#অন্তঃকরণে_তুমি
#নাফিসা_বিনতে_সুলতান
পর্ব: ১৪
আয়জা !
ভাইয়ের আওয়াজ পেয়ে আয়জার ভয়ে আত্মা কেঁপে উঠে।
তাহমিদ বিকালে বন্ধুদের সাথে ফুটবল খেলতে বেরিয়েছিল। খেলা শেষে বন্ধুদের সাথে একত্রে বাড়ির উদ্দেশ্যে যাচ্ছিল সে। তার বন্ধু মহলের মধ্যে থেকে একজন তাকে উদ্দেশ্য করে জিজ্ঞেস করে,
আরে তাহমিদ এটা তোর বোন না?
বন্ধুর হাতের ইশারার দিকে তাকিয়ে তাহমিদ অবাক হয়ে যায়। এ তো দেখছি আসলেই তার বোন আয়জা। সে অবাক হয়ে চোখ বড় বড় করে বোনের দিকে তাকিয়ে থাকে। তার আরেক বন্ধু তাকে জিজ্ঞেস করে,
তাহলে তোর বোন এখানে কি করছে? আর বাইকের উপর বসা ছেলেটা কে ? তুই কি চিনিস তাকে?
তাহমিদ কারো কথার কোন উত্তর দিচ্ছে না। সে শুধু বিষ্ময় নিয়ে বোনের দিকে তাকিয়ে আছে। তার বোনের হাবভাব এবং চোখের চাহনি দেখে তার আর কিছু বুঝতে বাকি থাকে না। সেই মুহূর্তে সে আয়জাকে ডাক দেয়। আয়জা ভাইয়ের কন্ঠ শুনে ভয়ে কেঁপে ওঠে। তাহমিদকে দেখে সে চমকে উঠে। তার পরিবারের কেউ যাতে তাকে দেখতে না পায় এর জন্য সে বাড়ি থেকে এক গলি পরে এসে দাঁড়িয়েছিল। কিন্তু ওই যে কথায় আছে না যেখানে বাঘের ভয় সেখানেই রাত হয়। এত কিছু করার পরও দিনশেষে সে ধরা পড়েই গেল। তাহমিদ আয়জার সামনে এসে দাঁড়িয়ে তাকে চোখ রাঙিয়ে জিজ্ঞেস করে,
এখানে কি করছিস তুই?
আয়জা ভয়ে আমতা আমতা করে বলে,
আ আ আসলে ভাইয়া
তাহমিদ আয়জার হাত ধরে একপ্রকার তাকে টেনে নিয়ে যেতে যেতে বলে,
আসলে নকল কি হয়েছে সেগুলো তো সব তুই আম্মা আব্বার সামনে গিয়ে বলবি।
আয়জাকে এভাবে টেনে নিয়ে যেতে দেখে আরহান বাধা দেওয়ার চেষ্টা করে তাহমিদকে বলে,
ওকে এভাবে টেনে নিয়ে যাচ্ছো কেন? আমার কথাটা তো শোনো।
তাহমিদ রাগান্বিত স্বরে বলে,
যা শোনার আমি আমার বোনের কাছ থেকে শুনবো। কিন্তু এখানে না বাসায় গিয়ে। আর তোমার থেকে কিছু শোনার ইচ্ছা আমি রাখি না। এটা আমার ফার্স্ট এবং লাস্ট ওয়ার্নিং। আমার বোনের আসেপাশে যাতে তোমাকে আমি আর কোনদিন না দেখি।
কথাগুলো বলে তাহমিদ আয়জাকে টেনে বাসায় নিয়ে যেতে থাকে কারো তোয়াক্কা না করে। মেহেরুন্নেসা এবং জাওয়াদ আহমেদ সোফায় বসে বিকেলের চা খাচ্ছিলেন এবং গল্প করছিলেন। এমন সময় তাহমিদ এসে তাদের সামনে আয়জাকে একপ্রকার ছুড়ে মারে। আয়জা হঠাৎ এমন ছুঁড়ে মারায় তাল সামলাতে না পেরে নিচে পড়ে যায় এবং হাঁটুতে ব্যথা পায়। মেয়েকে এভাবে পড়ে যেতে দেখে মেহেরুন্নেসা তাড়াতাড়ি গিয়ে তাকে তুলে এবং জাওয়াদ আহমেদ ছেলেকে ধমক দিয়ে ওঠেন এবং জিজ্ঞেস করেন,
এটা কোন ধরনের ব্যবহার তাহমিদ?
