Saturday, June 6, 2026







একজন রূপকথা পর্ব – ১০

#একজন রূপকথা
#পর্ব_১০
#নুশরাত জেরিন

শোভন বেশ কয়েকদিন ধরে কথার কাছে কবিতার বিষয়টা বলতে চাচ্ছে , পারছে না, কোথাও যেনো বাঁধছে। স্ত্রীর ছোট বোনের চরিত্র সম্পর্কিত কথা স্ত্রীকে বলা যায় না, তার উপর যদি হয় নিজেও জড়িত। কথার হয়তো তার উশখুশ করাটা নজরে পড়লো। রাতে ঘুমোবার সময় শোভনকে জেগে বসে থাকতে দেখে সে বলল,
“ঘুমাবেন না, জেগে বসে আছেন কেনো?”

শোভন আমতাআমতা করলো, তার ঘুম আসছে না। কথাকে বিষয়টা না জানানো অবদি শান্তি ও লাগছে না।
সে বলল,
“এইতো ঘুমাবো, এখনই।”

“আজ এত রাত অবদি জেগে আছেন? শরীর খারাপ করলো নাতো?”

কথা বিছানায় উঠে এসে শোভনের কপালে হাত রাখলো। তাপমাত্রা স্বাভাবিক। তবে কী হলো।
সে বলল,
“কাল অফিস নেই?”

“আছে তো।”

“তবে ঘুমাচ্ছেন না কেনো? সকাল সকাল উঠতে হবে তো।”

শোভন আকস্মিক কথার একহাত চেপে ধরলো। তার চোখে মুখে উৎকন্ঠা। কথা নিজেও চমকে গেছে।

“কী হয়েছে? এমন করছেন কেনো? কোনো সমস্যা হয়েছে?”

“আমাকে তুমি বিশ্বাস করো কথা?”

শোভনের আকুল কন্ঠস্বর শুনে কথা কিছুটা কেঁপে উঠলো। এমন ভাবে বলছে কেনো লোকটা? কি হলো তার? বিশ্বাসের কথা কেনো উঠবে? পরক্ষনেই নিজেকে সামলালো। সামান্য হাসার চেষ্টা করে বলল,
“নিজের থেকেও বেশি, আপনি জানেন না?”

“আমি তোমার বা কবিতার বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত নিলে মানতে পারবে?”

কথা এবার মন থেকেই হাসলো।
“কী আশ্চর্য! আমার যেকোনো বিষয়ে যেকোনো সিদ্ধান্ত নেবার পূর্ণ অধিকার আছে আপনার!”

“আর কবিতার?”

“বা রে কবিতা আমার বোন হলে আপনার বোন নয় বুঝি? আপনি কী আমাদের পর?”

শোভন তড়িৎ কথা ঘোরালো, বিষয়টা এগিয়ে নিতে তার বুক কাপছে, অসস্তি হচ্ছে।

“পর নয় বলছো? তাহলে আপনি আজ্ঞে করো কেনো?”

কথা লাজুক হাসলো।
“কতবার যে চেষ্টা করেছি তুমি করে বলার, আপনার অগোচরেই চেষ্টা করেছি, পারিনি। তাছাড়া সম্বোধনে কী যায় আসে? ভালবাসা মেশানো থাকলেই তো হলো।”

শোভন মৃদু হাসলো।

সেদিন বলতে না পারলেও পরদিন ঠিকই সে কথার সামনে মনের কথাটা প্রকাশ করলো। একেবারে হড়বড় করে বলল,
“কবিতার বিয়ে ঠিক করেছি কথা, ভাল ছেলে, আমারই অফিসের ম্যানেজার। আমার চেয়েও উচু পদ, ভালো বেতন। কবিতার ছবি দেখে খুব পছন্দও করলো। দাবিদাওয়া তার কিচ্ছু নেই, শুধু কনে সুন্দরী হলেই চলবে।”

কথা সামান্য অবাক হলেও শোভনের আশানুরূপ প্রতিক্রিয়া করলো না। শোভন ভেবেছিলো কথা রাগারাগি করবে অথবা অভিমান। তাকে না জানিয়ে তার নিজের বোনের বিয়ে ঠিক করেছে, এতটুকু রাগ করার অধিকার তার অবশ্যই আছে। অথচ কথা মৃদু গলায় বলল,
“ভালো করেছেন, আমিও কবিতার জন্য ছেলে দেখার কথা বলতে চেয়েছিলাম। ”

শোভনের খুব বলতে ইচ্ছে হলো,
“কেনো কথা? কেনো ছেলে দেখতে বলতে চেয়েছিলে? কবিতার পড়াশোনা তো শেষ হয়নি, অনার্স ও কমপ্লিট হয়নি। তুমি না বলেছিলে ওর অনার্স শেষ হবার আগে বিয়ে দেবে না। তবে কেনো?”

