#নীল_ধ্রুবতারা [২]
#সানজিদা_খানম_স্বর্ণা
আমাদের প্রেমের বিয়ে। ভদ্রলোকের সাথে আমার পরিচয় ফেইসবুকে। ফেইসবুক নামক একটা প্ল্যাটফর্মেও যে এহেন রত্ন খুঁজে পাওয়া যায় সেই সম্পর্কে আমার ধারণাও ছিল না। তবে আমি পেলাম একটা খাঁটি রত্ন খুঁজে। ঘটনা হচ্ছে, এসএসসি পরীক্ষার পর বাবা আমাকে একটা ফোন কিনে দিলেন। মোটামুটি দামী ফোন। মানুষ বহু আকাঙ্ক্ষিত বস্তু পাবার পর যেমন খুশি হয় আমিও তেমন খুশি হলাম। বন্ধুদের সাথে নানা ভাবে যোগাযোগ করে এই আনন্দের সংবাদটা প্রচার করে দিলাম তাদের কাছে। সহপাঠীদের অনেকেই তখন এই যন্ত্রের স্বাদ নিচ্ছে হৃষ্টচিত্তে। ফোন কিনে দিলেও নিয়মিত ফোনে টাকা পাঠানোর ব্যাপারে বাবার আপত্তি ছিল। সুতরাং বন্ধুদের সাথে যোগাযোগের বিকল্প মাধ্যম খোঁজা আমার প্রয়োজন ছিল ভীষণ।
একজন আমাকে জানাল, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেইসবুকে কথা। এতে নাকি ফ্রী-তে মেসেজ করা যায়। আমি আনন্দিত মনে ফেইসবুক ডাউনলোড করলাম। একাউন্ট খুললাম। আমার কাছে উন্মোচিত হলো পৃথিবীর নতুন দ্বার। এতো আশ্চর্য লাগতো সব! যদিও অতশত বুঝতাম না। গণহারে ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট পাঠাতাম এবং এক্সেপ্ট করতাম। কপি পেস্ট করে করে অন্যের পোস্ট গ্রুপে গ্রুপে ছড়িয়ে দিতাম। বিধাতা জানেন এতে আমার এতো আনন্দ কেন হতো!
একদিন একটা নতুন গ্রুপে পোস্ট করেছি কিন্তু তিনদিন পরেও সেই পোস্ট এপ্রুভ হলো না। রাগে দুঃখে স্ক্রিনশট নিয়ে সেই গ্রুপের এডমিনকে ইনবক্স করলাম, “ভাইয়া, আপনি কি এই গ্রুপের এডমিন? দেখুন আমি তিন দিন আগে একটা পোস্ট করেছি। এখনো এপ্রুভ হচ্ছে না।”
ভদ্রলোক আমাকে রিপ্লাই দিলেন আরও তিন দিন পর। আমি বারবার উনার আইডিতে গিয়ে চেক করি উনি আমার কথার উত্তর দেয় কিনা। কিন্তু বারবার হতাশ হই। তিন দিন পর প্রায় রাত নয়টার দিকে তিনি উত্তর দিলেন,
“জ্বী আপু। আমি এই গ্রুপের এডমিন। আপনি দাঁড়ান, আমি এপ্রুভ করে দিচ্ছি।”
“আচ্ছা।”
আমি আনন্দিত মনে ভদ্রলোকের মহানুভবতায় মুগ্ধ হয়ে গেলাম। ফেইসবুক গ্রুপের এডমিনকে তখন আমি বোধহয় আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের মতো বিরাট কেউ মনে করতাম। উনার মতো বিরাট পর্যায়ের লোক আমার মতো নগণ্য মানুষের কথার উত্তর দিয়েছেন তা তো হাতে চাঁদ পাওয়ার মতোই আনন্দের। এরপর থেকে ওই গ্রুপে নিয়মিত পোস্ট করতাম আমি। পোস্ট করে সাথে সাথে গিয়েই উনাকে বলতাম,
“ভাইয়া, আমার পোস্টটা প্লিজ এপ্রুভ করে দিন।”
বলার সাথে সাথে ব্যস্ততা ভুলে ভদ্রলোক আগে আমার পোস্ট এপ্রুভ করতেন। দিনে বিশটা পোস্ট করলেও তিনি সাথে সাথেই সেগুলোর হিল্লে করতেন। কখনো বিরক্ত হতেন কিনা জানি না। তবে আমি খুবই আনন্দিত হতাম। আমাদের পরিচয়ের সেই শুরু। এরপর নিয়মিত পোস্ট করার সাথে সাথে নিয়মিত তাকে ইনবক্সে নক করাও যেন আমার অভ্যাসে হয়ে দাঁড়াল। তার সাথে কথা না বললে, আমার অস্থির লাগে। দম বন্ধ হয়ে আসে। দিন কাটে না। একটা সময় পর মনে হলো আমার বোধহয় মাথা খারাপ হয়ে যাচ্ছে। ভয়াবহ এক অসুখের পূর্ব লক্ষণ এসব। একদিন তাকে মেসেজ করলাম,
“আপনার সাথে আজ থেকে আর কোনো যোগাযোগ করব না। আমার ফোনটা আব্বাকে দিয়ে দিচ্ছি।”
না। আদতে ফোন আব্বাকে দিচ্ছি না। মূলত নিজের মাঝে যেই অস্থিরতা লক্ষ্য করেছি সেই অস্থিরতার ছিঁটেফোঁটাও ভদ্রলোককে স্পর্শ করেছে কিনা সেটা জানার জন্যই আমার এই ছলচাতুরী। আমার চতুরতা সে ধরতে পারল না। লিখল,
“কেন?”
