#অন্তঃকরণে_তুমি
#নাফিসা_বিনতে_সুলতান
পর্ব: ৫
পড়ার টেবিলের আশেপাশে আয়জা ঘুরপাক খাচ্ছে এবং হাতের নখ কামড়াচ্ছে। মেহেরুন্নেসা রান্নাঘর থেকে রুমে প্রবেশ করে তাকে এমন ঘুরপাক খেতে দেখে বলেন,
কি ব্যাপার এমন টই টই করছো কেনো?
_ না এমনি আম্মা।
_ আমার জীবনে আমি তোমার মতো পড়া চোর আরেকটা দেখি নি। কতবড় ফাকিবাজ। আমি লাঠি আনার আগে ভালোয় ভালোয় পড়তে বসো নয়তো মার একটাও মাটিতে পড়বে না।
আয়জা কথা না বাড়িয়ে চুপচাপ পড়তে বসে। কিন্তু পড়ায় তার মন মোটেই বসছে না। এই প্রেমিক পুরুষটা কে হতে পারে ভেবে ভেবেই তার মাথা ধরে আসছে। তার এই চিন্তা ভাবনার মধ্যেই তাদের রুমে উপর তলার রুমের হামিদা বেগম আসেন মেহেরুন্নেসার সাথে দেখা করতে। তিনি আয়জাকে দেখে জিজ্ঞেস করেন,
কি খবর আয়জা? কেমন আছো?
_ আলহামদুলিল্লাহ ভালো আছি খালাম্মা। আপনি কেমন আছেন?
_ আলহামদুলিল্লাহ ভালো। বাবাহ আজ তুমি পড়তে বসেছো বিশ্বাসই হচ্ছে না। তাহলে কি আমাদের ফাকিবাজ আয়জা ভালো হয়ে গিয়েছে?
পাশ থেকে মেহেরুন্নেসা উত্তর দেন,
ওর মতো ফাকিবাজ ভালো হওয়ার মানুষ? মার খাবার ভয়ে পড়তে বসেছে।
তারা দুইজন একত্রে হেসে উঠেন। আয়জা একটি দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলে বইয়ের পাতা উল্টানোতে মনোযোগ দেয়। মেহেরুন্নেসা এবং হামিদা বেগম গল্পে মেতে উঠেন। তাদের গল্পের এক পর্যায়ে হামিদা বেগম বলে,
জানেন ভাবি পাশের বাড়ির ফারিহা মেয়েটা একটা ছেলের সাথে পালিয়ে গিয়েছে। মেয়েটার মা কি কান্না করছে।
_ স্বাভাবিক কান্না করবেই তো। তাদের মানসম্মান ধুলোয় মিশিয়ে দিয়ে গিয়েছে। তারা কি এখন এলাকায় মুখ দেখাতে পারবে? ছেলে মেয়েরা তো এগুলো বুঝে না।
_ ঠিক বলেছেন।
_ মেয়েরা তো আর একদিনে পালিয়ে যায় না। প্রথমে মেয়ের কাছে প্রেমপত্র আসে তারপর দেখা করে । আস্তে ধীরে কথা আগায়। মেয়েদের অনেক শাসনে রাখতে হয়। আমার মেয়ে যদি এমন কিছু করে আর ওর কাছে এমন কোনো কিছু যদি আমি পাই মেরে তক্তা বানিয়ে ফেলবো। আমার সবচেয়ে ভয়ংকর রূপ দেখবে তখন।
এই কথা কানে যেতেই ভয়ে শরীর কাপনি দিয়ে উঠে আয়জার। হাত পা ঠাণ্ডা হয়ে আসে তার। কোনো দোষ না করেও কোন বিপদে পড়লো সে। আয়জা মনে মনে বলে,
আম্মা যদি ভুলেও এই চিঠি দেখে আমাকে কথা বলার সুযোগই দিবে না। ধুমধাম মারা শুরু করবে। যে এই চিঠিটা লিখেছে তাকে যদি পাই মেরে ভর্তা বানিয়ে ফেলবো। আমার শান্তির জীবনে কালবৈশাখী ঝড় নিয়ে এসেছে।
~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~
আয়জা সকালে ঘুম থেকে উঠে দেখতে পায় তাদের বাড়িতে টেলিফোন লাইন লাগানো হয়েছে। আয়জা উৎসাহের সহিত জিজ্ঞেস করে,
টেলিফোন লাইন?
_ হুম।
_ হঠাৎ?
_ তোর বাবার অফিসের অনেক প্রয়োজনীয় কল আসে তাই লাগিয়েছে।
_ যাক ভালোই হয়েছে। মাঝে মাঝে দূরের আত্মীয়দের সাথে ঘরে বসে কথা বলতে পারব। আগে তো অন্যদের ঘরে গিয়ে অন্যদের টেলিফোন দিয়ে কথা বলা লাগতো।
_ হুম।
_ আম্মা নীলিমাকে আমাদের টেলিফোন নাম্বার টা দেই?
