“ঘাসফুলের ধ্রুবতারা ”
শাহাজাদী মহাপারা
সাহিল ভাইকে আমরা বিশেষ পছন্দ করতাম না। আমরা মানে কাজিনরা। তিনি অবশ্য আমাদের কাজিনও ছিলেন না। আমার ছোট ফুপির ননদের ছেলে। একমাত্র ননদের একমাত্র ছেলে। সাহিল ভাইয়ের মা মারা যাবার পর তার বাবা দ্বিতীয় বিয়ে করেন। কিন্তু তিনি এটা মেনে নিতে পারেন নি। যদিও তার সৎ মা খুবই ভালো মানুষ তিনি সাহিল ভাইকে রাখতে চেয়েছিলেন কিন্তু সাহিল ভাই তার মায়ের স্থান তাকে দিতে পারেন নি। ১২ বছর বয়স থেকেই তিনি ফুপির কাছে মানুষ। আমার ফুপি নিজের দুই ছেলে মেয়ের চেয়ে সাহিল ভাইকে বেশি ভালোবাসেন এবং তার প্রশংসায় পঞ্চমুখ। এর অবশ্য কারণ ও রয়েছে। সাহিল ভাই খুবই ট্যালেন্টেড। তিনি পঞ্চম থেকে এইচ এস সি পর্যন্ত সব ক্লাসে স্কলারশিপ পেয়েছেন। এমনকি বিশ্ববিদ্যালয় জীবনেও স্কলারশিপ পেয়েছেন। আমরা ভেবেছিলাম তিনি হয়তো সাইন্টিস্ট বা এস্ট্রোনট হবেন। কিন্তু তিনি পড়লেন বিজনেস স্টাডিস। তারপর ভেবেছিলাম হয়তো কোনো মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানিতে জব করবেন কিন্তু তিনি এই মফস্বলে এসে দিলেন দোকান। ফুপা বেজায় রাগ সাহিল ভাইয়ের উপর। কিন্তু তিনি কারো কথায় গুরুত্ব দিলেন না। ফুপা সাহিল ভাইকে ব্যবসা করার জন্য মূলধন ও দিতে চাইলেন কিন্তু তিনি এক টাকাও নিলেন না। অবশেষে তিনি এইখানে মাহাবুবা স্টেশনারি স্টোর খুললেন। ধীরে ধীরে তিনি একটা এগ্রো ফার্ম খুললেন তারপর একটা ছোট বুটিক হাউজ খুললেন। ধীরে ধীরে তার ব্যবসা বাড়তে লাগলো। এই ছিলো সাহিল ভাইয়ের পরিচয় পর্ব।
আমরা সবাই ছোটবেলা থেকেই এই সাহিল ভাইয়ের আচার আচরনের জন্য অপদস্থই হয়েছি বলা চলে। প্রতিবার পরীক্ষার রেজাল্টের সময়ও হোক বা কোনো ফ্যামিলি ফাংশান মায়েদের মুখে শুধু একটাই কথা থাকতো সাহিলের পা ধোঁয়া পানি খাও। এখানেই খ্যান্ত দিলেও হতো কিন্তু না তা হয় নি। ঘটনা একদিন চূড়ান্ত পর্যায়ে চলে যায়। তার পর থেকেই আমি মোহনা , সাহিল নামক কীটটাকে মনে প্রাণে ঘৃনা করি। শুধু তাই নয় আমি তাকে সতর্ক ভাবে এড়িয়ে চলি। বলা তো যায় না কবে খুন করে বসি। তাই যেকোনো ফ্যামিলি ফাংশানে তার উপস্থিত থাকলে আমি যাই না। এমনিতেও সেই ঘটনার পর থেকে এইসব গ্যাদারিং এড়িয়ে চলি।
এগুলো ছিলো ছোটবেলার ঘটনা এখন আমরা সবাই সেই ইনোসেন্ট ছেলেবেলা ফেলে এসেছি।
সবাই এখন একেক যায়গায় পড়াশোনা করছে ম্যাক্সিমামই দেশের বাহিরে থাকে। আমি থাকি ঢাকায়। একটা প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করছি। এমন না যে আমি পাবলিকে চান্স পাইনি তবুও ইচ্ছে করেই প্রাইভেট কে বেছে নিয়েছি। স্কলারশিপেই পড়ছি হয়তো গোল্ড মেডিলিস্ট হতে পারবো না কিন্তু জীবনে ভালো কিছু করার ইচ্ছে আছে। মুদি দোকান যে দিবো না তা নিশ্চিত।
