#একলা_একার_গান
লেখনীতে:#তাবাসসুম_তোয়া
৩.
ভাগ্যের উপর ভীষণ মায়া হলো। নিজের জন্য কান্না ও পেলো! এলো তবে!
তবে কেন এই বড্ড অবেলায়! নীড়হারা পাখির কাছে। চালচুলোহীন অসহায়ের দুয়ারে! যার আর দেওয়ার মতো কিছুই নেই। কিচ্ছু অবশিষ্ট নেই!
যে হারিয়ে ফেলেছে জীবনের সব রুপ রং ঘ্রাণ!
বেচারি কোনমতে বেঁচে আছে, গলার কাছে শ্বাসটা কোনমতে আটকে। সেটার খোঁজ আছে ক’জনের কাছে?
ধীর পায়ে এগোলাম কেবিনের দিকে। কেবিনের গেট বন্ধ। মানুষটা সেখানে নেই। খুঁজতে গেলাম তার ডিপার্টমেন্টে। কিছু কথা তাকে বলা প্রয়োজন! বেশিই প্রয়োজন। যে ভুল সে করছে সেটা ধরিয়ে দিতে হত!
বাইরে তখন মুষলধারে বৃষ্টি। অঝোর ধারার বাদল ভিজিয়ে দিয়ে গেল কাঠগোলাপের ডাল। তাকিয়ে তাকিয়ে দেখলাম। আমি করিডরের ঐ প্রান্তে তাকে দেখলাম। এগিয়ে যেতেই দেখলাম সে ঘুরে চলে যাচ্ছে!
’ফেস করার সাহস নেয় আবার কনফেস করে।’
আমি এগিয়ে গেলাম তার ভুল গুলো ভাঙানো জরুরি। দ্রুত পায়ে তাকে ধরতে চাইলাম। কিন্তু আমাকে অবাক করে দিয়ে পাগ’লাটা ঝুপ করে নেমে পড়লো সে ঝুুম বৃষ্টির মাঝে। আমি দাঁড়িয়ে পড়লাম হতবিহ্বলের মতোই। ইয়াং স্যারকে বৃষ্টিতে নামতে দেখে আরও কয়েকজন ছেলেমেয়েও নেমে গেল, হৈ হৈ করতে করতে। সবার সে কি উচ্ছ্বাস। পাগ’লাটাকে দেখলাম একদম ভিজে একাকার। অফ হেয়াইট শার্টটা লেগে আছে পেশিবহুল দেহের সাথে। বডি বোঝা যাচ্ছে সুস্পষ্ট ভাবে! চোখ নামিয়ে নিলাম৷ তাকে দেখার অনুমতি আমার নেই।
সবাই তখন দৌড়ে গেল ঐ রাস্তা জুড়ে। ঝম ঝম বৃষ্টির মাঝে তাদের সেকি উচ্ছ্বাস! তারা লাফালাফি করলো একজন আরেকজনকে টানতে টানতে নিলো বেশি পানির মাঝে।
রাস্তায় পানি জমে গেছে গোড়ালি সমান। বুয়েটের এই এক সমস্যা! ঝুম বৃষ্টি নামলে দ্রুত পানি জমে যায়। অনেক সময় ডুবে যায় হলগুলোও,প্রায় হাঁটু সমান পানি! তখন মনে হয় নৌকা আনলে বুঝি বুয়েটের নদীতে ভাসানো যেত। এটা নিয়ে আমরা প্রতিবছর অনেক মজা করি। বৃষ্টি নামলে পুরো ঢাকা শহর ডুবে যায় সেখানে বুয়েট তো অনেক ছোট জায়গা!
