#সুলেখার_প্রেগনেন্সি
পর্ব- তিন
মাহবুবা বিথী
সুলেখার কথা শুনে রিস্তা মুখ বাঁকিয়ে বলে,
—আমি তোমার মতো অতো বিদ্যাধারী নই যে কোনটা তথ্যগত ভুল আর কোনটা স্বাভাবিক ভুল সেই বিষয়টা বুঝবো। আম্মা সকালে বললেন, তার ফ্রিজে থাকা তরকারী খেতে ভালো লাগে না। সেই কারনেই নিয়ে এসেছি। যদি জানতাম এটা নিয়ে এতো কথা হবে তাহলে আনতাম না। আমি তোমাদের সবার ভালোর জন্যই কাজটা করলাম।
সুলেখার মাথাটা প্রচন্ড ধরেছে। মনে মনে বলে,ভালো করেছো না কি মন্দ করেছো তা একটু পর বুঝা যাবে।এখন এসব অনর্থ বিষয় নিয়ে সুলেখার কথা বলতে ইচ্ছে করছে না। সে কারনে কথা না বাড়িয়ে এঁটো চায়ের কাপগুলো নিয়ে কিচেনে চলে যায়। আসলে সারাদিন অফিস করে আসার পর শরীরের এই অবস্থায় কিচেনে কাজ করতে সুলেখার ভালো লাগছে না। এদিকে রিস্তার তো বাসায় যাওয়ার নাম গন্ধ নেই।
সন্ধার আবীর চারিদিকে ছড়িয়ে পড়েছে। মাগরিবের আযান শোনা যায়। সবাই ওজু করে নামাজ আদায় করে নেয়। ডোরবেলটা বেজে উঠে। আশফাক দরজা খুলে দেখে মতিন এসেছে। সালাম দিয়ে ঘরে ঢুকে মতিন বলে,
—বিনা আমন্ত্রণে এসে হাজির হলাম।
আশফাক কিছু বলতে চাইছিলো তার আগেই সখিনা বেগম বলেন,
—এসেছো বেশ করেছো। যখন খুশী তখন শ্বশুর শাশুড়ীর সাথে দেখা করতে আসবে এটাই স্বাভাবিক।
সখিনা বেগমের কথা বলা শেষ হলে আশফাক মতিনকে বলে,
—যখন খুশী তখন তুমি আসতেই পারো। তবে এখন আব্বা আম্মা আছেন তাই কোনো সমস্যা নেই। কিন্তু আমরা দুজন যখন থাকি তখন জানিয়ে আসলে ভালো হয়। যদি বাসায় না থাকি তখন আবার ফিরে যেতে হবে। মতিন,তুমি একটু বসো আমি একটা জরুরী কাজ সেরে আসছি।
—সমস্যা নেই। আমি ডিনার করেই যাবো। আপনি কাজ সেরে আসুন। ততক্ষণে আমি বাবা মায়ের সাথে গল্প করি। ভাবির অবশ্য একটু কষ্ট হবে।
সাথে সাথে সখিনা বেগম বলেন,
—ওতো কাঠের চুলো জ্বালিয়ে রান্না করছে না যে কষ্ট হবে? দুটো ভাত তরকারী রাঁধবে এ আর এমন কি কষ্ট?
আশফাক নিজের রুমে চলে যায়। মতিন এভাবে হঠাৎ না বলে বাসায় চলে আসাতে সুলেখা মনে মনে বিরক্ত বোধ করে। শ্বশুর শাশুড়ী ওকে কাজে সাহায্য করবেন বলে আসলেন অথচ ওকেই এখন আত্মীয়স্বজনের সেবা শুশ্রূষা করতে হচ্ছে। নিশ্চয় এই রাতে এখন রান্না করতে হবে। সুলেখা মুখে মেকী হাসির প্রলেপ টেনে ড্রইংরুমে এসে মতিনকে সালাম দিয়ে বলে,
–ভাই কেমন আছেন?
