#সুলেখার_প্রেগনেন্সি
শেষ পর্ব
মাহবুবা বিথী
আশফাক নিজের বাবা মাকে নিয়ে এসেছে ওর আর সুলেখার এই প্রেগনেন্সির সময়টা যেন ভালোভাবে কাটানো যায়। কিন্তু সে আশা তো গুড়ে বালি। উল্টো সুলেখাকে নিত্য কোনো না কোনো ঝামেলা পোহাতে হচ্ছে। প্রতিদিন কেউ না কেউ সুলেখাকে দেখতে আসছে। সবাই আশফাকের আত্মীয়। এসব সামাজিকতা ম্যানেজ করতে গিয়ে প্রেগনেন্সির এই সময়টাতে সুলেখা প্রচন্ড বিরক্ত। অফিস করে এসে শরীরের এই অবস্থায় এসব সামাজিকতা করতে সুলেখার ভালো লাগে না। ছুটির দিনগুলোতে হলে তাও কোনো রকমে সামলে নেওয়া যায়। কিন্তু অফিস করে বাড়িতে এসে তখন শুধু শরীরটাকে বিছানায় এলিয়ে দিতে মন চায়। সুলেখার কপালে অফিস করে বাসায় এসে এই মুহুর্তে এই বিশ্রামটুকু ও জোটে না। ইদানিং ওর মেজাজটাও বেশ তিরিক্ষি হয়ে থাকে।
সুলেখার সময়টা যেন ভালো কাটে সে কারণে ওর বাবা মাকে আশফাক আনতে চেয়েছিলো। যাতে ওর একটু আরাম হয়। কিন্তু ও রাজি হয়নি। সুলেখা ওর বাবা মায়ের একমাত্র সন্তান। ওর বাবা মা ওকে একজন সন্তান হিসাবে বড় করে তুলেছেন। সেখানে ছেলে বা মেয়ের পার্থক্য কোনোদিন করা হয়নি। সে কারণে ও চায় না ওর বাড়িতে এসে ওর বাবা মা কোনো অস্বস্তিকর পরিস্থিতির মধ্যে পড়ে যাক। কেননা ওর শ্বশুর শাশুড়ী মুখে না বললেও হাবে ভাবে বুঝাতে চান উনারা ছেলের বাবা মা। সুতরাং এই বাড়ীর সব কতৃত্ব উনাদের থাকবে। অথচ সুলেখা ও সমানভাবে এই সংসারের দায়িত্ব পালন করে। কিন্তু শ্বশুর শাশুড়ীর ধারণা ওর বাবা মা আসতে পারবে তবে এখানে থাকার দরকার নেই। উনারাই সামলে নিতে পারবেন।
কিভাবে সামলে নিচ্ছেন তাতো বলাই বাহুল্য। সেই কারণে আশফাক সুলেখার বাবা মাকে আনতে চেয়েছিলো। কিন্তু সুলেখার কথা হচ্ছে, এখানে আবার নতুন করে যাত্রা পালা শুরু হবে। যা সুলেখার পক্ষে হজম করা কঠিন। ওর বাবা মাকে আনতে হলে আগে ওর শ্বশুর শাশুড়ীকে পাঠিয়ে দিতে হবে। আশফাক সেই লক্ষ্যে আজ সকালে ওর বাবা মায়ের ঘরে গিয়ে বলে,
—আব্বা মহসীন চাচাকে ফোন দিয়েছিলে?
—কেন?
–বাড়ীর খোঁজখবর নেওয়া দরকার না?
—হুম,নিয়েছি। এসেছি প্রায় একমাস পার হয়েছে। দুদিন আগে ফোন দিয়েছিলাম। জমিতে সার লাগবে। তোর মহসিন চাচা বাড়ি যেতে বলেছে।
মহসিন মিয়া আশফাকদের বাড়ীর কেয়ারটেকার। রায়হান সাহেবের কথা শুনার সাথে সাথে সখিনা বেগম ছ্যাঁৎ করে উঠে বলেন,
—বউমার বাচ্চা হবার জন্য এসেছি। সুতরাং বাচ্চা না হওয়া পর্যন্ত আমি এখান থেকে কোথাও যাবো না। আর বৌমাকে বলিস,আজকে দুপুরে খিলগাঁও থেকে তোর খালা আসবে। অন্তত আজকের দিনে ও যেন বাসায় থাকে।
আশফাকের নিজের উপর প্রচন্ড রাগ হয়। এসেছিলো ঝামেলা সরিয়ে দিতে অথচ এখানে এসে আবার ঝামেলায় জড়াতে হলো। ও কিভাবে সুলেখাকে এসব কথা বলবে? আশফাক রেগে গিয়ে বলে,
—খালাকে এখুনি কেন আসতে হবে? আমাদের বাচ্চা হয়ে যাবার পর আসলে কি এমন ক্ষতি হবে?
