#অসময়ের_বৃষ্টি
#সূচনা_পর্ব
#তাসমিয়া_তাসনিন_প্রিয়া
“পনেরো বছরের একটা মেয়ের সাথে কীসের বাসর করব আমি? ও বাসরের ‘ব’ কি তা-ও তো বোঝে না! তোমরা কি সবাই পাগল হয়ে গেছ? একে তো জোর করে ঘাড় ধরে বিয়েটা করালে, এখন আবার বাসর নিয়ে টানাহেঁচড়া শুরু করেছ! সমাজে আমি কীভাবে মুখ দেখাব শুনি?”
এক নিঃশ্বাসে কথাগুলো বলে থামল আফ্রিদি। বুকটা রাগে হাঁপরের মতো ওঠানামা করছে তার। পরক্ষণেই খাটিয়ায় বসা তার দাদা সুফিয়ান খন্দকার খেঁকিয়ে উঠলেন,
“ঢং করো না আফ্রিদি! বিয়ে করছ বলে মুখ দেখাতে পারবা না? আর সারা এলাকায় যখন মাস্তানি করে বেড়াও, তখন মুখ দেখানোর হুঁশ থাকে কই, শুনি? আমরা গ্রামে থাকি বলে কি কিছু জানি না? এলাকায় মাস্তানি করে বেড়াও তুমি।”
আফ্রিদি দাদার দিকে কপাল কুঁচকে ত্যাড়ছা চোখে তাকাল। রাগটা এবার গিয়ে পড়ল বুড়োর ওপর।
“বুইড়া, তুমি বেশি কথা বলতেছ। তোমার এত শখ জাগলে তুমি নিজে আরেকটা বিয়ে করতে! আমার গলায় ওরকম পিচ্চিকে ঝুলায়া দিলা কেন?”
“আফ্রিদি! মুরুব্বির সাথে ঠিকমতো কথা বলো।”
বাবার কড়া ধমক খেয়ে বসা থেকে এক ঝটকায় উঠে দাঁড়াল আফ্রিদি।
“ ঠিকমতই বলছি। এরচেয়ে ঠিক বলতে গেলে বেঠিক হয়ে যাবে। আমার জীবন নিয়ে হাডুডু খেলে আবার আসছে ঠিকবেঠিক শেখাতে! “
বলেই হনহনিয়ে চলে গেল সেখান থেকে আফ্রিদি। মেজাজটা তার এমনিতেই অত্যধিক খারাপ, তার ওপর এই বাসর ঘরের যন্ত্রণা! ধুর! এসেছিল দাদাবাড়ি ফুপাতো ভাইয়ের বিয়ে খেতে। কিন্তু কে জানত, পরের ফেলে যাওয়া কনেকে নিজের বুকে জড়িয়ে বিয়ের পিঁড়িতে বসতে হবে! সব ওলটপালট হয়ে গেল মাত্র কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে।
দুপুরেই যখন জয়নাল খন্দকার তাঁর পরিবার নিয়ে হৃদয়পুর গ্রামে নিজের পৈতৃক ভিটায় পা রাখলেন, চারপাশটা তখন উৎসবমুখর। ঢাকা থেকে বেশ দূরের, ছবির মতো সুন্দর এই গ্রামটাতেই খন্দকার পরিবারের আদি প্রাণ। জয়নাল খন্দকারের এক ছেলে আর দুই মেয়ে। স্ত্রী শারমিন আর ছেলেমেয়েদের নিয়ে অনেকদিন পর গ্রামে আসায় দাদা সুফিয়ান খন্দকার আর দাদি ফরিদা খন্দকারের আনন্দের সীমা ছিল না। নাতি-নাতনিদের কাছে পেয়ে তাঁরা যেন হাতে চাঁদ পেয়েছিলেন।
পথের ক্লান্তি শেষে সবাই হাত-মুখ ধুয়ে ফ্রেশ হয়ে দুপুরের খাওয়া-দাওয়া সেরে নিয়েছিল। ঠিক ছিল, বিকেলবেলা সবাই মূল বিয়ের অনুষ্ঠানে যাবে। জয়নালের ছোট বোন শিউলির একমাত্র ছেলের বিয়ে আজ এলাকারই এক মেয়ের সাথে। উল্লেখ্য, জয়নালরা তিন ভাইবোন। জয়নাল সবার বড়, মেজো বোন শিউলি, আর ছোট ভাই সালাম থাকে ইউকেতে। তবে সালামের সাথে খন্দকার বাড়ির সম্পর্ক নেই বললেই চলে।
