#চেনা
#পর্ব_৫
মনের সঙ্গে মস্তিষ্কের দ্বন্দ্ব চলে ক্রমাগত| কখনো জিতে যায় মন, কখনো মস্তিষ্ক| অফিস শেষে আজ সোজা বালিগঞ্জ চলে গেল সম্রাজ্ঞী| এই মন মস্তিষ্কের ক্রমাগত দ্বন্দ্বে ক্ষ তবিক্ষ ত হয়ে যাচ্ছে সে, মা একমাত্র মা’ই পারে তাকে সঠিক রাস্তা দেখাতে| নিজের থেকেও বেশি মাকে বিশ্বাস করে সে… জানে কখনোই মা তাকে অ ন্যায়ের সঙ্গে আপোষ করতে বলবে না, বলবে না স্বাধীনতা হা রিয়ে শ্বশুরবাড়ির সবার মন জয় করার ট্রেনিং নিতে| মায়ের জীবন নিয়ে দেখেছে মা, যদি সুখ না ভাগ্যে থাকে, নিজেকে পুরোপুরি বি কিয়ে দিলেও সুখ মেলে না|
বুঝতে পারছে সুকুমারীর মতো স্নেহপ্রবণ মানুষ জীবনে থাকলে সম্রাজ্ঞীর জীবনটাই বদলে যাবে কিন্তু বহুদিনের চেনা মানুষজনের যে স্বার্থপর চেহারা চোখের সামনে দেখেছে সে, দেখেছে মায়ের যন্ত্র ণা, হ তাশার দিনগুলো তাতে সে কিছুতেই আর কাউকে সহজে বিশ্বাস করতে পারে না| তার বিশ্বাসের দুনিয়ায় ছোটকালে যে ফা টল তৈরি হয়েছে, আর মেরামত হয় নি তা| কে বলতে পারে সম্রাজ্ঞী এখন নরম হলে একদিন সুকুমারীও এভাবেই বদলে যাবেন না? ক্ষমতার মোহ বড় ভ য়ঙ্কর, যার হাতে আসে তাকেই অ ন্ধ করে দেয়|
অন্যমনস্ক ভঙ্গিতে কলিং বেলে হাত ছোঁয়াল সম্রাজ্ঞী| পরক্ষণেই খুলে গেছে দরজা| গার্গী যেন জানতেনই আজ তাঁর মেয়ে আসবে, দিব্যি হাসিমুখে বললেন, তোর জন্যই অপেক্ষা করছিলাম|
একটু অবাক হল সে, তুমি জানতে আমি আসব?
মায়ের মন, সন্তানের সঙ্গে যে তার নাড়ির যোগ| তাই দিব্যি আন্দাজ করে নিতে পারে| বল দেখি এবার হয়েছে কি? এত উস্কোখুস্কো লাগছে কেন? কিসের এত চিন্তা? কাকে নিয়ে দ্বিধা? অভি? অভি কি কিছু বলেছে তোকে?
একসঙ্গে এতগুলো প্রশ্নের উত্তর দিতে হবে নাকি… ঈষৎ ঠাট্টার সুরে বলে সম্রাজ্ঞী, তুমি তো দেখছি মা ম্যারাথন জেরা শুরু করলে| আগে একটু ঠাণ্ডা শরবত খাওয়াও, তারপর বলছি সব|
শাশুড়ি মা এসেছেন| গ্ৰাম থেকে| কি একটা সমস্যা হয়েছে লিভারে, তার চিকিৎসার জন্য| যতদূর বলছে অভি তাতে বুঝলাম আগামীকালই উনি ফিরে যাবেন| কিন্তু সমস্যাটা সেখানে নয় মা, ঠাম্মাকে আমি যেমনটা দেখেছি উনি একেবারেই তেমনটা নন, বড় ভাল, বড় মিষ্টি ব্যবহার তাঁর| মুহূর্তের মধ্যে মানুষকে আপন করে নিতে পারেন| কত চেষ্টা করছি খারাপ ব্যবহার করতে কিন্তু পারছি কই? ওই মানুষের সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করাই যায় না|জানো মা, রতুপিসি যেমন আমাকে ছোটবেলায় হলুদ চাউমিন বানিয়ে দিত, তেমনটা লাঞ্চে একদিন বানিয়ে দিয়েছিলেন… গড়গড় করে বলে গেল সম্রাজ্ঞী অভির বলা কথাগুলো, কতগুলো টাকার লোভ সম্মান বজায় রাখতে ছেড়ে দিয়েছেন সুকুমারী| ফিরেও তাকান নি জমিদার বাপের সম্পত্তির দিকে….