—তখন তো আমরা থাকবো না?
—আমি সুলেখাকে কিছু বলতে পারবো না।
আশফাক অফিসে চলে যায়। সুলেখা রেডী হয়ে শাশুড়ী মায়ের ঘরে এসে বলে,
—মা আমি আসছি,
—তোমার খিলগাঁও খালার আসার কথা তোমাকে সেদিন বলেছিলাম না?
—হুম,
—আজকে হাসনা আসবে। তুমি বরং আজ বাসায় থাকো। ওদের খাবারের ব্যবস্থা তো করতে হবে।
সুলেখা কিছুটা সময় চুপ থেকে বলে,
—আমি তো খালার পছন্দের খাবারগুলো জানি। সব বাইরে থেকে অর্ডার করে দিবো। আপনারা শুধু রিসিভ করে নিবেন। আজ আমার জরুরী মিটিং আছে।
সখিনা রেগে গিয়ে বলেন,
—কি এমন রাজ কার্য করো যে তুমি না গেলে সব উচ্ছন্নে যাবে? আজকের দিনটা বাসায় থাকলে তোমার অফিসের কি এমন ক্ষতি হতো?
—হতো মা,অফিস আমাকে এই কাজ করার জন্য টাকা দেয়। সে কারণে আমি আমার দায়িত্বে অবহেলা করতে পারবো না। তাছাড়া আজকে আমার বাসায় ফিরতে বেশ রাত হবে।
—কেন? তোমাদের কি আবার রাতের বেলা অফিস হয়?
—অফিস তার নিদিষ্ট নিয়ম মেনে হয় তবে আজ আমার আব্বাকে নিয়ে একটু ডাক্তারের কাছে যাবো। আগে থেকেই অ্যাপয়েটমেন্ট করা ছিলো।
—বিয়ের পর মেয়েরা পর হয়ে যায়। সে কারণে পরের বাড়ীর মেয়েদের নিয়ে টানাটানি করতে হয় না। আমাকে দেখেছো কখনও রিস্তাকে নিয়ে টানাটানি করতে?
—রিস্তাকে নিয়ে টানাটানি করার দরকার নেই মা। টানাটানি করার জন্য আপনার ছেলে তো রয়েছেই। আর আমার বাবা মায়ের আমি একমাত্র সন্তান। সুতরাং উনারা আমাকে নিয়েই তো টানাটানি করবেন। এটাই স্বাভাবিক।
সুলেখার কথায় সখিনা বেগম মনে মনে ফুঁসে উঠলেন। কিন্তু বলতে পারছেন না। সুলেখা ঠান্ডা মাথায় গুছিয়ে সব উত্তরগুলো দিয়েছে বিধায় উনার গায়ে যেন জ্বালা ধরেছে। সে কারণে ঝাঁঝ মিশিয়ে বলেন,
—তোমার মা তো পারতেন তোমার বাবাকে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যেতে?
