#কার্সড_লাভ
#লামিয়া_রহমান_মেঘলা
#পর্ব____০৩
[🚫কপি করা সম্পূর্ণ নিষেধ ]
সেদিনের পর বহু দিন পেরিয়ে গেছে। সময় তার নিজস্ব নিয়মে এগিয়ে চলেছে বটে, কিন্তু মাইরার জীবন যেন কোথাও এসে থমকে আছে। সে আর আগের মতো হাসে না। ঠোঁটের কোণে যে হাসি একদিন অনায়াসে ফুটে উঠত, আজ সেখানে জমে থাকে নীরবতা। কারণ, আলভি ফিরে আসার পর থেকে প্রতিটি মুহূর্তে, প্রতিটি কথায়, প্রতিটি আচরণে তাকে বুঝিয়ে দিয়েছে, তার অপরাধ কত গভীর, তার ভুল কত অমার্জনীয়।
সেই রাতেও ডিনার টেবিলে নিস্তব্ধ হয়ে বসেছিল মাইরা। সামনে সাজানো প্লেটে ধোঁয়া ওঠা ভাত, নানা পদ, সবই ছিল, শুধু ছিল না তার খাওয়ার ইচ্ছে। অন্যমনস্ক আঙুলে সে ভাতের দানাগুলো নাড়ছিল, যেন সেগুলোর ভেতরেই কোনো উত্তর খুঁজে পাবে।
আজ আলভি সবার সামনে তাকে এমনভাবে অপমান করেছে, যার ভার এখনো বুকের ভেতর পাথরের মতো চেপে আছে। অথচ সেখানে তার কোনো দোষই ছিল না। তবু অপমানের দায়ও যেন তাকেই নিতে হয়েছে।
মাইরা যখন এইসব ভাবনায় ডুবে আছে, ঠিক তখনই হঠাৎ কর্কশ অথচ স্থির কণ্ঠে তার বাবা বলে উঠলেন,
“মাইরা, আগামীকাল তোমার আর সিডের এনগেজমেন্ট ঠিক করেছি আমি। কাল কলেজে যাওয়ার দরকার নেই। সামনে শুক্রবার তোমাদের বিয়ে।”
কথাগুলো যেন বজ্রপাতের মতো এসে আঘাত করল তাকে। মাইরার হাত থেমে গেল। সে ধীরে ধীরে মুখ তুলে বাবার দিকে তাকাল। বিস্ময়, আতঙ্ক আর অবিশ্বাসে তার চোখ কেঁপে উঠল।
“বা… বাবা”
সালাউদ্দীন ফিরোজ মেয়ের দিকে তাকালেন। সেই দৃষ্টিতে কোমলতার লেশমাত্র ছিল না। মাইরার চোখ বেয়ে নিঃশব্দে জল গড়িয়ে পড়ল, মিশে গেল তার প্লেটের খাবারে।
কঠিন, শীতল কণ্ঠে তিনি বললেন,
“ডোন্ট টেল মি তুমি এখনো ওই আলভির থেকে মুভ অন করতে পারোনি। এসব কথা আমাকে বলবে না, মাইরা। তুমি সিডকেই বিয়ে করছো।”
মাইরা কাঁপা গলায় বলতে চাইল,
“বাবা, আমার কথাটা”
কিন্তু তার কথা শেষ হওয়ার আগেই আবারও বজ্রের মতো গর্জে উঠলেন সালাউদ্দীন ফিরোজ,
“জাস্ট একটাও কথা বলবে না তুমি। ওই ছোটলোক আলভিটাকে যদি আজও ভুলতে না পারো, তবে এক বোতল বিষ কিনে দেব, সেটা খেয়ে নিও।”
কথাগুলো ছুড়ে দিয়ে তিনি হনহন করে নিজের ঘরের দিকে চলে গেলেন।
মাইরা স্তব্ধ হয়ে তাকিয়ে রইল বাবার চলে যাওয়ার পথে। তার চোখে জল, ঠোঁটে শব্দহীন আর্তি, আর বুকের ভেতর ধসে পড়া এক পৃথিবী।
রান্নাঘর থেকে সবই শুনেছিলেন শান্তা পারভীন। মেয়ের জন্য বুকের গভীরে ব্যথা কাঁটার মতো বিঁধলেও তিনি সামনে এগিয়ে এলেন না। কিছু কিছু মায়ের কষ্টও নীরব থাকে, অশ্রুহীন, শব্দহীন, অথচ অসীম গভীর।
———–