_ দে। কিন্তু অন্য কাউকে দিবি না। মনে থাকে যেনো।
_ আচ্ছা।
আয়জা ফ্রেশ হয়ে নাস্তা করে নেয়। এরপর স্কুল ড্রেস পড়ে মাথায় দুই বেণী করে কাঁধে ব্যাগ নিয়ে বাড়ি থেকে বের হয়। রাস্তার মোড়ে গিয়ে দেখে নীলিমা দাঁড়িয়ে আছে। তারা দুইজন গল্প করতে করতে স্কুলের পথে হাটা দেয়। তাদের গল্পের মাঝে নীলিমা বলে উঠে,
বলিস কি তোর ব্যাগে প্রেম পত্র?
_ হুম।
_ বাবাহ্! বান্ধবী দেখি প্রেমপত্র পাওয়া শুরু করে দিয়েছো। ( বাকা হাসি দিয়ে )
_ মজা করবি না। মেজাজ এমনি অনেক খারাপ আমার। চিনি না জানি না কই থেকে কোন উটকো প্রেমিক এসে টপকালো আর তুই কিনা মজা করছিস? আম্মা যদি এই প্রেম পত্র দেখে ফেলতো এতক্ষণে আমার জানাজা অনুষ্ঠিত হতো।
_ দেখা তো প্রেম পত্রটা আমাকে।
আয়জা ব্যাগ থেকে চিঠিটা বের করে নীলিমাকে দেয়। নীলিমা চিঠিটা পড়ে বাকা হেসে বলে,
আরে যেই লিখেছে সে তো তোর উপর পুরা ফিদা। আহ্ জীবন! আজ সুন্দর না বলে আমাকে কেউ প্রেমপত্র দিলো না।
আয়জা নীলিমার পিঠে চাপড় মেরে বলে,
ভন্ডামি বাদ দে। এখন কি করবো সেটা বল। সবচেয়ে বড় কথা আমার ব্যাগে কখন রাখলো এই চিঠি? আর কেই বা রাখলো? আমাদের স্কুলে তো কোনো ছেলে নেই। আমাদের স্কুল তো গার্লস স্কুল। তাহলে ব্যাগে চিঠি রাখলো কে?
_ আসলেই ভাবার বিষয়। তোদের বিল্ডিং এর কেউ নয় তো?
_ আমাদের বিল্ডিং এর কে হবে? আমাদের বিল্ডিং এ এমন কেউ নেই। আর যদি থেকেও থাকে আমাদের ফ্ল্যাটে ঢুকে আমার ব্যাগে চিঠি রাখার সাহস পাবে না।
_ তাও কথা।
নীলিমা চিঠিটি আবার দেখে বলে,
লেখাটা খুব চেনা চেনা লাগছে। মনে হচ্ছে কোথাও যেনো দেখেছি।
_ কোথায় দেখেছিস?
_ সেটাই তো মনে পড়ছে না।
_ সময় মতো তোর কিছু মনে থাকে না ।
আয়জা চিঠিটি ছিঁড়ে ময়লার ঝুড়িতে ফেলে দেয়। নীলিমা জিজ্ঞেস করে,
আরে ফেলে দিলি কেন?
_ তো কি ফ্রেম করিয়ে রাখবো? কালকে কত ভয়ে ভয়ে লুকিয়ে রেখেছিলাম। সারাটা দিন রাত আতঙ্কে ছিলাম। ঘুমও হয়নি ঠিক মত এই চিন্তায়। আম্মার হাতে ভুলেও এই চিঠি পড়লে আমি তো শেষ হয়ে যেতাম।
কিছুক্ষণের মধ্যেই তারা স্কুলে পৌঁছে যায় এবং ক্লাসে মনোযোগ দেয়। আয়জা নীলিমাকে তাদের টেলিফোন নাম্বারটি কাগজে লিখে দেয় । স্কুল ছুটি হলে সবাই। নিজেদের বাড়ি চলে যায় ।
নীলিমারা সবাই দুপুরের খাবার খেতে বসেছে। খাবার শেষে নীলিমা হাত ধুতে টেলিফোনের কাছে যায়। তাকে টেলিফোনের কাছে যেতে দেখে তার মা তাকে প্রশ্ন করে,
টেলিফোনের কাছে কি করছিস তুই?
_ আয়জাকে কল করবো।
_ আয়জাকে?
_ হ্যাঁ। আজকে সকালে ওদের বাসায় টেলিফোন লাইন লাগিয়েছে।
_ একটু আগে না ওর সাথে দেখা করে এলি স্কুলে তাহলে এখন আবার কল করে কি করবি?
_ আরে আম্মু তুমি বুঝো না। টেলিফোনে কথা বলার মজাই আলাদা। আর ওর সাথে আমার কখনো টেলিফোনে কথা হয় নি।
_ হ্যাঁ আমরা তো কিছু বুঝি না সব তোরাই বুঝিস।
_ ওহ নাম্বারটা তো ভুলে গেছি। আয়জা কাগজে লিখে দিয়েছিলো সেটা নিয়ে আসি।
নীলিমা দৌঁড়ে তার রুম থেকে নাম্বার লিখা কাগজটি নিয়ে আসে এবং আয়জাকে কল দেয়। কলটি মেহেরুন্নেসা ধরেন। নীলিমা সালাম দেয় এবং মেহেরুন্নেসা সালামের উত্তর নেন।
_ খালাম্মা আমি নীলিমা। আপনি কেমন আছেন?