—কিন্তু সামনে আব্বার প্রোস্টেটে একটা অপারেশন করতে হবে সে কারণে আমাকে ডাক্তারের সাথে কথ বলতে হবে। আর একটা কথা, দায়িত্ব ছেলে বা মেয়ে
বলে নয়, সন্তান হিসাবে সবার উপর বর্তায়। আসি মা।
সুলেখা চলে যাবার পর সখিনা বেগম স্বামীর দিকে তাকিয়ে বলেন,
—দেখলে কেমন টকটক করে কথা বলে গেল। চাকরি করে দেখে যেন সাপের পাঁচ পা দেখাচ্ছে।
রায়হান সাহেব গম্ভীর হয়ে বলেন,
—বৌমা কিন্তু একটা কথাও ভুল বলেনি। তুমি মাথা ঠান্ডা করে ওর কথাগুলো একবার ভেবে দেখো। প্রতিটি কথা সঠিক বলেছে।
—ঠিক আর বেঠিক নিয়ে তুমি আর তোমার ছেলে ভাবো। গরীবের কথা বাসি হলে ফলে। আমি বলেছিলাম গ্রামের সরকারী কলেজে অনার্স ফাস্ট ইয়ারে পড়ে একটি কমবয়সি মেয়েকে বউ করে আনো। তোমাদের দুজনের কারোর আমার কথা ভালো লাগলো না। এখন বুঝো কত ধানে কত চাল। আমার কি? দুদিন পর আমি তো আমার নিজের সংসারেই ফিরে যাবো। বুঝবে তোমার ছেলে।
—আমিও তো সেকথাই বলি। ওদেরটা ওদেরকে বুঝতে দাও।
এদিকে দুপুরের আগেই ক্যাটারিং সার্ভিস থেকে সব খাবার চলে আসে। সখিনা বেগমের বোন এসে এমন আতিথ্য পেয়ে সুলেখার অনেক প্রশংসা করেন। সুলেখা বাড়ীতে নেই অথচ হাসনার পছন্দের সব খাবার ক্যাটারিং থেকে আনিয়ে রেখেছে। কাউকে ভালো না বাসলে কিংবা কারো একটা সুন্দর মন না থাকলে সে এভাবে আয়োজন করতে পারে না। সখিনার প্রশংসা শুনতে ভালো না লাগলেও মুখে কিছু বলে না। শুকনো মুখে হাসনার প্রশংসা বাক্যগুলো হজম করে নিলো।
আরো একমাস সময় অতিবাহিত হয়। সামনের সপ্তাহে সুলেখার ডেলিভারী ডেট। ইদানিং মাঝে মাঝে তলপেটে প্রচন্ড ব্যথা হয়। সেই কারনে সুলেখা অফিস থেকে মাতৃকালীন ছুটি নিয়েছে।
আজ সকাল থেকেই যেন ব্যথাটা বেড়েই চলেছে। সুলেখা আশফাককে ফোন দিয়ে তাড়াতাড়ি বাসায় চলে আসতে বলে দেয়। এদিকে সকাল থেকে বিছানায় শুয়ে এপাশ ওপাশ করছে। মাঝখানে মিনারা খালা এসে চা নাস্তা দিয়ে যায়। সখিনা বেগম ঘরে বসে টিভিতে সিরিয়াল দেখছিলো। রায়হান সাহেব নিজের বেডরুম থেকে উঠে এসে সখিনা বেগমের দিকে তাকিয়ে বলেন,
—বৌমার ঘরে গিয়ে একটু তো খোঁজ নিতে পারো না কি?
—এখানে এতো খোঁজ নেওয়ার কি আছে? মেয়ে মানুষ হয়ে জন্মেছে বাচ্চা জন্ম দিবে এটাই স্বাভাবিক। তুমি ভুলে গিয়েছো, যেদিন আশফাকের জন্ম হয় সেদিনও আমি তোমাদের সবার জন্য কাঠের চুলো জ্বালিয়ে রান্না করেছি। টেবিলে ভাত বেড়ে সবাইকে খাইয়েছি। সেদিন তোমার আমার খারাপ লাগার কথা মনে হয়নি?
রায়হান সাহেব আর কিছু না বলে নিজের ঘরে চলে যান। সখিনা বেগম টিভিটা বন্ধ করে দিয়ে বলে,
—একটু শান্তি করে টিভি দেখবো তারও উপায় নেই।
এরপর কিচেনে গিয়ে একটু সরিষার তেল গরম করে নিয়ে মিনারা খালার হাতে দিয়ে বলে,
—এটা বৌমার ঘরে নিয়ে যাও। কোমরে মালিশ করে দিও।
মিনারা খালা তেলটা নিয়ে চলে যায়। এরমাঝে ডোর বেল বেজে উঠে। সখিনা বেগম দরজা খুলে দেখে,আশফাক চলে এসেছে। সখিনার দিকে তাকিয়ে বলে,
—মা, সুলেখার কি অবস্থা?