রুমের দরজা ভেতর থেকে বন্ধ করে মেঝেতে হাঁটু গেড়ে বসে আছে মাইরা। দু’হাঁটুর ফাঁকে মুখ গুঁজে রেখেছে সে, যেন এভাবেই নিজেকে পৃথিবীর সব দৃষ্টি থেকে আড়াল করা যায়। বুকের ভেতর জমে থাকা কান্না শব্দ হয়ে বেরোতে পারছে না, শুধু নিঃশ্বাসগুলো ভারী হয়ে উঠছে।
আজ তার বাবা আবারও সেই একই কাজ করলেন, যে কাজ একদিন তার কিশোরী জীবনটাকে ভিতর থেকে ভেঙে দিয়েছিল।
তখন মাইরা সদ্য ক্লাস এইটে উঠেছে। কৈশোরের দোরগোড়ায় দাঁড়ানো এক কিশোরী, যার চোখজুড়ে ছিলো হাজার রঙিন স্বপ্ন, মনে অগণিত চাওয়া-পাওয়া। তাদের স্কুলটি ছিল স্কুল অ্যান্ড কলেজ, একই প্রাঙ্গণে ছোটদের হাসি, বড়দের ব্যস্ততা, আর কিশোর হৃদয়ের গোপন গল্পেরা পাশাপাশি বাস করত।
সেই কলেজের সবচেয়ে সিনিয়র ব্যাচে, ইন্টার সেকেন্ড ইয়ারে পড়ত আলভি।
আলভিকে ভীষণ পছন্দ ছিল মাইরার। সেই বয়সের সরল মুগ্ধতা, লুকিয়ে তাকানো, দূর থেকে দেখলেই বুকের ধকধক বেড়ে যাওয়া, সবকিছুর কেন্দ্র ছিল ছেলেটি।
আলভি ছিল মেধাবী, ক্লাস টপার। কিন্তু ভাগ্য তার প্রতি উদার ছিল না। তাদের সংসারে ছিল না ধনসম্পদ, ছিল না স্বাচ্ছন্দ্য। ছোটবেলাতেই মাকে হারিয়েছে সে। বাবা জাবেদ মির্জা দিনমজুর মানুষ, দিন এনে দিন খাওয়া জীবন। নুন আনতে পান্তা ফুরিয়ে যেত প্রায়ই। তবু ছেলের পড়াশোনার জন্য তিনি নিজের সর্বস্ব উজাড় করে দিতেন।
আলভিও তাই পড়াশোনার প্রতি ছিল কঠোর মনোযোগী। প্রেম-ভালোবাসার দিকে তার কোনোদিন নজরই ছিল না।
কিন্তু মাইরা ছিল অন্যরকম। সে যেন আলভির ছায়াসঙ্গী হয়ে গিয়েছিল। কখনো দামি চকলেট, কখনো সুন্দর কলম, কখনো পেনসিল, ছোট্ট ছোট্ট উপহারে সে নিজের ভালো লাগা জানাতে চাইত।
শেষমেশ একদিন বিরক্ত হয়ে সবার সামনে মাইরাকে চড় মেরেছিল আলভি।
সেদিনের অপমান আর আঘাতে ছোট্ট মেয়েটার মন ভেঙে গিয়েছিল। সে দূরে সরে যায়, আলভির পথ এড়িয়ে চলতে শুরু করে।
আর তখনই আলভি প্রথমবার অনুভব করে, মাইরার অনুপস্থিতি কতখানি শূন্যতা এনে দেয়।
তাই সে সিদ্ধান্ত নেয়, মেয়েটিকে আবার নিজের কাছে ফিরিয়ে নেবে।
মাইরার প্রিয় জায়গা ছিল স্কুলের পেছনের কৃষ্ণচূড়া গাছের নিচে। লাল ফুল ঝরা সেই ছায়াঘেরা স্থানে বসলে তার মনখারাপ কেটে যেত। সেদিনও সে পা ঝুলিয়ে বসে ছিল, আনমনে আলভির কথাই ভাবছিল।
হঠাৎ কেউ এসে তার পাশে বসে।
ফিরে তাকিয়ে দেখে, আলভি।
মাইরা ভ্রু কুঁচকে উঠে যেতে চাইলে আলভি আলতো করে তার হাত ধরে বসিয়ে দেয়। তারপর পকেট থেকে একটি চকলেট বের করে তার হাতে দিয়ে মিষ্টি হেসে বলে,
“সরি, মাইরা।”
মাইরা ঠোঁট ফুলিয়ে জিজ্ঞেস করেছিল,
“কিসের সরি?”
