#অবহেলার_দিনগুলি
#পর্ব_৪
#ইলোরা_ফারদিন
“আপা, আমার জন্য সুন্দর দেখে একটা বর খুজো তো। শুনো, ছেলের যাতে টাকা পয়শা ভালো থাকে আর আমার বাচ্চাদের যাতে মেনে নেয়। বারো বছর আগে শূন্য পকেটে বেকার এক পুরুষকে বিয়ে করেছিলাম। বারোটা বছরে নিজের শখ আহ্লাদ সব বিসর্জন দিয়ে তার সংসার করেছি। কিন্তু বিনিময়ে কি পেলাম? প্রতারণা? বারো বছর পর সে যখন সফল হল জীবনে, তখন চোখের পলকে আমাকে ভুলে যেয়ে নতুন নারীতে মত্ত হলো। আমাকে একদম ছুড়ে ফেলে দিল। কি লাভ হল বলো?
তাই তো এবার ঠিক করেছি প্রতিষ্ঠিত পুরুষককে বিয়ে করব। সে কামাই করবে, আমি আরামে শুধু বসে বসে খাব। ঠিক বলেছি না?
শুনো আজই তুমি তোমার ওই পরিচিত ঘটকের সাথে কথা বলবে। ওই অমানুষ বেইমানটার সাথে আমার ডিভোর্সের চারমাস হয়ে গিয়েছে। আমি কেন আর একা থাকব বলো। নাচে নাচে বিয়ে করব।” কষা মুরগীর তরকারি দিয়ে ভাত খেতে খেতে বলল সুমনা
বোনের কথায় টাসকি খেল রোমানা। বোনটা একদম তার মায়ের মতো শক্ত মনের হয়েছে। কাউকে ভালোবাসলে জীবন দিতে রাজি, কিন্তু কেউ যদি এদের মন নিয়ে খেলে তাদের জীবন ধ্বংস করতে দ্বিতীয় বার ভাববে না।
রোমানা সুমনাকে আরেক পিস গোস্ত তুলে দিতে দিতে জিজ্ঞেস করলো,” সত্যি কি ঘটক লাগাবো?”
“অবশ্যই। আমি কি সারাজীবন একা মরে পচব নাকি? বাচ্চারা বড় হচ্ছে। এক সময় ওরা বিয়ে করে নিজ নিজ সংসারে ব্যস্ত হবে। তখন? আমি কি করব? আমারও নিজের একটি সংসার প্রয়োজন আপা। আমারও একটু যত্ন আহ্লাদের প্রয়োজন আছে। আগের ভুল এবার আর করব না। এবার নিজেকে ভালোবাসব, একটু বেশিই ভালোবাসব। আমাকে স্বার্থপর ভাবলে ভাবতে পারো।” কথা বলার সময় চোখে অশ্রু জমলো সুমনার। যতই অস্বীকার করুক। আজও সে জহিরকে ভালোবাসে, ভুলতে পারে নি। কিভাবে ভুলবে? জহির প্রতারক হলেও, সুমনা তো সত্যি সত্যি তাকে ভালোবেসেছিল।
——————
আজকাল জহিরের শরীর ভালো যাচ্ছে না। দুদিন পর পর সর্দি জ্বর-এলার্জি আরও কত কি। শরীরটা যেন ভেঙে পরেছে। অফিসও অনেক মিস দিয়েছে এই কয়েকমাসে। ফলে সেখানেও একটি বাজে প্রভাব পরছে।
এদিকে দু দিন হল তার ডিসেন্ট্রি। একেবারে ভয়ানক লেভেলের। ওষুধ খেয়েও নিয়ন্ত্রণে আসচগে না। ডাক্তার তো বলেই দিয়েছে কালকের মধ্যে ঠিক না হলে হসপিটালে ভর্তি হতে হবে।
জহিরের খুব পানি পিপাসা পেয়েছে। এসব ডাক্তার বার বার সেলাইন আর ডাবের পানি খেতে বলেছে। কিন্তু এসব এগিয়ে দেয়ার মতো মানুষ নেই। রিতা তো কালকেই আলাদা রুমে চলে গিয়েছে। বলেছে জহির একেবারে সুস্থ হলে এ ঘরে আসবে। জহিরের কাছ থেকে নাকি পায়খানার গন্ধ আসে, এ ঘর নাকি পায়খানার গন্ধে ভরে গিয়েছে।
এসব ভাবনার মাঝে জহিরের মনে পরে যায় আজ থেকে প্রায় সাত বছর আগের ঘটনা। যাত্রাবাড়ীতে একটি হোটেলে খেয়ে তার ভয়ংকর ডায়রিয়া হয়েছিল। পুরো সাতদিন সে বিছানায় পরেছিল। এমনকি বিছানাতেই পায়খানা করে দিত। আর সেসব ময়লা কাপড় সুমনা নিজের হাতে পরিষ্কার করতো। একটু পর পর জহিরকে সেলাইন বানিয়ে খাওয়াতো। সাতটাদিন পরম যত্নে জহিরের সেবা করেছিল সুমনা। কই সুমনাতো একটাবারের জন্য নিজের নাট সিটকায় নি বা তার থেকে দূরে সরে যায় নি!