মনের কথা মুখ ফুটে বের হলো না। পাছে অপ্রত্যাশিত কিছু শুনে ফেলে।

কথা বলল,
“বিয়ের পর পড়াশোনাটা করতে দেবে?”

“হু।”

“ওর সব শখ আহ্লাদ পূরণ করবে?

” হু।”

“সুখে রাখবে?”

“সে আর বলতে।”

কথা উদাস গলায় বলল,
“আমি নিজেকে এককালে চালাক ভাবতাম জানেন! অথচ আমি বড্ড বোকা, একটু বেশিই হয়তো। যে আমার ক্ষতি চায় আমি তবু কেনো তার ভালো চাওয়া থেকে নিজেকে বিরত রাখতে পারি না? বলতে পারেন?”

শোভন উত্তর দিতে পারলো না। নিঃশব্দে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে পরলো।

মেয়েটার নাম মালোতি। খুব বেশি বয়স না, কবিতার থেকে দু-এক বছরের বড় হতে পারে। তবে সাজপোশাক দেখলে বয়স আরও বেশি লাগে। মলিন রংচটা শাড়ির ওপর মোটা চাদর টাইপের ওড়না পরে সে কাজে আসে। সারাদিন রান্না বান্না থেকে শুরু করে ঘরের যাবতীয় কাজ সামলায়, বিকেলে বাড়ি ফিরে যায়। শোভন তাকে কোথা থেকে এনেছে সেটা কথা জানে না, জানতেও চায়নি৷ উল্টো সে শোভনের উপর বেজায় ক্ষেপে আছে। লোকটা সত্যি সত্যি কাজের মেয়ে নিয়ে এলো? কেনো? কথা কাজ পারে না?
শোভন নির্দোষ ভঙ্গিতে বলল,
“আমার উপর রাগ না দেখিয়ে মাকে বলো, তার কথা শুনতেই তো মালোতিকে নিয়ে এলাম।”

কথা তার শাশুড়ীকে সোজাসুজি কিছু বলতে পারলো না। তিনি কখন ভালো মনে থাকেন আর কখন রেগে যান বোঝা যায় না। তবে এক ভরা দুপুরে চুলে তেল লাগিয়ে দেবার সময় মিনমিন করে বলল,
“মালোতিকে রাখার কী দরকার আছে মা? আমিই তো কাজ করতাম। তাছাড়া কী এমন কাজ আছে, অতটুকু করতে কোনো কষ্টও হতো না। শুধু শুধু আপনার ছেলের টাকা নষ্ট হচ্ছে। ”

রোজিনা বেগম কথার কথায় কান দিলেন না।নিজের মতো বললেন,
“কাজের মেয়েটা বড্ড বেয়াদব, এটাকে তাড়িয়ে অন্য মেয়ে খুজতে হবে।”

কথা উত্তর দিলো না। কেননা শাশুড়ীর সাথে সেও একমত। মালোতি নামের মেয়েটা কারো সাথে ঠিকমতো কথা বলে না, নিজের মতো কাজ করে চলে যায়। কেউ কিছু জিজ্ঞেস করলে ত্যাড়াবেকা উত্তর দেয়। এই তো সেদিন যখন রোজিনা বেগম তার নাম জিজ্ঞেস করলো তখন সে কড়া গলায় বলল,
“নাম না জেনে কাজে রাখছেন? এত ভালো মানুষ আপনারা? বাহ্!

রোজিনা বেগম দাতে দাত চিপলেন,
” বেয়াদব মেয়ে মানুষ।”

“জ্বি আমি বেয়াদব, আর কিছু বলবেন? তরকারি কাটতে অসুবিধা হচ্ছে। ”

কথা নিজেও আগবাড়িয়ে তার সাথে কথা বলতে গেলো না। তবে একটা বিষয় ঠিক লক্ষ্য করলো। মেয়েটা কথাগুলো স্পষ্ঠ শুদ্ধ ভাষায় বলে, ব্যক্তিত্ব টাও চোখে পড়ার মতো। এ বাড়ি থেকে সে এক দানা খাবারও কখনও মুখে তোলে না। কেউ খেতে বললেও না। তার এক কথা, এ বাড়িতে টাকার বিনিময়ে কাজ করতে এসেছি, বাড়তি সুবিধা কেনো নেবো? পরে খোটা শোনার জন্য?”

