Thursday, June 18, 2026







নীল ধ্রুবতারা পর্ব-০৩

#নীল_ধ্রুবতারা [৩]
#সানজিদা_খানম_স্বর্ণা

অন্যদিন ভদ্রলোক অফিসে যাবার পরে আমার তিলতিল করে গড়ে তোলা সংসারটা মন দিয়ে গুছিয়ে রাখতাম আমি। বাসি জামাকাপড়গুলো ধুয়ে রোদে শুকোতে দিতাম। এলোমেলো বিছানার চাদর একটু পরপর টানটান করে বিছিয়ে রাখতাম। কাজ করতে আমার ভীষণ ভালো লাগতো। আমার সংসার। আমি গুছিয়ে রাখব না? তাছাড়া আমার শুচিবায়ুর সমস্যা আছে। আমার সুপুরুষ স্বামী খুব পরিপাটি হলেও একটা বিষয়ে ভীষণ বেখেয়ালি। সবসময় ভেজা তোয়ালে বিছানার উপর রেখে দেয় সে। বিয়ের পর থেকে এই ব্যাপারে কথা বলতে বলতে আমি অতিষ্ঠ। আজ হঠাৎ আশ্চর্য হয়ে খেয়াল করলাম সে ভেজা তোয়ালে বারান্দার দড়িতে মেলে দিয়েছে। তা দেখে আমার কেন যেন ভীষণ কষ্ট হলো। মানুষটা এতো দ্রুত বদলে গেল কি করে? যেই কাজটা আমার করার কথা তা কেন সে করছে? এমন তো কথা ছিল না। বিয়ের আগে তো আমি এসব বিষয়ে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হইনি। তবে কেন এই রদবদল?

চোখ বন্ধ করলে আজও দেখতে পাই বছর তিনেক আগে তিনদিন আলাপহীন থাকার পরে মানুষটা কতটা মুষড়ে পড়েছিল। অসহায়ের মতো দীর্ঘ মেসেজ করেছিল,
“আচ্ছা, আপনার সাথে কথা বলতে না পারলে আমার এতো অস্থির লাগে কেন? মনে হয় দম বন্ধ হয়ে আসছে। জানেন, এই তিন দিন আমি ঠিক করে কিছুই খেতে পারিনি। খালি মনে হয়েছে, আমার কাছের কিছু একটা যেন আমার থেকে দূরে সরে গিয়েছে। আমি হারিয়ে ফেলেছি কোনো প্রিয় বস্তু। কিংবা প্রিয়জন। আপনি কি জানেন কি সেটা? অথবা আমার কি হয়েছে?”

আমি উনার দেওয়া এই একটা ক্ষুদে বার্তা একবার দুবার করে বহুবার পড়ে ফেললাম। অজান্তেই ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠল দারুণ সলজ্জ হাসি। কি আশ্চর্য! আমার নিজের সমস্যার সবটুকুই কি শোষণ করে নিয়েছে ভদ্রলোক? নয়তো এমন কঠিন অসুখে কি করে পড়লেন তিনি? আকস্মিক তীব্র এক আবেগে আমার চোখে জল চলে এল। অদেখা মানুষটার প্রতি তীব্র প্রেমে দ্রবীভূত হয়ে গেল আমার সদ্য যৌবনা মন। এসব ভাবতে ভাবতে মেসেজের উত্তর দিতে দেরি হলো।

অধৈর্য ভদ্রলোক ফের লিখলেন,
“কোথায় হারালেন?”
“হারাইনি, এখানেই আছি।”
“কি করছেন?”
“ভাবছি।”
“কি ভাবছেন?”
“আপনার অসুখটা নিয়ে ভাবছি।”
“ভেবে কি পেলেন? উত্তর মিলল কিছু?”