বাবা মায়ের উপর আমার কোনো রাগ নেই। আগে হতো, খুব রাগ হতো তাইতো ঘর ছেড়েছিলাম।
আমি যখন অষ্টম শ্রেনিতে পড়ি তখন বাড়ি ছেড়েছিলাম। নিজের প্রিয় নীড় ছেড়েছি। যে আমি চঞ্চলা নদীর মতো ছিলাম সে আমি এখন শান্ত এক নদী যার কোনো তরঙ্গ নেই। বয়ে চলেছি নিঃশব্দে।
****
মোহনা বসে আছে রেলওয়ে স্টেশনে। ট্রেন ছাড়তে আর ৫ মিনিট। এমনিতেই ট্রেন লেইট ছিলো এক ঘন্টা। একটা ফোন কল আসার পর থেকেই সে আনমনা হয়ে সব ভাবলো।মোহনার যদিও একাই যাবার কথা ছিলো কিন্তু শেষ মুহূর্তে শনির দশা কপালে এসে জুটলো।
আর কে? সাহিল ভাই।
সাহিল এসেই বললো,” তোর আম্মা আমার সাথে যাইতে বলছে। তুই নাকি এখনো একলা ট্রেনে চলাচল করতে পারিস না। দ্রুত আয়। ”
বিরক্ততে মোহনার মেজাজটাই খিচড়ে গেলো। মনে মনেই গালাগাল পারতে লাগলো।
“এই অভদ্র লোক আমি ছাড়া আর কারো সাথেই এমন খবিশের মতো আচরণ করে না। আমি এক মুহূর্তও এই লোকের সামনে থাকতে চাইনা। কিন্তু উপায় নেই। ১৯/২০ হলেই আম্মার কানে কথা যাবে।”
অজ্ঞতা সিট ছেড়ে সে তার পিছু পিছু চলল। সাহিলের কেবিনে বোঝাই করা মালামাল। কিন্তু এক পাশে খালিই। মোহনা ভিতরে গিয়ে বসতেই ট্রেনটা হুইসেল দিয়ে ছাড়লো।
” কফি খাবি?”
” না। ”
” তোর হবু ভাবীর ছবি দেখেছিস? ”
” না। ”
” দাঁড়া দেখাচ্ছি। ”
বলেই সাহিল তার ফোনটা বের করলো। মোহনার ইচ্ছে করছে একটা আছাড় দিয়ে ফোনটা ভেঙ্গে ফেলতে। নিজের রাগকে দমিয়ে রেখেই সে অত্যাধিক শীতল গলায় বললো, ” সাহিল ভাই আমি ঘুমাবো।”
সাহিল গ্যালারি খোজা বন্ধ করে মোহনার দিকে তাকালো। এবং খুবই মজার কথা শুনেছে এমন ভাবে হাসলো।
” আরে ঘুমাবি মানে? ট্রেন জার্নি কেউ ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে করে? কি বলদ মেয়েমানুষ। ”
মোহনার ইচ্ছে করলো ওই খোঁচা খোঁচা দাঁড়ি ওয়ালা সুন্দর গেলে চপাট করে একটা চটকানা মারতে। কিন্তু সুদর্শন পুরুষদের মারা যায়না শত দোষেও তাদের ভুল মাফ। মোহনা আরও শান্ত স্বরে বললো, ” আপনাকে সবাই খুবই গম্ভীর আর ব্যক্তিত্ববান হিসেবে জানে। কিন্তু আজকে আপনার আচরণে আমার ধারণা পাল্টে গেলো। আসলে আপনি একটা ছেচড়া লোক। আর এইসব ছেচড়ামি শুধু আমার সামনেই করেন । ” বলেই কানে হেডফোন গুঁজে চোখ বন্ধ করে পরে রইলো সে।
মোহনার কোথায় রাগে সাহিলের পা থেকে মাথা পর্যন্ত জ্বলে গেলো যেনো। নিজেকে স্বাভাবিক রাখতে সাহিল ট্রেনের দেয়ালে একটা প্রকান্ড ঘুসি দিয়ে বসলো। মোহনার ভিতরটা কেঁপে উঠলেও কিছুই শুনতে পায়নি এমন ভান করে পরে রইলো সে।
ট্রেন তার নিজেস্ব গতিতে এগিয়ে যেতে লাগলো। সাহিল ও একসময় বাহিরের দৃশ্য অবলোকন করতে করতেই ক্লান্ত দেহ নিয়ে ঘুমিয়ে গেলো।