বিকেল গড়াতেই ধুমধাম করে সবাই কনে বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা দিল। জয়নালের বড় ছেলে আফ্রিদি। সদ্য পড়াশোনা শেষ করে আপাতত টো টো কোম্পানির ম্যানেজারগিরি করে আর এলাকায় দাপট দেখায়। আর তার সাথে আছে দুই যমজ বোন –সারা আর জারা, ওরা এবার সবে এইচএসসি পরীক্ষা দিয়েছে।
কনে বাড়ি পৌঁছানোর পর সব ঠিকঠাকই চলছিল। কিন্তু বিয়ে শুরুর ঠিক আগ মুহূর্তে জানা গেল, বর অর্থাৎ আফ্রিদির ফুপাতো ভাই নিজের পালিয়ে গেছে। আর তখনই বিয়েবাড়িতে হইহট্টগোল শুরু হয়ে গেল।
কনেপক্ষের কান্নাকাটি আর আচরণে খন্দকার পরিবারের ইজ্জত মাঝনদীতে ডুবুডুবু। স্মৃতি এতিম মেয়ে, মামার বাড়িতে বড় হয়েছে। বয়স সবেমাত্র পনেরো ছুঁয়েছে। আজ তার জীবনের সবচেয়ে বড় খুশির দিন হওয়ার কথা ছিল, অথচ বরের এভাবে পালিয়ে যাওয়া মানে সমাজে মেয়েটার চিরদিনের জন্য মুখ পুড়বে। স্মৃতির মামা সোবাহান আলী বলতে গেলে জয়নাল খন্দকারের পা জড়িয়ে ধরে কাঁদতে লাগলেন। খন্দকার বাড়ির সবার খুব খারাপ লাগছিল। কারণ এই ঘটনায় তো কনে কিংবা কনে পক্ষের কোনো দোষ ছিল না। বিশেষ করে স্মৃতির বাবা-মা নেই শুনে আফ্রিদির মা শারমিনের চোখ পানি চলে এল। ভদ্রমহিলা খুব নরম মনের মানুষ। তার ওপর নিজেও এতিম। তিনি জয়নাল খন্দকারের হাত ধরে বললেন,
“মেয়েটার কোনো দোষ নেই। আমাদের বংশের ছেলের পাপের শাস্তি ও কেন পাবে? তুমি আফ্রিদিকে বলো।”
সুফিয়ান খন্দকার আর ফরিদা খন্দকারও খুব করে চাইলেন স্মৃতি যেন খন্দকার বাড়ির বউ হয়। কারণ মেয়েটা তাদের পরিচিত। ওর আচার-আচরণ খুব ভালো। সেজন্য সুফিয়ান ও ফরিদা আফ্রিদির হাত ধরে অনুরোধ করতে লাগলেন,
“ভাইরে, আমাদের বংশের মুখটা তুই রক্ষা কর। এই এতিম মেয়েটাকে তুই আপন করে নে।”
আফ্রিদি মুখে অনেকবার না করলেও শেষে রাজি হলো ঠিকই, কিন্তু সুযোগ পেতেই বাড়ির পেছনের দেয়াল টপকে পালানোর ধান্দা করছিল! সে এলাকার মাস্তান হতে পারে, কিন্তু বোকা নয়। পনেরো বছরের এক পিচ্চির দায়িত্ব কাঁধে নেওয়ার কোনো শখ তার নেই। কিন্তু কপাল খারাপ, দেয়াল পার হওয়ার আগেই বাপের খড়হস্ত এসে পড়ল তার ঘাড়ে। জয়নাল খন্দকার তাঁর বড় ছেলেকে টেনে হিঁচড়ে ঘরে নিয়ে এলেন।
আফ্রিদি রেগে গিয়ে ফিসফিসিয়ে বলল,
“বাবা, আমি এই বিয়ে করব না মানে করব না! তোমরা সবাই মিলে আমার লাইফটা এভাবে হেল করতে পারো না।”
