#নিষ্ঠুর_নিয়তি
পর্ব – ৪
Kzal Mithun
রান্নাঘরের টাইলসের উপর ছিটকে পড়লো ছোট বউর মোবাইল । পড়ার সাথে সাথেই তিন টুকরা হয়ে গেলো ওর মোবাইলটা । এমন ঘটনার জন্য অবশ্য আমি মোটেই প্রস্তুত ছিলাম না । একটু ভড়কে গেলাম । তবে আমার একটুও অনুসোচনা হচ্ছে না । মনে মনে বরং খুশিই হয়েছি আমি । ঠিক হয়েছে । একটা অসুস্থ মানুষকে নিয়ে তামাশা করার শাস্তি আল্লাহ সাথে সাথে দিয়ে দিয়েছেন ।
মুহুর্তের জন্য রান্নাঘর পুরো নিস্তব্ধ হয়ে গেলো । রাগে , অভিমানে ছোট জা’র মুখটা একদম ফ্যাকাশে হয়ে গেছে । ওর চোখ দুটোতে মনে হলো আগুন জ্বলছে । পারলে সে আগুন দিয়ে আমাকে ঝলসে দেয় । ছোট জা বিশ্বাস করতে পারছে না যে , আমি এই খোড়া পা আর কাটা ঠোঁট নিয়ে এভাবে প্রতিবাদ করতে পারি । সে থতমত খেয়ে ফ্লোর থেকে নিজের ফোনটা হাতে তুলে নিলো । স্ক্রিনটা বোধহয় ফেটে গেছে ! দাঁত কিড়মিড় করে চেচিয়ে উঠলো সে – তুমি ইচ্ছে করে আমার মোবাইলটা ফেলে দিলে মেজো ভাবি ? তুমি জানো এই মোবাইলটার দাম কতো ? তোমার এতো সাহস হলো কি করে ?
আমি ছোট জা’র কথার কোনো উত্তর দিলাম না । আমার তখনও রাগে , অপমানে সারা শরির কাঁপছে । চুলার আগুন আর মনের ভিতরের যন্ত্রনা মিলে মিসে একাকার হয়ে যাচ্ছে আমার । তপ্ত আগুনের মতো স্থির দৃষ্টিতে ওর দিকে তাকালাম আমি । ছোট জা আর কথা বাড়ালো না । নিজের ভাঙা মোবাইলটা নিয়ে রাগে গজ গজ করতে করতে বের হয়ে গেলো রান্নাঘর থেকে । আমি বুঝতে পারলাম নিশ্চিতভাবে , সে এখন ড্রইংরুমে গিয়ে বড়সড় সিনক্রিয়েট করবে ।
ঠিক – তাই হলো । কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে আমার হাসব্যান্ড রান্নাঘরে এসে হাজির হলো । বাপরে ! তার সে কি যঘন্য চাহনি ! একদম তেড়ে এলো আমার দিকে । পারলে তো সে আমার গায়ে হাত তোলে । কোনো কিছু জিজ্ঞাসা না করেই হুঙ্কার দিয়ে উঠলো সে – তোমার সাহস তো কম না নাজমা ? অসুস্থ হয়েছো বলে কি মাথায় উঠে গেছো নাকি ? ছোট বউ সখ করে একটু ভিডিও বানাচছিলো । তাতে তোমার কি এমন ক্ষতি হলো যে – তুমি জিদ করে ওর মোবাইলটায় ভেঙে ফেললে ? তোমার মনে এতো হিংসা ? ঘরভরা মানুষের সামনে কয়েক মিনিট ধরে , উনার যা মুখে আসলো তাই বললো আমাকে ।
সে দাঁত মুখ খিচিয়ে আঙুল উচিয়ে চিৎকার করতে করতে একদম আমার মুখের কাছে চলে এলো । তার গায়ের তপ্ত নিশ্বাস আমার মুখের উপর এসে পড়লো তখন । সেই নিশ্বাসে কোনো মায়া ছিলো না , ছিলো শুধু বিষ । সবচেয়ে কাছের মানুষটার এমন অমানুষিক আচরনে আমি খুব আহত হলাম । বুকের ভিতরটা ভেঙে চুরে একেবারে চুরমার হয়ে গেলো । তবুও তার কথার কোনো জবাব দিলাম না আমি । এক দৃষ্টিতে তার দিকে তাকিয়ে রইলাম । খুব কান্না পাচ্ছিলো আমার , কিন্তু কান্তে পারলাম না । মনে হচ্ছে , কাঁদলে তো ওরা আরো অপমান করবে আমাকে । অবাক হয়ে আমার হাসব্যান্ডের দিকে তাকিয়ে শুধু এটুকুই ভাবলাম – যাকে জীবনের সবটুকু উজাড় করে দিয়ে এতগুলো বছর ভালোবেসেছি , সেই মানুষটা আজ আমার আত্মসম্মানের চেয়ে , একটা প্লাস্টিক আর কাঁচের জড় বস্তুকে বেশি মুল্যায়ন করছে । হায়রে নিয়তি !
