#সুলেখার_প্রেগনেন্সি
পর্ব দুই
মাহবুবা বিথী
শরীরটা একটু ভালো লাগাতে সুলেখা রাতেই টিফিন রেডী করে রাখে। ডিনারের পর সুলেখা কিচেনে এসে এয়ারফ্রাই এ ম্যারিনাইড করে রাখা মুরগীর দুটো লেগ পিচ ঢুকিয়ে দেয়। এরপর চুলায় একটা ডিম সিদ্ধ করে নেয়। একটা আপেল ধুয়ে রাখে। লেগপিচটা ফ্রাই হয়ে গেলে সুলেখা টিফিন বক্সটা রেডী করে ফেলে।এমন সময় শাশুড়ী মা কিচেনে চলে আসে। টিফিন বক্সে দুটো লেগপিচ আর ডিম দেখে জিজ্ঞাসা বললেন,
—এগুলো কে কে খাবে?
সুলেখা শাশুড়ী মায়ের দিকে তাকিয়ে বলে,
—মা,এগুলো আমার একার খাবার। সাথে আপেল আর কলা ও নিয়ে যাবো।
সুলেখাকে এতো খাবার নিতে করে উনি হা করে একবার খাবারের দিকে একবার সুলেখার দিকে তাকায়। তারপর দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে,
—তুমি এগুলো একাই খাবে?
—জ্বী মা,
সুলেখা বক্সটা ফ্রীজে রেখে নিজের ঘরে চলে আসে।
পানির বোতলটা খালি হওয়াতে আশফাক রুম থেকে বের হয়ে পানি নিতে খাবার ঘরে চলে আসে। ফিল্টার থেকে পানি বোতলে ভরতেই সখিনা বেগমও হাতে খালি গ্লাস নিয়ে চলে আসেন। উনিও ফিল্টার থেকে পানি নিয়ে আশফাকের দিকে তাকিয়ে বলে,
—আশফাক, একটা কথা তোকে না বলে পারছি না।
আশফাক বোতলের মুখের ছিপিটা লাগিয়ে নিয়ে বলে,
—এতো হ্যাজিটেট করছো কেন? কি বলবে বলে ফেলো।
—মানে,সুলেখা যেভাবে মাছ মাংস ডিম খাচ্ছে এতে পেটের বাচ্চাটা তো দ্রুত অনেক বড় হয়ে যাবে। তখন সিজার করা ছাড়া বাচ্চা হবে না। বরং বাচ্চা ছোটো থাকলে খুব দ্রুত নরমালে হয়ে যাবে। আমি তো ওকে বলতে পারি না তুমি মাছ মাংস কম খাও। তুই বরং ওকে বুঝিয়ে বলিস।
আশফাক মনে মনে একটু বিরক্ত হলো। কিন্তু মায়ের সামনে প্রকাশ করলো না। তবে মাকে খুব শান্তভাবে বলে,
—আমাদের ভাবনা তুমি আমাদের উপর ছেড়ে দাও। তুমি বরং তোমার শরীর স্বাস্থ্য, বাবার শরীর স্বাস্থ্য নিয়ে ভাবো। কথাটা বলেই নিজের ঘরে চলে আসে। মা সখিনা বেগম ছেলের কথা শুনে রেগে গেলেন। ঘরে এসে রায়হান সাহেবকে বলেন,
—,ভাবতে অবাক লাগে তোমার ছেলে কিভাবে এতো স্ত্রৈন হলো?
—কেন কি করেছে আমার ছেলে?
—এখানে আসা অবদি দেখছি তোমার ছেলে বৌয়ের হাতে হা আর নাতে না বলছে। কেন তোমার চোখে পড়ছে না?
— এখানে নতুন করে চোখে পড়ার কি হলো? ছোটো বেলা থেকে বাবাকে যা করতে দেখেছে তাই শিখেছে।
সখিনা বেগম আর কথা বাড়ালেন না। শুধু আপন মনে বললেন,
“গরীবের কথা বাসি হলে ফলে।”
আশফাক ঘরে আসতেই সুলেখা বলে,
–মা কি বললো?
