#অন্তঃকরণে_তুমি
#নাফিসা_বিনতে_সুলতান
পর্ব: ২
মেহেরুন্নেসা সব ঘর পরিষ্কার করে , মুছে চকচকে করে ফেলেছেন। তিনি পরিষ্কার পরিচ্ছনতা খুব পছন্দ করেন। তার ভাষ্যমতে ঘরবাড়ি সব সময় পরিষ্কার থাকবে চকচক করবে। সব কাজ শেষ করে তিনি খাটের দিকে তাকান। তার তিন জন ছেলেমেয়েই ঘুমিয়ে আছে। সে স্বস্তির নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। জামাকাপড়ের আলনা থেকে শাড়ি, গামছা নিয়ে গোসল করতে বাথরূমে যান তিনি। নিশ্চিন্ত মনে গোসল সেরে রুমে প্রবেশ করে তিনি বিস্মিত হয়ে যান । তার চঞ্চল হরিণী মেয়ে ঘুম থেকে উঠে গেছে এবং পুরো ঘর পাউডার দিয়ে মাখিয়ে ফেলেছে। সে নিজেও পাউডার দিয়ে মাখিয়ে সাদা ভূত সেজে আছে। পুরো এক কৌটা পাউডার চোখের পলকেই শেষ করে দিয়েছে সে । এত ঘণ্টা লাগিয়ে গুছানো ঘরের এই নাজেহাল অবস্থা দেখে তিনি হতবাক হয়ে পড়েন। তিনি ভাবতেও পারেন নি তার কষ্টের উপর তার মেয়ে এভাবে পাউডার ঢেলে দিবে। তিনি চোখ গরম করে মেয়ের দিকে তাকান। মেয়েকে ধমক দিয়ে জিজ্ঞেস করেন,
কি করেছো তুমি এগুলো? ঘর নোংরা করেছো কেনো?
আয়জা চুপ। সে বুঝতে পেরেছে মা তার রেগে গিয়েছে। তাই সে মাটি থেকে উঠে দাঁড়ায় এবং নিজের জামাকাপড় হাত দিয়ে ঝাড়া দেয়। যার ফলে তার জামায় লেগে থাকা পাউডার গুলো উড়ে উঠে। আয়জা কাশি দিয়ে উঠে। মেহেরুন্নেসা দুই হাত বুকের উপর ভাঁজ করে দাঁড়িয়ে মেয়ের কাহিনী দেখে যাচ্ছেন। আয়জা সুন্দর করে মায়ের কাছে মাফ চায়। মেহেরুন্নেসা ও আর কি বলবেন আয়জা তো ছোট মানুষ ভালোমন্দের জ্ঞান নেই তার। তাকে হাজার বললেও কাজ হয় না। সে সারাদিন বাড়ি মাতিয়ে রাখে । চঞ্চল হরিণীর মতো ছুটাছুটি করে। তাকে এক জায়গায় চুপচাপ বসিয়ে রাখা প্রায় অসম্ভব। পড়াশোনার প্রতি তার বেশ অনিহা। পড়াশোনা সে করতেই চায় না। মেহেরুন্নেসা ভেবে রেখেছেন সামনে বছর আয়জার চার বছর হবে তখন তাকে স্কুলে ভর্তি করিয়ে দিবেন। তাই এখন থেকে তাকে অক্ষর চেনানো শুরু করেছেন। মেহেরুন্নেসা তেমন শিক্ষিত নন। উনি তৃতীয় শ্রেণী পর্যন্ত লেখাপড়া করেছিলেন। কিন্তু তার বাচ্চাদের অক্ষর শেখানোর মতো পড়াশোনা করেছিলেন তিনি। তাহমিদকেও তিনি অক্ষর চিনিয়েছেন। তিনি যখনই আয়জাকে পড়তে বসাতে চান সে শুধু পালিয়ে বেড়ায়। সে যতটুকু পড়াশোনা করে বাবার কাছে। কারণ সবাইকে না করলেও বাবাকে না করতে পারে না। তার বাবা যখন তাকে আম্মা বলে ডাক দিয়ে নিজের পাশে বসিয়ে হাত ধরে ধরে তাকে অক্ষর পড়তে এবং লিখতে শিখান সে তখন শিখে। এ নিয়ে মেহেরুন্নেসার বেশ অভিমান। তার কাছে পড়তে চায় না অথচ বাবার কাছে ঠিকই পড়ে এ কেমন কথা?