তাহমিদ রাগান্বিত স্বরে বাবাকে বলে,
সেটা আমাকে জিজ্ঞেস না করে তোমার মেয়েকে জিজ্ঞেস করো।
এবার মেহেরুন্নেসা জিজ্ঞেস করেন,
কি করেছে ও?
তাহমিদ রাগান্বিত স্বরে বলে,
ওকে আমি মাত্র আমাদের বাড়ির এক গলি সামনে আরহানের সাথে দেখেছি।
মেহেরুন্নেসা শান্ত স্বরে বলেন,
তো কি হয়েছে? ও নীলিমার ভাই ওর সাথে কথা বলতেই পারে।
তাহমিদ রাগান্বিত স্বরে বলে,
আচ্ছা ঠিক আছে তাহলে তুমি আমাকে এটা বুঝাও আরহান ওকে এসব কেন দিয়েছে?
তাহমিদ আরহানের দেওয়া বক্সটি তাদের দিকে ছুড়ে মারে , যার কারণে বক্সে থাকা কাঁচের চুড়ি গুলো ভেঙে যায় এবং কানের দুল গুলো ছিটকে পড়ে।
এগুলো দেখে মেহেরুন্নেসা অবাক চোখে একবার মেঝেতে পড়ে থাকা ভাঙা কাঁচের চুড়ির টুকরো গুলোর দিকে তাকান আবার একবার আয়জার দিকে তাকান। তিনি একদম শান্ত স্বরে আয়জাকে প্রশ্ন করেন,
এগুলো কি আয়জা?
আয়জা সেই যে রাস্তা থেকে কান্না শুরু করেছে এই পর্যন্ত তার কান্না থামেনি। এখনো সে ফুঁপিয়ে ফুপিয়ে কেদেই চলেছে। আয়জাকে উত্তর দিতে না দেখে মেহেরুন্নেসা এবার গলার স্বর উঁচু করে জিজ্ঞেস করেন,
আমি কিছু জিজ্ঞেস করছি তোমাকে উত্তর দিচ্ছো না কেন?
মায়ের ধমকে আয়জার কান্নার বেগ বেড়ে যায়। তবুও সে কোনো উত্তর দেয় না।
তাহমিদ বলে,
ও কি উত্তর দিবে? ওর কি উত্তর দেওয়ার মতো মুখ আছে? ওর এত সাহস বাড়লো কীভাবে? ওকে জিজ্ঞেস করো কতদিন ধরে চলছে এসব?
আয়জা তার জামার ওড়না খামচে ধরে কান্না করে যাচ্ছে। মেহেরুন্নেসা মেয়ের দিকে কিছুক্ষণ শান্ত চোখে চেয়ে থেকে হঠাৎ করে জোরে আয়জার গালে চড় বসিয়ে দেন। চড়ের বেগ এতটাই বেশি ছিলো যে আয়জা তাল সামলাতে না পেরে নিচে পড়ে যায়। তার গালে মায়ের হাতের পাঁচ আঙুলের ছাপ বসে যায়। মেহেরুন্নেসা আয়জার চুলের মুঠি ধরে তাকে দাড়া করান এবং জিজ্ঞেস করেন,
এত সাহস কিভাবে হলো তোর? মনে ভয় করলো না? মনে একবার ও এই চিন্তা আসে নি যে আমি জানলে তোর কি হাল হবে?