—তেমন কিছু না,তুমি ঘুমিয়ে পড়ো।
—আমি কিন্তু মায়ের কথাগুলো শুনেছি।
—,মা তার পুরোনো ধ্যান ধারণা থেকে কথা গুলো বলে। তুমি কিছু মনে করো না।
সুলেখা আপাতত কিছু মনে করেনি। তবে কতদিন মনে না করে সুলেখা থাকতে পারবে ও অনুমান করতে পারছে না।
পরদিন সকালে আবার সুলেখার দৈনন্দিন জীবন শুরু হলো। শ্বশুর শাশুড়ী আর হাসবেন্ডকে নাস্তা দিয়ে নিজে খেয়ে অফিসের উদ্দেশ্যে বেরিয়ে যায়। আজ সকাল থেকেই সুলেখার শরীরটা খুব একটা ভালো লাগছে না। বসকে বলে একটু আগেই অফিস থেকে বের হয়ে উবার নিয়ে বাসায় চলে আসে। দরজার কাছে ওর ননদ রিস্তার জুতোজোড়া দেখা যাচ্ছে। ডোরবেল বাজাতেই রিস্তা দরজা খুলে দিয়ে বলে,
—বাবা মাকে দেখতে চলে আসলাম।
—ভালো করেছো।
সুলেখার খুব খারাপ লাগছে। শরীরটা আজ ভীষণ দুর্বল লাগছে। ও রিস্তাকে বললো,
—আমি একটু বিছানায় গড়িয়ে আসি। তারপর তোমার সাথে গল্প করবো।
–আমি অবশ্য আর বেশীক্ষণ বসবো না। অর্ণবকে না বলে এসেছি। আসলে বাবা মায়ের তো ফ্রিজের বাসি খাবার খাওয়ার অভ্যাস নেই। সে কারণেই আমি উনাদের জন্য কিছু খাবার রান্না করে এনেছি। তুমি রেস্ট করো। আমি একটু পরেই চলে যাবো।
অগত্যা সুলেখার আর বিছানায় গড়ানো হলো না। যদিও মনে মনে সুলেখা বিরক্ত হলো। কারণ ওর বাসায় মেইন তরকারীটা সুলেখা ছুটির দিনে রান্না করে রাখে। আর কাজের খালা এসে ডাল সবজি ভাত প্রতিদিন রান্না করে দিয়ে যায়। এখানে বাসি খাবার বলতে রিস্তা কি বুঝাতে চাইলো?
পোশাক বদলে শাশুড়ীর রুমে গিয়ে ননদ রিস্তাকে বলে,
—চায়ে কি চিনি দিবো?
রিস্তা ব্যতিব্যস্ত হয়ে বলে,
—তুমি উঠে আসলে কেন? আমি বাসায় গিয়ে চা খাবো। তোমার শরীরটা যেহেতু অসুস্থ তুমি বরং শুয়ে থাকো।
সাথে সাথে সখিনা বেগম মানে সুলেখার শাশুড়ী বলেন,
—সে কি কথা,সুলেখা তো চা বানাবে নিশ্চয় পাহাড় ভাঙ্গবে না? তাহলে এখানে অস্বস্তির কি আছে? তাছাড়া—সুলেখার দিকে তাকিয়ে সখিনা বলেন,
–শরীর বেশী খারাপ হলে চাকরি ছেড়ে দাও।
এমন সময় আশফাক অফিস থেকে ঘরে ফিরে। মায়ের কথা শুনে বিরক্ত হয়ে বলে,
–সুলেখা চাকরি না করলে আমার সংসারের চাকাটা ভালোভাবে সচল হবে না। কারণ আমাদের দুজনের চাকরিতেই আমাদের সংসারের চাকাটা সচল হয়। সুতরাং চাকরি ছাড়ার প্রশ্নই আসে না।
যাক সুলেখার কথাগুলো আশফাকের মুখ দিয়ে বের হওয়াতে সুলেখা মনে মনে খুশী হয়। কিচেনে গিয়ে চুলায়