আলভি নিজের দু’কানে হাত দিয়ে হেসে বলেছিল,
“বি মাই কিউটি, প্লিজ।”
মুহূর্তেই মাইরার চোখ দু’টো জ্বলে উঠেছিল আনন্দে। এ কথাটাই তো সে সবসময় শুনতে চাইত। কতবার বলেছে, যেদিন তাকে মেনে নেবে, সেদিন যেন এই কথাটাই বলে।
আলভি জানত, মাইরা এখনো ছোট। তবু সেই নিষ্পাপ মায়া, সেই কিউটনেস থেকে নিজেকে সরিয়ে রাখতে পারেনি সে।
এরপর কেটে যায় আরও একটি বছর।
মাইরা ক্লাস নাইনে থেকে টেনে উঠেছে, আর আলভি তখন বিশ্ববিদ্যালয়ের দ্বিতীয় বর্ষে। তাদের সম্পর্ককে কেউ নাম দিতে পারত না, তবু আলভি তাকে আগলে রাখত ভীষণভাবে।
এক রাতে মাইরা জেদ করে আলভিকে তাদের বাড়ির পেছনের গেটে আসতে বলে। প্রথমে না করলেও, মেয়েটার আবদার শেষমেশ ফিরিয়ে দিতে পারেনি আলভি। হাতে একটি কোন আইসক্রিম নিয়ে সে গিয়ে দাঁড়ায় পেছনের গেটে।
মাইরাও সুযোগ বুঝে সেখানে যায়।
কিন্তু সেদিনই ঘটে বিপর্যয়।
হঠাৎ সালাউদ্দীন ফিরোজ কয়েকজন লোক নিয়ে সেখানে হাজির হন। আলভিকে ধরে অভিযোগ তোলেন, সে রাতে এসে মাইরাকে বিরক্ত করছে।
তারপর মাইরাকে ভয় দেখান, যদি সে কাউকে সত্যি কথা বলে, তবে আলভিকে মেরে ফেলা হবে।
ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে সেদিন মাইরা মিথ্যে স্বীকারোক্তি দেয়, আলভিই তাকে বিরক্ত করতে এসেছে।
সেই অপমানের পর আলভির বাবা-ছেলেকে গ্রামছাড়া করা হয়।
সবই ছিল সালাউদ্দীন ফিরোজের পরিকল্পনা। তিনি চেয়েছিলেন মেয়ের বিয়ে দেবেন তার ব্যবসায়িক অংশীদার আজিজ খানের ছেলে সিডের সঙ্গে।
সেদিন থেকে আজ পর্যন্ত মাইরা প্রতিদিন একটু একটু করে মরেছে।
আলভিকে সে পায়নি, শুধু হারিয়েছে।
আর আজ, যখন ভাগ্য তাকে আবার ফিরিয়ে দিয়েছে, তখনও সে শান্তি পেল না।
তার বুকের ভেতর অসহ্য যন্ত্রণা পাক খাচ্ছে।
আলভি আবারও তাকে ভুল বুঝবে, এ ভয় তাকে পুড়িয়ে মারছে।
কিন্তু মাইরার ভেতরে এত বছর ধরে জমে থাকা এই রক্তক্ষরণ, এই নীরব মৃত্যুর কষ্ট, সেটা কি আলভি কোনোদিন বুঝবে?
———
পরদিন মাইরার এনগেজমেন্ট হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু সিড স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছিল, এসব আনুষ্ঠানিকতায় তার কোনো আগ্রহ নেই, সে একেবারে বিয়েটাই করবে। তাই তড়িঘড়ি করে শুক্রবার দিনটিই নির্ধারণ করা হলো। মাঝখানে ছিল মাত্র দু’টি দিন।
এই পুরো তিন দিন মাইরা বিশ্ববিদ্যালয়ে যায়নি। সালাউদ্দীন ফিরোজ নিজেই চাননি সে বাইরে যাক, বিশেষত যেদিন থেকে তিনি জেনেছেন, মাইরার বিশ্ববিদ্যালয়ে নতুন প্রফেসর হয়ে এসেছে আলভি।
মাইরাও নিজেকে গুটিয়ে নিয়েছিল নিজের ঘরের চার দেয়ালের ভেতর। দরজা বন্ধ করে, আলো নেভিয়ে, নিজেকেই নিজের শাস্তি দিচ্ছিল সে। এই দুঃখ একান্তই তার, এমনটাই ভাবছিল। যদি সে জেদ না করত, তবে আলভি হয়তো তার জীবনে আসত না। আর না এলে হয়তো ছেলেটিকে সেই অপমান, সেই নির্বাসনও সহ্য করতে হতো না।
তার বাবা তার সঙ্গে যা খুশি করুক, আলভি তো অন্তত ভালো আছে। এই ভ্রান্ত সান্ত্বনাটুকু বুকে নিয়েই মাইরা নিজেকে বিয়ের জন্য প্রস্তুত করল।
আজ শুক্রবার।
সকাল থেকেই বাড়ির ভেতর বিয়ের প্রস্তুতির ব্যস্ততা। সিড জানিয়েছে, অল্প কিছু বরযাত্রী নিয়েই আসবে।
আর মাইরা?