ছেলেরা ছুটে গেল। দুই জন সামনাসামনি বসে হাত আর পায়ের সিঁড়ি বানালো অন্য ছেলেরা দৌড়ে এসে ঝাঁপ দিয়ে দিয়ে পার হলো সেই সিঁড়ি। মেয়েদের ক্ষেত্রে সেই সিঁড়ি কমে গিয়ে খানিকটা ছোট হলো। পানির ভেতরে সেই শব্দ যেন রিদম তুললো।
আর নিরব পাগ’লাকে দেখলাম দুই হাত বাতাসে ভাসিয়ে নিজেকে যেন সঁপে দিলো প্রকৃতির কাছে।ও নিজেও কিছুদিন আগে এরকম ভাবেই মজা করতো। আমিও দেখেছি। বৃষ্টি নামলেই ওর ব্যাচের অনেক মেয়ে আর ছেলেরা নেমে যেত ক্যাফের সামনে। এক নম্বর গেট থেকে সে সড়ক ইউআরপির দিকে গেছে সেই রাস্তায় ছুটোছুটি করতো। কিন্তু তাই বলে এখন? এখন কি ছোট আছে? কিন্তু তাকে দেখলাম সে নির্বিকার। আকাশের দিকে তাকিয়ে বন্ধ চোখ। তারপর চশমাটা নামিয়ে চোখমুখ মুছে আমাকে দেখলো বার কয়েক! আমি ততক্ষণে নিজেকে আড়াল করতে দোতলায় চলে গেছি। দোতলার বেলকনির থামের পেছন থেকে তাদেরকে দেখছি। ওদের খেলাধুলা দেখতে ভালোই লাগছিলো। নিচের তলায় দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে সবাই তাদের আনন্দ দেখছে। আসলে মানুষ যতই বড় হোক তাদের মধ্যেকার বাচ্চামিটা সুযোগ পেলেই বেরিয়ে আসতে চায়!
নিরবের দিকে খেয়াল হলো সে নিচের তলায় আমাকে না পেয়ে দোতলায় আমাকে খুঁজলো। ওর চোখ ঘুরে আমার অব্দি আসতেই আমি লুকিয়ে পড়লাম থামের আড়ালে। আমি কেন তাকে দেখবো। মেয়েরা তখনও কি ভীষণ চেয়ার আপ করছে। ইয়াং, হ্যান্ডসাম তার উপর আবার অবিবাহিত স্যার ভিজছেন! এর থেকে আনন্দ আর কি হতে পারে ? হঠাৎ মেসেজ আসলো আমার ফোনে।
” একদিন আপনাকেও এই ঝুম বৃষ্টিতে টেনে এনে একসাথে ভিজবো, সেদিনের অপেক্ষায়….! ”
মেসেজ দেখে ভড়কে গেলাম। থামের আড়াল থেকে বেরিয়ে এলাম। বৃষ্টিতে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কিভাবে মেসেজ দেয়? দেখলাম সে আর ভিজছে না। বরং সে ওখানেই নেই। আমি তাকে খুঁজতে চারিপাশে তাকালাম। খুঁজলাম কিছুক্ষণ গাছের আড়ালে আবডালে! নাহ সে হয়তো ঐ ছেলেদের সাথে গেছে। ঠিক তখনই পেছন থেকে কেউ বলে উঠলো।
” আমাকে খুঁজছেন? ”
আমি লাফ দিয়ে উঠেছি। সে কখন এখানে এসেছে? দেখি সে একদম ভিজে একাকার। সামনের জামা লেপ্টে দেখা যাচ্ছে ভেতরের গেঞ্জি। সাথে সাথে চোখ নামিয়ে নিয়েছি৷ কি নির্লজ্জ এই ছেলেটা। আমার বুক কাঁপছে তাকে এভাবে দেখে!
