#ইরাবতীর_চুপকথা
#অন্তিমপর্ব
#কলমে_প্রমা_মজুমদার
ইরার মোবাইলে একটা ফোন আসছে কিন্তু ইরার হাত বন্ধ তাই দোলা ফোনটা রিসিভ করে,আগামী সপ্তাহে একটা বিয়ের অনুষ্ঠান আছে,অফিস থেকে ইরাকে জানিয়ে দেয়া হচ্ছে।
দোলা ফোন রেখে ইরার কাছে যায়,মেয়েটা এখন পুরোদস্তুর চাকরিজীবী হয়ে গেছে,
আগে থেকে তাকে সব জানানো হয়,বাড়িতে লোক এসে ওর সাথে বসে সব লিখে নিয়ে যায়।
কিন্তু মোবাইলটা ঠিকঠাক ব্যবহার করতে পারে না,যেখানে সেখানে ফেলে রাখে।
দোলা ইরাকে বলে,”এই যে ম্যাডাম আপনার অফিস থেকে কল এসেছে,হাতের কাজ হয়ে গেলে ফোন করতে বলেছে,তুই তো দিন দিন ভি আই পি হয়ে যাচ্ছিস,কদিন পর আমাকে চিনতে পারবি তো?
ইরা দোলার মুখে সবটা শুনে হেসে ফেলে।
দোলা অবশ্য কথাটা ভুল বলেনি,ওর কথায় আজকাল খাবারের মেন্যু ঠিক হয়।পরে অফিসে কথা বলা যাবে কারণ আজ একটা বিশেষ দিন।
শুভ দুই হাত ভর্তি করে বাজার করে নিয়ে এসেছে,আজ ইরার বাড়িতে একটা ছোটখাটো অনুষ্ঠানের আয়োজন হচ্ছে। তাই ইরা খুব ব্যস্ত।
বাজার দেখে দোলা সেগুলো গোছাতে বসে যায়।
আজ এই বাড়িতে দিয়া দিদির সাধের রান্না করা হচ্ছে।
ইরা আর দোলা মিলে দিদিকে সাধ খাওয়াবে।
ইরা এখান থেকেই সব রান্না করে নিয়ে যাবে দিদির বাড়ি।ওর খুব শখ নিজে সব করবে দিদি অবশ্য বলেছিলো তার ফ্ল্যাটে সবকিছু করতে কিন্তু ইরা মানেনি,ও চেয়েছিলো নিজেই বাজার হাট করবে,দিদির বাড়ি হলে সেটা পারতো না তাই এই ব্যবস্থা।
এখন বেশি লোকের আয়োজন করতে ইরার একটুও ভয় লাগে না তবে আজ শুধু তাদের জন্য রান্না করবে।
প্রথম দিন রান্নার জায়গায় যাওয়ার আগে ইরা খুব ভয় পেয়েছিলো।প্রথম কাজ তাই হাজারটা প্রশ্ন হাজারো আশংকা।
সেদিন শুভ ওকে সাথে করে নিয়ে গিয়েছিলো।
কিন্তু ইরা সব দেখে খুব অবাক হয়ে গিয়েছিলো এতো বড় রান্নার জায়গা। সব ওর ফর্দ মতো হাতের কাছে গুছিয়ে রাখা।আবার ওকে সাহায্য করার জন্য আরও কিছু লোক।
ইরার শশুরের ধানের ব্যবসা ছিলো,প্রতি বছর নতুন ধান গোলায় তোলার পর একদিন একটা ভোজের আয়োজন করতো,বাড়ির উঠানে সামিয়ানা টাঙানো হতো।
আর বাড়ির পেছনে হতো রান্নার আয়োজন বড় বড় হাড়িতে।
ইরা সেখানে তদারকি করতো আর নিজেও কয়েকটা পদ রান্না করতো সেই অভিজ্ঞতা এখানেও কাজে লেগেছিলো।
এখন ইরার রান্নার প্রশংসায় সবাই পঞ্চমুখ দিয়ার নতুন ক্যাটারিং এর কাজ দিন দিন বেরেই যাচ্ছে।
