#হৈমন্তী
#লেখা: আফরা আরনাজ
#পর্ব: ০২( অন্তিম পর্ব)
প্রিয়মের যাওয়ার পরেও হৈমন্তী মেঝেতে ঠাই বসে রইলো।ঘরের মধ্যে থাকা হলদে আলোয় হৈমন্তী আশেপাশে চোখ বুলালো। প্রিয়মদের বাড়িটা পুরনো আমলের। বাড়িটা দেখতে কিছুটা পুরনো জমিদারদের বাড়ির মতো কিন্তু এক তলা বিশিষ্ট। বাড়ির ভেতরের নকশাগুলো খুব মনোরোম।যে কারোরই এক দেখায় বাড়িটি ভালো লাগবে।
কিন্তু এ মুহূর্তে বাড়ির আকর্ষণ হৈমন্তী কে টানলো না।মেঝেতে ছুরে মারায় ওর খোপা খুলে গেছে। একদম বিধ্বস্ত অবস্থা। হৈমন্তী মেঝে থেকে ওঠে দাড়ালো। কেটে যাওয়া হাতটির দিকে তাকালো, রক্ত শুকিয়ে গেছে।ও আলগোছে চুলগুলো খোপা করলো।তারপর গুটিগুটি পায়ে জানালার পাশের টেবিলের কাছে গেলো।একটা খাতা আর কলম নিয়ে চিঠি লিখতে বসলো।হাত টা কেটে যাওয়ায় কলম ধরতে কষ্ট হলেও হৈমন্তী লেখা শুরু করলো ,
আমার প্রিয়ম,
তোমাকে এখন আমার বলে দাবি করতেও ঘেন্না হচ্ছে। প্রিয়ম তুমি তো এমন ছিলে না। কেমন করে এমন হলে!আমাদের প্রেমের দু বছর আর বিয়ের পাঁচ বছর, এ সাত বছরে ও আমি তোমায় চিনতে পারলাম না।তোমার অভিনয়গুলো বুঝতে পারলাম না।অভিনয়ে তুমি যে এতো পাকা তা আমি জানতাম না।শুনেছি তুমি নাকি আগে থেকেই এমন ছিলে।আমি যখন প্রথম এ বাড়ি বউ হয়ে এলাম তখন শুনেছিলাম তুমি নাকি তোমার খুড়তুতো বোনের সাথে বাজে কিছু করতে চেয়েছিলে কিন্তু পারো নি।
জানো?,,,তখন একথা আমি অতো গুরুত্ব দিই নি। কারন আমি ভেবেছিলাম হয়তো এগুলো সব মিথ্যে কথা বা তুমি হয়তো আগে এমন ছিলে।আমি তো আর স্বচক্ষে কিছু দেখলাম না।কারন তখন তুমি আমার চোখে সুপুরুষ ছিলে। জানো?,,,,আমার মা আমায় বলতেন,আমি নাকি অনেক বোকা।আজ সেটা হারে হারে টের পাচ্ছি।হয়তো তুমি আমায় বিয়ে করেছিলে এইজন্য যে আমি বড্ড বোকা, আমার চোখে ধুলো দিতে পারবে খুব সহজেই।সে যাক গে,এতো কিছুর পর আমার আর তোমার সাথে থাকা সম্ভব না। আমি হারিয়ে যাচ্ছি তোমার জীবন থেকে। আমায় খুঁজো না। ডিভোর্স পেপারটা রেখে যাচ্ছি, সই করে দিও।
শেষবেলায় বলতে চাই, বড্ড ভালোবেসেছিলাম তোমায় প্রিয়ম। কিন্তু তুমি প্রতারক, নরপশু।আমি এটাও বুঝলাম যে নারীরা প্রথম থেকেই বোকা হয় কিন্তু কাউকে ভালেবাসলে আরো বেশি বোকা বনে যায়।নিজের সর্বস্ব দিয়েছিলাম তোমায়।তুমি ঠকালে।আমি আর তোমার সাথে থাকতে চাই না।
ইতি
হৈমন্তী