তিনি আয়জার চুলের মুঠি ছেড়ে তার গলা চেপে ধরে জিজ্ঞেস করেন,
আমি কি বেশি ছাড় দিয়ে ফেলেছি? নাহলে এত সাহস তুই কিভাবে পেলি? বেশি বড় হয়ে গেছিস? যৌবন এসে গেছে যে প্রেম করা শুরু করেছিস? আগে বলবি না? তাহলেই তো বিয়ে দিয়ে দিতাম।
মেহেরুন্নেসার এসব কথা শুনে জাওয়াদ আহমেদ বলেন,
এগুলো কি বলছো তুমি?
_ঠিকই বলছি। এসবের পিছনে তোমার সবচেয়ে বেশি দোষ। মেয়েকে অতিরিক্ত লাই দিয়েছো এখন তোমার মাথায় উঠে নাচছে। এখন আমরা না জানলে হয়তো কয়দিন পর আমাদের মুখে চুনকালি মেখে পালিয়ে যেতো।
_আমার মেয়ের উপর আমার বিশ্বাস আছে। আমার মেয়ে কখনো এমন করতেই পারে না। তোমরা ওকে ভুল বুঝছো।
জাওয়াদ আহমেদ মেয়েকে নিজের সামনে দাঁড়া করিয়ে তাকে মাথায় হাত বুলিয়ে জিজ্ঞেস করেন,
আয়জা আম্মা আমার কান্না করো না। ওরা তো তোমাকে ভুল বুঝছে। ওদের ভুলটা ভাঙিয়ে দাও। তুমি বলো আরহানের সাথে তোমার কোনো সম্পর্ক নেই।
আয়জার কান্নার গতি বেড়ে যায়। সে মাথা নিচু করে ফেলে। জাওয়াদ আহমেদ হতভম্ব হয়ে যান। তার মেয়ে যে তার বিশ্বাসকে এভাবে ভেঙে গুড়িয়ে দিবে সে কখনো কল্পনাও করেননি। আয়জা কান্না করতে করতে মাটিতে বসে পড়ে এবং বলে,
আমাকে মাফ করে দাও আব্বা।
জাওয়াদ আহমেদ শান্ত এবং ঠান্ডা গলায় বলেন,
যা হওয়ার হয়েছে। তাকে ভুলে যাও তুমি।
আয়জা হিচকি তুলতে তুলতে বলে,
আমি পারবো না আব্বা। আমি তাকে অনেক ভালোবাসি।
এই কথা বলার সাথে সাথে মেহেরুন্নেসা তার চুলের মুঠি ধরে টেনে তুলে যার কারণে আয়জা প্রচন্ড ব্যাথা পায়। মেহেরুন্নেসা রাগে গর্জে উঠে বলেন,
নির্লজ্জ, বেহায়া মা বাবার সামনে ভালোবাসার প্রেমের কথা কিভাবে বলিস তুই? লজ্জা শরম সব শেষ তোর? ছিঃ ছিঃ। এই শিক্ষা দিয়েছি তোকে? তুই ভালোবাসার কি বুঝিস হ্যাঁ? এখনো নাক টিপলে দুধ বের হবে ।
তাদের এসব কথাবার্তার মাঝেই ঘরে প্রবেশ করে আরহান। আয়জার এই অবস্থা দেখে সে দৌড়ে আয়জার কাছে যায় এবং মেহেরুন্নেসার কাছ থেকে আয়জাকে সরিয়ে আনে। আরহানকে তাদের ঘরে দেখে তাহমিদ আরো বেশি রেগে যায় এবং আরহানকে একটি ঘু*ষি মারে। সে আরহানের সামনে গিয়ে তার শার্টের কলার ধরে কাছে এনে তাকে রাগান্বিত স্বরে জিজ্ঞেস করে,
