#কার্সড_লাভ
#লামিয়া_রহমান_মেঘলা
#পর্ব____
ভার্সিটির প্রফেসর হিসাবে নিজের প্রাক্তনকে দেখে খানিকক্ষণের জন্য থমকে দাঁড়িয়ে রইলো মাইরা।
খানিক্ষণের জন্য সে নিঃশ্বাস নিতে ভুলে গিয়েছিলো।
হৃৎস্পন্দনের গতি এত তীব্র হারে বৃদ্ধি পেয়েছে ।
হটাৎ হাতে কারোর চিমটি খেয়ে ধ্যান ফিরে মাইরার। সে হকচকিয়ে পাশে ফিরে চায়৷
তার বান্ধবী রুহি চাপা কন্ঠে বলে,
“কিরে হা করে কি দেখছিস? প্রফেসর কি কি বলল শুনলি?”
মাইরা মাথা নাড়ায় না বলে। সে নিজের কল্পনায় ব্যস্ত ছিলো যে। সামনে কি ঘটেছে সে দিকে তার কোন ধ্যান ছিলোনা।
এই পুরুষটা এতটা বদলে গেলো কিভাবে মাইয়া বুঝতে পারছে না। ৫ বছর আগে মোটা ফ্রেমের চমশা পরিহিত সেই পুরুষ মির্জা আরফান আলভির সাথে আজকের মির্জা আরফান আলভির আকাশ পাতাল তফাত।
জিম করা ওয়েল বিলড বডি, পরনে কালো সুট। হাতে ব্রান্ডের ঘড়ি। চুল গুলো বেশ লম্বা। চোয়াল তীক্ষ্ণ ব্লেডের চেয়ে ধারালো।
কথা বলার স্টাইলও বদলেছে।
কিছু বছরে মানুষের এতটা পরিবর্তন হতে পারেকি মাইরা বুঝতে পারেনা সেসব৷
৫ বছর আগে লোকটা তাকে পাগলের মত ভালোবাসত। কি না করত তার জন্য।
ডোবায় গিয়ে শাপলা তুলে আনা থেকে শুরু করে প্রখর গরমে কৃষ্ণচূড়া গাছে উঠে ফুলের ডাল পেড়ে আনা। সবই করত।
তবে এসব শুধু মাইরার জন্যই করত। অন্য কাউকে তেমন পাত্তা দিতো না।
মাইরার জন্য সে হাসত। যা অন্য কারোর জন্য করতো না৷
মাইরা যেন তার পৃথিবীর এক দিক ছিলো।
সভাবত ছেলেটা শান্ত মেজাজের ছিলো।
হাজার কষ্ট সইলেও কখনো শব্দ করার মত সে নয়।
অথচ যে দিন মাইরা তাকে সবার সামনে অপমান করে ব্রেকআপ করেছিলো সেদিন সে কেঁদে ছিলো।
ভীষণ কেঁদেছিলে। অপমান সইতে না পেরে মাঠ ভর্তি মানুষের সামনে মাইয়ার পায়ের কাছে বসে পড়েছিলো। আকুতিভরা কন্ঠে অনুনয় করেছিলো,
“মাইয়া প্লিজ, বন্ধ করো এসব। আমি আর শুনতে পারছি না। আমার কষ্ট হচ্ছে।”
সে সব দৃশ্য চোখের সামনো ভেসে আসতে মাইয়ার চোখ ভিজে ওঠে।
সেদিনের পর মাইরা এই মানুষটাকে নিজের চোখের সামনে কোন দিনও দেখেনি।
আজ এভাবে দেখা হবে মাইরা বুঝতেও পারেনি।
আলভি নিজের পরিচয় দিয়ে ক্লাস শুরু করে দিয়েছে।
আলভি একটা বার মাইরার দিকে তাকায় নি।
না মাইরাকে দেখে কোন রিয়াক্ট করেছে।
আলভি ফিজিক্সের প্রফেসর তাই সে ভীষণ স্ট্রিক্ট একজন মানুষ।
ক্লাসের সবাই সেটাই ধারণা করছে।
