#অন্তঃকরণে_তুমি
#নাফিসা_বিনতে_সুলতান
সূচনা পর্ব
সময়টা ১৯৭৫ সালের এক বিকেলে। বিছানার উপর সাদা রঙের ফ্রক পড়ে বসে আছে তিন বছরের একটি মেয়ে আয়জা । তার পাশে শুয়ে আছে তার নয় দিন বয়সী ছোট ভাই সাফওয়ান। তাদের মা মেহেরুন্নেসা ঘরের টুকটাক কাজ করছিলেন। সেই সময় তার হঠাৎ টয়লেটে যাবার দরকার পড়ে। তিনি বাচ্চাদের কাছে আসেন। সাফওয়ান ঘুমিয়ে আছে। ছেলেকে ঘুমাতে দেখে উনি নিশ্চিত হলেন। উনি আয়জাকে উদ্দেশ্য করে বললেন,
আয়জা আমি একটু টয়লেটে যাচ্ছি তুমি ভাইয়ের দিকে খেয়াল রেখো।
_ আচ্ছা।
_ ভাই যদি ঘুম থেকে উঠে কান্না করে আমাকে ডাক দিও কেমন?
_ আচ্ছা।
উনি মেয়েকে বুঝিয়ে টয়লেটে প্রবেশ করেন। আয়জা খাটে বসে তার খেলনা দিয়ে খেলা করছিলো। সে বর্তমানে টুকটাক কথা বলতে পারে। আয়জা খুবই চঞ্চল একটি মেয়ে। সে বেশিক্ষন এক জায়গায় স্থির থাকে না। এক খেলনা দিয়ে বেশিক্ষন খেলে না। সারাদিন তুরতুর করে ঘুরে বেড়ায় পুরো ফ্ল্যাটে। খেলতে খেলতে এক পর্যায়ে তার চোখ যায় ঘুমন্ত সাফওয়ানের দিকে। সে এগিয়ে গিয়ে সাফওয়ানকে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখতে থাকে। তার চোখ আটকে যায় সাফওয়ানের নাভির দিকে। নাভিটি উঁচু হয়ে কিছুটা ফুলে আছে। (ছোট বাচ্চাদের সাত থেকে চৌদ্দ দিনের মধ্যে নাভি শুকিয়ে পড়ে যায়) । আয়জা সাফওয়ানের নাভি নিয়ে খেলতে থাকে। এক পর্যায়ে সে সাফওয়ানের নাভি ধরে টান দেয়। যার ফলে সাফওয়ানের নাভি ছিঁড়ে তার হাতে চলে আসে। ব্যথায় সাফওয়ানের ঘুম ভেঙে যায় এবং সে চিল্লিয়ে কান্না করে উঠে। চারিদিক র*ক্ত দিয়ে মেখে যায়। এই অবস্থা দেখে ভয়ে আয়জা ও কান্না করে উঠে। দুই ছেলে মেয়ের কান্নার আওয়াজে মেহেরুন্নেসা তাড়াহুড়ো করে দৌঁড়ে টয়লেট থেকে বের হন। রুমে এসে তিনি বাকরুদ্ধ হয়ে যান। তার দুই ছেলেমেয়ের শরীর র*ক্তে মাখামাখি হয়ে আছে। বিছানার চাদর, আয়জার সাদা ফ্রক সব র*ক্তে মেখে গিয়েছে। তিনি দৌঁড়ে গিয়ে ছেলেকে কোলে তুলে নেন । তাদের ফ্ল্যাট থেকে বের হয়ে পাশের ফ্ল্যাটের এক ভাবীকে ডাক দেন। তিনি একজন নার্স। তিনি এসে সাফওয়ানের ঘা সুন্দরমতো পরিষ্কার করে ঔষধ লাগিয়ে দেন। মেহেরুন্নেসা বিছানার চাদর পাল্টে ফেলেন এবং আয়জার ফ্রক ও পাল্টে দেন। ছোট আয়জা র*ক্ত দেখে বেশ ভয় পেয়েছে। এখনো ফুপিয়ে ফুপিয়ে কান্না করছে। মেহেরুন্নেসা যে মেয়েকে বকবেন এই কাজের জন্য মেয়ের কান্না দেখে তাও করতে পারছেন না।
কিছুক্ষণ পর দুইজনই শান্ত হয়ে যায় এবং কান্না থামিয়ে দেয়। দরজা নক করার আওয়াজে মেহেরুন্নেসা এগিয়ে যান দরজার দিকে। দরজা খুলে দেখেন তার স্বামী জাওয়াদ আহমেদ অফিস থেকে বাসায় ফিরেছেন। তিনি স্বামীর হাত থেকে তার অফিসের ব্যাগটি নিজের হাতে নেন এবং তাকে ভিতরে প্রবেশ করতে বলেন। জাওয়াদ আহমেদ ঘরে এসে বসেন। মেহেরুন্নেসা তাকে পানির গ্লাস এগিয়ে দেন। তিনি পানি পান করে মেয়েকে কোলে নিয়ে আদর করতে থাকেন। মেহেরুন্নেসা গ্লাস টেবিলে রাখতে রাখতে বলেন,
আজকে তোমার গুণধর মেয়ে কি করেছে জানো?