কাঠ কাঠ গলায় বললাম,
” যাও, চেঞ্জ করো! তোমার সাথে কথা আছে! ”
” কিভাবে চেঞ্জ করবো? এক্সট্রা কাপড় তো নেই। বাসায় গেলে সর্দি কাশির সাথে মায়ের বকুনি ফ্রীতে পাবো। ইস আজ একটা বৌ নেই বলে! মাথাটা যে কি দিয়ে মুছি৷ ”
বলেই আমার হিজাবের একপাশ হাতে নিয়ে তার মাথাতে ঘষা দিয়ে দিলো মূহুর্তেই৷ আমি ঝাঁপ দিয়ে সরে গেছি। কি আশ্চর্য এই ছেলে! পাগল! পুরোই পাগল! এটা কেউ করে? কেউ যদি দেখে নেয়?
আমি আর এক মূহুর্তও সেখানে দাঁড়ালাম না। দ্রুত সেখান থেকে হেঁটে চলে এসেছি। বাম হাতের দুই আঙ্গুলের সাহায্য হিজাবটাকে টেনে তুলে ধরে ছুটলাম কমনরুমের দিকে! যেন সেটা অস্পৃশ্য! আসলেই পর পুরুষের ছোঁয়া আমার গায়ে কেন লাগাবো? হিজাব টাকে নিজের সাথে লাগাতে দিলাম না মোটেও।
আমার হিজাবটা তখন আর আমার মনে হচ্ছে না। কি আশ্চর্য তার ছোঁয়া এই হিজাবে। তার মাথার পানি। আমি কমনরুমে দৌড়ে গেলাম। কমনরুমে ঢুকেই আগে হিজাবটা টান দিয়ে খুলে ফেললাম। কি পরিমান পাগ’লামি। আমি দাঁড়িয়ে ছিলাম কর্ণারে সেখানে আসলেই কেউ ছিলো না। এজন্যই ও এতো সাহস পেলো। হিজাবটাকে মেলে দিলাম চেয়ারে। জর্জেট হিজাব শুকাতে সময় লাগবে না। চোখ বন্ধ করে বসে পড়লাম সোফায়।
আমার বন্ধ চোখের পাতায় ভাসলো বড় ডায়ালের ঘড়ি পরিহিত হাতটা কিভাবে আমার হিজাবের প্রান্তটা ধরলো! সাদা ধবধবে হাত! বৃষ্টিতে ভিজে আরও বেশি সাদা হয়ে উঠেছে! ফোনটা ভাইব্রেট করলো। দেখলাম তার মেসেজ।
” হিজাবটাকে সোনার ফ্রেমে বাধায় করে মুড়িয়ে রাখবেন। প্রিয় মানুষের প্রথম ছোঁয়া। আর স্যরি এটা করা ঠিক হয়নি। আপনার ঐ ফোলা, রাগী মুখখানা দেখে নিজেকে সামলাতে পারিনি। ”
আমি ছেলেটার নম্বরটা ব্লকলিস্টে ফেললাম৷ একে একে সব সোশ্যাল মিডিয়ার সকল প্রোফাইল! এটা উন্মা’দ। উন্মা’দের পাল্লায় পড়েছি। সমাজ মানে না, কিচ্ছু না। কতবড় সাহস!
হিজাব শুকাতে সময় লাগলো না। ততক্ষণে বাসের সময় হয়ে এসেছে। আমি আবারও সেটা পরে দ্রুত আসলাম ল্যাবের দিকে। ল্যাবের মধ্যে আমার ব্যাগ।
বাসায় গেছি সন্ধ্যার পরে আরেকটা নম্বর থেকে হোয়াটসঅ্যাপে একটা মেসেজ আসলো। সেই চিরকুটের ছবি। তখন মনে পড়লো চিরকুটটার কথা! তার মানে আমার হাত থেকে সেটা পড়ে গিয়েছিল আর তুলে নিয়েছে সে! আবারও পড়লাম!