নতুন প্রফেসর আসলে হয়ত সবাইকে পরিচয় দিতে বলবে। ভালো মন্দ জিজ্ঞেস করবে।
কিন্তু আলভি সেসবের কিছুই করেনি। সোজা বই খুলে পড়ানো শুরু করে।
পড়াতে পড়াতে হটাৎ করেই আলভির সাদা বোর্ডে চলতে থাকা কালো মার্কারটা থেমে যায়।
ক্লাসে উপস্থিত সবাই তখন থেমে যায়৷
আলভি হটাৎ করেই পেছনে ফিরে তাকায়৷
ক্লাসের সবাই তার দিকেই তাকিয়ে আছে,
“লিসেন ক্লাস এটা আমার প্রথম ক্লাস তাই কোন স্ট্রিক্টনেস দেখাচ্ছি না। বাট কাল থেকে নিজেদের মনোযোগ শুধুমাত্র ব্লাকবোর্ড এবং বইয়ে না দিয়ে আমার উপর দিলে তার খবর আমি নিজে পড়ব।
এই যে পড়া বাদে যারা আমাকে পর্যবেক্ষণের করে যাচ্ছিস এদের এক একটাকে মুরগী বানিয়ে ক্যাম্পাসে রোদের মাঝে দাঁড় করাব।
আর হ্যাঁ আমার কাছে জেন্ডার ডাজেন্ট মেটার। তুই ছেলে হস বা মেয়ে আমার শাস্তি থেকে তোকে কেউ বাঁচাতে পারবে না৷
সো বি কেয়ারফুল। আমার কনসেনট্রেশান যতই পড়ায় থাকুক না কেন আমি তোদের প্রতিটা নিঃশ্বাসের খোঁজ রাখি৷”
আলভির গম্ভীর কণ্ঠে বলা প্রতিটি কথা ক্লাসরুমের ভেতর এমন এক পরিস্থিতি তৈরি করল, যেন মুহূর্তেই পুরো পরিবেশ ভারী হয়ে গেল। সবাই চুপ হয়ে গেল, চোখে মুখে এক ধরনের অজানা ভয় ছড়িয়ে পড়ল।
আলভি তখনো মাইরাকে লক্ষ করেনি।
কিন্তু মাইয়া তখন থেকেই তাকিয়ে আছে আলভির দিকে।
আলভি ফের বোর্ডের দিকে ফিরে নিজের বাকি কাজটুকু শেষ করে বলে,
“সি ইউ টুমরো।”
কথাটা বলে সামনে টেবিলে থাকা নিজের নোট এবং পেনটা তুলে বেরিয়ে যায় আলভি।
আলভি বেরিয়ে যেতে পুরো ক্লাস ওকে নিয়ে আলোচনায় শুরু করে।
এত স্টাইলিশ এবং অল্পবয়সী প্রফেসর তারা কখনো দেখেনি।
মেয়ে গুলো আলভির লুক, ওর আউটফিট নিয়ে আলোচনা শুরু করেছে।
সবার আলোচনার মাঝে নিষ্প্রাণ হয়ে বসে আছে মাইরা।
তার মুখে কোন কথা নেই।
তার পাশে বসে থাকা রুহি ফের মাইরাকে ধাক্কায়।
মাইরা ফিরে চায় রুহির দিকে।
“কিরে কি হয়েছে?”
“ক কিছুনা।”
“পরের ক্লাসে যাবি না? ‘
” না আমি একটু আসছি।”
“কোথায় যাচ্ছিস? চল আমিও যাই৷”
“না না থাক তুই ক্লাসে যা৷”
মাইরা নিজের ব্যাগ নিয়ে ক্লাসরুম থেকে বেরিয়ে যায়।
সে প্রথম দৌড়ে প্রফেসরদের রুমের দিকে যায়।
সেখানেই প্রবেশ করার পর তার ডিপার্টমেন্টের অন্য সব প্রফেসররা তাকে দেখে ভ্রু কুঁচকে তাকায়।
মাইরা চারদিকে চোখ বুলায় আলভি নেই সেখানে।
প্রফেসর আরিফুল ইসলাম মাইরাকে দেখে জিজ্ঞেস করেন,
“কিছু লাগবে মাইরা?”