তোর সাহস কি করে হলো আমাদের বাসায় আসার? কিছুক্ষণ আগে তোকে মানা করে এসেছিলাম না? সাহস বেশি বেড়ে গিয়েছে? তবে আয় আজকে তোর সাহস আমি মাপবো।
আরহান তাহমিদের হাত নিজের শার্টের কলার থেকে সরিয়ে শান্ত কন্ঠে বলে,
আমি এখানে ঝগড়াঝাঁটি করতে আসি নি । আমি এসেছি সমাধান করতে।
তাহমিদ রাগান্বিত সরে বলে,
তোর সাথে কোন সমাধান হবে না । তুই এই মুহূর্তে আমার বাড়ি থেকে বের হবি।
তাহমিদ আবারো জোরে আরহানকে একটি ঘু*ষি মারে যার কারনে আরহানের নাক দিয়ে র*ক্ত বের হতে থাকে। আরহানের এই অবস্থা দেখে আয়জা ছুটে তার কাছে গিয়ে ভাইয়ের কাছে মিনতি করে,
ভাইয়ার মেরো না প্লিজ । দয়া করো।
মেহেরুন্নেসা বলেন,
আরহান তুমি চলে যাও।
আরহান মেহেরুন্নেসার সামনে গিয়ে তার হাত ধরে শান্ত সরে বলে,
খালাম্মা আমি আয়জাকে সত্যিই অনেক ভালবাসি। আমি তাকে বিয়ে করতে চাই। আপনি দয়া করে আমাদের সাথে এরকম করবেন না।
_আমার মেয়েকে আমি তোমার কাছে বিয়ে দিবো না।
_কেন দিবেন না? কি কমতি আছে আমার মধ্যে? আমি আমার সর্বোচ্চ দিয়ে আপনার মেয়েকে সুখি রাখার চেষ্টা করবো।
_আমি এখন এসব বিষয়ে কোন কথা বলতে চাই না।
_আমাকে কিছুদিন সময় দিন । আমি পড়ালেখা শেষ করে একটা ভালো চাকরি করে তারপর আয়জাকে আপনার কাছ থেকে চেয়ে নিয়ে যাব। সেই পর্যন্ত আমাকে একটু সময় দিন।
আরহান এবার জাওয়াদ আহমেদের সামনে গিয়ে বলে,
খালু আপনি অন্তত বুঝার চেষ্টা করুন। আমাকে একটু সময় দিন নিজেকে গুছিয়ে নেয়ার। আমি কখনো আয়জার খারাপ চাইতে পারিনা আমাকে একটু সময় দিন।
এবার আয়জা তার বাবার সামনে গিয়ে বাবার হাত ধরে বলে,
আব্বা একটু সময় দাও ওনাকে।
জাওয়াদ আহমেদ মেয়ের দিকে কিছুক্ষণ চেয়ে থেকে আরহানের উদ্দেশ্যে বলেন ,
বাসায় চলে যাও এবং তোমার আম্মাকে আমাদের বাসায় আসতে বলো। এভাবে আমার মেয়ের ভবিষ্যৎ আমি নষ্ট হতে দিতে পারি না। তোমরা যখন নিজেরা নিজেদের মতো সিদ্ধান্ত নিয়েই ফেলেছো এখানে আমাদের আর বলার কিছু নেই। কারণ তোমার নিজেদের বুঝ নিজেরা বুঝেছো। আমাদের মতামত জানার প্রয়োজনবোধ মনে করো নি। আমাদের সিদ্ধান্তকে তোমরা গুরুত্বপূর্ণ ভাবো নি। যাই হোক তোমার আম্মাকে বলো আমাদের বাসায় বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে আসতে আমরা বড়রা মিলে সব ঠিকঠাক করে তোমাদের এনগেজমেন্ট করে রাখবো তারপর তুমি যখন সাবলম্বী হবে তখন তোমাদের বিয়ে হবে।