মুখ বুজে সব অপমান সহ্য করলাম । দুপুরে সবাইকে খেতে দিলাম নিরবে । একটা কথাও আর কারো সাথে বলিনি । ওদের সাথে কথা বলার রুচিই নষ্ট হয়ে গেছে আমার । মনে মনে আল্লাহ আল্লাহ করতে থাকলাম – কখন ওরা বাসা থেকে বিদায় হবে আর আমি একটু স্বস্তির নিশ্বাস ফেলবো । মানসিক চাপ আর নিতে পারছিলাম না ।
সন্ধ্যার সময় সবাই বিয়ের অনুষ্ঠানে যাওয়ার জন্য রেডি হলো । । আশ্চর্য ! আমাকে কেউ জিজ্ঞেস করলো না যে আমি যাবো কি না ? যেনো ওরা ধরেই নিয়েছে যে আমি যাবো না । অবশ্য আমি এখন আর যেতেও চাই না ভাশুরের ছেলের বিয়েতে । ভাশুরের বউ তো ছোট দেবরের বউয়ের থেকেও ভয়াবহ খারাপ । এই মানুষগুলোকে এখন আর আমি জাস্ট সহ্য করতে পারছি না । আমার হাসব্যান্ড কিন্তু দুপুরে খাওয়ার পর পরই হেববি মাঞ্জা মাইরা বের হয়ে গেছে । যাবেই বা না কেনো ? ভারি মেকাপ নেয়া মধ্যবয়সী মহিলাগুলোর সাথে আড্ডা দিতে হবে তো ! এখন যে তার এই ঠোঁট ফাটা , খোড়া মহিলাকে ভালো লাগে না ।
আমার মাইশা আজকে গোলাপি রঙের লেহেঙ্গা পরেছে । ওর লম্বা সিল্কি চুলগুলো পিঠের উপর ছেড়ে দিয়েছে । হাত ভর্তি কাঁচের চুড়ি পরেছে আমার মেয়ে । কি যে অপুর্ব লাগছে দেখতে আমার মেয়েটাকে…! মনে মনে বললাম – মাশা আল্লাহ ! কারো নজর না লাগে । কিন্তু আজকে বিয়ের অনুষ্ঠানে মেয়েকে যেতে দিতে কেনো জানি মনটা সায় দিচ্ছে না । ছোট বউ তার মোবাইল ভাঙার শোধ না জানি কিভাবে তোলে আমার উপর দিয়ে । আমার মেয়েটাকে দিয়েই প্রতিশোধ নেয় কি না আল্লাহ জানেন । এখন যদি মেয়েকে নিষেধ করি যে তুমি বিয়ের অনুষ্ঠানে যেও না । তা কি ও শুনবে ? ও তো ছোট মানুষ , ও যে এই নোংরা ফ্যামিলি পলিটিকসের কিছুই বোঝে না ।
মাইশাকে দেখেই ছোট জা হৈ হৈ করে উঠলো – ওরেএ ! আমাদের মাইশাকে তো দেখি কালকের থেকেও আজকে আরো বেশি জোছ্ লাগছে ! মাইশার গালটা টিপে দিতে দিতে ছোট জা বললো – জানিস মাইশা ! তোর নাচের ভিডিওতে কিন্তু অলরেডি এক লাখ ভিউ হয়েছে । হাজার হাজার কমেনট এসেছে । হ্যা , দুই একটা ব্যাড কমেনট এসেছে । ওটা কোনো ব্যাপার না । অবশ্য তুইতো সবই দেখছিস ফেইসবুকে । মাইশা হালকা একটু মাথা ঝাকালো । ছোট বউ এবার আর একটু রসিয়ে বললো – দেখলি ! একদিনেই তোকে আমি কেমন ভাইরাল করে দিলাম । অথচ তোর আম্মু হুদাই এটা নিয়ে সিন ক্রিয়েট করলো । আসলে নিজের মেয়ে ফেমাস হচ্ছে , এটা তোর আম্মুর সহ্য হচ্ছে না বুঝলি ?