মাইরা আরিফুল ইসলামের দিকে তাকায়,
“জ জি সরি স্যার না পারমিশন নিয়ে চলে এলাম। আসলে ভুল করে চলে এসেছি৷”
আরিফুল ইসলাম অবাক হলেন মাইরার উত্তর শুনে তবে তিনি কিছু মনে করলেন না৷
মাইরা দ্রুত পায়ে বেরিয়ে গেলো।
৩ তলার উপরে ছিলো সে।
সেখান থেকে নিচে তাকাতে দেখলে পেলো আলভি বেরিয়ে যাচ্ছে ভার্সিটি থেকে৷
মাইরা দ্রুত ছুটে চললো সেদিকে।
এত দ্রুত দৌড়াচ্ছে মেয়েটা আশেপাশের কিছুই লক্ষ করছে না৷
দৌড়াতে দৌড়াতে সে যখন আলভির সামনে চলে আসে দেখতে পায় আলভি একটা গাড়ি থেকে কিছি দুরত্বে দাঁড়িয়ে।
হয়ত সে গাড়িটায় উঠে বসবে।
মাইরা হাত উঠিয়ে আলভিকে ডাকে।
“আলভি।’
আলভি দাঁড়িয়ে যায় সেখানে।
মাইরা যখন ওর দিকে এগিয়ে আসবে তখনি পায়ের নিচে কিছু একটা পড়ায় মাইরা হুমড়ি খেয়ে পড়ে রাস্তায়৷
সেই সময় আশেপাশে তেমন কেউ ছিলোনা৷
মাইরা ভাবে হয়ত আলভি তাকে সাহায্যে করবে। কিন্তু তাকে অবাক করে দিয়ে আলভি নিজের পকেটে হাত গুঁজে তার দিকে তাকিয়ে ছিলো নীরবে।
মাইরা মাথা তুলে তাকায়। হাত কেটেছে তার। সাথে পিজের উপর পড়ায় হাটুও।
সাদা ড্রেস ছিলো তার পরনে রক্ত স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে।
মাইরা ছলছল দৃষ্টিতে সামনের দিকে তাকায়৷
আলভির প্রতিক্রিয়া দেখার জন্য।
আলভি পকেট থেকে গাড়ির চাবি বের করে গাড়ি অনলক করে গাড়িতে উঠে বসে পড়ে।
এক মুহুর্ত দেরি না করে সে চলে যায় সে স্থান থেকে।
মাইরা অবাক পানে তাকিয়ে রয় সেদিকে।
বুকের ভেতর হাহাকার করে ওঠে।
ব্যাগ থেকে সব কিছুই মাটিতে পড়ে গিয়েছে তার।
মাইরা কাঁদো চোখে সব জিনিস উঠিয়ে নেয় ব্যাগে।
এরপর একটা রিক্সা ডেকে উঠে বসে রিক্সায়।
——–
গাড়িতে বসে আলভি স্মোক করছে।
এক হাতে সিগারেট আর অন্য হাতে গাড়ির স্টেয়ারিং কন্ট্রোল করছে।
তার চোখে এই মুহুর্তে ভয়ঙ্কর ক্রোধ ভেসে উঠেছে।
খুব দ্রুতই ড্রাইভ করছে সে।
কিছুক্ষণ পর সে হুট করেই গাড়ি থামিয়ে দেয় একটা রাস্তার পাশে।
রাস্তার পাশে বিরাট এক কৃষ্ণচূড়া গাছ৷
গাছ ভর্তি লাল লাল ফুলে ভরে উঠেছে।
সবুজের কোন অংশ দেখা যাচ্ছে না গাছে।
হাতের সিগারেট খানা শেষ হতে সে গাড়ির গ্লাস নামিয়ে সেটা গাছের দিকে ছুঁড়ে মারে।
এরপর সে আবারো গাড়ি স্টার্ট করে।
শুঁকনো আবহাওয়া চারিদিকে রোদ চকচক করছে।
গাছের নিচে কিছু পাতার স্তুপে গিয়ে পড়েছিলো আগুন লাগা সিগারেট খানা।
এরপর সেই পাতার স্তুপ ধিরে ধিরে আগুনে পরিণত হয়।
বেশ কিছুক্ষণের মাথায় সমস্ত ফুলে ফুলে ভরে ওঠা গাছটা এক বিরাট আগুনের গোলায় পরিণত হয়।
জ্বলন্ত গাছটা যেন প্রকাশ করছে আলভির ভেতরে জমে থাকা ভয়ঙ্কর ক্রোধ এবং ধ্বংস।
———-
রিক্সা নিয়ে কোন মতে বাড়িতে ফেরে মায়রা৷
বাড়িতে ফিরে কারোর সাথে কথা না বলে সোজা নিজের রুমে চলে যায় সে।
মায়রার আম্মা শান্তা পার্ভিন মেয়েকে পেছন থেকে ডাকলে, মাইরা জাবাব দেয়,
“আমি ভীষণ টায়ার্ড মা আমি একটু ঘুমাতে চাই। ডিসটার্ব করোনা৷’
শান্তা পার্ভিন মেয়েকে আর কিছু বললেন না। ভাবলেন হয়ত সত্যি ক্লান্ত সে।
মাইরা রুমে গিয়ে দরজা বন্ধ করে দেয়।
দরজায় হেলান দিয়েই মেঝেতে বসে পড়ে সে।
হাত এবং হাটুর রক্ত ঝরা তখনো বন্ধ হয়নি।
ভেতরটা কেমন ফাঁকা ফাঁকা লাগছে তার৷
আলভি একটা বার ফিরে চায়নি তার দিকে।
তার হাঁটুর রক্ত দেখেও কোন প্রকার প্রতিক্রিয়া জানায় নি।
অথচ এই মানুষটা মাইরার শরীরে সামান্য ফুলের টোকা পর্যন্ত সহ্য করতো না।
মাইরা জানেনা তার কেন এত ভয়ঙ্কর বিষাদ লাগছে সব কিছু৷
শুধুমাত্র সে এতটুকু জানে এই বিষাদময় বিষ সে নিজেই পান করেছে।
চলবে?