সাহিলের যখন ঘুম ভাঙলো তখন ট্রেন একটা স্টেশনে থেমেছে। গলা শুকিয়ে কাঠ হওয়া সাহিল পানির তেষ্টায় এদিক সেদিক তাকাতে লাগলো। খেয়াল হলো মোহনা এখানে নেই। সে বাহিরে বের হতে নিতেই দরজা খুলে মোহনা ঢুকোলো। সাহিল কথা বলার আগেই মোহনা তার হাতে পানির বোতলটা ধরিয়ে দিলো। সে পানির বোতলটা হাতে নিয়েই ঢকঢক করে পানি পান করলো ।
” কই গিয়েছিলি? ”
রুমাল দিয়ে মুখ মুছে উত্তর দিলো মোহনা, ” দোকানে। পানি আর কিছু স্নাক্স কিনতে। আপনি খাবেন? ”
সাহিল মোহনার সিটের পাশে দাঁড়িয়ে ওর সুতি ওড়না দিয়ে মুখ মুছতেই বিরক্তিতে তেঁতেঁ উঠোলো মোহনা।
” কি করলেন এইটা? খবিশ। ছিঃ আমার ওড়না কি আপনার ঘাম মোছার জিনিস? টিস্যু চাইলেই তো দিতাম। ” রাগে দুঃখে কান্না চলে এলো মোহনার।
দাঁত বের করে হাসছে সাহিল যেনো খুব মজার সার্কাস দেখছে।
” চিন্তা করিস না । ঘামইতো, শুকিয়ে যাবে। ”
বমি চলে এলো মোহনার।
এখন এই ওড়না পাল্টানো যাবে না। কাপড় সব ব্যাগে আর এখানে ব্যাগ খোলার মতো অবস্থা নেই। অগ্যতা সেই ওড়না নিয়েই রাগে বোম হয়ে বসে রইলো সে। আর বেশিক্ষন নেই পরের স্টেশনেই নামবে ওরা। নিজেকে যথা সম্ভব শান্ত রাখার চেষ্টা করলো মোহনা।
সাহিল মোহনার অন্তর্ভেদি দৃষ্টি দেখে হাসছে।
” তোকে তো বউ এর ছবিই দেখানো হলোনারে। ওয়েট।” বলেই পকেট থেকে ফোনটা বের করে মোহনার সামনে তুলে ধরলো সে।
মোহনা এক পলক চেয়েই চোখ নামিয়ে নিলো। বলল, ” বাহ্! মিষ্টি দেখতে মেয়েটা। ”
সাহিল বেশ খানিকটা সময় মোহনার দিকে তাকিয়ে রইলো। হাঁসফাঁস করছে ভেতরটা এভাবে তাকিয়ে আছে কেনো? কোনো মানেই হয় না। মোহনা জানালার বাহিরে তাকালো।
আসলে বাড়ি যাওয়ার বিশেষ কারণই সাহিল ভাইয়ের বিয়ে। সেমিস্টার ব্রেক পরায় মোহনা বাড়ি যেতোই কিন্তু হঠাৎ সকালে মায়ের ফোন কলে তলব এলো সাহিলের অবশেষে বিয়ে। মোহনা আসতে চায় নি যদিও। তবুও ফুফুর ফোন পেয়েই যেতে হচ্ছে । নইলে এই মানুষটার বিয়ে দেখার তার কোনো ইচ্ছেই নেই।
ট্রেনটা তাঁদের গন্তব্যে পৌঁছাতেই নেমে পরলো ওরা।
” একটু অপেক্ষা কর আমি এগুলো বুঝিয়ে দিয়েই আমরা একসাথে বাড়ি ফিরবো।”
একসাথে কথাটা শুনতেই মোহনা চোটে গেলো।
গম্ভীর ভাবে বললো, ” আমি আপনার সাথে আর কোথাও যাবো না। অনেক উপকার করেছেন আবার আপনি আপনার মতো আমি আমার মতো। ” তখন প্রায় সন্ধ্যে।
মোহনার কথা শুনে সাহিলের ইচ্ছে করলো একটা থাপ্পড় দিতে কিন্তু সে অপারগ। মোহনার হাতটা শক্ত করে টেনে ধরেই সে বাকি কাজ করতে লাগলো। পাত্তাই দিলো না ওর কথার। মোহনা এদিকে সাহিলের হাত থেকে ছুটার জন্য ছটফট করতে লাগলো। স্টেশন থেকে বের হয়ে সিএনজি ডেকে ব্যাগ উঠিয়ে তাতে বসে পরলো। রাগে মোহনার গাল লাল হয়ে আছে। সাহিল একবার সেদিক তাকিয়ে চোখ ফিরিয়ে নিলো। বেশি সুন্দর কিছুর দিকে খুব বেশিক্ষন তাকিয়ে থাকা যায় না। অতঃপর সিএনজি তার গন্তব্যের উদ্দেশ্যে ছুটে চললো।
চলবে…!