” কিছু দরজা অটোমেটিক কিছু মানুষের জন্য খুলে যায়। কিভাবে সে গেট বন্ধ করতে হয় আমার জানা নেই! আপনার জানা থাকলে আমাকে একটু সাহায্য করতে পারেন? ”
অনান্য সব নম্বর ব্লাকলিস্টে তাই সে আরেকটা নম্বর থেকে সেটা আমাকে পাঠিয়েছে, মুহূর্তেই এলো আরও একটা মেসেজ,
” হিজাবটাকে এতক্ষণে নিশ্চয়ই বাঁধিয়ে টাঙিয়ে রেখেছেন? আমাকে পিক দিয়েন তো! ”
মেজাজটা এমন চটলো। সরাসরি কল দিলাম তাকে। সে ধরলো না। রিং হয়ে হয়ে কেটে গেল। জবাবে সে মেসেজ দিলো।
” আগামীকাল সকাল ১১.০০ টায়, আমার কেবিন কিংবা আপনার ল্যাব? ”
রিপ্লাই করলাম না। তবে মনে মনে ঠিক করে ফেললাম কি বলবো তাকে!
.
সকালে দশটার দিকে বাসা থেকে বেরিয়ে আসলাম। রিকশায় করে পৌঁছাতে এতক্ষণ লেগে যাবে। পৌঁছেই তার কেবিনের সামনে দিয়ে হেঁটে আসার সময় দেখলাম গেটটা আবারও হাট করে খোলা। দরজাটা দুইহাতে বন্ধ করে রেখে নিজের ল্যাবে ফিরলাম। ঠিক এগারোটা এক মিনিটে আমার ল্যাবের দরজায় নক পড়লো একটা! আমার ল্যাবের অবস্থা যাচ্ছেতাই! আর এই ল্যাবে তার কি কাজ, এসব বিষয়ে যদি কথা উঠে। তাই চাবির গোছাটা নিয়ে বেরিয়ে এলাম ল্যাব থেকে। সে সেটা দেখে হেসে নিজের কেবিনে ফিরলো।
আমি যেতেই দেখলাম সে দাঁড়িয়ে দরজার পাশটায়, আমার বুকটা কাঁপছে! কখনও এমন পাগ’ল মানুষের মুখোমুখি হইনি।
” আসসালামু আলাইকম! ”
কোনমতে হেঁটে গেলাম। বসে পড়লাম চেয়ারে। লম্বা চওড়া টেবিলের ঐ প্রান্তে বসলো সে।
” আমি তোমার থেকে চার বছরের বড়, জানো? ”
সে হাসলো। হেসে আমার চোখের দিকে তাকিয়ে গভীর দৃষ্টি দিয়ে জবাব দিলো ছোট্ট শব্দে,
” তো! ”
” তোমার কি মনে হয়না, এখন টাইম পাস করার বয়স কেটে গেছে তোমার? ”
” আপনার কি মনে হয়? এ পর্যন্ত ক’জনের সাথে টাইম পাস করেছি! ”
” সেটা তুমি জানো, আমার জানার বিষয় না। ”
” আপনি সত্যিই জানেন না? ” সে সুক্ষ্ম চোখে তাকালো।
” টুকটাক শুনেছি তোমার একমাত্র এফেয়ার ছিলো বইয়ের সাথে,এজন্য হঠাৎ বইয়ের জগত থেকে এ জগতে এসেছো তো তাই বুঝতে পারছো না কার সাথে তোমার এফেয়ার করা উচিত! হুট করে ভুল পথে চলে এসেছো? ”
সে হাসলো।
” উহু! যদি বলি বইয়ের জগত থেকে সরাসরি বৌয়ের জগতে গিয়ে পড়তে চাই,সেই চেষ্টায় করছি! ”
চোখ গরম করে তাকালাম!
” অনেক বছর পর বই থেকে বেরিয়ে এসেছো তো তাই জগতটা চেনো না। আগে জগতটা দেখো, চেনো তারপর নাহয় সুন্দর মতো একটা সিদ্ধান্ত নিও। এসব আজেবাজে চিন্তা এখন বাদ দাও! ”
” উপদেশের জন্য ধন্যবাদ। এটা ঠিক এ জগতে আমি নতুন, তবে আমার ব্যাপারে একটা কথা আপনি জানেন না, আমি সিদ্ধান্ত নেবার ব্যাপারে খুব পাকা, সিদ্ধহস্ত! সবসময় অ্যাকিউরেট সিদ্ধান্ত নিই। ১০০% নির্ভূল!
