#সুলেখার_প্রেগনেন্সি
প্রথম পর্ব
মাহবুবা বিথী
সকাল বেলা উঠে সুলেখা কিচেনে গিয়ে দুটো ডিম সিদ্ধ বসিয়ে দিয়ে ওয়াশরুমে গিয়ে ফ্রেস হয়ে এসে চেয়ারে বসে ফজরের নামাজ পড়ে নেয়। প্রেগনেন্ট হওয়ার পর থেকেই মাঝে মাঝে এমন হচ্ছে। ফজরের সময় ঘুম ভাঙ্গতে চায় না। যারফলে সকালে নামাজটা পড়ে নিতে হয়ে। এর মাঝে আশফাককে ডেকে দেয় সুলেখা। ওকে জুস বানাতে বলে। সকালে অফিসে যাওয়ার আগে দুটো ডিম দুই পিচ ব্রেড এক গ্লাস জুস আর একগ্লাস মিল্কসেক খেয়ে ও অফিসে যায়। গতকাল শাশুড়ী আর শ্বশুর আব্বা কুমিল্লা থেকে এসেছেন। প্রেগনেন্সির এই সময়টাতে সুলেখাকে সাহায্য করার জন্য তাদের এখানে আসার উদ্দেশ্য। সে কারণে সুলেখা ওর নাস্তার পাশাপাশি শ্বশুর শাশুড়ী আর আশফাকের জন্য ফ্রোজেন পরোটা সেঁকে টেবিলে দিয়ে দেয়। সাথে ডিমভাজি আর কলা তারপর আশফাক চা তৈরী করে টেবিলে দেয়। রায়হান সাহেব আর উনার স্ত্রী সখিনা বেগম এসে টেবিলে বসেন। সুলেখা তখন একটা সিদ্ধ ডিম শেষ করেছে। আর একটা হাতে নিতেই শাশুড়ী মা সখিনা বেগম বলেন,
–তোমার বেশ খাওয়ার রুচি আছে তো? আমি বাবা পানিও খেতে পারতাম না। পানি খেলেও বমি করে দিতাম। তবে আপেল কমলা বেদানা খেতে ইচ্ছে হতো। কিন্তু শ্বশুর শাশুড়ীর সামনে কি করে সব নিজের প্লেটে তুলে নেই বলো? আমি আবার খুব লাজুক ছিলাম।
সুলেখা আশফাকের দিকে তাকায়। শাশুড়ী মায়ের কথার খোঁচাটা ভালোই বুঝতে পারে। সাথে সাথে আশফাক বলে,
—আম্মু সুলেখার না খেলে তো চলবে না। ওকে এই অবস্থায় অফিস সামলাতে হচ্ছে আবার ঘরে এসে রান্না করতে হয়। শরীরটা তো ফিট রাখতে হবে। বেচারা সারাদিন শোয়ার সময় পায় না।
বৌয়ের দিকে ঝোল টেনে কথা বলাতে সখিনা বেগম মনে মনে বলেন,
“বউ চাকরি একখান করে বলে ছেলে আমার ফুটানি কম দেখায় না।” তবে উনিও ছাড়বার পাত্রী নন।
সখিনা বেগম গলায় কাঠিন্য ভাব এনে বলেন,
—তাতো ঠিক। তাও ভালো অফিসের এসি রুমে বসে সখিনা কাজ করে। রোদে তেঁতে পুড়ে কিছু করতে হয় না। তোদের পেটে নিয়ে সেই কোন ভোরে উঠে আগে মাটির চুলা লেপে ঠিকঠাক করে রাখতাম। তারপর এঁটো বাসন কল তলায় নিয়ে মাঝাধোয়া সারতে হতো। এরপর চুলো জ্বালিয়ে তোর দাদা দাদী ফজরের নামাজ পড়ে চায়ের জন্য বসে থাকতো। চা আর মুড়ি জলপান সহ তাদের রুমে দিয়ে এসে চুলায় আঠার পানি চাপিয়ে দিতাম। এরপর সবজি কুটে চুলায় বসিয়ে দিয়ে ঐ ভরা পেট নিয়ে পিড়ে বেলুনে রুটি বেলতে হতো। এখনকার মত ফ্রোজেন রুটির সময় কাল আমাদের আমলে ছিলো না। এরপর তো আমার পোয়াতী হওয়ার খবর শুনে আমাকে দেখতে আত্মীয় স্বজন আসতো। তাদের আদর আপ্যায়ন আমাকেই করতে হতো। পরিবারের বড় বউ হওয়াতে তোর চাচা ফুফুদের দেখভালের দায়িত্ব আমার উপর এসে পড়ে। সে এক কঠিন জীবন পার করেছি।
সুলেখা তাড়াতাড়ি নাস্তা শেষ করে উঠে পড়ে। এরপর না জানি আরো কত কঠিন জীবনের ইতিহাস শুনতে হবে কে জানে?