আমি একগাল হাসলাম। উত্তর তো অনেকই মিলেছে। কোনটার ব্যাখ্যা দেব আমি উনাকে? উনাকে কি বলব, এই রোগ কেবলমাত্র আপনাকেই কাবু করেনি। এই রোগ আমাকেও বড্ড বাজে ভাবে আহত করেছে। না, তা বলা যায় না। ওই যে বলে না, মেয়ে মানুষের বুক ফাটে তো মুখ ফোটে না।

আমি লিখলাম,
“জটিল প্রশ্নের উত্তর কি সহজে মেলে?”
“আমার কি খুব জটিল কোনো অসুখ করেছে?”
“শুধু জটিল নয়। ভয়াবহ একটা অসুখ হয়েছে আপনার। যেই রোগে আপনি আক্রান্ত হয়েছেন, এই পৃথিবীতে কোনো ডাক্তার নেই যে এই রোগ সারাবে।”

ভদ্রলোক বোধহয় সামান্য শঙ্কিত বোধ করলেন। জবাব দিলেন না কিছু। আমার কেমন যেন ভয় ভয় করতে লাগল। মানুষটা কি আমার এমন করে বলায় রাগ করল? আমার ইঙ্গিতপূর্ণ কথা অনুধাবন করেই চুপ হয়ে গেছেন? আমার বুক ধুকপুক করতে লাগল। মানুষটাকে যে আমার জীবনের আলোকবর্তিকা মেনেছি আমি। আমি অপেক্ষা করতে লাগলাম উনার জবাবের। দীর্ঘসময় ব্যয় করলাম উনার ইনবক্সে। কিন্তু দেখা গেল একটা সময় নামের পাশে জ্বলজ্বল করতে থামা সবুজ বাতিটা নিভে গিয়েছে। সেখানে ভেসে উঠেছে পনেরো মিনিট পূর্বে উনার সক্রিয় থাকার বার্তা। আমি ক্ষুণ্ণ মনে বেরিয়ে এলাম ফেসবুক ছেড়ে। কিন্তু মিনিট খানেক পরেই আবার উঁকিঝুঁকি দিলাম একটিবার সবুজ বাতি দেখার আশায়। কিন্তু না, সেদিন বারবার আইডি ঘুরেও সবুজ বাতির সাক্ষাৎ পেলাম না। মনটা আঁকুপাঁকু করতে লাগল। অবসাদে ছেয়ে গেল বুক। সেদিন সারারাত আমার ঘুম হলো না। মাঝরাতে উঠে গিয়ে কিছুক্ষণ পরপর দেখতে লাগলাম উনার আইডিটা।

ভদ্রলোক জবাব দিলেন ভোরবেলা। এখানে উল্লেখ্য, আমার গৃহকর্তা নিয়মিত ফজরের নামাজ পড়েন। নামাজের পর দুটো নোনতা বিস্কিটের সাথে চা খান। বিয়ের আগে থেকেই উনার এই অভ্যাস। নামাজের পর আয়েশ করে চায়ে চুমুক বসিয়ে আমাকে ভদ্রলোক লিখেছিলেন,
“কেমন আছেন নবনী? রাতে ভালো ঘুম হয়েছে?”

সারারাত ঘুম হয়নি বিধায় আমার চোখ ভোরের দিকে লেগে এসেছিল। গভীর ঘুমে তলিয়ে গিয়েছিলাম। সেই ঘুম ভাঙল দিবসের মধ্যভাগে। ঘুম থেকে উঠে ক্লান্ত, অবসন্ন শরীরটা নিয়ে বাথরুমে চলে গেলাম। দীর্ঘ সময় নিয়ে গোসল সেরে বের হয়ে ঘরে এসে আয়নায় দাঁড়িয়ে অনেক সময় নিয়ে দেখলাম নিজেকে। দেখতে আমি গড়পড়তা আর পাঁচটা বাঙালি মেয়ের মতোই। শ্যামলা গায়ের রঙ, বোঁচা নাক, বিশ্রী মোটা এক জোড়া ঠোঁট, যুক্ত ভ্রু যুগল, ডার্ক সার্কেল যুক্ত চোখে মোটা ফ্রেমের চশমা, মাথায় একগাছি লম্বা কেশ। এই। এইতো আমি। মুগ্ধ হবার মতো বিশেষত্ব কিছু নেই আমার মাঝে। না আমি মোটেও রূপবতী নই। এমন রূপহীন একটা মেয়েকে কেউ কেন উজাড় করে ভালোবাসবে? নিজেকে দেখে আমার ভীষণ মন খারাপ হয়ে গেল। বরাবর নিজের এই বাজে চেহারাটা নিয়ে হীনম্মন্যতায় ভুগি আমি। চেহারা সুন্দর না হবার কারণে সমাজের অনেকে অনেক কথাই বলে। তদ্মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো, আমার বিয়ে হবে না।