যখন ভাবলাম আমাকে নটরডেমে পড়তে হবে ব্যস নটরডেমে ভর্তি হলাম, যখন পণ করলাম আমাকে বুয়েটে পড়তে হবে ব্যাস বুয়েটে ভর্তি হলাম এবার যখন সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছি আমি আপনাকে বিয়ে …. ”
তাকে থামিয়ে দিলাম। শক্ত কন্ঠে বললাম
” তুমি জানো, আমি ম্যারিড! ”
তার চেহারার হাসিটা উবে গেল। চেহারাটা একটুখানি হয়ে গেল। বেদনার্ত চোখ দিয়ে আমাকে দেখলো।
” নিরব, জীবন কি এতোই সহজ! হুট করে কাউকে ভালো লেগে গেল আর ওমনি তাতে ঝাঁপিয়ে পড়লে, ডুবে গেলে? আগে ঠিকমতো খোঁজখবর নিলেনা? সে ম্যারিড নাকি না? এতটাদূর পর্যন্ত এসেও কেউ এখনও আনম্যারিড থাকে?
তাহলে কেন এ বৃথা চেষ্টা। আবেগের বৃথা অপচয়! শুধু শুধু নিজের শুদ্ধ মনকে নিয়ে খেলছো! ”
এ পর্যন্ত এসে সে এবার তাকিয়ে হাসলো।
” বৃথা অপচয় বলছেন? ”
” হুম! চোখ খুলে তাকাও। জগতে সবাই সবার জন্য থাকে না। সবার জন্য ঝুঁকে যেতেও নেই! কতশত সুন্দরী মেয়ে রয়েছে জগত জুড়ে! সেসব না দেখেই সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলছো? ”
সে হাসলো আবারও! আমি বলে চললাম বিজ্ঞের মতো..
” এখনও তেমন কোন সমস্যা হয়নি। এসব ভুলে যাও। দুদিনও লাগবে না ভুলতে, আমি এমন অনন্য কেউ নই। খুব সুন্দরী কাউকে দেখে বিয়ে করে ফেলো। দেখবে সব ঠিক হয়ে যাবে! ”
” আপনার কি মনে হয় নিরব এতোটাও বোকা! আবেগের এভাবে অপচয় হতে দিবে? ”
” উহু, বোকা তুমি নও! তবে একটা বোকামি করে ফেলেছো? ভুলে যাও সবঠিক হয়ে যাবে। মেয়ে চাইলে আমাকে বলতে পারো। আমার পরিচিত অনেক সুন্দরী মেয়ে রয়েছে। ”
আমি আসার জন্য উঠে দাড়ালে সে বলে উঠলো,
” You are separated ”
আমর দম বন্ধ হয়ে এলো। এতোদূর! এতোদূর অব্দি সে চলে গেছে!
” একজন দলীয় ক্রিমি*নাল আপনাকে তুলে নিয়ে গিয়েছিলো ইন্টার পরীক্ষার পর। আপনাকে বিয়ে করেছিলো শুনেছি। বহু কষ্ট সেখান থেকে মুক্তি মিলেছে আপনার। যদিও আপনি কয়েকবার হাসপাতালেও ভর্তি হয়েছিলেন৷ সর্বশেষ গত জুলাইয়ের আন্দোলনে তারা সবাই পালিয়ে গেলে তখন আপনিও সে বাসা থেকে পালিয়ে এসেছেন? Am I right? ”
আমার বুক কাঁপতে শুরু করলো৷ হঠাৎ সবচেয়ে বড় সত্যের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে গেলাম তাই হয়তো!