সুলেখার উঠার ভাব দেখে সখিনা বেগম বলেন,
—আশফাক তোমাকে কত সাহায্য করে। এই যেমন জুস বানিয়ে দিলো। আমার কি আর সেই কপাল ছিলো? তোমার শ্বশুর আমাকে শ্বশুর শাশুড়ীর কাছে রেখে নিজে তার কর্মস্থলে চলে যেত। সপ্তাহে ছুটির দিনগুলোতে আসতো। আমার খেদমত কি করবে উল্টো তার খেদমত আমাকে করতে হতো।
শ্বশুর উুসখুস করে বলেন,
—তোমার শাড়িকাপড়, বিছানার চাদরগুলোতো আমি পুকুরে নিয়ে ধুয়ে দিতাম।
শাশুড়ী ফোঁস করে বলেন,
–ওতো কালেভদ্রে,সেটা আবার তুমি মুখ তুলে বলছো?
আশফাকও উঠে পড়ে। না জানি এরপর বাবা মায়ের খুনসুটি শুরু হয়। সুলেখার দিকে তাকিয়ে আশফাক বলে,
—চলো,তোমাকে অফিসে নামিয়ে দিয়ে আমি অফিসে যাবো।
সুলেখা হাফ ছেড়ে বাঁচে। অফিসে যাওয়ার সময় শাশুড়ী মাকে বলে,
—মা ফ্রীজে রান্না করা তরকারী বক্সে করে রাখা আছে। মাছমাংস সবই আছে। যেটা খেতে মন চায় সেটা বের করে ওভেনে গরম করে নিয়েন। আর মিনারা খালা এসে ডাল ভাত সবজি করবে। আপনাকে কিছু করতে হবে না।
সাথে সাথে সখিনা বেগম বলেন,
—আমাদের দুই বুড়াবুড়িকে নিয়ে তুমি এতো ভেবো না। খাই তো পাখির আঁধার। সে একটা ব্যবস্থা ঠিক হয়ে যাবে। তুমি বরং সাবধানে অফিসে যাও।
গাড়িতে উঠে সুলেখা সীট বেলটা বেঁধে নেয়। ড্রাইভিং সীটে আশফাক বসে গাড়িতে স্টার্ট দেয়। সুলেখা আশফাকের দিকে তাকিয়ে বলে,
—মা তার অভিজ্ঞতার লেকচার ভালোই দিলেন।
আশফাক জানে সুলেখার এগুলো পছন্দ নয়। তারপরও বলে,
—কি করবে বলো? উনার জীবনের কিছু ট্রমার কথা শেয়ার করলেন।
সুলেখা আর কিছু বলে না। রাস্তায় ভালোই জ্যাম লেগেছে। কি জানি কোনো ভি আইপি যাচ্ছে কিনা কে জানে? যাক এক ঘন্টার মধ্যে ও অফিসে পৌঁছে যায়।
অফিসে থাকাকালিন সময়ে সুলেখা দুইবার ফোন করে শ্বশুর শাশুড়ীর খবর নেন। আজ সুলেখার শরীরটা ভালো লাগছে না। বসকে বলে ছুটি নিয়ে একটা উবার ডেকে বাসায় চলে আসে। ডোর বেল বাজাতে মিনারা খালা মুখটা বাংলার পাঁচ বানিয়ে দরজা খুলে দেয়। সুলেখা ঠিক বুঝতে পারে শাশুড়ী মায়ের সাথে নিশ্চয় কোনো ঝামেলা হয়েছে। মিনারা খাল ওয়াশরুমে ঢুকে জোরে দরজাটা লাগিয়ে দেয়। মিনারা খালার বডি ল্যাঙ্গুয়েজ দেখে সুলেখার শতভাগ নিশ্চিত ঘরে নিশৃচয় একটা গোলমাল পেকেছে। নিজের রুমে এসে বিছানায় বসতেই শাশুড়ী মা এসে বলেন,
—তোমার মিনারা খালার গায়ে আজ যেন বিঁচুটি পাতা লেগেছে।
—,কেন কি হয়েছে মা?