_ কি করেছে?
তিনি সব ঘটনা খুলে বলেন জাওয়াদ আহমেদকে। পুরো ঘটনা শোনার পর তিনি মেয়ের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করেন,
এমন কেনো করেছো আম্মা?
_ আমি তো খেলছিলাম একটু।
_ এমনটা করে না আম্মা। ভাইয়া ব্যাথা পেয়েছে না?
_ হুম।
_ যাও তাহলে ভাইয়াকে সরি বলো আর আদর করে দিয়ে আসো।
বাবার কথা মতো আয়জা ছোট ভাইকে আদর করে দেয় । ওর কান্ড দেখে জাওয়াদ আহমেদ এবং মেহেরুন্নেসা মুচকি হাসেন। মেয়েকে কি বা বলবেন সেও তো ছোট। ভালো মন্দের বুঝ তো তার এখনো হয় নি। জাওয়াদ আহমেদ মেহেরুন্নেসাকে জিজ্ঞেস করেন,
তাহমিদ কোথায়? এত কিছু ঘটলো ও বাসায় ছিলো না?
_ না ও তো স্কুল থেকে এসে খাওয়া, দাওয়া করে মাঠে খেলতে চলে গেছে।
_ ওহ।
_ তুমি হাত মুখ ধুয়ে এসো আমি খাবার বাড়ছি।
_ ঠিক আছে।
জাওয়াদ আহমেদ এবং মেহেরুন্নেসার তিন ছেলে মেয়ে। দুই ছেলে এবং এক মেয়ে। উনাদের বড় ছেলে তাহমিদ বয়স ছয় বছর। সে ক্লাস টু তে পড়ে। মেঝো মেয়ে আয়জা তার বয়স তিন বছর এবং ছোট ছেলে সাফওয়ান যার বয়স নয় দিন। জাওয়াদ আহমেদ সরকারি চাকরি করেন যার কারণে তাকে একেক সময় একেক জেলায় বদলি হতে হয়। সরকারি কোয়ার্টারে তারা বসবাস করেন। তিনি অত্যন্ত মেধাবী একজন লোক। তিনি উচ্চ পর্যায়ে সরকারি চাকরি করছেন। বর্তমানে তিনি যশোরে বদলি হয়েছে। সরকার কর্তৃক তাকে একটি ফ্ল্যাট দেওয়া হয়েছে। যেখানে রয়েছে দুইটি বেডরুম, একটি বারান্দা, একটি বাথরুম,রান্নাঘর, ডাইনিং এর জন্য একটি বিশাল জায়গা। সেখানে একসাইডে ডাইনিং টেবিল রাখা অন্য পাশে সোফা রাখা। তাদের বিল্ডিংটি পাঁচ তলা। জাওয়াদ আহমেদরা থাকেন তিন তলায়। তাদের পাশের ফ্ল্যাটে একটি দম্পতি থাকেন। খালেদ মাহমুদ এবং শারমিন আক্তার । খালেদ মাহমুদ সরকারি চাকরি করেন এবং শারমিন আক্তার একজন সরকারি হাসপাতালের নার্স। তাদের বিল্ডিং এর পাশাপাশি আরও দুটি বিল্ডিং আছে। সেখানেও সব সরকারি চাকরি করা লোকজনরা থাকে।
~~~~~~~~~~~~~~~~~
মেহেরুন্নেসা ঘরের সব কাজ শেষ করে দেয়াল ঘড়ির দিকে তাকান। পাঁচটা বেজে গিয়েছে। উনার স্বামী অফিস থেকে বাড়ি ফেরার সময় হয়েছে। তিনি ওয়াশরুম থেকে হাত মুখ ধুয়ে আসেন। তিনি সব সময় শাড়ি পড়েন।কাজ করে ঘেমে এবং বাচ্চাদের খাওয়াতে গিয়ে তার শাড়ি সেতসেতে হয়ে গিয়েছে। তাই তিনি হাতমুখ ধুয়ে শাড়ি পাল্টে অন্য একটি শাড়ি পড়েন। অগোছালো চুল গুলো চিরুনি দিয়ে আঁচড়িয়ে সুন্দর করে খোপা করেন। মুখে হালকা করে পাউডার দেন এবং ঠোঁটে দেন হালকা গোলাপী লিপস্টিক। চোখে পড়েন গাঢ় করে কাজল। মেহেরুন্নেসা দেখতে বেশ সুন্দরী। খুবই অল্প বয়সে তার বিয়ে হয়েছিলো।