আমার জীবনের এই কঠিন সত্যিটা কি কখনও আমার পিছু ছাড়বে না?যেটা ভুলতে চেয়েছি সবসময়।
পিছু ছাড়াতে চেয়েছি সবসময়!
সে কেন এতো কিছু জানলো? কেন? আমি বেশ আছি, সব ভুলে! তাহলে সে কেন জানলো। নিরব তখন আমার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে!
” নিরব দূরে সরে দাঁড়াও, এতোকিছু কেন জেনেছো? ”
” কাউকে ভাল লাগলেই মন দিয়ে দিতে নেই। খুব ভালো ভাবে জেনে, বুঝে, শুনে,দেখে তবেই মন লাগাতে হয়। আপনিই মাত্র বললেন! জীবন কি এতোই সহজ? ”
” নিরব, তুমি বোকা। এ যুগে দাঁড়িয়ে কেউ একজন বিবাহিত বা ডিভোর্সপ্রাপ্ত মানুষের পেছনে ছোটে না,তাও আবার তোমার মতো এতটা এলিজিবল মানুষ! নিরব, যেতে দাও আমাকে। ”
” আমার আপনাকে চাই। অন্য কাউকে না ”
” আমাকে পেলে তুমি কি পাবে? কিছুই না! কিছুই দেবার নেই আমার! ”
“ ওই সুন্দর মুখখানা পাবো, একটি অসাধারণ মানুষ পাবো-একটি খুব সুন্দর মন। আর সবচেয়ে বড় ব্যাপার হচ্ছে লয়ালিটি-খুব সৎ একজন মানুষ।
আপনার পুরো বিষয়টা জানার পর আমার মনে হয়েছে, আপনি যেন শুধু আমার জন্যই এতদিন ধরে নিজের লয়ালিটি ধরে রেখেছেন।
আপনাকে পেলে আমি এমন একজনকে পাবো, যে জীবনে আর কোনোদিন কারও দিকে তাকাবে না। ওই সুন্দর চোখজোড়া শুধু আমাকেই দেখবে—আমাকেই।
দিনশেষে ক্লান্ত-পরিশ্রান্ত আমি, আপনার মাঝেই খুঁজে পাবো আমার একমাত্র আশ্রয়। এতশত মুখোশের আড়ালে, একটি খাঁটি অর্ধাঙ্গিনী পাবো। এই ছোট্ট আয়ুষ্কালে আর কি চায়! ”
” নিরব, এসব সাহিত্যে মানায়। তোমার পরিবার কখনোই মানবে না। এতটা যোগ্যতা সম্পন্ন একজন মানুষের সঙ্গে একজন তালাকপ্রাপ্ত নারীর বিয়ে—তা কখনোই সম্ভব নয়। মিথ্যা স্বপ্ন দেখা ছেড়ে দাও।
আর আমার এখনও ডিভোর্স হয়নি; মামলাটা এখনও চলমান। আমি এখনও ঝুলে আছি—হয়তো সারাজীবনই এভাবেই ঝুলে থাকবো। সে মানুষকে তুমি চেনো না, এতো সহজে আমাকে ছাড়বে না ”
” আমি অপেক্ষা করবো! ”
” নিরব যেতে দাও। ”
” আজ যেতে দিচ্ছি, এখন দিচ্ছি কিন্তু পুরোপুরি যেতে দিবো না কোনদিনই। ”
সে গেট ছেড়ে দিলো। আমি চুপচাপ বেরিয়ে এলাম।
হেঁটে গেলাম জীবনের পথে! ক্লান্ত পরিশ্রান্ত সে হেঁটে চলা! সেই এটুকু বয়স থেকে কি কি না সহ্য করেছি! নিরব কিছু জানে? কিচ্ছু না,ও জগত দেখেনি, আমি দেখেছি। হাড়ে হাড়ে নিজের পুরোটা জীবন বিসর্জন দিয়ে দেখেছি। আমি কি ওর মতো পাগলের কথায় নাচতে পারি? কিভাবে মুক্তি মিলেছিলো ঐ জাহান্নাম থেকে ও তো সেটাও জানে না। জান হাতে নিয়ে ছুটে এসেছিলাম ঢাকাতে। নিজেকে লুকিয়ে রেখেছি কতগুলো মাস। এই বুঝি আমাকে ধরে নিয়ে গেল সেই জাহান্নামে!