গ্রামাঞ্চলে পরনিন্দা আর পরচর্চার বিষয়টি অধিক প্রচলিত কি না! আমার জন্মধাত্রীরও আমাকে নিয়ে চিন্তার অন্ত নেই। কে জানে, উনি হয়তো মানুষের কথা সত্য হয়ে যায় এই ভয়ে তটস্থ থাকেন। আয়নায় নিজেকে দেখে আমি বিড়বিড় করলাম,
“আমাকে কেন আরেকটু রূপসী বানালে না, আল্লাহ! কেন আমার গায়ের রঙ আরেকটু সুন্দর হলো না? কেন আল্লাহ? কেন?”

বলতে বলতে আমি কেন যেন কেঁদে ফেললাম। আমাকে দেখে অপছন্দ করে ভদ্রলোক আমার মেসেজের জবাব দিচ্ছেন না এমনটা নয়। কারণ তিন মাসের পরিচয়ে এখনো আমরা কেউ কাউকে দেখিনি। তবুও কেন যেন এইটাকে প্রধান কারণ দাঁড় করাতে চেষ্টা করলাম। হয়তো আমার আইডি ঘেঁটে আমার ছবি দেখেছেন তিনি। সন্দেহী মনে ফোন হাতে নিয়ে একবার ঘুরে এলাম নিজের আইডি। মুখ উন্মোচন করা কোনো ছবি নেই আমার আইডিতে। যা আছে সবই মুখ ঢাকা। তবে কেন আমার মেসেজের উত্তর দিচ্ছেন না তিনি? ইনবক্সে গিয়ে দেখলাম ভদ্রলোক মেসেজ দিয়েছেন। আমার মনে হলো দূরে বহুদূরে পালিয়ে যাওয়া আমার প্রাণ পাখিটি খাঁচায় ফিরে এসেছে। দ্রুত লিখলাম,
“ভালো আছি। আপনি রাতে আমার সাথে কথা বলতে বলতে কোথায় হারিয়ে গেলেন?”
মিনিটখানেক সময়ের ব্যবধানে সে লিখল,
“কেন? মিস করছিলেন বুঝি?”

আমি ধরে ফেললাম তার কথার সুর। আমিও তো একই ভঙ্গিমায় এই প্রশ্নটা করেছিলাম তাকে। তবে কি সে প্রতিশোধ নিচ্ছে? তার সাথে তিন দিন কথাহীন থাকার শাস্তি? শুকনো ঢোক গিলে আমি লিখলাম,
“মোটেও মিস করছিলাম না। কিন্তু কথা বলতে বলতে হুট করে হারিয়ে যাওয়াটা ভদ্রতা নয়, নিশ্চয়ই?”
সে লিখল,
“আমি কি খুব অভদ্র?”
“হুঁ।”
“আমাকে সহ্য করা যাচ্ছে না একদম?”
“না, ঠিক তা নয়।”
“তবে কি?”
“কিছু না।”

তিন অক্ষর সংবলিত শব্দটা লিখে আমি চুপ করে রইলাম। আমার বুকের ভেতর তখন একটা অচেনা পাখি ডানা ঝাপটাচ্ছে। সে কি আমাকে ভালোবাসে? পছন্দ করে সিকিভাগও? কথার টোন এমন অন্যরকম কেন? হাজারো প্রশ্ন আমাকে ঘিরে রইল। ভদ্রলোক নিজেই লিখল,
“আমার রোগ সম্পর্কে বিস্তারিত বললে না তো!”
আমি লিখলাম,
“কেউ নিজেই জানতে আগ্রহী নয়। তাছাড়া আমি তো ডাক্তার নই।”