–আমি তো ভালোই আছি তবে আপনাকে এই রাতে বিব্রত করার জন্য দুঃখিত। আসলে রিস্তা আমাকে ফোন করে আসতে বললো। ওর নাকি বাসায় ফিরতে রাত হবে। সে কারণেই আসা। মেহরানকে আবার বাসায় রেখে এসেছি।
–ওকে সাথে করে আনলেই পারতেন।
–আমি তো অফিস থেকে এসেছি। সমস্যা নাই। শিউলি আজ হল থেকে বাসায় এসেছে।
সখিনা বেগম সুলেখার দিকে তাকিয়ে বলেন,
—গল্প দিয়ে তো পেট ভরবে না। মতিনের জন্য খাবারের আয়োজন করো।
সুলেখা ওখান থেকে উঠে নিজের বেডরুমে চলে আসে। আশফাককে দিয়ে বাইরে থেকে খাবার আনিয়ে নিবে। যদিও শাশুড়ী মা সমস্যা করবে তারপরও কিছু করার নেই। রুমে এসে দেখে আশফাক মোবাইলে কি যেন করছে,সুলেখা সেদিকে দৃষ্টি দিয়ে বলে,
—ফেসবুক স্ক্রল করা বন্ধ করে আমার দিকে তাকাও। জরুরী কথা আছে।
—আমি ফেসবুক স্ক্রল করছি এ কথা তোমাকে কে বলল?
—দেখো আশফাক,আমার প্রচন্ড বিরক্ত লাগছে। শরীরের এই অবস্থায় এসব প্যারা নিতে ইচ্ছে করছে না। মা আমাকে রাঁধতে বললো। কিন্তু আমি এখন রাঁধতে পারবো না। তুমি বাইরে থেকে খাবার অর্ডার করো।
—আমি রুমে এসে অলরেডী খাবার অর্ডার করে দিয়েছি। আর দশ মিনিটের মধ্যে চলে আসবে।
—তবে এটা মাথায় রাখো,মা জানতে পারলে কিন্তু খাবারগুলো খাবে না।
—মাকে জানতেই দিবো না।
আশফাক নীচে চলে যায়। অর্ডারের খাবারগুলো নিয়ে আশফাক চুপিসারে কিচেনে চলে যায়। খাবারগুলো দ্রুত ডিসে বেড়ে ওভেনে গরম করে টেবিলে দিয়ে দেয়। সুলেখা এসে টেবিলে সুন্দর করে খাবার বেড়ে দেওয়া দেখে হাঁফ ছেড়ে বাঁচে। আশফাক খাবারের প্যাকেটগুলো একটা পলিথিনে মুড়িয়ে বিনে ফেলে দেয়। ডাল, সবজি, মুরগীর মাংসের রেজালা, রুই মাছ ভুনা আর সালাদ দিয়ে টেবিল সাজিয়ে আশফাক মতিন আর রিস্তাকে ডাকতে যায়।
সখিনা বেগম অবাক হয়ে যায়। এতো তাড়াতাড়ি কিভাবে সুলেখা রান্না করলো? কুমিল্লা থেকে আসার পর দেখে সুলেখা সপ্তাহে একদিন মেইন তরকারী রান্না করে রাখে। বাকিটা প্রতিদিন মিনারা খালাকে দিয়ে রান্না করায়। এতো কষ্ট করে ছেলেকে ইন্জিনিয়ার বানিয়ে শেষ পর্যন্ত কাজের বুয়ার হাতে রান্না খেতে হয়। এই কপালে লেখা ছিলো। চাকরি করার উছিলায় বউ তো খোঁড়া হয়ে বসে থাকে। আগে যা একটু রান্না করতো এবার কনসিভ করার উছিলায় ধরাকে সরা জ্ঞান করছে। সেই কারণে আজ রিস্তার সাথে এই প্লান করলেন। অসময়ে মতিন আসলে সুলেখা কাজ করতে বাধ্য হবে। এতো তাড়াতাড়ি কিভাবে সব করলো কে জানে? আশফাক এসে মতিনকে বলে,
—ভাই খেতে আসেন, সব রেডি হয়ে গেছে।
—কি বলেন ভাই,ভাবির হাতে কি যাদু আছে? মুহুর্তে সব রেডী করে ফেললো।
রিস্তা তাড়াতাড়ি কিচেনে চলে যায়। হাড়ি পাতিল সব তো তুলে রাখা আছে। রান্না করলো কোথায়? বিনের ঢাকনিটা খুলে দেখে ওখানে ফুড পান্ডার প্যাকেট দুমড়ে মুচড়ে রাখা আছে। সাথে সাথে রিস্তার মুখটা গম্ভীর হয়ে গেল। এরমাঝে রায়হান সাহেব হাত ধুয়ে টেবিলে এসে বললেন,
—এতো এলাহি কান্ড! এতো অল্প সময়ে কিভাবে সব করলে বৌমা?