সে যেন তিন দিনের না-ঘুমানো, না-খাওয়া এক ছায়ামূর্তি। চোখের নিচে কালি, ঠোঁটে রক্তহীনতা, মুখে জমাট বিষাদ। গত তিন দিনে সে ঠিকমতো ঘুমোয়নি, একমুঠো খাবারও খায়নি। সবকিছুই তার কাছে এখন বিষের মতো তেতো লাগে।
তাকে বিয়ের সাজে সাজানো হলো। গায়ে লাল শাড়ি, হাতে অলংকার, কপালে টিপ। মাথায় লাল ওড়না তুলে দেওয়া মাত্রই তার চোখ বেয়ে নিঃশব্দে দু’ফোঁটা জল গড়িয়ে পড়ল।
মাইরা জানে, তার জীবনের প্রথম এবং শেষ ভালোবাসা হয়তো আলভিই হয়ে থাকবে।
ক্লাস নাইনের সেই কিশোরী মাইরা আজও ভুলতে পারেনি আলভিকে। তাই হয়তো আর কোনোদিন নতুন করে কাউকে ভালোবাসাও সম্ভব হবে না।
এমন ভাবনাতেই সময় কেটে গেল।
বরযাত্রীরা এসে গেছে। শান্তা পারভীন মেয়েকে ধরে বাইরে নিয়ে এলেন।
মাইরাকে গিয়ে বসানো হলো সিডের পাশে।
সিডকে দেখে সহজেই বোঝা যাচ্ছিল—সে নেশাগ্রস্ত। মাতাল অবস্থাতেই এসেছে নিজের বিয়েতে। তার শরীর থেকে তীব্র মদের গন্ধ ছড়িয়ে পড়ছে চারদিকে।
মাইরা চোখ বন্ধ করে নিল।
কাজি বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা শুরু করলেন। প্রথমে সিডকে কবুল বলতে বলা হলো। সে ঢুলতে ঢুলতে প্রায় পড়ে যাচ্ছিল, তবু অস্পষ্ট কণ্ঠে কবুল বলে দিল।
এরপর এলো মাইরার পালা।
কাজি তাকে কবুল বলতে বললে মাইরা কিছুক্ষণ নীরব রইল।
শান্তা পারভীন এগিয়ে এলেন। মেয়ের কানে কাঁপা গলায় বললেন,
“মা রে, কবুল বল।”
মাইরা মৃদু স্বরে বলল,
“ছেলেটা একটা নেশাখোর”
আর কিছু বলার আগেই বাবার রক্তচক্ষুর দিকে চোখ পড়ল তার। সে মাথা নিচু করে নিল।
ঠিক যখন সে প্রথমবার ‘কবুল’ উচ্চারণ করতে যাবে,
সেই মুহূর্তে ঝড়ের মতো কেউ এসে তার হাত ধরে টেনে দাঁড় করাল।
মাইরা কিছু বুঝে ওঠার আগেই তার গালে সজোরে এক চড় পড়ল।
ছলছল চোখে সামনে তাকিয়ে সে দেখল,আলভি।
রাগে তার সমগ্র শরীর কাঁপছে। চোখে জ্বলছে দাউদাউ আগুন। সে এগিয়ে এসে মাইরার চুলের মুঠি ধরে নিজের দিকে ফিরিয়ে হিসহিসিয়ে বলল,
“তুই ভাবলি কী করে? আমি বেঁচে থাকতে অন্য কাউকে কবুল বলে স্বীকার করবি?”