জাওয়াদ আহমেদ সন্ধ্যার পরে খবরের কাগজ নিয়ে এসে টেবিলের সামনে বসেন। কিছুক্ষণের মধ্যেই তাহমিদ তার বই খাতা নিয়ে এসে টেবিলে রাখে এবং চেয়ারে বসে। আয়জাকে আসতে না দেখে তিনি গলার স্বর একটু উঁচু করে মেয়েকে ডাক দেন,
আম্মা? কোথায় তুমি? তোমার বই খাতা নিয়ে আসো।
জাওয়াদ আহমেদ আয়জাকে বড্ড ভালোবাসেন। তাকে আম্মা ছাড়া ডাক দেন না। তিন ছেলেমেয়ের মধ্য থেকে আয়জা তার চোখের মণি। আয়জাও বাবার ভালোবাসা বুঝতে পারে। তাই বাবা তাকে ডাক দিলে সে ফেরাতে পারে না। তার সব আবদার বাবার কাছে। বাবার ডাক শুনে সে বই নিয়ে বাবার কাছে যায়। জাওয়াদ আহমেদ মেয়েকে কোলে নিয়ে হাত ধরে ধরে অক্ষর উচ্চারণ করতে এবং লিখতে শিখান। মেহেরুন্নেসা জাওয়াদ আহমেদের জন্য চা এবং বাচ্চাদের জন্য গ্লাসে করে দুধ নিয়ে আসেন। তাহমিদ ভদ্র ছেলের মতো বিনা বাক্যে চুপচাপ দুধ পান করে। আয়জা দুধের গ্লাস দেখেই নাক মুখ ছিটকে ফেলে। মেহেরুন্নেসা মেয়েকে ধমক দেন । আয়জা বাবাকে জড়িয়ে ধরে মুখ লুকায়। মেহেরুন্নেসা মেয়েকে উদ্দেশ্য করে বলেন,
বাবার কোলে আছো বলে বেঁচে যাবে এই কথা ভেবো না। চুপচাপ গ্লাসের দুধটুকু শেষ করো নাহলে একটা মার ও মাটিতে পড়তে না বলে রাখলাম।
_ আহা এভাবে ধমকাচ্ছো কেনো ওকে? ও ছোট মানুষ। বুঝিয়ে বললেই তো হয়।
_ ও বুঝার মানুষ? ও যে দুষ্ট। সারাদিন আমাকে জ্বালিয়ে মারে। তোমার সামনে ভদ্র হয়ে থাকে। আমার কোনো কথা শুনে না অথচ তুমি একবার বললেই শুনে।
_ শুনবেই তো। আমার আম্মা তার বাবাকে বেশি ভালোবাসে। তাই না আম্মা? ( উনি আয়জাকে প্রশ্ন করেন )
আয়জা মাথা নাড়িয়ে হ্যাঁ বুঝায়। মেহেরুন্নেসা বাবা মেয়ের আহ্লাদ দেখে রাগে ফুঁসে উঠে বলেন,
তোমাদের ভালোবাসা পড়ে দেখিও আমাকে। এখন গ্লাসের দুধটা শেষ করে আমাকে উদ্ধার করো।
জাওয়াদ আহমেদ মেয়ের সামনে গ্লাসটি ধরেন। আয়জা ভদ্র মেয়ের মতো সবটুকু দুধ পান করে নেয়। জাওয়াদ আহমেদ খালি গ্লাসটি মেহেরুন্নেসার দিকে এগিয়ে দেন। তিনি গ্লাসটি হাতে নিয়ে চলে যাওয়ার আগে মেয়েকে বলে যান,
অনেক ভালোবাসা না বাপের জন্য? রাতে ঘুমানোর সময় আমাকে খুঁজিস মেরে তক্তা বানিয়ে দিবো।
এই কথা বলে উনি রুম থেকে চলে যান। আয়জা কাঁদো কাঁদো মুখ করে বাবার দিকে তাকায়। জাওয়াদ আহমেদ মেয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে বলেন,
তোমার আম্মা আমাদের দেখে হিংসা করে বুঝছো? তুমি যে বাবাকে বেশি ভালোবাসো এটা তোমার আম্মু সহ্য করতে পারে না।
_ আম্মা পঁচা।
_ আম্মাকে এভাবে বলতে হয় না।
_ আম্মা শুধু বকে।
_ আম্মা কি শুধু বকেই? আদর করে না? তোমাকে খাইয়ে দেয় কে?
_ আম্মা।
_ তোমাকে গোসল করিয়ে দেয় কে?
_ আম্মা।
_ তোমাকে ঘুম পাড়িয়ে দেয় কে?
_ আম্মা।
_ তুমি ব্যাথা পেলে কে আগে দৌঁড়ে তোমার কাছে আসে?
_ আম্মা।
_ তাহলে আম্মা পঁচা হয় কিভাবে?
আয়জা কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলে,
আম্মা ভালো।
_ হ্যাঁ। আম্মা সারাদিন কাজ করে ক্লান্ত থাকে তুমি দুষ্টুমি করে আম্মাকে জ্বালাও কেনো? আর দুষ্টুমি করবে না ঠিক আছে?