তাছাড়া তার কাজে খুশি হয়ে মাস শেষে যখন কিছু বাড়তি টাকা যোগ করে দেওয়া হলো। তখন সেটাও সে ফিরিয়ে দিলো। কথার সাথে সাথে রোজিনা বেগমও অবাক হলেন। মেয়েটা বেয়াদব হলেও আত্মসম্মান প্রবল।

এরমাঝে কবিতার বিয়ের ব্যাপারটা চাপা পরে গেলো। শোভন নিজেও এ ব্যাপারে আর কথা বলল না।

—-;

ছুটির দিনে বিকেল বেলাটা শোভন ছাদে কাটায়। অফিসে নিয়মিত বদ্ধ রুমে যান্ত্রিক জীবন কাটাতে কাটাতে সে হাপিয়ে ওঠে। একটু খোলা হাওয়ায় নিশ্বাস নিতে ইচ্ছে করে। আর্থিক কারনে দুরে কোথায় বেরিয়ে আসা সম্ভব না।
সেইজন্য ছাদের খোলা আকাশটায় তাকিয়ে নিজেকে হালকা করার প্রয়াস চালায়।
নিচে একবার কথাকে গিয়ে চায়ের কথা বলে এসেছে। এখনও কথা আসেনি। মিনিট দশেক তো হলোই।
সে আবার ডাকতে পা বাড়ালো। কবিতা এসেছে, হাতে চায়ের কাপ। শোভন বলল,
“কথা কোথায়? তুমি কেনো চা নিয়ে এসেছো?”

কবিতা নিঃশব্দে চায়ের কাপ এগিয়ে দিলো। ঠোঁটের কোনে তার মৃদু হাসির রেখা। বলল,
“আজ আমায় নিয়ে ঘুরতে যাবে?”

শোভন থমকালো, চমকালো, হতবাক হলো। কবিতা তাকে তুমি করে বলছে?
কবিতা এবার একটু কাছ ঘেঁষে দাড়ালো।
“বললে না? যাবে? তার আগে এই চা টা খেয়ে দেখো, আমি নিজে বানিয়েছি, নিজের হাতে। নাও!”

শোভন হাত এগোলো না। বরং গুটিয়ে নিলো। তার মাথা কাজ করছে না। একটা মেয়ে এতটা নির্লজ্জ, এতটা সার্থপর, লোভী কী করে হতে পারে? কষ্ট হয় না? আয়নার সামনে দাড়ালে চোখে চোখ রাখতে ইতস্তত লাগে না?

কবিতা চায়ের কাপ পাশে রেখে শোভনের দিকে খানিক ঝুকে পড়লো। ততক্ষণে ওড়না গড়িয়ে পড়েছে নিচে। কবিতার চোখে মুখে অর্থবহ হাসি।
তবে সেটা বিষাদে রুপ নিতে সময় লাগলো না।
শোভনের পুরুষালী হাতের চড়টা ততক্ষণে তার দুগাল লাল করে ফেলেছে।
পেছন থেকে ভেসে এলো ভগ্ন এক কন্ঠস্বর,
“কবিতা?”

,

,চলবে…..

পূর্ববর্তী নিবন্ধ
পরবর্তী নিবন্ধ
গল্প পোকা
গল্প পোকাhttps://golpopoka.com
গল্পপোকা ডট কম -এ আপনাকে স্বাগতম......
RELATED ARTICLES

