#আলো_আঁধারি |০৩ ও শেষ পর্ব|
#নুপুর_মজুমদার_জবা
রাতে ঘরে ফিরল আসিফ,কিন্তু তখনও শারমিন চুপচাপ।রোজকার মতো এসে আসিফকে খাবার দিলো,অফিসের ব্যাগ টেবিলে রাখলো।সব কাজ ঠিক ভাবে করলেও আসিফের কাছে খটকা লাগলো শারমিনের এই আচরণ।আজ আসিফ শারমিনের চোখে ভালোবাসা না দেখে দায়িত্ববোধ দেখলো।খাওয়াদাওয়া শেষ করে নিজের রুমে গেল আসিফ ঠিক এমন সময়ই শারমিন বাজারের ব্যাগ থেকে বিষের শিশি বের করে টেবিলে রাখলো।একটু পরেই আসিফকে চা দিতে যাবে।
রাত বোধহয় তখন এগারোটার ঘরে শারমিন নিজের খাবারটুকু খেয়ে এক কাপ চা হাতে ঘরে ঢুকলো।আসিফ থতখন জানালার পাশে দাঁড়িয়ে ফোনে কথা বলছে।শারমিনকে দেখেই পিছনে ফিরে ফোন কাটল।শারমিন এগিয়ে গেল সামনে,
__কি হলো কার সাথে কথা বলছিলে? হুট করেই কেটে দিলে!
__আরে না পুরনো বন্ধু কল করেছিল কথা হয়ে গেছে তাই কেটে দিলাম।
__ও আচ্ছা। এই নাও তোমার চা।
__আজ তোমাকে দেখি কিছু বলতে হচ্ছে না একা একাই সব কিছু করছো।
__সবসময় একা একাই করি কখনো তো তোমায় দেখি না কোনো কিছুতে।
হকচকিয়ে গেল আসিফ।শারমিন খুব শান্ত মস্তিষ্কের মেয়ে হুট করে রেগে যাওয়াটা ওর সাথে যায় না তা ওর আচরণের বিরুদ্ধে। আজকেও শান্ত মাথায় আসিফের সামনে বসলো।
__আসিফ তুমি কি কিছু বলতে চাও আমায়? আমার থেকে কিছু আড়াল করছো?
__কি যে বলো না,আমি আবার কি আড়াল করবো? তুমিই বরং আজকাল বেশি সন্দেহ করো আমায়।একটু এদিকে এসো তো।
কথা শেষ করতে না করতেই জড়িয়ে ধরলো শারমিনকে।পেছনে হাত দিয়ে শারমিন কিছু একটা সামনে এনে রাখলো আসিফের হাতে।নির্বিকার চিত্তে আসিফের ঠোঁট শুকিয়ে আসলো।কাঁপা কাঁপা হাতে শারমিনের হাত থেকে প্রেগন্যান্সি কিটটা নিলো।সেখানে স্পষ্ট লাল দুটি দাগ নিজেদের অস্তিত্বের জানান দিচ্ছে। আসিফ জড়িয়ে ধরলো শারমিনকে।
__শারমিন! শারমিন! এটা কি সত্যি?
চোখে জল নিয়ে দুবার ওপর নিচ মাথা দোলালো শারমিন।
কাঁপা কাঁপা গলায় বলল,
__হু হুম সত্যি….
__তুমি জানো এর থেকে বেশি খুশি আমি কোনোদিনও হইনি।আজকে আমাদের পরিবার পরিপূর্ণ হলো শারমিন।নতুন কেউ আসতে চলেছে।কাউকে জানিয়েছো এ খবর?
__নাহ এখন অব্দি কাউকে জানাইনি।তুমিই প্রথাম যার কাছে খবরটা দিলাম।
__তুমি বসো কি খাবে বলো? আমি এক্ষুণি নিয়ে আসছি।
শারমিন কিছু বলতেই যাবে এমন সময় আসিফের ফোন বেজে উঠল।আসিফ রিসিভ করার আগেই শারমিন ফোন রিসিভ করলো।ওপাশ থেকে তমার গলার আওয়াজ শোনা যাচ্ছে।
__হ্যালো আসিফ ভাই আমার কথা ছি……
তমার কল দেখার সাথেই শারমিনের মাথা গরম হয়ে উঠলো।কড়া করে কিছু কথা শোনাবে বলে মনস্থির করেও কিছু বলল না।ও আজ দেখতে চায় কি এমন কথা তমা আর আসিফের মধ্যে হয় সেও আজ জানতে চায়।তমা ফোনের ওপাশ থেকে কোনো জবাব না পেয়ে আবার জিজ্ঞেস করল,