আরহান খুশি মনে তাকে উত্তর দেয়,
জি ঠিক আছে। আমি আজকেই গিয়ে আম্মার সাথে কথা বলবো ।
আরহান আয়জাকে আশ্বস্ত করে সেখান থেকে চলে যায়। আয়জা তার বাবার দিকে তাকায় কিন্তু তার বাবা তার দিকে না তাকিয়ে সোজা ঘরে চলে যান। মেহেরুন্নেসাও তার সাথে কোন কথা না বলে সেখান থেকে চলে যান। তাহমিদ রাগে সেখানে থাকা একটি ফুলদানি আছাড় মেরে ভেঙে বাড়ি থেকে বের হয়ে যায়। আয়জা মাটিতে বসে ফুলদানির ভাঙা অংশগুলো কুড়িয়ে নেয় ফেলে দেয়ার জন্য এবং ফুঁপিয়ে কান্না করতে থাকে।
চলবে।
#অন্তঃকরণে_তুমি
#নাফিসা_বিনতে_সুলতান
পর্ব: ১৫
আরহান বাসায় এসে চারিদিকে তার মাকে খুঁজতে থাকে। রান্নাঘরে টুং টাং আওয়াজ পেয়ে সে রান্নাঘরের দিকে ছুটে যায়। সেখানে গিয়ে সে দেখতে পায় তার মা থালা বাটি ধুচ্ছেন। আরহান তার মায়ের সামনে দাঁড়িয়ে তার মাকে উদ্দেশ্য করে বলে,
আম্মা তোমার সাথে আমার অনেক জরুরী কথা আছে।
আরহানের মা থালা বাটি ধুতে ধুতেই প্রতিউত্তরে বলেন,
কি বলবি বল আমি শুনছি।
আরহান তার মায়ের কাছ থেকে থালা বাটি গুলো কেড়ে নিয়ে সেগুলো সিঙ্ক এর উপর রাখে এবং তার হাত ধুইয়ে পানির কল বন্ধ করে তাকে চেয়ারে বসায়। সে নিজেও তার মায়ের পাশে বসে তার মায়ের হাত ধরে বলে,
তুমি এখন আগে আমার কথা শোনো। কাজ তুমি পরেও করতে পারবে।
_আচ্ছা ঠিক আছে বল কি বলবি।
_আম্মা আমি একজনকে পছন্দ করি এবং তাকে আমি বিয়ে করতে চাই।
আরহানের মা বেশ অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করেন,
কি?
আরহান শান্ত সরে উত্তর দেয়,
হ্যাঁ।
_কাকে পছন্দ করিস?
_তুমি তাকে খুব ভালো করেই চেনো।
_আমি চিনি তাকে?
_হ্যাঁ।
_কথা এরকম ঘোরপ্যাচ না করে সোজাসুজি বল।
_আমি আয়জাকে পছন্দ করি।
আরহানের মা আরেক দফা অবাক হন এবং প্রশ্ন করেন,
আমাদের আয়জা?
_হ্যাঁ তোমাদের আয়জা।
_তাহলে তো কোন সমস্যায় নেই। আয়জাকে তো আমরা সবাই অনেক পছন্দ করি। সেই ছোট থেকে বড় হতে দেখেছি ওকে। কিন্তু ও কি তোকে পছন্দ করে?
_হ্যাঁ।
_কতদিন ধরে চলছে এসব হুম?
_ চলছে আরকি।
_ তো এতদিন আমাকে বলিস নি আজ হঠাৎ বলছিস যে?