আর চুপ থাকতে পারলাম না । দাঁতে দাঁত চেপে বললাম – আমার মেয়েকে নিয়ে তোমার এই নোংরা ভিউ ব্যবসা বন্ধ করো ছোট বউ । এর ফল কিন্তু ভালো হবে না বলে দিচ্ছি । আমার কথায় পাত্তা দিলো না সে । আরে মাইশা ! তুই দাড়িয়ে আছিস কেনো ? যা গিয়ে গাড়িতে ওঠ ! আমি আসছি । টেকনিক করে সে মাইশাকে সরিয়ে দিলো । মাইশা বের হয়ে গেলে ছোট জা আমার দিকে একটা তাচ্ছিল্যের হাসি দিয়ে বললো – তুমি তোমার নিজের কথা ভাবো মেজো ভাবি । আমার মোবাইলের টাকা আমি তোমার কাছ থেকে নেবো না ভেবেছো ? যত দ্রুত সম্ভব টাকার জোগাড় করো । আর যদি টাকা না দাও , তাহলে কিন্তু আমাদের মাইশা মামনিকে দিয়ে আরো সুন্দর সুন্দর ভিডিও বানিয়ে …… ! তখন মুখ দেখাতে পারবা তো ? বলেই সে কেমন জানি একটা অশ্লিল অঙ্গ ভঙ্গি করলো ।
মাথায় রক্ত উঠে গেলো আমার । প্রচন্ড রাগ হলো ছোট জা’র কথা শুনে । কথা শেষ করে চলে না গেলে , সত্যিই ওর গালে আজ আমি ঠাটিয়ে একটা চড় লাগাতাম । অসভ্য মহিলা একটা ! সুযোগ পেলে থাপ্পড় তো তোকে আমি মারবোই ! রেডি থাকিস ।
শরিরটা আর চলছে না । দুপুরে ঠিকমতো খাওয়া হয়নি আমার , সেই সাথে মানসিক অত্যাচার ! অসুস্থ অবস্থায় রান্না বান্না , মেহমানদারি করে একদম হাপিয়ে গেছি । প্রচন্ড দুর্বল লাগছে এখন । ঘুম পেয়েছে খুব । রেস্ট করা দরকার । ড্রইংরুম থেকে যে বেডরুম পর্যন্ত যাবো , সেই শক্তিটা পর্যন্ত পাচ্ছি না আমি । মনে হচ্ছে মাথা ঘুরে পড়ে যাবো । তারপরও দেয়াল ধরে এক পায়ে হাটতে হাঁটতে বেডরুমের দিকে এগোলাম । আমার ছেলে আলিফের রুমের সামনে এসে ভিষন অবাক হলাম আমি !! দরজাটা একটু ফাঁক করা ছিলো । ধাক্কা দিয়ে খুললাম – কিরে আব্বা ! তুই যাসনি বিয়ের অনুষ্ঠানে ?
অনুষ্ঠানে যাওয়ার কাপড় পরে বিছানায় আধশোয়া অবস্থায় ছিলো আলিফ । ওর হাতে মোবাইল । আমাকে দেখে ধড়মড়িয়ে উঠলো আলিফ ….!
চলবে ….!