.
তারপরে বেশ কয়েকটা দিন আমি ডিপার্টমেন্টে আসিনি। তার সামনে পড়তে চাইনি তাই। তার বোকা কথায় ভুলে যাওয়ার মতো মেয়ে কি আমি? আমার ডিফেন্সের ডেট হয়ে গেল দ্রুতই। তার এক সপ্তাহ আগে ওপেন সেমিনার!
সেমিনার শেষ করে দূর থেকে একবার তার কেবিনের দিকে দেখেছি। গেটটা তখন আর হাট করে খোলা নেই। হাসলাম হয়তো ছেলেটার বুদ্ধি হয়েছে। এগিয়ে আসতেই দেখলাম কেবিনে তালা লাগানো!
ডিফেন্সের দিন সকাল থেকে ক্যাম্পাসে ছিলাম।দুরুদুরু বুকে খুব কঠিন একটা দিন পার করলাম। কি যে ভালো লাগলো যখন চেয়ারম্যান স্যার বললেন,
” নোহা,
You have successfully defended your thesis. Now you have officially completed your degree.”
বহু কষ্টে শেষ হলো সে যাত্রা! কয়েকবছরের কঠোর অধ্যাবসায়! আমি ডেস্কে মাথা দিয়ে ঝরঝর করে কাঁদলাম। কাঁদতেই থাকলাম। পাশের জুনিয়ররা আমাকে স্বান্তনা দিলো। বুয়েটের সাথে আমার সকল দেনা পাওনা চুকলো।
চুপচাপ ছেড়ে দিলাম বুয়েট। সবকিছু গুছিয়ে নিয়ে, সিঁড়ি দিয়ে নেমে যেতে যেতে ফিরে ফিরে দেখলাম অতি চেনা ডিপার্টমেন্ট! করিডর! ঐ কাঠগোলাপ গাছটাকে! যাকে সবসময় দেখেছি দোতলা থেকে। আজ নিচে নেমে তার গায়ে হাত বুলালাম। ভালবাসার স্পর্শ। ও আমার মন ভালো করে দিতো। ভীষণ কষ্ট ভেঙে পড়া আমিকে কি বিশাল শক্তি দিতো। ও বার বার শুকিয়ে মর-মর হয়ে আবারও জন্মেছে নতুনভাবে, আমাকে শিখিয়েছে কিভাবে নতুন করে জন্ম নিতে হয়। আমি ওর প্রতি কৃতজ্ঞ! ওর কতগুলো ফুল পড়েছিলো নিচে। সেগুলোকে তুলে ব্যাগে নিলাম।
নিরবকে আর দেখা হলো না৷ সেদিন আমার খারাপ লাগেনি তবে ভাবছিলাম বিদায় বেলায় একবার দেখা হলে মন্দ হতো না। বোকা একটা ছেলে! এই শেষ, একবার! তারপর মনটাকে শাসালাম। যে ছিলো সোনার হরিণ তাকে ছুঁতে চাওয়া এতোটাও সহজ? মন থেকে মুছে ফেলো তাকে!