__আসিফ ভা…….
__কি হয়েছে তমা তোর দুলাভাই না আমি কথা বলছি বল।কিছু বলবি?
ফোনের এপাশে আসিফকে না পেয়ে মেজাজ গরম হয়ে গেল তমার।
___তোর কাছে দরকার থাকলে তোকে কল দিতাম আসিফ ভাইকে না।অবশ্যই দরকার আছে নইলে তো আর এমনি এমনি কেউ কাউকে ফোন দেয় না।
__দুলাভাই বল।আর আসিফ আরমার স্বামী ওর সাথে তোর কোনো সম্পর্ক থাকতো না যদি না আমার বিয়ে হতো আসিফের সাথে।তাহলে যা কথা বলার আমাকেই বল।তোর দুলাভাই আমার সামনেই দাঁড়ানো।
__আরে তুই এতো রাগছিস কেন আপু আমি তো আসিফ ভাইকে মাঝে মাঝেই ফোন দিই।আর আসিফ ভাই তো ওষুধ কোম্পানিতে চাকরি করে কাল রাত থেকেই হুট করে আমার পেটে ব্যাথা এই কারণে জানতে চাইছিলাম একটা ওষুধের কথা।
__ওহ তা তোরা কেমন আছিস?
__ভালো তুই কেমম আছিস?
__আমরাও ভালো। আর হ্যাঁ তুই খালামনি হতে চলেছিস আর আম্মু নানি।
__মানে? আরে একটু বুঝিয়ে বল।
__আমি গর্ভবতী আমার পেটে দুই মাস বয়সের একটা ভ্রুণ রয়েছে।
__ওও কংগ্রাচুলেশনস আপু।
__আচ্ছা তা তুই রাখ এখন ঘুমাতে যাবো।
__আচ্ছা ভালো থাকিস।
__হুম।
ফোন কেটে দিয়ে আসিফের দিকে তাকালো শারমিন। দরদর করে ঘামছে আর ঢোক গিলছে সে।শারমিন শাড়ির আচল দিয়ে মুখ মুছিয়ে দিলো আসিফের। সন্দেহজনক কঠোর দৃষ্টি দিয়ে সরে এলো।
রাত বোধহয় অর্ধেক পার হয়ে গেছে।আসিফ আর শারমিন তখন অর্ধেক ঘুমে।এমন সময় শারমিন অনুভব করলো আসিফের আস্তে আস্তে গলার অস্পষ্ট আওয়াজ আসছে। ঘর থেকে শার্ট প্যান্ট পড়ে বেরোচ্ছে সে।
শারমিন কিছুতেই বুঝতে দিলো না আসিফকে যে সে জেগে গেছে।আসিফের ছায়া মিলিয়ে যেতেই উঠে এলো শারমিন।
___________________
আসিফকে আসতে দেখেই হাউমাউ করে কেদে উঠলো তমা।আসিফ তমাকে বসতে বলল চেয়ারে।এই মুহুর্তে একটা আবাসিক হোটেলে বসে আছে দুজন।এরই মধ্যে সেখানে হাজির হলো একটা মধ্যবয়স্ক লোক।আসিফের সাথে তর্কের মাঝেই লোকটা ওর কলার চেপে ধরল।তারপরই একটা রুমে গেল তিনজন।বিছানার ওপর বসে কেদে যাচ্ছে তমা।এখনও দুজন কথা বলছে।লোকটার সাথে কথা বলার এক পর্যায়ে আসিফ বাইরে গেল সিগারেট খেতে।মাঝেমধ্যে শরীর খারাপ লাগলেই সিগারেট ধরায় সে।প্রায় চল্লিট মিনিট পড়ে রুমে যেতেই আশ্চর্য হয়ে গেল।তমার লাশ ঝুলছে ফ্যানের সাথে,আর মধ্যবয়স্ক লোকটার হৃৎপিণ্ডটা কেউ খুবলে বের করে নিয়েছে।এহেন ভয়ংকর রকমের চিত্র দেখে অন্তর আত্মা কেঁপে উঠলো ওর।সেখান থেকে বেরিয়ে যেতে গিয়েই উলটে পড়লো।খেয়াল হলো না যে হাতের ঘড়িটা ওখানেই পড়ে আছে।
ঐদিন রাতেই আসিফকে বাড়ি থেকে গ্রেফতার করা হয়েছে। কারণ যে ছুড়িটা দিয়ে খুন করা হয়েছে সেটায় আসিফের হাতের ছাপ রয়েছে।
পুরোটা রাত জেলে কাটানোর পর দেখা গেল শারমিনকেও হাজির করা হয়েছে পুলিশ স্টেশনে।পুলিশের সুপার শারমিনকে জিজ্ঞেসাবাদ করার জন্য নিয়ে গেল আলাদা ইনভেশটিগেট রুমে।পুলিশ ইনচার্জ সিগারেট ধরালেন।
__তা মিসেস শারমিন শেখ কে খুন করলো আপনার ছোট বোনকে? আপনার স্বামীকে শেষ দেখা গিয়েছিল তার রুম থেকে বেড়োনোর সময়।তা আবার একটা নিম্নমানের আবাসিক হোটেল থেকে।কি শাস্তি দেবো ওনার?