ইরা এখন খুব ব্যস্ত থাকে,বাচ্চাদের আনা নেয়া টাও ঠিকমতো করতে পারে না তাই দোলাই ভরষা।
দোলা দুই বাড়ির কাজ ছেড়ে দিয়েছে,দিশা আর বাবাইকে সে বেশি সময় দেখে রাখে।
এই নিয়ে দোলার কোনো খারাপ লাগা নেই,একজন এগিয়ে গেলে আরেক জনকে তো পেছন থেকে সাহায্য করতেই হয়।
দিয়ার নয় মাস পরে গেছে,যে কোনো দিন কিছু হতে পারে,ইরা আর দোলা ওকে দেখেশুনে রাখে।কিন্তু এখন আরও একজন খোঁজা হচ্ছে যে সারাক্ষণ দিয়ার পাশে থাকবে।
নতুন অতিথির দেখাশোনা করবে।
ইরা এই কয়মাসে খেয়াল করেছে দিয়ার বাড়িতে অফিসের কয়েকজন আর দু একজন বন্ধু বান্ধব ছাড়া আত্মীয় স্বজনরা কেউ আসে না।
যদিও রায়ান দাদা স্ত্রীর খুব খেয়াল রাখে তবুও নিজের কেউ কেন আসে না।
একদিন খুব আগ্রহ নিয়ে দোলাকে জিজ্ঞেস করেছিলো,
“দিদির বাড়ি থেকে কেউ আসেনা কেন?শশুর বাড়িরও কেউ নেই নাকি?
দোলা একটু মলিন হাসে,এই শহরে তার আর ইরার মতো সর্বহারা মানুষ যেমন আছে তেমন দিয়া দিদির মতো সব থেকেও নেই মানুষের সংখ্যাও কম না।
“দিয়া আর রায়ান দুজনেই সমবয়সী ভালোবেসে বিয়ে করেছিলো কিন্তু তাদের দুই পরিবারের কেউ তা মেনে নেয়নি তাদের নাকি জাতের মিল নেই।
রায়ানের বাবা অনেক বড়লোক কিছু টাকা দিয়ে ছেলেকে আলাদা করে দেয়।
দিয়া দিদি এই শহরে আলাদা করেই নিজের সংসার সাজায়,নিজের পায়ের তলার মাটি শক্ত করে”
দিয়ার জন্য ইরার খুব কষ্ট হয় যে মানুষটা তাকে একটা নতুন পরিচয় দিয়েছে সেই মানুষটার জীবন এতোটা নিস্প্রভ।
তাই হয়তো সে দোলা ইরার মতো মেয়েদেরকেই আপন করে নেয় তাদের সাথেই সুখ দুঃখ ভাগ করে নেয়।
তখন থেকেই ইরার মনে হচ্ছিলো এই কথাটা একদিন সাহস করে দিদিকে বলেও দিয়েছিলো,”দিদি তোমাকে সাধ খাওয়াতে চাই”
দিয়া হেসে বলে তুই তো আমাকে প্রতিদিন ভালো ভালো রান্না করে দিচ্ছিস,আমার আর আলাদা কিছু খাওয়ার সাধ নেই।
ইরা তখন দিয়াকে বলে,এভাবে না দিদি একটু আলাদাভাবে।
মনের অনেক ইচ্ছাকে লুকিয়ে রেখেছে দিয়া কিন্তু কিছু কিছু স্বপ্ন পূরণ করার লোভ হয়।
তাই ইরাকে না বলতে পারেনা।
বাবাই হওয়ার সময় মা যেভাবে ইরার জন্য সব আয়োজন করেছিলো ইরা আজ সেভাবেই সব করবে।
ইরা দিদির জন্য অনেক কিছু করেছে,কাল থেকেই একটু একটু করে গুছিয়েছে।
দিদির টক খাবার খুব একটা পছন্দ না তাই “আমের মিষ্টি টক” করেছে,এটাও মায়ের কাছ থেকে শেখা।
