অভিজাত চালচলন, দামী হোটেল রেস্টুরেন্ট আর আমার ওই গ্ৰাম্য ধুলোমাখা সাদামাটা জীবন… আপনি হয়ত হাঁফিয়ে উঠবেন|
কি যে বলেন না বেয়ান! এইটুকুতে হাঁফিয়ে উঠলে, চলবে? আপনার সামানে যাকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখছেন তার পুরোটাই নির্ভেজাল সত্য নয়… ভেতরে অনেক ফাঁক, অনেক ফাঁকি| আমি যাব আপনার গ্ৰাম দেখতে, সেই ধুলোমাখা সাদামাটা জীবনের স্বাদ আস্বাদন করতে| তার ফাঁকে ফাঁকে দুজনে মিলে আপনার চায়ের দোকান সামলাব| কিছু না পারি অন্ততঃ কেটলিটুকু ধুয়ে তো সাহায্য করতে পারব|
আপনি কিন্তু এবার আমায় লজ্জায় ফেলছেন বেয়ান|
বহুদিন পর মাটির গন্ধমাখা ভালোবাসার সোয়াদ পাচ্ছি যে| আপনাকে ছাড়ি কিভাবে? একটাই অনুরোধ সেই ভালোবাসা থেকে বঞ্চিত করবেন না আমায়…
( ক্রমশ )
©️ Monkemoner dakbakso – Anindita