দরজায় নক করার শব্দে উনি দৌঁড়ে গিয়ে দরজা খুলেন ।তার স্বামী সারাদিন কাজ করে ক্লান্ত হয়ে বাসায় ফিরেছেন। জাওয়াদ আহমেদ মেহেরুন্নেসাকে দেখে মুচকি হাসি দেন। তার অফিস ব্যাগ থেকে একটি প্যাকেট বের করে মেহেরুন্নেসার হাতে দেন। জাওয়াদ আহমেদ রুমে প্রবেশ করেন মেহেরুন্নেসা গেইট আটকিয়ে প্যাকেটটি খুলে দেখেন দুই ডজন গোলাপী রঙের কাঁচের চুড়ি। তিনি মুচকি হাসি দিয়ে চুড়ি গুলো হাতে পড়ে নেন। রান্না ঘরে এসে ঠান্ডা পানি দিয়ে শরবত বানাতে ব্যস্ত হয়ে পড়েন। সে কাজ করার সময় হাত নাড়ালেই তার হাতের কাচের চুড়িগুলোর রিনিঝিনি শব্দ ভেসে আসছে। রুম থেকে সেই শব্দ শুনে জাওয়াদ আহমেদ মুচকি হাসেন।
এটা তাদের প্রতিদিনের রুটিন। মেহেরুন্নেসা যত ব্যস্ত থাকুক না কেনো স্বামী আসার সময় হলে সে নিজেকে সাজাতে ব্যস্ত হয়ে পড়েন। নতুন শাড়ি, লিপস্টিক, কাজল দিয়ে নিজেকে সাজিয়ে তুলেন। জাওয়াদ আহমেদ প্রতিদিন অফিস থেকে আসার সময় কিছু না কিছু নিয়ে আসেন মেহেরুন্নেসার জন্য। কোনোদিন চুড়ি, কোনোদিন লিপস্টিক, কোনো দিন ফুলের গজরা।
আয়জা দৌঁড়ে বাবার কাছে আসে । জাওয়াদ আহমেদ মেয়েকে কোলে তুলে নেন। পকেট থেকে চকলেট বের করে মেয়ের হাতে দেন। বড় ছেলে তাহমিদকে ডেকেও তার হাতে চকলেট দেন। মেয়েকে কিছুক্ষণ আদর করে ছোট ছেলেকে কোলে তুলে নেন। তাকে কিছুক্ষণ আদর করে উনি ফ্রেশ হতে চলে যান। ফ্রেশ হয়ে এসে খাবার খেতে বসেন। মেহেরুন্নেসা তার অপেক্ষায় না খেয়ে বসে থাকেন প্রতিদিন। জাওয়াদ আহমেদ অনেক মানা করেছেন তবুও তিনি শুনেন না। জাওয়াদ আহমেদ ভাত মেখে প্রথম লোকমাটি মেহেরুন্নেসাকে খাওয়ান সব সময়। তারপর তিনি নিজে খাওয়া শুরু করেন। দুইজন খেতে খেতে তাদের সারাদিনে কি কি হয়েছে সব ঘটনা একে অপরকে বলেন।
রেডিও ওন করে কিছুক্ষণ রেডিও শুনেন তারা। মাগরিবের পর জাওয়াদ আহমেদ বড় ছেলে তাহমিদকে নিয়ে টেবিলে বসেন। তিনি নিউজ পেপার নেন পড়ার জন্য এবং তাহমিদ তার স্কুলের পড়া গুলো পড়তে থাকে। যেটা যেটা সে বুঝতে পারে না বাবার থেকে সাহায্য নেয়। তাহমিদ হয়েছে ওর বাবার মতন বুদ্ধিমান। এক পড়া তাকে বারবার পড়াতে হয় না। সে খুবই মেধাবী একজন ছাত্র। এই ছোট বয়স থেকেই সে বেশ গম্ভীর। হাসি ঠাট্টা হইহুল্লোড় সে তেমন একটা পছন্দ করে না। দিনের প্রায় বেশিরভাগ সময় সে পড়ায় ব্যয় করে। বিকেলে মাঠে গিয়ে বন্ধুদের সাথে কিছুক্ষণ ফুটবল খেলে।
চলবে।