চায়ের পানি চাপিয়ে দেয়। কিচেন থকে সুলেখা শুনতে পারছে,ওর শাশুড়ী মা ননদকে বলছে,
—সুলেখা আবার খাওয়া দাওয়া ভালোই করে। তোর মনে আছে, তুই পানি খেয়ে পানিও বমি করতি। তারপর তোকে হাসপাতালে ভর্তি করে স্যালাইন দেওয়া হলো। ঐ অবস্থায় সংসারের সব কাজ তোকে করতে হতো।
এমনসময় রায়হান সাহেব বলেন,
—,কি বলছো তুমি? সে সময় আমি আর তুমি গিয়ে রিস্তার বাসায় চারমাস থেকে আসি। ও তো বিছানা থেকে উঠতে পারেনি। শ্বশুর অসুস্থ থাকার কারণে শাশুড়ী আসতে পারলো না। অগত্যা তুমি আর আমি গিয়ে চারমাস থেকে আসি। তুমিই তো সব কাজ করেছো। সেদিক থেকে সুলেখা অবশ্য নিজের মতো করে সামলে নিচ্ছে।
রিস্তার মনে হয় বাবার বলা সত্যি কথাগুলো ভালো লাগছিলো না। সে কারণে একটু গম্ভীর হয়ে বলে,
—তুমি তো দুপুরে খাবার পর ঘুমালে না?
—প্রতিদিন তো ঘুমাই।
সখিনা বেগম ঝাঁমট মেরে বলেন,
—ঘুমাবে কেন? তা না হলে বেফাঁস কথা কে বলবে?
রায়হান সাহেব স্ত্রীর রাগের কারণটা বুঝতে না পেরে বলেন,
—আমি আবার কখন বেফাঁস কথা বললাম।
এমনসময় সুলেখা চা আর পাকোড়া ভেজে আনে। শ্বশুরের হাতে চায়ের কাপ তুলে দিয়ে বলে,
–বাবা পাকোড়াটা নিয়ে নেন।
এরপর শাশুড়ীর হাতে চায়ের কাপ তুলে দেয়। চায়ের কাপ হাতে নিয়ে সখিনা বেগম বলেন,
—বৌমা, কাল থেকে কি কি রাঁধতে হবে আমাকে বলে যেও। তোমার শ্বশুরের মনে হয় আমার বসে খাওয়াটা সহ্য হচ্ছে না।
—আমি আবার সে কথা কখন বললাম?
রিস্তা পাকোড়াতে কামড় দিয়ে বলে,
–একটু আগেই তো বললে। আমার প্রেগনেন্সির পিরিয়ডে মাকে নাকি বাসার সব কাজ করতে হয়েছে। ভাবির এখানে মাকে তেমন কিছু করতে হয় না। ভাবি কি ভাববে বলতো? মাকে কি আমার বাসায় শুধু কাজ করাতে নিয়ে গিয়েছি?
সুলেখা সবই বোঝে। কিন্তু কাউকে কিছু বুঝতে না দিয়ে বলে,
—সন্তানের বিপদে তো বাবা মা পাশে থাকবেন। এটাই তো স্বাভাবিক।তোমার ঐ অবস্থায় মা তোমাকে কাজে সাহায্য করবেন এটা তো খুবই নরমাল ব্যাপার। তুমি আবার কষ্ট পাচ্ছো কেন? আর আমি কিছুই মনে করিনি।
তাছাড়া পৃথিবীর প্রতিটি মানুষের সংসার তার নিজের মতো চলে। এই যেমন আমার সংসারে প্রতিদিন ভাত ডাল সবজিটা টাটকা রান্না হয়। শুধু মাছ বা মাংসের মেইন কারীটা আমি ছুটির দিন রান্না করে রাখি। তুমি বলছিলে না, বাবাকে আমাদের বাসায় বাসি খায় কথাটা আসলে সঠিক নয়। সেখানে তথ্যগত ভুল রয়েছে।
চলবে