“আসলে আব্বার ফোনটা নষ্ট হয়ে গিয়েছে। এখন কিছুদিন আমার ফোন ব্যবহার করবে।”
সে লিখল, “আচ্ছা।”
তার ‘আচ্ছা’ দেখে আমার ভীষণ মন খারাপ হয়ে গেল। আমার অনুপস্থিতি তাকে যন্ত্রণা দেবে না, একাকিত্ববোধ করাবে না এটা ভেবেই যেন কান্না পেল আমার। কেন? আমাকে সে কেন একটুও মিস করবে না? কেন আমাকে মনে করে মন পুড়বে না তার? অথচ এক বেলা তার সাথে কথা না হলে আমার ভীষণ পাগল পাগল লাগে। তবে কেন, একই অনুভূতির যাতাকলে পিষ্ট হবে না সে? আপনমনে এই প্রশ্নগুলো করতে করতে নিজেকে বোকা বলে ধিক্কার দিলাম হাজারবার। এক পাক্ষিক একটা ভালোবাসায় আমার মন জড়িয়ে গেছে সেটা বুঝতে বাকী রইল না কিছু। অভিমানে তিন দিন অফলাইনে ছিলাম।
দিন তিনেক পরে অনলাইনে গিয়ে দেখি অপরিচিত, অদেখা ভদ্রলোক মেসেজের বন্যা বইয়ে দিয়েছেন। কতশত কথা! কতশত মেসেজ! কয়েকবার অডিও কলও দিয়েছেন। উনার উদ্বিগ্নতা দেখে খুশিতে আমার মনটা চনমনে হয়ে উঠল। আমি লিখলাম,
“বাবাহ, এতো মেসেজ! খুব মিস করছিলেন বুঝি?”
ভদ্রলোক লাইনেই ছিলেন। জবাব এল,
“খুব বেশী।”
“তিনদিনেই এতো? যেদিন নীল-সাদার দুনিয়া থেকে চিরতরে হারিয়ে যাব, সেদিন কি করবেন?”
আমার কথার প্রেক্ষিতে ভদ্রলোক তিনটে রাগের ইমোজি দিল। বহু সময় নিয়ে টাইপ করতে লাগল কি যেন। উনার দীর্ঘ টাইপিংয়ে কোন বার্তা ভেসে আসে সেটা দেখার জন্য উদগ্রীব হয়ে রইলাম আমি। অনেকটা সময় পর বিরক্ত হয়ে ঘুরে এলাম তার আইডি থেকে। বেচারা তিন দিনেই অসংখ্য দুঃখের কথায় ভর্তি করে ফেলেছে নিজের প্রোফাইল। উনার স্যাড পোস্টগুলোর কমেন্ট বক্সে ঘুরে এলাম আমি। কয়েকজন বন্ধু লিখেছে,
“কি ব্যাপার মাহতাব, ছ্যাঁকা খেয়েছো নাকি?”