রিস্তা মুখ বাঁকিয়ে বলে,
–ভাবি করেনি,ফুড পান্ডা থেকে অর্ডার করে এনেছে।
—তা যাইহোক, ব্যবস্থা তো করতে পেরেছে। সারাদিন অফিস করে এসে এই রাতের বেলা রান্না করা বিশাল ঝক্কির কাজ।
সখিনা বেগম ফোঁস করে উঠেন। গলায় ঝাঁঝ এনে বলেন,
—কই আমার সময় তোমার তো মনে হয়নি এসব ঝক্কির কাজ। শীত গ্রীষ্ম বর্ষা দিন নেই রাত নেই তোমার বোনেরা ভাগনা ভাগনি এমনকি তোমার ফুফুরা চলে আসতো। আমিও তখন হাত পুড়িয়ে রান্না করে খাওয়াতাম। কোনোদিন তোমাকে একটু মায়া করতে দেখিনি।
রায়হান সাহেব নিজের পাতে ভাত আর ডাল তুলে নিয়ে বলে,
—তুমি তো আর চাকরি করতে না। তাছাড়া তখন সিস্টেমটাই এমন ছিলো। যদি এখনকার মতো খাবার অর্ডার করে আনা যেত আমি ঠিক নিয়ে আসতাম। এখন পুরনো কথা বাদ দিয়ে খেতে বসো।
সখিনা বেগম রেগে গিয়ে বলেন,
—তোমার খাওয়া তুমি খাও আমারটা নিয়ে তোমায় ভাবতে হবে না। আমার আবার যার তার হাতে খাবার মুখে রুচে না। হাত ধুয়ে রান্না করেছে নাকি রান্নার সময় হাত দিয়ে নিজের সর্দি মুছেছে তা কি আমি জানি?
এবার রায়হান সাহেব রেগে গিয়ে বলেন,
—তুমি খাবে না ভালো কথা কিন্তু অন্যের খাবারের স্বাদ নষ্ট করার কোনো অধিকার তোমার নেই।
আশফাক অবস্থা বেগতিক দেখে বলে,
—মা, সুলেখা তোমাকে ডিম ভেজে দিলে তুমি খাবে তো?
সখিনা কিছু বলার আগেই রিস্তা বলে,
—মা, ডিম ভাজির সাথে ডালটা মেখে খেতে পারো ভালো লাগবে।
সুলেখা দাঁড়িয়ে থেকে সখিনা বেগমের নাটক দেখতে থাকে। এরকম একটা পরিস্থিতির সৃষ্টি হবে এটা ও বুঝেছিলো। কিন্তু আশফাক হয়তো বুঝতে পারেনি। ওর ও তো বুঝা উচিত। ওর মা কোন ধাতু দিয়ে গড়া। আশফাক সুলেখাকে বলে,
—সুলেখা,আম্মার জন্য একটা ডিম ভেজে আনো।
সুলেখা কিচেনে গিয়ে ডিম ভেজে এনে দেয়। সখিনা বেগম ডাল দিয়ে ভাত মেখে ডিম ভাজা সাথে নিয়ে খাওয়া শেষ করে। সব কাহিনী শেষ করে রিস্তা আর মতিন চলে যায়। রুমে এসে সুলেখা আশফাককে বলে,
—তোমাকে বলেছিলাম না, মা জানতে পারলে কাহিনী করবেন।
—আম্মা তো জানতে পারতো না। সমস্ত নষ্টের গোড়া হচ্ছে রিস্তা। ও না জানালে আম্মা কিছুতেই জানতে পারতো না।
—যাই হোক এদিকে আমার যে বারোটা বাজতে চললো। আজকে শরীরটা এতো খারাপ লাগছে তোমাকে বুঝাতে পারবো না। মা তো আমার অবস্থা বুঝতে চান না। এদিকে যত দিন গড়াচ্ছে ততই আমি যেন দুর্বল হয়ে যাচ্ছি।
চলবে