সঙ্গে জুড়ে দিলাম ঠোঁট বাঁকানো ইমোজি। যেন আমি তাকে গুরুত্বপূর্ণ ভাবছি না মোটেও। অথচ তার গুরুত্ব আমার জীবনে অক্সিজেনের থেকেও কম কিছু নয়। মানুষটাকে যে আমি কতটা তীব্র ভাবে চাই তা সৃষ্টিকর্তা ভিন্ন আর কেউ জানে না। ভদ্রলোক একটা হাসির রিয়েক্ট দিল আমার কথায়।

এরপর লিখল,
“আমার রোগ বোঝার জন্য অভিজ্ঞ ডাক্তার প্রয়োজন বুঝি?”
“হুঁ।”
“আপনি কি কিছুই বুঝতে পারছেন না?”
আমি কম্পিত হস্তে লিখলাম,
“বুঝতে পারছি।”
“কি বুঝতে পারছেন? নাম কি এই রোগের?”
“প্রেম রোগ।”

এই সামান্য দুটো শব্দ লিখতে অনেকটা সময় নিলাম আমি। অনভিজ্ঞ রোমাঞ্চে সারা শরীর শিরশির করতে লাগল। খোলা জানালা দিয়ে ভেতরে প্রবেশ করা দক্ষিণা হাওয়া যেন সেই শিরশিরে অনুভূতিকে জোরালো তুলল। কপালে জমল বিন্দু বিন্দু ঘাম। আমার সমস্ত সত্তা হিম হয়ে গেল তার পরবর্তী কথা শোনার আগ্রহে। তার লেখার পূর্বাভাস যখন তিনটে ডট আকারে অবিরত নৃত্য করে চলে চোখের সামনে, তখন একই রকম তালে নৃত্য করে আমার হৃদপিণ্ড। সে লিখল,
“শুনেছি এই রোগ খুব খারাপ। যাকেই এই রোগ একবার ধরেছে মৃত্যু বিনা তার মুক্তি মেলেনি।”

আমি হতচকিত হয়ে লিখলাম,
“এ আবার কেমন কথা? বাজে কথা যত।”
“মোটেও বাজে কথা নয়। এটাই সত্যি কথা।”

আমি গোঁয়ারগোবিন্দ হলাম তখন। বাজে কোনো কথা উদ্ভট কোনো যুক্তি চাপিয়ে দিলেই আমি মেনে নেব? মোটেও না। লজিকের সাথে কোনো কমপ্রোমাইজ আমি কস্মিনকালেও করব না। তিনটে অ্যাংরি ইমোজির সাথে তাকে বললাম,
“প্রমাণ দিন দেখি। এটা কেমন সত্যি কথা।”
“প্রমাণ তো দূর থেকে দেওয়া যায় না। সেজন্য ভালোবাসতে হয়, কাছে আসতে হয়।”

আমার কেন যেন ‘কাছে আসা’ শব্দটিতে বড্ড সমস্যা হয়ে গেল। কাছে আসা আবার কি ধরনের আলাপ? উনার সাথে এমন কথা বলার মতো কোনো সম্পর্ক এখনো আমার হয়নি। যদিও তাকে সম্পূর্ণ উজাড় করে ভালোবেসে ফেলেছি। তা বলে এমন একটা কথা? মানতে আমার বড্ড বিবেকে বাঁধল। মনে কিঞ্চিৎ সন্দেহ হলো, স্বল্প পরিচিত বা অপরিচিত মেয়েদের ইনবক্সে গিয়ে কি উনি এসব কথাই লিখে বেড়ান? ছি! এ কেমন মানুষের প্রেমে পড়লাম আমি? গা গুলিয়ে উঠল হঠাৎ। বিক্ষিপ্ত মেজাজ নিয়ে উত্তর দিলাম,

“হোয়াট ডু ইউ মিন? কাছে আসা আবার কি? আমি কেন আপনার কাছে যাব?”