কাঁচা আম আর টমেটো আগে অল্প লবণ আর হলুদ দিয়ে ভাপিয়ে নরম করে নেয়।
তারপর কড়াইয়ে তেল দিয়ে খেজুর আর কিসমিস একটু উল্টো পাল্টে তুলে নেয় তারপর সেই তেলে শুকনা মরিচ আর সরষে ফোড়ন দিয়ে টমেটোটা দিয়ে দেয়,একটু বলক উঠে এলে পরিমান মতো চিনি দেয়।
ঘন হয়ে এলে একটা ঘরে বানানো আচারের মসলা আর খেজুর কিসমিসগুলো দিয়ে দেয়।কড়াই থেকে নামিয়ে ঠান্ডা করে রাখে।
কাল রাতে চাটনি করে রেখেছে আজ অন্য কাজ করবে।
ভোর বেলা উঠে স্নান সেরে আগে চুলায় দুধ বসায়,শুভকে দিয়ে আগেই খেজুরের গুড় আনিয়ে রেখেছে সেই গুড় একপাশে জ্বাল করতে দেয়।
গুড়ের গন্ধে মিশে আছে ইরার শৈশব।
পৌষ মাসের শুরুতেই গ্রামের শীত জাকিয়ে বসতো, সকালে হিম পরতো,ঘাসের উপর চিকচিক করতো,একটু বেলা হয়ে এলে রোদের দেখা মিলতো।প্রায় সব বাড়ির সামনে মৌসুমী সবজির চাষ,হালকা চাদর গেয়ে বাড়ির সামনে বাচ্চাদের হল্লা চলতো,
তার মধ্যেই ঝোলা গুড় আর খেজুরের রস নিয়ে আসতো গাছিরা।
বাবা ওদের কাছ থেকে এক কলসি গুড় রেখে দিতেন।
ইরার বাবার খুব প্রিয় ছিলো গুড়ের পায়েস,তাই মা খুব যত্ন করে বানাতো সেই পায়েসটা। আগের দিন সন্ধ্যায় দুধের মালসা চুলায় বসাতো।
অগ্রহায়ণের নতুন আতপ চাল বেশ কিছুক্ষণ জলে ভিজিয়ে একটু কচলে আধভাঙ্গা করে ঘন দুধে দিয়ে দিতো।
চাল সিদ্ধ হয়ে এলে মালসা চুলা থেকে নামিয়ে এর মধ্যে ঝোলা গুড় দিয়ে হালকা হাতে নাড়া দিতো।
তারপর ঢাকনা দিয়ে দিতো পরদিন সকালে পায়েসের উপর একটা মোটা সর পরে থাকতো, সকালে গরম গরম লুচি ভাজতো আর সবার জন্য একবাটি পায়েস বাড়া হতো,উপরে ঘন সর পরা গুড়ের পায়েস, দেখলেই মনটা ভরে যায়।
ইরা দুধটা ঘন হয়ে এলে কালোজিরা চালটা একটু আধভাঙ্গা করে দিয়ে দেয়,কয়েকটা তেজপাতা ছিরে দেয় সেই দুধে।
চুলার আঁচ একটু বারিয়ে চাল সিদ্ধ করে নেয় তারপর আবার কমিয়ে দেয় ঘন হওয়ার জন্য,একফাঁকে অল্প একটু চিনি দেয়।
হাড়িটা চুলা থেকে নামিয়ে গুড়ের সিরাটা ঠান্ডা করে গরম দুধে দিয়ে দেয়।
আজ শুভ ইলিশ মাছ,রুই মাছ,চিংড়ি মাছ আর কিছু ছোট মাছ এনেছে।
মুরগি টা আগেই এনে রেখেছিলো।
ইরা আগে থেকেই ভেবে রেখেছে তাই কাজ করতে একটুও অসুবিধা হচ্ছে না।
যেহেতু ছুটির দিন তাই সবাই ঘরে আছে,ইরা সকালের জল খাবার করে মুল রান্নায় চলে যায়।
মাংসটা কিছু মসলা দিয়ে মেখে আলাদা করে রেখেছে,এরই মধ্যে