হৈমন্তীর লেখা শেষ হলো।সঙ্গে সঙ্গে চোখ বেয়ে দুফোঁটা জল চিঠির পাতায় গড়িয়ে পরলো।যদিও ও কিছু প্রশ্নের উত্তর প্রিয়মের কাছ থেকে পায়নি। আগে সে প্রশ্নগুলো করতে চাইলে ও এখন সেই ইচ্ছা মরে গেছে। এ বাড়ি আর প্রিয়ম ওর কাছে এখন নরক লাগছে।
ও চোখ মুছে উঠে দাড়ালো।চিঠিটি ভাজ করলো অতপর টেবিলেই সেটিকে কলম দিয়ে আটকে রেখে দিলো।ড্রেসিং টেবিল হতে নিজের ব্যাগটা এনে সেখান থেকে ডিভোর্স পেপারখানা বের করে টেবিলে রেখে দিলো। ওখানে ওর সই আগে থেকেই করা।
প্রিয়মের সকল কারসাজির বিষয়ে হৈমন্তী আগেই জেনেছিলো।ও শুধু সঠিক সময়ের অপেক্ষায় ছিলো এতদিন। আজ সবকিছু একদম ওর পরিকল্পনা মতো হলো।হৈমন্তী ইচ্ছে করেই আজকে বাইরে বেরিয়েছিলো। পরে রাত করে বাড়ি ও ফিরলো যেনো প্রিয়ম ওর সাথে ঝগড়া করে এবং ও যেনো প্রিয়মের সব কালো সত্যিগুলো বলতে পারে। হৈমন্তী সোজা হয়ে দাড়ালো।শেষবারের মতো নিজের সংসার, নিজের ঘরের দিকে নজর বুলালো।চোখদুটি ছলছল করে উঠলো।কিন্তু চোখের পানি এবার গাল বেয়ে গড়ালো না। চোখেই শুকিয়ে গেলো। একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে হৈমন্তী নিজের ব্যাগটা নিয়ে প্রিয়মের কাছ থেকে হারিয়ে যাওয়ার প্রস্তুতি নিলো।
__________________
কিছুক্ষণ পরেই ভোরের আলো ফুটতে শুরু করলো চারপাশে। পাখিরা ডেকে ডেকে জানান দিচ্ছে ভোরের।তখনই প্রিয়ম দরজা খুলে ঘরের ভেতর ঢুকলো।
পুরো ঘর শূণ্য,হৈমন্তী নেই।মেঝেতে চোখ পরতেই দেখলো ফোঁটা ফোঁটা শুকিয়ে যাওয়া রক্ত।ঘরের মধ্যে থাকা টেবিলের পাশের জানালা টা খোলা।প্রিয়ম বুঝলো হৈমন্তী জানালা দিয়ে পালিয়েছে।ওর মাথা গরম হয়ে গেলো। তখন রাগের মাথায় মনেই ছিলো না ওর যে জানালায় শিক নেই।ও রাগে খাটের পায়ায় লাথি দিলো সজোরে। তখনই ওর নজর পড়লো টেবিলে থাকা দুটো সাদা কাগজে।
প্রিয়ম টেবিলের কাছে গিয়ে প্রথমেই চিঠিটি খুললো।চিঠির পাতায় দুফোঁটা জলের ছাপ। প্রিয়ম বুঝলো হৈমন্তীর চোখের জলের ছাপ এটা। চিঠিটি পরে ও ডিভোর্স পেপার টা খুললো। সেখানে হৈমন্তীর সই দেখে একটি ফিকে হওয়া তিক্ত হাসি দিলো। ও চিঠি আর ডিভোর্স পেপার টেবিলেই রাখলো। তারপর খুলে থাকা জানালার কাছে গেলো।
সকাল শুরু হচ্ছে,কি মিষ্টি লাগছে!
প্রিয়ম সিগারেট ধরালো।একের পর এক টান দিতে লাগলো।যেনো সিগারেটের ধোঁয়ায় নিজেকে উড়িয়ে দিতে চাইলো।ও বুঝে গেলো হৈমন্তী কে ও খুঁজে পাবে না।কারন, “আমরা তাদেরকেই খুঁজে পাই যারা হারিয়ে গিয়ে ও ফিরে আসতে চায়। তাদের খুঁজে পাই না যারা স্ব-ইচ্ছায় হারিয়ে যায়।”
প্রিয়ম শেষমেশ সব হারালো। ওর সব যে হৈমন্তীই ছিলো।
(সমাপ্ত)