জয়নাল খন্দকার রাগে কাঁপছেন। ছেলের মুখের ওপর আঙুল তুলে শেষ অস্ত্রটা ছাড়লেন,
“আফ্রিদি, আমার ফুপা-ফুপির দিকে তাকিয়ে দেখ, ওদের ইজ্জত আজ ধুলোয় মিশে যাচ্ছে। খন্দকার বাড়ির রক্ত কখনো কাপুরুষ হয় না। তুই যদি আজ এই মেয়েটাকে বিয়ে না করিস, তবে আজ এই মুহূর্ত থেকে তোকে আমি ত্যাজ্যপুত্র করলাম! বাড়ির দরজায় তুই আর কোনোদিন পা দিবি না, আমার এক পয়সার সম্পত্তিও তুই পাবি না।”
বাবার মুখের ‘ত্যাজ্যপুত্র’ শব্দটা শুনে আফ্রিদির পায়ের তলার মাটি সরে গেল। সে ভালো করেই জানে, তার বাবা মুখে যা বলেন, কাজেও তা-ই করেন। একদিকে বেকারত্বের জ্বালা, তার ওপর যদি বাবার সম্পত্তি আর আশ্রয়ও চলে যায়, তবে তার মাস্তানি যে লাটে উঠবে সেটা সে ভালো করেই বুঝতে পারল।
শেষমেশ, ভেতরে ভেতরে রাগে-ক্ষোভে ফুঁসতে ফুঁসতে, সমস্ত অনিচ্ছা আর বাধ্যবাধকতা কাঁধে নিয়ে আফ্রিদি বিয়ের পিঁড়িতে গিয়ে বসল। তিনবার ‘কবুল’ বলার সময় তার মনে হচ্ছিল সে বিয়ের খাতা নয়, নিজের ডেথ ওয়ারেন্টে সই করছে। আর তার পাশে ঘোমটা মাথায় লাল বেনারসি পরে কাঁপছিল পনেরো বছরের স্মৃতি, যে তখনো জানেই না তার ভাগ্যের চাকা কোন দিকে ঘুরে গেছে।
বর্তমান….
দাদাবাড়ির সবার ওপর আফ্রিদির প্রচণ্ড ক্ষোভ উথলে উঠেছে। রাগের চোটে সে আর এক সেকেন্ডও এখানে থাকবে না বলে সিন্ধান্ত নিল। কাউকে কিছু না জানিয়ে, বিয়ের শেরওয়ানিটা গা থেকে ঝেড়ে ফেলে একটা টি-শার্ট আর জিন্স গলিয়ে রাতের অন্ধকারেই ঢাকার উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পড়ল সে।
মধ্যরাতের শুনশান গ্রাম্য পথ। বুকভর্তি ফ্রাস্ট্রেশন আর মেজাজটা তখন তার চড়চড় করে সপ্তমে চড়ছে। পকেট থেকে লাইটার বের করে একটা সিগারেট ধরাল আফ্রিদি। গভীর টানে সিগারেটে একটা লম্বা দম নিয়ে ধোঁয়াটা বাতাসে ছাড়ল। তার মনে হচ্ছে নিজের ভেতরের সবটুকু রাগ সে ধোঁয়ার সাথে উগড়ে দিচ্ছে। একের পর এক সিগারেট ফুঁকতে ফুঁকতে সে হনহন করে হেঁটে মেইন রোডের দিকে এগোতে লাগল।
তার মাথায় একটাই চিন্তা ঘুরপাক খাচ্ছে,কী হয়ে গেল আজ তার জীবনে! মাত্র কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে সে একটা পনেরো বছরের বাচ্চার স্বামী হয়ে গেল!
সিগারেটের লালচে আলোয় আফ্রিদির চোখমুখ আরও শক্ত দেখাল। সে তো ওই মেয়েটার, মানে স্মৃতির মুখটাও ভালো করে দেখেনি। বিয়ের পিঁড়িতে যখন পাশে বসেছিল, শুধু লাল বেনারসির মস্ত বড় ঘোমটাটুকুই নজরে পড়েছে। কেবল কানে এসেছে মেয়েটা নাকি অনেক ছোট, বয়স মাত্র পনেরো!