ডালের বড়া দিয়ে শুক্তো করেছে,আর চিংড়ি মাছ দিয়ে ভাপা করেছে, ছোট মাছের ঝাল চচ্চড়ি করেছে।
দোলা পাশে বসে মসলা কেটে বেটে দিচ্ছে।
রুই মাছটা দিয়ে একটু অন্য রকম কিছু করবে।
প্রথমে চুলায় একটা কড়াই বসিয়েছে রুই মাছের মাথা ভেজে নেয়ার জন্য
মাছের মাথা দিয়ে “মুড়িঘণ্ট” করবে।
মুরগির মাংস খুব ভালো করে কসিয়ে একটা চুলায় বসিয়ে রেখেছে। বেশি ঝোল হবে না তাই একটু সময় নিয়ে জ্বাল করবে।
ইলিশ মাছ দেখে ইরার অনেক কিছু মনে পরে যায়।
পদ্মা পাড়ের মেয়ে ইরা,ইলিশ মাছের সাথে তার গভীর সম্পর্ক।
হাটবারে হাট বসতো বট গাছ তলায়,সব আরতদার মাছ নিয়ে শহরে চলে যাবে তাই গ্রামে আগে অল্প মাছ রাখতো।
বাবা সেই হাট থেকে রুপালি ইলিশ নিয়ে বাড়ি ফিরতেন প্রায় সন্ধ্যায়।
সেই মাছ দেখে বাড়িতে উৎসবের আমেজ শুরু হয়ে যেতো।
বাড়িতে মানুষ অনেক আর বর্ষার প্রথম ইলিশ তার স্বাদ সবাই নিতে চায়।
মা মাছটা কেটে ধুয়ে অল্প লবণ হলুদ আর একটু তেল মাখিয়ে রাখতো।
রাতের ভাতেও বসিয়ে দিতো তাড়াতাড়ি আজ একটু বেশি ভাত লাগবে।
কড়াইয়ে অল্প সরিষার তেল দিয়ে মাছগুলো ছেড়ে দিতো,মাছ ভাজার গন্ধ সারা বাড়ি ঘুরে বেরাতো
অন্যান্য দিন রাতে ঢুলু ঢুলু চোখে ভাত খেতে বসলে দুধ আর চিনি চাম্পা কলা দিয়ে ভাত মেখে মা খাইয়ে দিতো কিন্তু মাছ ভাজার গন্ধে ইরার ঘুম নিমেষেই গায়েব হয়ে যায়।
গরম গরম মাছের সাথে কিছুটা তেল, আর পেঁয়াজের বেরেস্তা।আহ্ মুখে পরতেই শান্তি।
পরে অবশ্য দিনের বেলাতেও ইলিশ কিনতেন তবে সেটা দিয়ে হতো অন্য পদ।
আজ ইরা সেরকমই একটা কিছু করবে।
দিদির লাউ শাক খুব পছন্দ তাই এই ভাবনা।
ইলিশ মাছের পেটির টুকরো গুলো কিছুটা হলুদ, লবণ আর মরিচের গুড়ো দিয়ে মেখে রাখে।
সরিষা আর কাচা মরিচ একসাথে বেটে নেয় তার মধ্যে কিছুটা কাচা সরিষার তেল দিয়ে মাছগুলো দিয়ে দেয়, লাউ পাতা ভালোভাবে লবণ জল দিয়ে ভিজিয়ে রেখে ধুয়ে নেয় তারপর সেই পাতা সমান করে বিছিয়ে একটা একটা মাছ রেখে মুড়িয়ে নেই।
কড়াইয়ে একটু তেল দিয়ে মোড়ানো পাতাটা একটু ভেজে আবার অল্প একটু জল ছিটা দিয়ে ঢেকে দেয়।
ঢাকা দিয়েই মাছটা রান্না হয়ে যাবে।
হয়ে গেলো “লাউ পাতায় ইলিশ পাতুরি”
মুড়িঘণ্ট টা যেহেতু চাল দিয়ে করবে তাই পোলাও এর চালটাও একটু হলুদ লবণ দিয়ে ভেজে নেয়,তারপর মসলা দিয়ে ভালোভাবে কসিয়ে ঝরঝরে মুড়িঘণ্ট করে নেয়।