_ আচ্ছা।
_ যাও তাহলে আম্মাকে সরি বলে এসো।
আয়জা বাবার কোল থেকে নেমে দৌঁড়ে মায়ের কাছে যায়। সে মায়ের আঁচল ধরে টানে এবং তাকে সরি বলে। মেহেরুন্নেসা ও মেয়েকে কোলে তুলে গালে চুমু এঁকে দেন। সন্তানের উপর মায়েরা বেশিক্ষন রেগে থাকতে পারে না। পরের দিন আয়জা নিজ থেকেই মায়ের কাছে বই নিয়ে যায় পড়ার জন্য। মেহেরুন্নেসা দেখে বেশ খুশি হন। তিনি মেয়েকে কোলে বসিয়ে পড়াতে থাকেন।
______________________
মেহেরুন্নেসা রান্নার কাজে ব্যস্ত। আজকে বাসায় নানা ধরনের রান্না হচ্ছে। এর অন্যতম কারণ হলো আজকে বাসায় আয়জার ছোট চাচা আসছে। উনার চাকরি পরীক্ষার সিট পড়েছে যশোরে। যার কারণে উনি বড় ভাইয়ের বাসায় আসছেন। আজকে বিকেলে আসবেন উনি । আগামীকাল সকালে উনার পরীক্ষা। পরশু আবার চলে যাবেন। দরজায় কড়া নাড়ার আওয়াজ পেয়ে মেহেরুন্নেসা দরজা খুলে দেন। জাওয়াদ আহমেদের পাশেই দাঁড়িয়ে আছেন উনার ছোট ভাই আনোয়ার। আনোয়ার ভাবীকে সালাম দেয়। মেহেরুন্নেসা সালামের উত্তর নিয়ে তাদেরকে ভেতরে আসতে বলেন। উনাদের ফ্রেশ হতে বলে উনি খাবারের ব্যাবস্থা করেন। জাওয়াদ আহমেদ এবং আনোয়ার খেতে বসেছেন তাদের সাথে তাহমিদ ও বসেছে। মেহেরুন্নেসা তাদেরকে খাবার বেড়ে দিচ্ছেন। আয়জা ঘুমিয়ে ছিলো। ঘুম থেকে উঠেই সে রুম থেকে বের হয় তার মাকে খোঁজার উদ্দেশ্যে। বাহিরে এসে চাচাকে দেখতে পেয়ে খুশিতে লাফিয়ে উঠে আয়জা। আনোয়ার আয়জাকে কোলে তুলে নেন। তিনি আয়জাকে
খাইয়ে দিতে চান। মেহেরুন্নেসা আয়জাকে মুখ ধুইয়ে নিয়ে আসেন। আয়জা আবার চাচার কোলে উঠে বসে। তিনি নিজের প্লেট থেকে ছোট আয়জাকে খাইয়ে দেন।
কিছুক্ষণ সবার সাথে গল্প করে উনি পড়তে বসেন। তখন আয়জা তার সামনে ঘুরঘুর করছিলো । তিনি আয়জাকে টেবিলে বসিয়ে দেন। এরপর ব্যাগ থেকে মাথার ব্যান্ড বের করে আয়জাকে পড়িয়ে দেন। তিনি বলে উঠেন,
এটা আমার পুতুল পরী। একদম একটা পুতুলের মতো লাগছে আমার আম্মাজান কে।
আয়জা টেবিল থেকে নামতে চায় কিন্তু আনোয়ার তাকে নামতে দেয় না। উনি বলেন,
আম্মাজান এখানে বসে থাকুন। আমি পড়ি। কোথাও যাবেন না। আমার পড়া শেষ হবে তারপর যাবেন।
উনি আয়জার হাতে একটি কলম খাতা ধরিয়ে দেন যাতে আয়জা ব্যস্ত থাকে আর এখান থেকে না যায়। এটা নতুন কিছুনা। উনি সময়ই এমন করেন। আয়জারা যখন দাদুবাড়ি বেড়াতে যায় তখনও আনোয়ার তাকে পড়ার টেবিলে বসিয়ে রাখতো এবং বই পড়তো। তাকে এই বিষয়ে কেউ কিছু জিজ্ঞেস করলে সে সব সময় বলে,
আমার আয়জা আম্মাজান একটা পুতুলের মতো। আমরা পুতুল যেমন যত্ন করে ঘরে সাজিয়ে রাখি আমার আয়জা আম্মাজানকেও এভাবে যত্ন করে সাজিয়ে রাখতে ভালো লাগে।
__________________
চারিদিকে সবার আদরে বড় হতে থাকে আয়জা। দাদুবাড়ী, নানুবাড়ি সবার পছন্দের তালিকায় আয়জা থাকে এক নাম্বারে। সবাই চঞ্চল বাচ্চাদের একটু বেশি পছন্দ করে। এটা হয়তো সবার আয়জাকে ভালোবাসার অন্যতম কারণ। আয়জা যেমন চঞ্চল তেমন মায়াবী। সে বড়দের সম্মান করে, সবার সাথে ভালো ব্যবহার করে। মনটা তার বড্ড নরম।
চলবে।