এসব কমেন্টেও দেখা মিলল ভদ্রলোকের রাগের রিয়েক্ট। জবাব কিছু দিলেন না তিনি। প্রায় প্রতিটি পোস্টেই কেউ না কেউ এ জাতীয় মন্তব্য করেছে। এসব দেখে আমার ভীষণ হাসি পেল। আহারে বেচারা! একটা উপযুক্ত প্রেম না করেও ছ্যাঁকাখোর ট্যাগ সহ্য করতে হচ্ছে উনাকে। তার এক বন্ধু লিখল,
“জীবনে প্রথমবার ছ্যাঁকা খাইলে যা হয়! দুঃখ করিস না বন্ধু। মেয়েরা হচ্ছে ছলনাময়ী। এদের বিশ্বাস করাটাই ভুল। মেয়েদের সাথে প্রেম করলে এমনই হয়।”
ভদ্রলোক এই কমেন্টের উত্তর দিয়েছেন। তিনি জবাবে লিখেছেন, “তুই তাহলে একটা ছেলের সাথে প্রেম করিস বন্ধু।”
জবাব দেখে আমার পেটে খিল দেওয়ার মতো হাসি পেল। বুঝলাম অতি শান্ত, ভদ্র যেই মানুষটার সাথে আমার পরিচয় ঘটেছে তিনি এতোটাও ভদ্র নয়। একই মুদ্রার আরেকটা পিঠ আছে তবে। মুদ্রার উল্টো পিঠের মানুষটা ভারী দুষ্টু। এর সাথে আমার প্রেম হলে ভারী দুষ্টু একটা প্রেমিক পাব আমি। আমি ফের ফিরে গেলাম ইনবক্সে। বহুক্ষণ ধরে ভদ্রলোক কি লিখেছে সেটা দেখার উত্তেজনায় আমার হাত-পা অবশ হয়ে এল। আমি বোধহয় এই ভাবনায় নিশ্চিত ছিলাম, ভদ্রলোক এখন আমাকে প্রেমের প্রস্তাব দিবে। কিন্তু দেখতে পেলাম আমাকে অবাক করে দিয়ে ভদ্রলোক একটা আশ্চর্য কথা লিখেছে। জানতে চেয়েছে কারণ।
“নবনী, এই নবনী?”
শরীরে একটা মৃদু ঝাঁকুনি অনুভব করে আমার ঘুম ছুটে গেল। ছিন্ন হলো আমার স্বপ্নের ঘোরের জাল। আমাদের অতীতের একটা দৃশ্যপট সুনিপুণ বিন্যাসে ধরা দিয়েছিল ঘুমন্ত চোখের পাতায়। আহা! আমার সেই সোনালী অতীত। চোখ বুজলেই যেই অতীতের স্নিগ্ধতা শরীর মন শীতল করে দেয়। কি দিন ছিল সেই সব। প্রেমে যে কি অপার সুখ সেটা তো এই ভদ্রলোকের থেকে জেনেছি আমি। ঘুম ঘুম চোখে আমি নির্বাক হয়ে চেয়ে রইলাম তার দিকে। ওই তো আমার সেই প্রেমিক পুরুষ। যাকে প্রথম দেখেছিলাম বৃষ্টিস্নাত এক দুপুরে। না, একগুচ্ছ কদম হাতে নয়। একগুচ্ছ গোলাপ হাতে এসেছিল সে। বিভিন্ন রঙের গোলাপ। আমি বিমুগ্ধ হয়ে গিয়েছিলাম তাকে দেখে। যেমন আজও হচ্ছি।
ঘনঘোর বর্ষার এই দিনেও ভদ্রলোকের কানের পাশ ঘেঁষে নামছে সরু ঘামের ধারা। অন্য সময় ঘুম থেকে উঠে এমন ঘর্মাক্ত মুখশ্রী দেখলে ব্যস্ত হয়ে পরনের ওড়নার কোণ দিয়ে মুছে দিতাম সেই নোনাপানি। আজ আর ইচ্ছে করল না। শরীর ও মনে কোথাও সেই তাড়না নেই। সে আমার বিমূঢ় চোখে চেয়ে থাকতে দেখে সামান্য হকচকিয়ে গেল বোধহয়। নিজের বাম