রুই মাছ টা দিয়ে “টক ঝাল মাছ”
করেছে।
এটা শুভর জন্য ইরা করে,শুভ যদিও ইরার হাতের সব কিছু পছন্দ করে তবুও এটা একটু বেশি ভালোবাসে।
এবার ভাজা গুলো করে নিলেই রান্না শেষ,মিষ্টি কুমড়া,আলু,বেগুন, আর মাছ এই ভাজাগুলোই থাকবে।
সাধের অনুষ্ঠানে মাছ খুব শুভ মানা হয় তাই ইরা মাছের কয়েকটা পদ করেছে।
ইরা অবাক হয়ে দেখে এই রান্নাঘরে এতো রকম রান্না আর কোনোদিন হয়নি।তার টানাপোড়েনের সংসারে সে এটা সেটা মিলিয়ে রান্না করেছে এতোদিন,কোনো রকমে দিন পার করেছে।
আজ সেই ঘরে সুদিন ফিরেছে দিয়া দিদির জন্য।
দিদির কথায় ইরা নিজের নামে ব্যাংকে একাউন্ট খুলে,প্রথম মাসে অফিস থেকে যে টাকাটা আসে তা দেখে শুভর চক্ষু চড়কগাছ।
শুধুমাত্র রান্না করে এতো টাকা পাওয়া যাবে এটা ওদের কল্পনাতীত।
কিন্তু ইরা নিজেকে একটুও বদলায়নি দিদির প্রতি তার সম্মান আর ভালোবাসা একই রকম আছে।
দিয়া ইরার জীবনে আশীর্বাদ হয়ে এসেছে,ইরার রান্নার কৌশলকে সবার সামনে তুলে এনেছে,নিজের যোগ্যতা প্রমাণ করার সুযোগ করে দিয়েছে তাই দিয়ার স্থান ইরার জীবনে অনেক ওপরে।
ইরা ভাবনা থেকে ফিরে আসে।
কয়েকটা পটল সামনে পরে আছে, পটল গুলো মনে হয় ইরার দিকে চেয়ে আছে বলছে,আমাদের একটা ব্যবস্থা করো।
ইরা মুচকি হাসে, হ্যা সত্যিই তো পটল গুলোর একটা গতি করতে হবে।
কয়েকটা পটল মাঝ বরাবর কেটে একটু ভাপিয়ে নেয়।
এইফাঁকে ইরা কয়েকটা আলু খোসা ছাড়িয়ে ভালোভাবে কুড়িয়ে নেয়,তারপর কড়াইয়ে পেঁয়াজ,রসুন আর কাচা মরিচ কুচি হালকা ভেজে নেয় একটু সোনালী হয়ে এলে আলু কুচিটা দিয়ে দেয়।
হলুদ, লবণ আর মরিচের গুড়ো দিয়ে একটু ভাজে তারপর একটু জল দিয়ে ঢেকে দেয় যতক্ষণ পর্যন্ত আলুটা একটু নরম হয় ততক্ষণ।
অন্য একটা কড়াইয়ে ডিম ঝুড়ি ভাজি করে নেয়,আলু নরম হয়ে গেলে এর মধ্যে ডিমটা দিয়ে ভালোভাবে মিশিয়ে নেয়, হয়ে গেল ভেতরের পুর।
এবার পটলের ভেতরের শাস টা ফেলে দিয়ে এর মধ্যে পুরটা ভরে দেয়।
চালের গুড়ার মধ্যে কিছু মসলা দিয়ে একটা পিঠালি করে নেয় তারপর পুর ভরা পটলগুলো দিয়ে মচমচে করে ভেজে নেয়।
হয়ে যায় মুচমুচে “পুর ভরা পটল”
দোলা অন্য বড়াগুলো করছে ইরা একটু হাতমুখ ধোয়ার জন্য নিজের ঘরে যায়।
বাবাই আর দিশা স্নান করে তৈরি হয়ে নিয়েছে ওরাও যাবে আজ মায়ের সাথে।
হঠাৎ দরজায় শব্দ এই সময় আবার কে এলো?