কেদে উঠলো শারমিন,
_ওর মতো জানোয়ারকে মেরে ফেলুন স্যার।ওর বাঁচার কোনো অধিকার নেই সমাজে।।
শারমিন যেতে নিলেই পথ আটকালো মহিলা পুলিশ।পেছনে ঘুরলো অফিসার,
__কেন মারলেন নিজের ছোট বোনকে? সে গর্ভবতী ছিল জানা সত্ত্বেও?
__আমি মারিনি ওকে।ও আমার ছোট বোন ছিল।
__সেটাই তো বলছি কেমন মারলেন?
__আমি মারিনি।
__আপনিই করেছেন খুন একটা না তাও আবার দু’দুটো।
স্বীকার করুন নইলে কি পরিমাণ অত্যাচার সইতে হবে ভাবতে পারছেন না।আপনিও গর্ভবতী আপনি কি চান আপনার বাচ্চার ক্ষতি হোক?
মুখের সামনে দু’ হাত এনে কেদে উঠলো শারমিন চিৎকার দিয়ে।
__কি করতাম আমি আমার সংসার ভাঙছিল ও।যে বোনকে পেলেপুষে বড় করলাম সেই বোনকেই আমার স্বামী ব্যবহার করল নিজের চাকরির বড় পজিশন পাওয়ার জন্য।চমার স্বামীর অফিসের বস ছিল যাকে খুন করেছি আমি।আমার স্বামী আমার ছোট বোনকে লোভ দেখায় যে আসিফ ওকে বিয়ে করবে।এই ভাবে নিজের চাকরিতে বড় পদ হাসিল করার জন্য ওর বসের কাছে পাঠায়,কিন্তু দূর্ভাগ্যবশত আমার ছোট বোন মা হতে চলছিল।আমি জানতে পারি যে ওরা দুজন মিলে আমার ছোট বোনকে মেরে জঙ্গলে ফেলে দেবে।তাই আমি সইতে পারিনি এই কারণে প্রথমে ওর বস আর তারপর আমার বোন দুজনকেই মেরে দিই।আর সব দোষ আসিফের ঘাড়ে চাপাই।টাকা দিয়ে ফুটেজ ডিলিট করে দিই।
__কিন্তু আপনি ধরা পড়ে যান।এই দেখুন শুধুমাত্র একটা চুড়ি যা আপনায় ফাঁসিয়ে দিলো।আপনি যখন নৃশংসভাবে খুন করছিলেন তখন এটা আপনার হাত থেকে খুলে ওখানেই পড়ে যায়।আপনি অবশ্যই ফাঁসিতে ঝুলবেন সাথে আপনার স্বামীও।
পেটের ওপর দুহাত চেপে চাপা,বোবা কান্নায় ভেঙে গেল শারমিন।দুনিয়াটা শুধুই ভালোমানুষের মুখোশে থাকা জানোয়ারদের নয় এখানে সবার ন্যায় পাওয়ার হক আছে।আর কোনো শারমিন কিংবা তমারা বলির শিকার না হোক।আর কোনো আসিফ কিংবা ওর বসের মতো জানোয়ার না থাকুক।
#সমাপ্ত