_ আলহামদুলিল্লাহ ভালো। তুমি কেমন আছো?
_ আলহামদুলিল্লাহ ভালো।
_ একদিন বাসায় আসো। তোমার তো চেহারাই ভুলে গিয়েছি কতদিন ধরে দেখি না।
_ আসবো একদিন সময় করে।
_ আচ্ছা। নাও তোমার বান্ধবীর সাথে কথা বলো।
মেহেরুন্নেসা আয়জাকে রিসিভার টি দিয়ে চলে যান। আয়জা বলে,
হাই বান্ধবী!
_ হাই ! তো বলো টেলিফোনে আমার গলার স্বর কেমন শোনায়?
_ রেডিওতে যখন ঠিকমতো কানেকশন পায় না তখন কেমন একটা খচখচ শব্দ করে না? ঠিক তেমন।
_ যা তোর সাথে কথা বলবো না।
_ আচ্ছা সরি সত্য কথা বলার জন্য।
_ তুই সত্যতা নিয়ে বসে থাক ।
এই কথা বলে নীলিমা কল কেটে দেয়। ওপর প্রান্তে আয়জার হাসতে হাসতে পেট ব্যাথা হয়ে গিয়েছে। বান্ধবীকে ক্ষেপাতে পেরে সে বেশ খুশি। নীলিমা রাগে গজগজ করতে করতে নিজের রুমে চলে যায় কিন্তু নাম্বার লেখা কাগজটি সাথে নিয়ে যেতে ভুলে যায়। নীলিমার মা সব প্লেট গুছিয়ে রান্না ঘরে যান। আরহান এতক্ষণ সব কান পেতে শুনছিলো। সুযোগ বুঝে সে কাগজ থেকে নাম্বারটি নিজের হাতের তালুতে কলম দিয়ে লিখে নেয় এবং সেও নিজের রুমে চলে যায়।
~~~~~~~~~~~~~~~~
সন্ধ্যার সময় মেহেরুন্নেসা রাতের খাবারের আয়োজন করছিলেন। এদিকে ঘরে তাহমিদ, আয়জা , সাফওয়ান তিন ভাইবোন লুডু খেলছিলো। এমন সময় রুমের টেলিফোনটি বেজে উঠে। রান্নাঘর থেকে মেহেরুন্নেসা চিল্লিয়ে বলেন,
আয়জা দেখো তো কে কল দিয়েছে। আমি রুটি বানাচ্ছি হাতে আটা মেখে আছে।
খেলার মাঝে কাজ পড়ায় আয়জা বেশ বিরক্ত হয়। বিরক্তি নিয়ে সে উঠে টেলিফোনের কাছে গিয়ে কলটি ধরে। তারপর সালাম দেয়। ওপর পাশ থেকে শুধু নিশ্বাস নেওয়ার আওয়াজ পাওয়া যায়। আয়জা বারবার হ্যালো হ্যালো বলতে থাকে। কিন্তু ওপর পাশ থেকে কোনো আওয়াজ আসে না নিশ্বাস এর আওয়াজ ছাড়া। আয়জা এবার বিরক্ত হয়ে বলে,
কে রে ভাই? কথাই যখন বলবেন না কল দিয়েছেন কেনো? একটু শান্তিতে লুডু ও খেলতে পারি না।
এবার ওপর পাশ থেকে একজন সালামের উত্তর নেয় এবং জিজ্ঞেস করে,
কেমন আছো আমার প্রেয়সী?
হঠাৎ এমন পুরুষালি কন্ঠ শুনে আয়জা হতবাক হয়ে যায় তার মধ্যে আবার তাকে প্রেয়সী বলছে। ভয়ে আয়জার হাত পা কাঁপতে থাকে। কাপাকাপা গলায় সে প্রশ্ন করে,
ক ক কে বলছেন?
_ তোমার প্রেমিক পুরুষ। যে তোমায় চিঠি লিখেছে। যে তোমার পাগলের মতো ভালোবাসে।
ভয়ে আয়জা দিকবেদিক চিন্তা না করে কল কেটে দেয়। মেহেরুন্নেসা চিল্লিয়ে জিজ্ঞেস করেন,
কে কল দিয়েছে?
আয়জা নিজেকে স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা করে চিল্লিয়ে উত্তর দেয়,
রং নাম্বার।
আয়জা নিজের ঘরের দিকে যেতে থাকে। তাকে চলে যেতে দেখে তাহমিদ জিজ্ঞেস করে,
কোথায় যাচ্ছিস? খেলবি না?
_ না। আমার ভালো লাগছে না। তোরা খেল।
কল কেটে যেতে দেখে আরহান মুচকি হাসে। সে বুঝতে পেরেছে তার প্রেয়সী হয়তো ভয় পেয়েছে। সে বিড়বিড় করে বলে,
আরেকটু অপেক্ষা করো। সঠিক সময় হলে আমি তোমার সামনে ধরা দিবো।
চলবে।