শুভ দরজা খুলে অবাক হয়ে যায়,দিয়া আর রায়ান দাড়িয়ে আছে।
দিয়া বলে,”সামনে থেকে সরে যা-ও আমাকে বসতে বলবে না”?
শুভ ওদের ঘরে নিয়ে আসে ঠিকই কিন্তু কোথায় বসতে বলবে বুঝতে পারছে না, তাদের এই দুই কামরার বাড়িতে আলাদা কোনো বসার ঘর নেই।
সে তাদের ইরার ঘরেই নিয়ে আসে।
দিয়াকে দেখে বাকিরাও অবাক হয়,ইরা বলে ওঠে,”আমরা তো এখনই তোমার বাড়ি যেতাম তুমি কেন কষ্ট করে এসেছ”?
দিয়া বলে,”আমার জন্যই এতো আয়োজন করেছিস আর আমি আসবো না?তোরা তো আমার সবচেয়ে কাছের মানুষ তোদের বাড়িতে আসতে আমার কোনো কষ্ট হয়নি”
ইরার চোখ ভিজে আসে।
দিদি সত্যিই সবার চেয়ে আলাদা,ইরা দিয়াকে বসতে বলে ভাতটা বসিয়ে দেয়।
ভেতর থেকে ইরার ডাক আসে,দোলা ওকে বলে,”তুই যা এতোটুকু আমি দেখে নিচ্ছি”
ইরা ঘরে যায়।
রায়ান দাদা শুভর সাথে কি সব কথা বলছে ইরা বুঝতে পারছে না।
সে দিদিকে ইশারায় জিজ্ঞেস করে, দিদি বলে,”শুভকে চাকরিটা ছেড়ে দিতে বলছে,আমার বেবি হয়ে গেলে
তুই একা সব দেখতে পারবি না তাই শুভ যেনো অফিসিয়ালি তোর পাশে থাকে তাই বলছে”
ইরা শুভর মুখের দিকে তাকায়,
ইরা কখনই শুভর উপর কিছু বলেনা,তাই এই বিষয়েও কিছু বলছে না।
শুভ আস্তে করে বলে,”আমি ইরা আর আপনাদের সাথে সব সময় আছি,আমাকে আলাদা কিছু দিতে হবে না”
রায়ান বলে উঠে,”আমি ব্যবসায়ী মানুষ এমনিতে কিছু করিনা,তোমাকে কিছুদিনের মধ্যেই জয়েন করতে হবে”
কথাটা শুনে সবাই একসাথে হেসে ফেলে।
দিয়া আজ খুব তৃপ্তি নিয়ে খেয়েছে,নিজের বাড়িতে টেবিল চেয়ারে বসে খেয়ে অভ্যস্ত হলেও আজ নিচে আসন পেতে বসে খাওয়ার স্মৃতি ওর জীবনের একটা সেরা মুহূর্ত হয়ে থেকে যাবে।
দিয়া ভেজা চোখে দেখে কতো সুন্দর আয়োজন করা হয়েছে শুধুমাত্র তার জন্য।এতো সুন্দর সাজিয়ে পরিবেশন করেছে ইরা আর দোলা দেখলেই মন ভরে যায়।
মা হওয়ার আগে এই অনুষ্ঠানটা সব মেয়ের জন্যই করা হয় নিজের পরিবার না হয়েও ইরা আর দোলা যা করেছে তা দেখে দিয়া কিছুতেই নিজের চোখকে বাধা দিতে পারছে না।
ইরা, দোলা, দিয়াদের চোখের জলে পূর্ণতা পায় আজকের সাধের অনুষ্ঠান।
তিনটা পরিবার তিনটা গল্প কিন্তু আজ একসাথে মিলে এক হয়ে গেছে।
এভাবেই ইরাবতী এগিয়ে যায় তার নিজ গুণে,নিজের যোগ্যতায়।
চলবে।