_আসলে আয়জার পরিবার আমাদের কথা জেনে গিয়েছে এবং আয়জাকে অনেক মারধরও করেছে। আমি অনেক কষ্টে থামিয়ে এসেছি। জাওয়াদ খালু বলেছেন আমার পরিবারকে তাদের বাসায় বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে যেতে।
_ তোর আব্বা আসুক তার সাথে কথা বলি। তারপর দেখি উনি কি বলেন।
_ আম্মা তুমি প্লীজ আব্বাকে রাজি করিও।
_ আমি আশা করি তোর আব্বা না করবে না। কারণ তিনিও আয়জাকে পছন্দ করেন।
~~~~~~~~~~~~~
বিকেলের ঘটনার পর থেকে আয়জার সাথে তার পরিবারের কেউ কোন প্রকার কথা বলছে না। আয়জা ফুলদানির ভাঙ্গা টুকরোগুলো পরিষ্কার করে সেই যে তার ঘরে ঢুকেছে এখন পর্যন্ত সে ঘর থেকে বের হয়নি। ঘরে বসে সে নিজের হাঁটুতে মলম লাগিয়েছে। তখন তাহমিদ তাকে ছুড়ে মারায় পড়ে গিয়ে তার হাঁটুতে বেশ ব্যথা পেয়েছিল সে। সন্ধ্যার পর আয়জা নিজের ঘর থেকে বের হয়। বাহিরে এসে সে দেখে তাদের বাড়ির পরিবেশ বেশ গম্ভীর হয়ে আছে। সাফওয়ান খেলাধুলা শেষে বাড়িতে এসে বেশ অবাকই হয়েছিল। কারণ তাদের বাসায় সব সময় হৈ হুল্লোড় লেগেই থাকে এবং পরিবেশটি থাকে আনন্দমুখর। তবে আজ ছিল তার সম্পূর্ণ ভিন্ন চিত্র। আজ সে বাসায় প্রবেশ করে দেখতে পায় গম্ভীর এবং নিস্তব্ধতা। সে তার মাকে এবং বড় ভাইকে কয়েকবার এর কারণ ও জিজ্ঞেস করেছে কিন্তু তারা উভয়ই তাকে ধমক দিয়ে বসিয়ে রেখেছে যার কারণে আর কোন প্রশ্ন করার সাহস পায়নি সে। সন্ধ্যায় সবাই চেয়ারে বসে রয়েছে নাস্তা করার উদ্দেশ্যে। টেবিল ভর্তি নাস্তা। মেহেরুন্নেসা সবার প্লেটে নাস্তা তুলে দিচ্ছেন কিন্তু আয়জার প্লেটে তুলে দিচ্ছেন না। আয়জা চুপচাপ নিজেই নাস্তা নিয়ে মাথা নিচু করে খেতে শুরু করে । অন্যদিন নাস্তার টেবিলে প্রচন্ড আড্ডা জমলেও আজ তা নীরব। নাস্তা করে যে যার মত ঘরে চলে যায় শুধু রয়ে যায় আয়জা এবং মেহেরুন্নেসা। মেহেরুন্নেসা প্লেট বাটি সব গুছাচ্ছিলেন আয়জা তাকে উদ্দেশ্য করে বলে,
আম্মা তোমরা আর কতক্ষণ আমার সাথে এভাবে রাগ করে থাকবা?
_ …………
_আমার সাথে এরকম করোনা। তোমরা আমার সাথে কথা বলছো না আমার অনেক খারাপ লাগছে।
_ এসব কথা প্রেম পিরিতি করার আগে চিন্তা করা উচিত ছিল।
_ আমাকে মাফ করে দাও আম্মা।
_ তুই আরহানকে ভুলে যা ওখান থেকে সরে আয় তখন হয়তো আমি তোকে মাফ করে দিতে পারি।
_ তুমি কেন উনাকে মেনে নিতে পারছো না? তুমি উনাকে ছোট থেকে বড় হতে দেখেছো তার সবকিছু জানো। তাহলে কেন মেনে নিতে পারছো না?
_সবকিছু জানি বলেই মেনে নিতে পারছি না।
_ মানে?