এই রিতাই তো একটা সময় জহিরকে পাওয়ার জন্য আত্মহ*ত্যা করতে চেয়েছিল, সেই রিতা আজ তার অসুস্থতায় এভাবে নাক সিটকাচ্ছে! এটা কেমন ভালোবাসা রিতার।
ইদানীং সুমনার কথা বড্ড বেশি মনে পরে জহিরের। অসুস্থ শরীরে এখন সে বিছানায় পরে আছে, কিন্তু রিতা তার পাশে নেই। কিন্তু রিতার জায়গায় যদি আজ সুমনা থাকতো তাহলে সে এক সেকেন্ডের জন্যও জহিরকে একা ছাড়তো না। জহিরের কেনোজানি আফসোস হচ্ছে। সে কি ভুল করলো সুমনাকে ছেড়ে। আচ্ছে বাচ্চারা কেমন আছে? যেই বাচ্চাদের সে এত ভালোবাসত, রিতাকে পেয়ে সেই বাচ্চাদেরও ভুলে গেল। একটা বারের জন্যও ভাবে নি বাচ্চারা বাবা ছাড়া কিভাবে বড় হব। কিন্তু এখন? এখন বড্ড বেশি আফসোস হয় বাচ্চাগুলোর জন্য। আচ্ছা সে যদি এখন বাচ্চাদের সামনে যায়, তাহলে কি তারা তাদের বাবার সাথে কথা বলবে? বাবার বুকে মাথা রাখবে?
এসব কথা ভেবেই চোখ ভরে আসে জহিরের।
——————
নির্জন আজ বাসায় আছে বোনের কাছে। বোনটা অসুস্থ। তাই সে আজ স্কুল যায় নি। তার বাবা মা যখন প্রথম সেপারেশনে গেল, তখন বয়স তার ১১ মাত্র। তার মা অবশ্য কিছু লুকায় নি তার কাছে। তার বাবার জীবনে যে নতুন আন্টি এসেছে, আর সেই আন্টিই তার বাবার কাছে বেশি গুরুত্বপূর্ণ, তাই তো বাবা ছেড়ে দিয়েছে তাদের, বোঝে নির্জন। এখন তার বয়স ১২। মায়ের কষ্ট, স্ট্রাগল বোঝে সে। সেজন্য তো চায় মায়ের উপর যাতে চাপ না পড়ে। মেয়ে অসুস্থ দেখে সুমনা আজ অফিস যেতে চায় নি। কিন্তু যেতে বাধ্য হয়েছে। এই চাকরি না থাকলে বাচ্চাদের খাওয়াবে কি? বাসা ভাড়া দিবে কিভাবে? স্কুলের ফি দিবে কিভাবে?
আর নির্জন বোঝে এখন মায়ের সমস্যা। নাদিয়া ছোট হলেও সেই একটু একটু বোঝে যে বাবা পচা। মাকে কষ্ট দিয়েছে। তাদের ছেড়ে চলে গিয়েছে। তাই তো সেও বাবাকে আর চায় না, বাবাকে ঘেন্না করে।
কিন্তু কষ্ট কি হয় না? দুই ভাই বোনেরি কষ্ট হয় যখন দেখে অন্যরা বাবা-মাকে নিয়ে কত খুশি, কিন্তু তাদের বাবা তাদের সাথে নেই….
চলবে…