ভাবতে ভাবতে আফ্রিদির ঠোঁটের কোণে একটা তাচ্ছিল্যের হাসি ফুটে উঠল। সত্যি, গ্রামগঞ্জে এখনো এই বয়সে কত মেয়ের বিয়ে হয়ে যায়! গ্রামের মানুষ এগুলোকে খুব স্বাভাবিকভাবেই নেয়। কিন্তু সে তো শহুরে ছেলে, মাস্টার্স পাস করেছে। সে খুব ভালো করেই জানে, আইন অনুযায়ী এটা সম্পূর্ণ বেআইনি এবং দণ্ডনীয় অপরাধ। নিজের অজান্তেই সে একটা বাল্যবিয়ে করে ফেলেছে! সমাজে, বন্ধুদের কাছে সে এখন মুখ দেখাবে কীভাবে? সবাই যদি জানতে পারে আফ্রিদি একটা ফ্রক পরা ইস্কুলপড়ুয়া বাচ্চার জামাই হয়েছে, তবে তার এতদিনের মাস্তানির ইমেজ এক নিমেষে ধুলোয় মিশে যাবে।
মাথার ভেতর চিন্তার জটলা যত বাড়ছে, আফ্রিদির সিগারেটের টান তত ঘন হচ্ছে। একটা শেষ হতে না হতেই সে পকেট থেকে আরেকটা সিগারেট বের করে লাইটার জ্বালল। জ্বলন্ত সিগারেটের ধোঁয়ায় চারপাশটা ঝাপসা হয়ে আসছে, ঠিক যেন তার নিজের ভবিষ্যতের মতোই ঝাপসা আর অনিশ্চিত!
*
নতুন বউয়ের সাজে সুসজ্জিত হয়ে মশারির ভেতর গুটিসুটি মেরে শুয়ে আছে স্মৃতি। রাত একটু বাড়তেই মেয়েটার চোখে রাজ্যের ঘুম নেমে এসেছে। এমনিতে স্মৃতি একদম ছিপছিপে গড়নের, গায়ের রঙ দুধে-আলতা। আর তার সবচেয়ে সুন্দর সম্পদ হলো তার চুলগুলো! পিঠ ছাড়িয়ে একেবারে হাঁটু অবধি নেমে গেছে। এত লম্বা আর ঘন চুল সামলাতে অনেক মেয়েরই হিমশিম খাওয়ার কথা, কিন্তু স্মৃতি এই বয়সেই নিজের চুলগুলো খুব যত্ন করে, সুন্দরভাবে সামলে রাখে।
বিয়েবাড়ির এত হুলস্থুল আর কান্নাকাটির মাঝে স্মৃতি শুধু এটুকুই বুঝতে পেরেছে যে, যে ছেলের সাথে তার বিয়ে হওয়ার কথা ছিল, সে বদলে গেছে। তার জায়গায় অন্য কেউ একজন বসেছে। তবে নতুন বরের মুখটা সে দেখার সুযোগ পায়নি, মস্ত বড় ঘোমটার আড়ালে শুধু তার লম্বা চওড়া অবয়বটুকুই নজরে পড়েছে। অবশ্য সেসব নিয়ে ওর কোনো মাথাব্যথা নেই।
কিছুক্ষণ আগেই ঘরের দরজা ঠেলে ভেতরে এসেছিলেন তার শাশুড়ি শারমিন। স্মৃতির মলিন মুখটার দিকে তাকিয়ে তাঁর বুকটা হাহাকার করে উঠেছিল। পরম মমতায় স্মৃতির মাথায় হাত বুলিয়ে তিনি বলে গেছেন,
“স্মৃতি? অনেক ধকল গেছে তোমার ওপর দিয়ে। আর জেগে থাকতে হবে না, তুমি নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে পড়ো। আগামীকাল সকালেই আমরা সবাই মিলে ঢাকার উদ্দেশ্যে রওনা দেব।”
শ্বশুরবাড়ির মুরুব্বির অবাধ্য হতে নেই–মামার থেকে এই শিক্ষা পেয়েছে স্মৃতি। মামিও পইপই করে বলেছেন, শ্বশুর বাড়ি গিয়ে সবার কথা শুনবি। তাই শাশুড়ির কথামতো সে চোখ বুজেছিল, আর কখন যে গভীর ঘুমে তলিয়ে গেছে নিজেও জানে না।
বাসর রাতে নতুন বর কেন ঘরে এল না, কেন চারপাশের মানুষ ফিসফিস করছে এইসব জটিল হিসেব-নিকেশ নিয়ে স্মৃতির বিন্দুমাত্র মাথাব্যথা নেই। তার কাছে ঘুমটাই এখন সবচেয়ে বড় শান্তি। সে ঘুমে বিভোর, অথচ সে জানেই না যে তার বর ততক্ষণে কিলোমিটারের পর কিলোমিটার পথ পেরিয়ে তাকে ফেলে ঢাকার দিকে ছুটে চলেছে।
চলবে….