_ওদের পরিবার আমার তেমন পছন্দ না। তুই আরো অনেক ভালো কিছু পাবি। তোর জন্য আরও অনেক ভালো কিছু রয়েছে। কিন্তু তুই রত্ন ছেড়ে পাথর বেছে নিচ্ছিস। আরহান কখনো তোকে সুখে রাখতে পারবে না।
_ এটা তোমার ভুল ধারণা।
_মায়ের মন সন্তানের জন্য কখনো ভুল ধারণা করতে পারে না। তুই এখন রঙিন চশমা পড়ে আছিস। তোর কাছে এখন সব স্বপ্নের মত লাগছে। তুই বাস্তবতা চোখে দেখতে পাচ্ছিস না। হয়তো যখন বাস্তবতা টের পাবি তখন অনেক দেরি হয়ে যাবে। যাক আমার আর কিছু বলার নেই তোর যা মন চায় তুই তাই কর।
মেহেরুন্নেসা প্লেট বাটি গুছিয়ে সেখান থেকে চলে যান এবং আয়জা স্তব্ধ হয়ে সেখানে দাঁড়িয়ে তার মার যাওয়ার পানে চেয়ে থাকে।
~~~~~~~~~~~~~~~~
রাতে আরহানের মা আরহানের বাবার সাথে কথা বলেন। তিনি এর জন্য কোন দ্বিমত করেন না কারণ আয়জাকে পুত্রবধু হিসেবে তিনিও পছন্দ করেন। সকল কথা আলোচনা করে তারপরের দিন বিকেলে সবাই আয়জাদের বাসায় যায় বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে। আরহানের পুরো পরিবার এই বিয়ে নিয়ে অত্যন্ত খুশি ছিল কিন্তু অপরদিকে আয়জার পরিবার মোটেও খুশি ছিল না। কিন্তু মেয়েকে বুঝাতে না পেরে শেষ পর্যন্ত মনের বিরুদ্ধে গিয়ে তাদের এসব মেনে নিতে হচ্ছে। আয়জার পরিবার তাদের সাথে বিয়ের কথা তুললে আরহানের বাবা বলেন,
আয়জা তো এখন ছোট সবে মাত্র মেট্রিক পরীক্ষায় পাশ করল। সে কলেজে পড়াশোনা করুক। আবার আরহানেরও এখনো পড়াশোনা শেষ হয়নি সেও তার পড়াশোনা শেষ করুক, একটা ভালো চাকরি পাক, তারপর আমরা ধুমধাম করে বিয়ের আয়োজন করবো। আপাতত ঘনিষ্ঠ আত্মীয়-স্বজন নিয়ে এনগেজমেন্ট করে রাখলে ভালো হয়।
তাদের কথা অনুযায়ী সেই সপ্তাহেই দুই পরিবারের ঘনিষ্ঠ আত্মীয়-স্বজনদের উপস্থিতিতে আরহান এবং আয়জার এনগেজমেন্ট করানো হয়। তার কিছুদিন পর আয়জা এবং নীলিমা একই কলেজে ভর্তি হয়। সবেমাত্র তাদের ক্লাস শুরু হয়েছে। আয়জা এখন আর আগের মতো আরহানের সামনে যায় না। নীলিমাদের বাসায় যাওয়া প্রায় বন্ধই করে দিয়েছে সে। নীলিমা এই বিষয়ে তাকে প্রশ্ন করলে উত্তরে সে বলে বর্তমানে সেই বাসায় যেতে তার প্রচন্ড লজ্জা বোধ হয় যার কারণে সে যায় না। এটা নিয়ে নীলিমা তাকে কয়েক দফা ক্ষেপিয়েও ফেলেছে।
আজ এক প্রকার জোর করে নীলিমা তাকে তাদের বাসায় নিয়ে এসেছে। এসেই সে এক কোনায় চুপচাপ বসে আছে। নীলিমা তাকে বেশ কয়েকবার স্বাভাবিক হতে বলছে কিন্তু সে লজ্জায় কুকিয়ে রয়েছে। নীলিমার মা আয়জার সাথে বেশ অনেকক্ষণ কথা বলে তাদেরকে নাস্তা খেতে দেন । নাস্তা শেষ করে আয়জা বেসিনে হাত ধুতে যায় তখন পাশ থেকে আরহান এসে কয়েক লাইন গেয়ে ওঠে,
কেন দূরে থাকো
শুধু আড়াল রাখো
কে তুমি কে তুমি আমায় ডাকো
কেন দূরে থাকো?