সঙ্গে সঙ্গেই সে লিখল,
“সরি, সরি আপনি কি আমার কথায় রাগ করলেন? আমি কাছে আসা বলতে দেখা সাক্ষাতের কথা বলেছি। অন্য কিছু নয়। প্লিজ, ভুল বুঝবেন না। আমি খুব সরি। এমন করে বলা উচিত হয়নি।”

আমি বুঝতে পারলাম না কি করব। মানুষটাকে কি বিশ্বাস করা যায়? শুধুমাত্র আমার বোঝার ভুল এই যুক্তিতে কি ক্ষমা করা যায় উনাকে? আমার অসহ্য লাগল খুব। দূর!প্রেম-ভালোবাসা নামক বস্তুটি এতো জটিল? হুটহাট মন খারাপ বা মন ভালো করে দেওয়ার জন্য এই জটিল শব্দ এতোটা ভূমিকা কেমন করে রাখে?

“ভাবী, এই ভাবী? কল ধরেন না কেন?”

ফোনের সুরেলা রিংটোন অনেকক্ষণ ধরেই কেউ আমাকে স্মরণ করেছে সেই বার্তা দিয়ে যাচ্ছিল। ভাবনায় বুঁদ হয়ে থাকা আমি টের পেলাম না কিছুই। স্মৃতিচারণ করছিলাম আমার প্রণয়ের কথা। আচানক পাশের রুমের ভাড়াটিয়ার কথায় আমার ধ্যানভঙ্গ হলো। কাটল স্মৃতির ঘোর। দেখলাম আমি বসে আছি জানালার ধারে। একদৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিলাম অদূরের ওই ছাতিম গাছের দিকে। মাঝখানে একটা মেয়েলি গলার স্বর এবং পরবর্তীতে সেই স্বরের অধিকারিণী এসে আমার নিচ্ছিদ্র মনোযোগে বাধা দিল। দৃষ্টি সরিয়ে একবার ফোনের দিকে তাকালাম। আমার নিদারুণ অবহেলায় বাজতে বাজতে ক্লান্ত হয়েছে বস্তুটা। ফোনের স্ক্রিনে দেখতে পেলাম ভদ্রলোকের কল। পারতপক্ষে তার নাম্বারটাও সেভ করেছি ‘ভদ্রলোক’ নাম দিয়ে। আমি ফোনটা হাতে নিলাম না। তাকালাম আমার ভাবনার জাল ছিন্ন করা মহিলার দিকে। উনার নাম শায়লা। দেখতে রূপবতী। মোটামুটি স্বাস্থ্য। লম্বায়ও বেশ। শুধু যে উনি দেখতে সুদর্শনা তা ঠিক নয়। শায়লা ভাবীর স্বামীও যথেষ্ট জেন্টলম্যান। ভদ্রলোকের একটাই সমস্যা, প্রচুর কৃপণ। ছেলে-মেয়ে কিছু নেই। তবুও এই অতিশয় মিতব্যয়ী স্বভাব কিসের জন্য আমি বুঝতে পারি না।

শায়লা ভাবী আমার বিমূঢ় চেহারাটা দেখে জানালার গ্রিলের খুব কাছে মুখ এনে প্রশ্ন করলেন,
“হঠাৎ এমন ঝিমিয়ে গেলেন কেন? সমস্যা কি? হাসপাতাল থেকে ফিরে এসে হঠাৎ এমন মরা কান্না জুড়ে দেওয়ার কি কারণ? অনেকরাত অবধি আপনার কান্নার শব্দ শুনতে পেলাম।”

কথা সত্যি। গতকাল অনেক রাত অবধি জ্বরের মাঝেও বালিশে মুখ গুঁজে গুনগুনিয়ে কেঁদেছি। আমি যে পিরিয়ডের সমস্যা নিয়ে হাসপাতালে যাচ্ছি সেই তথ্য জানত শায়লা ভাবী। উনারও ধারণা ছিল আমি বোধহয় মা হতে চলেছি। বোধকরি এই সম্ভাবনার সংবাদ উনার স্বামীর কর্ণগোচরও করেছিলেন তিনি। ফলশ্রুতিতে একটা বাজে ঝগড়া হয়েছিল উনাদের মাঝে। সমস্যা দুজনেরই আছে। তবে ঝগড়ার সময় উনারা একে অপরের দিকে খুব বাজে ভাবে আঙুল তুলেন। মা-বাবা না হতে পারার সম্পূর্ণ ব্যর্থতা একজন চাপিয়ে দেন অন্যজনের ঘাড়ে।
আমি বললাম,
“এমনি। শরীর ভালো না।”
“কেন? শরীরে আবার কি হইলো?”