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে

- Advertisment -

Most Popular

Recent Comments

Md masrur Hasan mahi على অবুঝ_বউ পার্ট: ৫
আমিনুল ইসলাম على প্রয়োজন পর্ব: ৩০ ( অন্তিম)
সাজিবুল ইসলাম على ধর্ষিতাবউ২ ৯ তথা শেষ পর্ব
শাহিদুল ইসলাম على জীবন সঙ্গী ১ম পার্ট
শাহিদুল ইসলাম على জীবন সঙ্গী ১ম পার্ট
Nita Sarkar على স্বপ্নীল ৬৮
শিয়াসা ইসলাম হুরিজিহান على রহস্য শেষ_পর্ব
শিয়াসা ইসলাম হুরিজিহান على অলক্ষ্যে তুমি পর্ব-০৬ এবং শেষ পর্ব
Nazmun Nahar Akhi على Psycho_is_back? part_7
Nazmun Nahar Akhi على Dangerous_Villian_Lover part 2
শিয়াসা ইসলাম হুরিজিহান على জানালার ওপারে পর্ব-১৭ এবং শেষ পর্ব
শিয়াসা ইসলাম হুরিজিহান على লীলা বোর্ডিং ১২১৫ পর্ব-১১ এবং শেষ পর্ব
মিজানুর রহমান রাহুল على সেই তুমি পর্ব-০১
@feelings على প্রহেলিকা
Anamika Basu على সে পর্ব-১২
Anamika Basu على সে পর্ব-১২
Nusrat jahan على coffee & vanilla Part-10
Pallabi Roy على স্বপ্নীল ৬৮
M.D Mahabub على The_Villain_Lover Part_2
Labani sarkar على Dangerous_Villain_Lover part 23
MD Akas Apc على বিবেক
Tanisha Ahmed على Devil love part-18 
Aius Barmon shorob على নারীর দেহকে নয়
Chandan roy على স্বপ্নীল ৬৮
Chandan roy على স্বপ্নীল ৬৮
Riya Biswas على তুমি রবে ৬০
Priya Banerjee على devil love married life last part
Riya Biswas على তুমি রবে ৬০
Riya Biswas على তুমি রবে ৫২
Mohammad Adib على তুমি রবে ৬০
Avni Ayesha على তুমি রবে ২৮
গল্প পোকা على Love At 1st Sight Season 3 Part – 69
সুমিত على তুমি রবে ২৮
TANJIBA ZENIFAR على তুমি রবে ৫০
TANJIBA ZENIFAR على তুমি রবে ৫০
Samiah Begum على তুমি রবে ৫১
biddut das rocky على নর নারী
গল্প পোকা على নষ্ট গলি শেষ পর্ব
Md Jobayer Hossain Shohag على নষ্ট গলি পর্ব-৩০
গল্প পোকা على দুই অলসের সংসার
গল্প পোকা على মন ফড়িং ❤৪২.
A.J.S Rakib على মন ফড়িং ❤৪২.
গল্প পোকা على গল্পঃ ভয়
গল্প পোকা على গল্পঃ ভয়
গল্প পোকা على গল্পঃ ভয়
Samiya noor على গল্পঃ ভয়
Sadikul على গল্পঃ ভয়
Samia Islam على গল্পঃ ভয়
শূন্য মায়া على মন ফড়িং ❤ ৪০.
Sutapa biswas على মন ফড়িং ❤৩৯.
Foysal Mahmud على My_Mafia_Boss_Husband Part: 16
sutapa biswas على মন ফড়িং ❤ ৩৮.
sutapa biswas على মন ফড়িং ❤ ৩৭
Foysal Mahmud على My_Mafia_Boss_Husband Part: 16
Siyam على বিবেক
Sudipto Guchhait على My_Mafia_Boss পর্ব-৯
saptami karmakar على devil love married life last part
saptami karmakar على devil love married life last part
মায়া على মন ফড়িং ৩০.
মায়া على মন ফড়িং ৩০.
মায়া على মন ফড়িং ২৬.
Shreyashi Dutta على  বিয়ে part 1
Sandipan Biswas على  বিয়ে part 1
Paramita Bhattacharyya على অনুরাগ শেষ পর্ব
জামিয়া পারভীন তানি على নষ্ট গলি পর্ব-৩০
মায়া على মন ফড়িং  ২২
সুরিয়া মিম على খেলাঘর /পর্ব-৪২
গল্প পোকা على মন ফড়িং ২১
গল্প পোকা على নষ্ট গলি পর্ব-৩০
গল্প পোকা على Love At 1st Sight Season 3 Part – 69
গল্প পোকা على Love At 1st Sight Season 3 Part – 69
গল্প পোকা على খেলাঘর /পর্ব-৪২
Sahin ssb على মন ফড়িং ২১
মায়া على মন ফড়িং ২১
মায়া على মন ফড়িং ❤ ২০.
গল্প পোকা على মন ফড়িং ❤ ২০.
গল্প পোকা على খেলাঘর /পর্ব-৪২
গল্প পোকা على খেলাঘর /পর্ব-৪২
মায়া على মন ফড়িং ❤ ১৮. 
মায়া على মন ফড়িং ❤ ১৭.
Jannatul Ferdous على খেলাঘর পর্ব-৩৫
গল্প পোকা على মন ফড়িং ❤ ১৬. 
গল্প পোকা على ফাল্গুনের_ফুল last_part_8
মায়া على মন ফড়িং ❤ ১৬. 
গল্প পোকা على ছাত্রী যখন বউ পাঠঃ ১
গল্প পোকা على বাজির প্রেম পাঠঃ ১
Foujia Khanom Parsha على মা… ?
HM Ashraful Islam على অবুঝ_বউ পার্ট: ৮
HM Ashraful Islam على অবুঝ_বউ পার্ট: ৫
Ibna Al Wadud Shovon على স্বার্থ