হাত দিয়ে কপালে মুক্তোর বিন্দুর ন্যায় জমে থাকা ঘামটুকু মুছে নিয়ে অদ্ভুত কায়দায় ছুঁড়ে ফেলল দূরে। মেঝেতে গড়িয়ে পড়া ওই একবিন্দু জলের দিকে চেয়ে রইলাম আমি। এমন করেই হয়তো সে কোনো একদিন আমাকে ছিঁড়ে ফেলবে নিজের জীবনের পাতা থেকে। সে আমার পাশে বসে কপালে হাত রাখল। না, জ্বর নেই। অস্ফুটে সে বলল,
“আলহামদুলিল্লাহ, জ্বর কমে গেছে। শোনো, আমি খিচুড়ি রান্না করেছি। তুমি খেয়ে ওষুধ খাও। সকালের ওষুধ আমি গুছিয়ে রেখেছি ওখানে।”
তার ইশারাকৃত স্থানের দিকে একবার তাকালাম আমি। টেবিলের ওপর রাখা ট্যাবলেটগুলো দেখে আমার বুকটা আবার হু হু করে উঠল। আস্ত ট্যাবলেটের পাতা থেকে সকল ট্যাবলেট কাঁচি দিয়ে একটা করে কেটে রেখেছেন তিনি। কেন আমাকে এতো আদর আহ্লাদ করতে হবে? এই আহ্লাদ যখন শেষ হয়ে যাবে আমি তখন সহ্য করতে পারব না। একদম পারব না। আমার চোখ ভরে উঠল জলে। গতকাল সন্ধ্যার পর বাসায় ফিরেছি। এসে থেকে বর্ষার অবিরাম ধারার মতো কেঁদেছি যতক্ষণ জেগে ছিলাম ততক্ষণ। আমাকে নিভৃত করার অনেক চেষ্টা করেছেন ভদ্রলোক। পারেনি। শেষটায় হতাশ হয়ে বললেন,
“ডাক্তার কি বলেছে আমাকে তো ঠিক করে জানালেও না। একা একা কেঁদে অস্থির কেন হচ্ছো? তুমি না আমার লক্ষ্মী বউ। লক্ষ্মী মেয়েরা তো এমন করে কখনোই কাঁদে না।”
অন্য সময় হলে, কয়টা লক্ষ্মী মেয়ের সাথে তার পরিচয় আছে সেই প্রশ্ন করে তাকে জর্জরিত করে ফেলতাম আমি। বাচাল নামক একটা বিশেষণ আমার সাথে খুব যায়। আজ হঠাৎ নিজের সাথে সেই বিশেষণের যোজন যোজন দূরত্ব টের পেলাম। কোনো নাটকীয়তা ছাড়াই রাতে তাকে সবটা খুলে বলেছিলাম আমি। বলা বাহুল্য সন্তান হবে না এই বিষয়টি থেকে আমার ওভারিতে থাকা সিস্ট উনার চিন্তার প্রধান বিষয়বস্তু ছিল। সে অনেক রাত অবধি আমার রিপোর্টগুলো নিয়ে ঘাটাঘাটি করেছে। অনলাইনে রিসার্চ করেছে বিস্তারিত। পরিচিত একটা গাইনী ডাক্তারের সাথে ফোনে কথাও বলতে শুনেছি। তবে পাত্তা দেইনি সেসব।
কাঁদতে কাঁদতে একটা সময় গা কাঁপিয়ে জ্বর এল আমার। শীত শীত করতে লাগল খুব। ফ্যান বন্ধ করে দিয়ে এসে কাঁথা-কম্বল মুড়ি দিয়ে ঝরাতে লাগলাম চোখের জল। বর্ষাকালের শীত শীত ভাব বিরাজমান প্রকৃতিতে। তা বলে ফ্যান বন্ধ করে কাঁথা মুড়ি দিয়ে নাক মুখ ঢেকে রাখার মতো মাঘমাসের শীত নামেনি। ভদ্রলোক বাগ্র হয়ে ছুটে এলেন। ব্যাকুল গলায় প্রশ্ন করলেন,
“এ্যাঁই কি হয়েছে তোমার?”