মেয়ের পিঠে হাত রাখলেন গার্গী| তোমাকে আমি লেখাপড়া শিখিয়েছি যাতে তোমার ভাবনাচিন্তার পরিধি বিস্তৃত হয়, খোলা মনে সবকিছুকে গ্ৰহণ করতে পারো| মনে রাখবে সব শাশুড়িই তোমার ঠাম্মার মতো হয় না, সবাই বাড়ির বউকে অসম্মান করে না…. বা ছেলেকে করতে শেখায় না… প্রতিটা মুদ্রারই দু পিঠ আছে| তাই যেমন সবাই ভাল নয়, তেমনি সবাইকে মন্দ ভাবাও উচিত নয়| চিনতে শেখ, বুঝতে শেখ, শেখ অনুভব করতে… দেখবে তোমার মনের গভীরে যে প্রশ্নগুলো উঁকি দিচ্ছে, হা তড়াতে হা তড়াতে তার উত্তর নিজেই কখন খুঁজে পেয়ে গেছ| সেই সময়টুকু কিন্তু তোমায় দিতে হবে….
একটিবার, মাত্র একটিবারের জন্য আমাদের ফ্ল্যাটে যাবে মা, এর আগে কখনো অনুরোধ করি নি তোমায়, আজ করছি| প্লিজ এই একটিবারের জন্য চলো মা| নরম গলায় বলল সম্রাজ্ঞী, কথা দিচ্ছি আর কখনো তোমায় কোনরকম অনুরোধ করব না|
মেয়ের মুখের খানিকক্ষণ একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকেন গার্গী সরকার| বোধহয় খবর নেওয়ার চেষ্টা করেন মনের ওঠাপড়ার| এই তাঁর আত্মজা, তার সবচাইতে আপনার জন| দুয়ারে এসে দাঁড়িয়েছে আজ প্রত্যাশা নিয়ে, কিভাবে ফিরিয়ে দেন তিনি…. নরম গলায় বললেন আচ্ছা, যাব|
ক্যাব বুক করে মা মেয়ে যখন ফ্ল্যাটে পৌঁছলো, ঘড়ির কাঁটা ততক্ষণে সন্ধ্যের ঘর পেরিয়েছে| উদ্বিগ্ন অভিজিৎ পায়চারি করছে ড্রয়িংরুম জুড়ে| চাবি খুলে সম্রাজ্ঞীকে ঢুকতে দেখে বলল, একটিবার ফোন তো করবে সোনা, তখন থেকে তোমার ফোনটা বেজে যাচ্ছে, রিসিভ করছ না, আমার বুঝি চিন্তা হয় না? এখুনি ভাবছিলাম তোমার অফিসের দিকে রওনা দেব| বড্ড চিন্তায় ফেলে দিয়েছিলে আজ| একজন সম্ভ্রান্ত চেহারার ভদ্রমহিলাকে ফ্ল্যাটে ঢুকতে দেখে একটু যেন থমকে গেল সে, ছবিতে অনেকবার দেখেছে, কিন্তু সামনাসামনি এই প্রথম| মনের মধ্যে প্রশ্নের উদয় হলেও মুখে সে ভাব দেখাল না অভি| হাসিমুখে অভ্যর্থনা জানালো গার্গী দেবীকে|
ফোনটা সাইলেন্ট মোডে ছিল, তাই শুনতে পাই নি| কৈফিয়তের সুরে বলল সম্রাজ্ঞী, আসলে অনেকদিন বাদে আজ মায়ের কাছে গিয়েছিলাম একটু| আসার পথে বললাম চলো, আমাদের বাড়িটা দেখে আসবে একবার| তুমি তো আসতেই চাইলে না কোনদিন|আজ রাতটুকু মা এখানেই থাকবে|
বলতে ইচ্ছে হল অভিজিতের, তুমিই তো কখনো কোন পরিবারের মানুষজন, আত্মীয় স্বজনকে এই ফ্ল্যাটে আনতে চাও নি… কিন্তু!
আন্তরিক ভঙ্গিতে বললেন গার্গী, এই অসময়ে এসে বোধহয় তোমাদের অসুবিধায় ফেললাম| তেমন হলে…
মনের দ্বিধা কেটে গেল অভিজিতের| এগিয়ে এসে পা ছুঁয়ে প্রণাম করে বলল, এটা যতটা আমার বাড়ি, ততটা আপনার মেয়েরও বাড়ি| আপনাকে আমাদের কুটিরে স্বাগত| একদিন কেন, যতদিন ইচ্ছে হয় থাকবেন| আপনারাই তো সেই বটগাছ, যার ছায়ায় নিশ্চিন্তের আশ্রয় মেলে|
সুস্মিত প্রশংসার দৃষ্টিতে জামাইয়ের দিকে তাকালেন গার্গী| হীরে চিনতে ভুল করে নি তাঁর মেয়ে| এখানে দাঁড়িয়ে বুঝতে পারছেন সম্রাজ্ঞীর বলা প্রতিটা কথাই ভীষণ সত্য, অমন মা না হলে এমন ছেলে হয় না| উপযুক্ত পারিবারিক শিক্ষাই গড়ে তোলে রুচিবোধ, আদর্শের সংজ্ঞা| তোমার মা কোথায়? তাঁকে এখানে দেখছি না তো? তার সঙ্গে আলাপ করার জন্যই তো এলাম আজ|
কিচেনে আছে| রান্নাবান্না করতে ভারী ভালোবাসে যে|
( ক্রমশ )
©️ Monkemoner dakbakso – Anindita