—-এসময় যেমন থাকার কথা তেমন আছে।
আশফাক আর কিছু বলে না। নিজের ঘরে এসে চটজলদি সুলেখাকে রেডী হতে বলে। দ্রুত একটা ব্যাগে সুলেখার কিছু কাপড় আর বাচ্চার জন্য নতুন টাওয়েল নিয়ে নেয়। বাবা মাকে বলে সুলেখাকে নিয়ে আশফাক বের হয়ে যায়। হাসপাতালে পৌঁছে ইমার্জেন্সিতে চলে যায়। সেখানে সুলেখার ভর্তির ব্যবস্থা করা হয়।
দুইদিন দুইরাত পার হয়ে যায়। সুলেখার পানি ভেঙ্গে যায়। অবশেষে সিজার করে ওর পুত্রসন্তান হয়। নাতি হওয়ার খবর পেয়ে সুলেখার শ্বশুর শাশুড়ী বাবা মা হাসপাতাল চলে আসেন। নাতি দেখে সখিনা বেগম খুশী হন তবে সিজার হওয়াতে মনক্ষুন্ন হন। সুলেখার মাকে বলেন,
—পুরো প্রেগনেন্সি সময় আপনার মেয়ের প্রোটিন খেয়ে কি লাভ হলো? সেই তো সিজার করে বাচ্চার জন্ম হলো। বাচ্চা তো বেশী বড় হয়নি। আমার আশফাক রিস্তা এর থেকে কত বড় হয়েছিলো। তাও তো নরমালে হয়েছে।
সুলেখার মা বিরক্ত হন। কিন্তু মুখে কিছু না বলে সখিনা বেগমকে জিজ্ঞাসা করেন,
—ওদের ওজন কেমন ছিলো?
—তিনকেজি তো ছিলোই।
তখন আশফাক কাছে এসে বলে,
—মা, আমার ছেলে সাড়ে তিন কেজির থেকে বেশী।
—দেখে তো অত বড় মনে হয় না।
হাসপাতালে বেশিক্ষন থাকলে সখিনা বেগম আর কিকি বলবেন তার কোনো ঠিক ঠিকানা নেই। সেই কারণে আশফাক নিজের বাবা মাকে বাসায় পৌঁছে দেয়। সুলেখার অনুপস্থিতে মায়ের দিকে তাকিয়ে আশফাক বলে,
—মা, তোমার আর এখানে থেকে কাজ নেই। কারণ তোমার পক্ষে বাচ্চাকে লালন পালন করা সম্ভব নয়। আমি কাল তোমাদের গাড়ি ভাড়া করে দেই। তোমরা বরং বাড়ি চলে যাও। তোমার নাতি একটু বড় হলে আবার চলে এসো।
সখিনা বেগম একটু রেগে বলেন,
—বৌমা আর নাতি বাড়িতে আসার পর আমি চলে যাবো।
হাসপাতালে তিনদিন থেকে সুলেখা ওর বাচ্চা সহ বাড়ীতে চলে আসে। সুলেখা আসার পরদিন সখিনা বেগম আর রায়হান সাহেব বাড়ীতে চলে যাবার সিদ্ধান্ত নেন। এখবর শুনে সুলেখা হাঁফ ছেড়ে বাঁচে। কারণ ওর বাবা মাকে নিয়ে আসতে পারবে।
যাওয়ার সময় সখিনা বেগম সুলেখাকে বলেন,
—বৌমা, তোমাকে হয়তো আমি অতটা পছন্দ করি না কিন্তু তোমার কথাগুলোকে আমি মনের দিক থেকে শতভাগ মেনে নেই। কারণ তুমি হক কথা বলতে পারো বলে নিজের অধিকার আদায় করে নিতে পারো। কিন্তু আমি পারিনি। তাই মৃত্যু শয্যায় থাকা আমার মাকে দেখতে যেতে পারিনি। মারা যাবার পর মাকে দেখতে গিয়েছি। মাঝে মাঝে বুকের ভিতর এই ক্ষতগুলো থেকে রক্ত ঝরতে থাকে। সুতরাং তুমি যেমন আছো তেমনি থেকো। অন্তত জীবনের মাঝ বয়সে এসে আমার মতো আক্ষেপ করতে হবে না।
কথাগুলো বলে সখিনা বেগম আর রায়হান সাহেব বাড়ীর পথে রওয়ানা দেন। সুলেখা ওদের গমন পথের দিকে তাকিয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে।
সমাপ্ত