শায়লা ভাবীর বড় কৌতূহলী প্রশ্ন। অবশ্য এই মরা কান্না দেখে যে কারো কৌতূহল হওয়া স্বাভাবিক। আমি বিষণ্ণ মুখে জানালাম,
“কিছু হয়নি।”
“কিছু হয়নি, নাকি মিষ্টি খাওয়ানোর ভয়ে শুভ সংবাদটা দিবেন না?”

আমার চোখ ছলছল করে উঠল। গতকালের পর থেকে আমার চোখ অকারণেই হুটহাট ছলছল করে উঠছে। না, কোনো লোকসমাগমের ভয়ে বাঁধন দিতে পারছি না চোখের জলে। এই থৈ থৈ জলের মাঝে যেন ভেসে উঠছে এক আকাশ পরিমাণ দুঃখ। আমি ভেজা গলায় বললাম,
“যদি শুভ সংবাদই হতো তবে কি এমন করে কাঁদতাম ভাবী? আমার সুখের অন্ত থাকত না তাহলে। অথচ দেখুন আমি কাঁদছি। সুখে কেউ এমন করে কাঁদে?”

শায়লা ভাবী অপ্রস্তুত হলেন। হকচকিয়ে আমার দিকে তাকালেন। দেখে নিলেন আমাকে পূর্ণ দৃষ্টিতে। এরপর গম্ভীর কণ্ঠে বললেন,
“কি হয়েছে? বাচ্চা পেটে না?”
“না।”

শায়লা ভাবী খানিকক্ষণ চুপ করে রইলেন। তারপর আমাকে বোঝানোর ভঙ্গিতে বললেন,

“বিয়ের মাত্র এই কয়দিন। এর মাঝেই বাচ্চা পেটে না দেখে এমনে কাঁদতে হবে? আমার বিয়ের যে আট নয় বছর হয়ে গেল, আমি কি এমন করে কাঁদছি? পা-গ-ল হইছেন?”

আমি ধীর লয়ে জবাব দিলাম,
“আমার খুব বড় অসুখ করেছে ভাবী। এই অসুখ হইলে নাকি জীবনে কখনো বাচ্চা হয় না। আমার জীবনে কোনোদিন বাচ্চা হবে না ভাবী।”

শায়লা ভাবী ঝট করে আমার দিকে অবিশ্বাস্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে বললেন,
“কি সব উল্টাপাল্টা কথা বলেন?”
“উল্টাপাল্টা না ভাবী। এসব সত্যি কথা। ডাক্তার বলেছে।”

বলতে বলতে আমি ঝরঝরিয়ে কেঁদে ফেললাম। ঝাপসা চোখে দেখলাম শায়লা ভাবী জানালার গ্রিল শক্ত করে চেপে ধরেছে। বোঝা যাচ্ছে এমন করুণ খবরে সে খুবই মর্মাহত। শায়লা ভাবী নিশ্চুপ সেখানে দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে রইল। একটা সময় পর বলল,

“কি রোগ হয়েছে?”
“ওভারিতে সিস্ট হয়েছে।”
“এটা আবার কি রোগ? জীবনে তো নামই শুনিনি।”