মনে হয় তবু বারে বারে
এই বুঝি এলে মোর দ্বারে
সে মধুর স্বপ্ন ভেঙ্গো নাকো
কেন দূরে থাকো
শুধু আড়াল রাখো
কে তুমি কে তুমি আমায় ডাকো
কেন দূরে থাকো?
আয়জা লজ্জায় সেখান থেকে তাড়াতাড়ি চলে যায় ।
~~~~~~~~~~~~
পরিবারের সাথে বেশ দুরত্ব তৈরি হয়েছে আয়জার। মেহেরুন্নেসা কোনো প্রয়োজন ছাড়া তার সাথে কথা বলেন না। জাওয়াদ আহমেদ যে কিনা অফিস থেকে এসে তার হাত ছাড়া অন্যকারো হাতে পানি পান করতেন না সেও আয়জার সাথে কথা বলছেন না। মাঝে মাঝে আয়জার কাছে মনে হয় তার দম বন্ধ হয়ে আসছে। এভাবে আরও কিছুদিন কেটে যায়। হঠাৎ একদিন আরহান আয়জাকে দেখা করতে ডাকে। আয়জা সেখানে গেলে কিছুক্ষণ কথা বলার পর আরহান হঠাৎ করে তাকে প্রশ্ন করে,
তুমি কি আমার জন্য অপেক্ষা করতে পারবে?
_ হঠাৎ এই প্রশ্ন যে?
_ আগে উত্তর দাও।
_ হুম পারবো।
_আমি সামনে সপ্তাহে আমেরিকা চলে যাচ্ছি পড়াশোনার জন্য। বাকি পড়াশোনা সেখান থেকে শেষ করে সেখানে ভালো একটি চাকরি করবো। এরপর দেশে এসে তোমাকে বিয়ে করে আমার সাথে আমেরিকা নিয়ে যাবো।
_ আপনি যে আমেরিকা যাচ্ছেন আমাকে আগে জানান নি কেনো?
_ আগে জানালে তুমি প্রচুর কান্নাকাটি করতে তাই জানাই নি। আমি এত কষ্ট আমাদের উজ্জ্বল ভবিষ্যতের জন্যই তো করছি। আমার উপর ভরসা রাখো।
আয়জার বাসায় আরহানের আমেরিকা যাওয়ার কথা শোনার পর তোলপাড় শুরু হয়। তারা আরহানের পরিবারকে বলে, যাওয়ার আগে বিয়ে করে যেতে। কিন্তু আরহানের পরিবারের সবাই তাদেরকে ভরসা রাখতে বলে এবং দুই বছর পর আরহান দেশে এসে আয়জাকে বিয়ে করবে বলে আশ্বস্ত করে।
দেখতে দেখতে আরহানের আমেরিকা যাওয়ার দিন চলে আসে। আয়জাও এয়ারপোর্টে এসেছে তাকে বিদায় জানাতে। আয়জা আরহানকে উদ্দেশ্য করে বলে,
নিজের খেয়াল রাখবেন। ঠিক মতো খাওয়া দাওয়া করবেন এবং সময় মতো ঘুমাবেন। আমাকে চিঠি লিখবেন। আমি আপনার চিঠির অপেক্ষায় থাকবো।
_ তুমিও নিজের খেয়াল রেখো। তোমার জন্য কি নিয়ে আসবো আমেরিকা থেকে?
_ আমার জন্য নিজেকে নিয়ে আসিয়েন আমেরিকা থেকে। আমার আর কিছু চাই না।
আরহান সবার থেকে বিদায় নিয়ে চলে যায়। কিছু সময় পর তার প্লেনটি উড়ে যায়। আকাশের দিকে অশ্রু সিক্ত চোখ নিয়ে আয়জা প্লেনটি চলে যেতে দেখে।
চলবে।