—কি আর হবে? মেশিনে কাপড় ধুতে দিয়েছিলো। ধোয়া শেষ হলে আমি ওকে বললাম,”আমার কাপড়গুলো তুমি আবার একটু তিন খলা দিয়ে দাও। ওখানে ভালো মতো খলানো হয় কিনা কে জানে।” আর বলো না বেটির যে কি গজগজ শুরু হলো, বাধ্য হয়ে তোমার শ্বশুর বললো,
—এতো বকর বকর করার দরকার নাই। না পোষালে কাজ ছেড়ে দাও।
সাথে সাথে সুলেখার মাথা গরম হয়ে যায়। আজ তিনবছর ধরে ট্রেনিং দিয়ে মিনারা খালাকে ও তৈরী করেছে। এখন চলে গেলে ভারী মুশকিল হয়ে যাবে। সুলেখা বিছানা থেকে উঠে ব্যাগ থেকে একটা পঞ্চাশ টাকার নোট বের করে কিচেনে যায়। মিনারা খালা তখন চুলার ধারগুলো মুছতে ছিলো। টাকাটা মিনারা খালার হাতের মুঠোয় ঢুকিয়ে দিয়ে বলে,
—খালা, আজ তোমার অনেক কষ্ট হয়েছে তাই না? এই টাকাটা দিয়ে কিছু পান সুপাড়ী কিনে খেও।
সাথে সাথে মিনারা বেগমের মুখ খুশীতে ঝলমল করে উঠে। ভাত না পেলেও সমস্যা নাই কিন্তু পান ছাড়া চলবে না। এছাড়া মিনারা বেগম খুশী করার আর কোনো পলিসি সুলেখার জানা নেই।
সুলেখার আজ বেশ খিদে লেগেছে। ফ্রিজ থেকে বড় একটা মাছের পিচ বের করে ওভেনে গরম করে বিয়ে খেতে বসে। শাশুড়ী এসে ওর প্লেটের দিকে তাকিয়ে বলেন,
—প্রেগনেন্সি সময়ে বেশী খেলে বাচ্চা জন্মের পর শুধু খেতে চায়। তাছাড়া বাচ্চা বেশী বড় হয়ে গেলে নরমালে হওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। নরমালে বাচ্চা হলে মায়ের সাথে বন্ধন সুদৃঢ় হয়।
এমনিতেই সুলেখার মাথা ধরে আছে তার উপর শাশুড়ী মায়ের এসব কথা বার্তায় মাথার দুপাশের শিরাগুলো দপদপ করতে থাকে। মাথাটা চক্কর মেরে উঠলো। সাথে সাথে শরীরটা গুলিয়ে উঠাতে ওয়াশরুমে গিয়ে বেসিনের উপর সুলেখা বমি করে ফেললো। বিরক্ত হয়ে মনে মনে বলে,এবার যদি শাশুড়ী একটু খুশী হন। আর বকবকটা দয়া করে যদি একটু বন্ধ করেন।
চলবে