এই প্রশ্নের জবাব দিতে গিয়ে আমি আটকে গেলাম। আমি জানি না ওভারিয়ান সিস্ট মানে কি? এমনকি অনার্স প্রথম বর্ষে পড়া আমি ওভারি সম্পর্কেও ঠিকঠাক জ্ঞান রাখি না। শুধু যে এই বিষয় তা নয়, আমি তেমন করে কোনো বিষয়েই জ্ঞান রাখি না। আমার মাঝে মাঝে খুব আশ্চর্য লাগে এই ভেবে— আমি কি করে এসএসসি, এইচএসসিতে ভালো নাম্বার পেয়ে পাস করলাম? বিদ্যের ঝুলি যে একেবারেই ফাঁকা। আমি নিজের অজ্ঞতা গোপন করলাম। ডাক্তার যা বলেছে তা সাতপাঁচ ঘুরিয়ে বললাম,

“সিস্ট হচ্ছে পানির ছোট ছোট ফুটকা। সেগুলো বাচ্চা হবার পথ বন্ধ করে রাখে। মাঝে মাঝে এসব বড় হয়ে ফেটে যায়। তখন মানুষ মারা অবধি যেতে পারে। আবার এই সিস্টের কারণেই মেয়েদের পিরিয়ড অনিয়মিত হয়। আর..”

শায়লা ভাবী মনোযোগ দিয়ে আমার কথা শুনছিলেন। কিন্তু আমি আরও বিস্তারিত জানানোর আগেই আমার ফোনটা আবার কর্কশ শব্দে বেজে উঠল। যদিও বিস্তারিত সবই অজানা আমার তবুও আরও বোধহয় বলতে যাচ্ছিলাম। বলা হলো না। শায়লা ভাবী চলে গেলেন। আমি অনিচ্ছায় স্বামীর কল রিসিভ করলাম। রিসিভ করতেই ভদ্রলোকের চিন্তিত স্বর ভেসে এল প্রশ্নের ঝুড়ি নিয়ে,

“নবনী, কি করছো তুমি? ঠিক আছো? সেই কখন থেকে কল দিচ্ছি ধরছো না কেন? ঘুমাচ্ছিলে নাকি? নাস্তা খেয়েছো? ওষুধ খেয়েছো? তোমার জ্বর এসেছে আবার?”

—চলমান—

পূর্ববর্তী নিবন্ধ
পরবর্তী নিবন্ধ
গল্প পোকা
গল্প পোকাhttps://golpopoka.com
গল্পপোকা ডট কম -এ আপনাকে স্বাগতম......
RELATED ARTICLES