আমার সেদিন হাঁটতে ভীষণ ভালো লাগলো। হাঁটতে হাঁটতে আসলাম শহীদ মিনার। ঝিরিঝিরি বৃষ্টি শুরু হলো শহীদ মিনার পৌঁছাতেই।
ঢাবির এ এফ মুজিবুর রহমান গনিত ভবনের সামনে থেকে নিলাম এক থোকা বাগানবিলাস! তারপর দোয়েল চত্বরে পেরিয়ে হাইকোর্টের দিকে। ঝিরিঝিরি বৃষ্টিতে কি যে ভীষণ ভালো লাগছিলো।
আমি থমকে দাড়িয়ে গেলাম হাইকোর্টের পাশে ঠাঁয় দাড়িয়ে থাকা কদম গাছটার নিচে।
ঝিরিঝিরি বৃষ্টির ফোঁটা ভিজিয়ে দিচ্ছিলো সদ্য ফোঁটা কদম ফুলগুলোকে!বাতাসে দুলছিলো সে কদম গুলো। আমি সে কদম গাছের দিকে তাকিয়েই সেই ঝিরিঝিরি পানি মাখতে লাগলাম আমার চোখেমুখে। আমার জাগ্রত সত্তায়!
ও কেন আমার দিকে ওমন করে দেখতো? কেন? কেন এতোটা হৃদয় লাগালো? কেন?
আমি তাকে ভালোবাসিনি। তাকে ভালবাসা আমার পক্ষে সম্ভব ছিলো না। ঘর পোড়া গরু সিঁদুরে মেঘ দেখলে ডরায়!
আমি দীর্ঘশ্বাস ছাড়লাম! ঐ কদম গুচ্ছের দিকে তাকাতেই একটা তীব্র আর্তনাদ বেরিয়ে এলো কোথাও থেকে।
” একগুচ্ছ কদমের আফসোস আমার থেকে যাবে অন্তত কাল। ”
আমাকে ছাড়তে হবে এ দেশ। এই মাটি! এই মানুষ! তবুও আমি বলে যেতে চাই এদেশের মানুষ কতটা বেরহম দিল হয়েছিলো আমার প্রতি! কতটা জুলুম করেছিলো সেই ছোট্ট আমিটাকে! তোমার কোনদিনও কল্পনাও করতে পারবে না! কোনদিন না।
আমি তো ভুলতে পারিনা। কখনও পারি না।
আমি হাউমাউ করে কেঁদে দিলাম। আমার সাথে পাল্লা দিয়ে বৃষ্টি শুরু হলো তুমুল ভাবে। মেঘের গর্জনে কেঁপে উঠছিলো ধরনী৷ আমি চিৎকার করে কাঁদতে থাকলাম। কেন আমিই খোদা? আমার সাথেই কেন? আমার গর্ভেই মেরে ফেলা বাচ্চাটার কি দোষ ছিলো? আমি তার নাম ধরে চিৎকার করলাম,যেটা আমি নিজে রেখেছিলাম।
” আমার আকিফফফ
আকিফফ সোনাআআ। ”
আমি বসে পড়লাম সেই ফুটপাতে হাঁটু গেড়ে!
” আমার সোনা পাখি! কোথায় গেলে মাকে ছেড়ে?মাকে কেন নিলে না? ”
আমি আমার ছেলেকে শুধু একবার বুকে জড়িয়ে ধরতে চেয়েছিলাম! অথচ….!
কান্নার এক পর্যায়ে বৃষ্টির তীব্রতা বেড়ে গেল আরোও। কেউ একজন আমার উপর ছাতা ধরলো। আমি ঝাপসা চোখে তাকে একবার দেখলাম।
ভিজে পুড়ে একাকার হওয়া একজন রাজপুত্র দাঁড়িয়ে!
সে কেন দাঁড়িয়ে? তাকে তো আসতে বলিনি।
তবে কেন আসলো সে…?
কেন?
সে আমার জন্য নয়! অথবা আমি!
সব হিসাব মেলে না! মেলাতেও নেই!
উঠে হাঁটতে লাগলাম অবিন্যস্তভাবে এলোমেলো পায়ে। ভেজা বোরকা জড়িয়ে যাচ্ছিলো, তবুও যেদিকে দু’চোখ যায়!
কিন্তু তখনও একটা সুবিন্যস্ত হাত ছাতা ধরে থাকলো আমার মাথায়…
~সমাপ্ত~