আমি জবাব দিলাম না। ভদ্রলোক আমার শরীর থেকে কাঁথা সরাতেই শিউরে উঠল সর্বাঙ্গ। লোমকূপ অবধি খাড়া হয়ে উঠল শীতের তোপে। গায়ে হাত দিয়ে চমকে উঠলেন তিনি। অতি চিন্তিত স্বরে বললেন,
“একি! গা তো জ্বরে পুড়ে যাচ্ছে।”
এরপর উনি নিজের একটা গেঞ্জি ভিজিয়ে এনে খুব গুছিয়ে আমার কপালে জলপট্টি দিলেন। আমরা হসপিটালে যাবার আগে দুপুর আর রাতের রান্না করে গিয়েছিলাম। ওহ, আমি না বলে আমরা বলছি কেন? কারণ ছুটির দিনে ভদ্রলোক রান্নায় আমাকে খুব সাহায্য করেন। সাহায্য না, উনার চাওয়া ছুটির দিনে উনি নিজে আমাকে রান্না করে খাওয়াবেন। প্রথমে কয়েকবার উনার এই চাওয়াকে সম্মান করেছি আমি। তবে কয়েক সপ্তাহ দেখার পর আর সেই প্রবৃত্তি হয়নি। বলা বাহুল্য, উনার ব্যঞ্জনে তেল, ঝাল মশলার এতো অপ্রতুলতা থাকে যে সেই খাবার মুখে তোলা যায় না। আবার মুখের উপর বলাও যায় না, তোমার রান্না খেতে পারি না আমি। তাই কসরত করে ছুটির দিনে আমি আর ও মিলে রান্না করি। সে যদি সবজি কাটে আমি সেই সবজি রান্না করি। সে মাছে নুন হলুদ মাখায় আমি ভেজে দেই। আবার আমি পেঁয়াজ কাটি সে গরম তেলে সেই কাটা পেঁয়াজ বেশী করে দিয়ে পিয়াজু ভাজে। এই তো আমার সুখ। তবে যেই সুখী সংসারের গল্প আমি করেছি তাতে মিথ্যে কি আছে বলুন?
ভদ্রলোক খাবার গরম করে নিয়ে এলেন। কিন্তু আমি খেলাম না কিছু। রুচি হলো না। হাজার অনুরোধ উপরোধের পর ব্যর্থ হয়ে একটা আপেল কেটে দিলেন তিনি। আমি সেটাও ফিরিয়ে দিলাম অবহেলায়। হতাশ হয়ে শেষ অবধি আমাকে খালি পেটেই একটা নাপা ট্যাবলেট খাওয়ালেন তিনি। যেহেতু খালি পেট সেহেতু আজকে ডাক্তার যেসব ওষুধ দিয়েছেন সেসব আর দিলেন না। আমিও আগ্রহ দেখালাম না। বরং চোখ বন্ধ করে নিলাম। কপালের জলপট্টি থেকে আমার নাকে আসতে লাগল আমার স্বামীর গায়ের গন্ধ। পৃথিবীর সবচেয়ে দামী পারফিউমের মাঝেও বোধহয় এতো সুগন্ধ নেই। এই গন্ধে ঘোর লাগে। চোখ বুজে আসে। ঘুম পায় ভীষণ। খুব গাঢ় ঘুম।
এরপর সকাল হলো। একটা অন্যরকম সকাল। আমার জীবনের পাতা বদলে দেওয়া একটা সকাল। ভদ্রলোক গোসল শেষ করে ফিটফাট হয়ে অফিসের জন্য বেরিয়ে গেলেন। যাবার আগে মারাত্মক সুদর্শন পুরুষটি আমার মতো এলোমেলো নারীর কপালে গাঢ় চুম্বন করলেন। কপালের এলোমেলো চুলগুলো গুছিয়ে কানের পিঠে গুঁজে দিয়ে বললেন,
“আসি হ্যাঁ? তুমি কিন্তু ঠিক করে ওষুধ খাবে।”
বরাবরের মতো আমি নির্বাক রইলাম। সে আমাকে আবারও বারবার করে ওষুধ খাবার কথাটা স্মরণ করিয়ে দিল। কিন্তু আমি? আমি কানেও তুললাম না সেসব। ভদ্রলোক বেরিয়ে যেতেই গতকালের অসহ্য যন্ত্রণা ফিরে এল আবার। নিদারুণ এক একাকিত্ব আমাকে গ্রাস করে নিল তখন। আমি কল্পনা করতে লাগলাম আমার ভাঙা সংসারের প্রতিচ্ছবি। যেখানে আমার এই দায়িত্বশীল স্বামী বদলে গিয়ে হয়ে উঠেছেন একজন হবু বাবা। যিনি একটিবার নিজের সন্তানের মুখে বাবা ডাক শোনার জন্য মরিয়া। আমার কানে বাজতে লাগল কল্পপুরুষের তাচ্ছিল্যের স্বর,
“যে নারী কোনোদিন মা হতে পারবে না, তার সাথে সারাজীবন কেন থাকব? কোন আশায়? তোমার ব্যর্থতার জন্য কেন বাবা ডাক শোনা থেকে বঞ্চিত থাকব আমি? নবনী প্লিজ, এবার এই সংসার সংসার খেলার সমাপ্তি হোক। আমাদের দুজনের ভালোর জন্য এবার একটা কঠিন সিদ্ধান্ত নিতেই হবে।”
—চলমান—