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে

- Advertisment -

Most Popular

Recent Comments

Md masrur Hasan mahi على অবুঝ_বউ পার্ট: ৫
আমিনুল ইসলাম على প্রয়োজন পর্ব: ৩০ ( অন্তিম)
সাজিবুল ইসলাম على ধর্ষিতাবউ২ ৯ তথা শেষ পর্ব
শাহিদুল ইসলাম على জীবন সঙ্গী ১ম পার্ট
শাহিদুল ইসলাম على জীবন সঙ্গী ১ম পার্ট
Nita Sarkar على স্বপ্নীল ৬৮
শিয়াসা ইসলাম হুরিজিহান على রহস্য শেষ_পর্ব
শিয়াসা ইসলাম হুরিজিহান على অলক্ষ্যে তুমি পর্ব-০৬ এবং শেষ পর্ব
Nazmun Nahar Akhi على Psycho_is_back? part_7
Nazmun Nahar Akhi على Dangerous_Villian_Lover part 2
শিয়াসা ইসলাম হুরিজিহান على জানালার ওপারে পর্ব-১৭ এবং শেষ পর্ব
শিয়াসা ইসলাম হুরিজিহান على লীলা বোর্ডিং ১২১৫ পর্ব-১১ এবং শেষ পর্ব
মিজানুর রহমান রাহুল على সেই তুমি পর্ব-০১
@feelings على প্রহেলিকা
Anamika Basu على সে পর্ব-১২
Anamika Basu على সে পর্ব-১২
Nusrat jahan على coffee & vanilla Part-10
Pallabi Roy على স্বপ্নীল ৬৮
M.D Mahabub على The_Villain_Lover Part_2
Labani sarkar على Dangerous_Villain_Lover part 23
MD Akas Apc على বিবেক
Tanisha Ahmed على Devil love part-18 
Aius Barmon shorob على নারীর দেহকে নয়
Chandan roy على স্বপ্নীল ৬৮
Chandan roy على স্বপ্নীল ৬৮
Riya Biswas على তুমি রবে ৬০
Priya Banerjee على devil love married life last part
Riya Biswas على তুমি রবে ৬০
Riya Biswas على তুমি রবে ৫২
Mohammad Adib على তুমি রবে ৬০
Avni Ayesha على তুমি রবে ২৮
গল্প পোকা على Love At 1st Sight Season 3 Part – 69
সুমিত على তুমি রবে ২৮
TANJIBA ZENIFAR على তুমি রবে ৫০
TANJIBA ZENIFAR على তুমি রবে ৫০
Samiah Begum على তুমি রবে ৫১
biddut das rocky على নর নারী
গল্প পোকা على নষ্ট গলি শেষ পর্ব
Md Jobayer Hossain Shohag على নষ্ট গলি পর্ব-৩০
গল্প পোকা على দুই অলসের সংসার
গল্প পোকা على মন ফড়িং ❤৪২.
A.J.S Rakib على মন ফড়িং ❤৪২.
গল্প পোকা على গল্পঃ ভয়
গল্প পোকা على গল্পঃ ভয়
গল্প পোকা على গল্পঃ ভয়
Samiya noor على গল্পঃ ভয়
Sadikul على গল্পঃ ভয়
Samia Islam على গল্পঃ ভয়
শূন্য মায়া على মন ফড়িং ❤ ৪০.
Sutapa biswas على মন ফড়িং ❤৩৯.
Foysal Mahmud على My_Mafia_Boss_Husband Part: 16
sutapa biswas على মন ফড়িং ❤ ৩৮.
sutapa biswas على মন ফড়িং ❤ ৩৭
Foysal Mahmud على My_Mafia_Boss_Husband Part: 16
Siyam على বিবেক
Sudipto Guchhait على My_Mafia_Boss পর্ব-৯
saptami karmakar على devil love married life last part
saptami karmakar على devil love married life last part
মায়া على মন ফড়িং ৩০.
মায়া على মন ফড়িং ৩০.
মায়া على মন ফড়িং ২৬.
Shreyashi Dutta على  বিয়ে part 1
Sandipan Biswas على  বিয়ে part 1
Paramita Bhattacharyya على অনুরাগ শেষ পর্ব
জামিয়া পারভীন তানি على নষ্ট গলি পর্ব-৩০
মায়া على মন ফড়িং  ২২
সুরিয়া মিম على খেলাঘর /পর্ব-৪২
গল্প পোকা على মন ফড়িং ২১
গল্প পোকা على নষ্ট গলি পর্ব-৩০
গল্প পোকা على Love At 1st Sight Season 3 Part – 69
গল্প পোকা على Love At 1st Sight Season 3 Part – 69
গল্প পোকা على খেলাঘর /পর্ব-৪২
Sahin ssb على মন ফড়িং ২১
মায়া على মন ফড়িং ২১
মায়া على মন ফড়িং ❤ ২০.
গল্প পোকা على মন ফড়িং ❤ ২০.
গল্প পোকা على খেলাঘর /পর্ব-৪২
গল্প পোকা على খেলাঘর /পর্ব-৪২
মায়া على মন ফড়িং ❤ ১৮. 
মায়া على মন ফড়িং ❤ ১৭.
Jannatul Ferdous على খেলাঘর পর্ব-৩৫
গল্প পোকা على মন ফড়িং ❤ ১৬. 
গল্প পোকা على ফাল্গুনের_ফুল last_part_8
মায়া على মন ফড়িং ❤ ১৬. 
গল্প পোকা على ছাত্রী যখন বউ পাঠঃ ১
গল্প পোকা على বাজির প্রেম পাঠঃ ১
Foujia Khanom Parsha على মা… ?
HM Ashraful Islam على অবুঝ_বউ পার্ট: ৮
HM Ashraful Islam على অবুঝ_বউ পার্ট: ৫
Ibna Al Wadud Shovon على স্বার্থ