মাইরা নিস্তব্ধ।
এই মুহূর্তে আলভির দেওয়া আঘাতও তার গায়ে লাগছে না। বরং বুকের ভেতর অদ্ভুত এক আনন্দ জন্ম নিচ্ছে, কারণ, তার সামনে দাঁড়িয়ে আছে আলভি।
পরের মুহূর্তেই উপস্থিত সবার সামনে আলভি তাকে জোর করে চুমু খেলো। আলভির দাঁত যেন মাইরার কোমল ঠোঁটটাকে ক্ষতবিক্ষত বানিয়ে দিলো।
তখনো মাইরা কিছু বললো না। চুপচাপ আলভিকে করতে দিলো সেটা যা আলভি করতে চায়৷
সালাউদ্দীন ফিরোজ তেড়ে আসতে গেলে আলভি বিদ্যুৎগতিতে কোমর থেকে ছোট বন্দুক বের করে সিডের বাম পায়ে গুলি ছুড়ে দিল।
সিড চিৎকার করে মাটিতে লুটিয়ে পড়ল।
আলভির হাতে অস্ত্র দেখে উপস্থিত সবাই ভয়ে কয়েক কদম পিছিয়ে গেল।
আলভি মাইরার হাত শক্ত করে ধরে বলল,
“চল। তোকে বিয়ে করাচ্ছি আমি।”
তারপর সালাউদ্দীন ফিরোজের দিকে তাকিয়ে তীব্র স্বরে উচ্চারণ করল,
“আর জনাব সালাউদ্দীন মির্জা, আপনার সুখের দিনের উল্টো গণনা শুরু করুন। মির্জা গ্রুপসের নতুন সিইও আমি, মির্জা আরফান আলভি। ওই সিড না।”
কথাগুলো শুনে সালাউদ্দীন ফিরোজ নিজের জায়গাতেই জমে গেলেন।
চোখের সামনে দিয়ে আলভি মাইরাকে টেনে নিয়ে গেল।
আর তিনি, একটি শব্দও উচ্চারণ করতে পারলেন না।
———–
মাইরাকে নিয়ে আলভি সোজা নিয়ে ভিলাতে আসে।
মাইরা আলভির ভিলা দেখে অবাক হয়। সেই আলভির আজ কত পরিবর্তন হয়েছে।
আলভি, মাইরাকে নিয়ে সোজা নিজের রুমে চলে যায়৷
মাইরাকে ধাক্কা মেরে বিছনায় ফেলে।
মাইরা তাকিয়ে রয় আলভির দিকে। ওর দু চোখে অদ্ভুত প্রশান্তি।
আলভি ঝুকে মাইরার ঠোঁটে লেগে থাকা লাল লিপস্টিক লেপ্টে দেয়,
“তুই কেন অন্য কারোর জন্য লিপস্টিক দিবি হ্যাঁ? কেন দিবি? তুই না আমার৷”
কথা গুলো বলে আলভি, মাইারার ওষ্ঠদ্বয় আঁকড়ে ধরে। মাইরা বিছনার চাদর খামচে ধরে।
আলভি হিংস্র হয়ে চুমু খাচ্ছে।
আর বলছে,
“কেন অন্য কারোর জন্য বউ সাজবি। তুইত আমার মাইরা আমার৷”
আলভি, একে একে মাইরার সব সাজ সরিয়ে দেয়।
মাইরা চোখ বন্ধ করে নেয়। আলভির সামনে সে এখন সম্পূর্ণ উন্মুক্ত।
আলভি এক টানে নিজের সার্টও খুলে ফেলে।
মাইরা চোখ বন্ধ করে নেয়।
আলভি হুস হারিয়েছে।
সে মাইরার ঘাড়ে চুমু খেতে শুরু করে।
মাইরাও বাঁধা দেয়না। উল্টে সে আলভিকে জড়িয়ে ধরে ওর চুলে হাত বুলিয়ে দেয়।
এই লায় টুকুন পেয়ে আলভি নিজের বাকি জ্ঞান টুকুন হারায়।
সম্পূর্ণ বিকালটা ছিলো মাইরার জন্য ভয়ানক।
আলভিকে সহ্য করতে না পেরে সে এক পর্যায়ে জ্ঞান হারায়।
আলভি, মাইরাকে বুকে নিয়েই ঘুমিয়ে যায়।
রাত ২ টার দিকে আলভির ঘুম ভাঙে।
তার বুকের উপরে মাইরা ঘুমিয়ে।
আলভি মাইরার দিকে তাকিয়ে ভাবে। মাইরা একটুও বলদায় নি। ঠিক সেই আগের মতই আছে বাচ্চা।
আলভি, মাইরার চুলে বিলি দিতে থাকে।
এমন সময় মাইরাও চোখ মেলে তাকায়। আলভিকে এত কাছে দেখে মাইরার চোখ দুটো ছলছল হয়ে ওঠে।
আলভি মাইরাকে কাঁদতে দেখে মাইরার চোখে চুমু খায়।
“আমি কি বেশি কষ্ট দিয়ে ফেলেছি?”
“না৷”
“তবে?’
” আপনাকে আমি অনেক কষ্ট দিয়েছি।”
বলেই মাইরা শব্দ করে কেঁদে ফেলে। আলভি মাইরাকে বুকের সাথে মিশিয়ে নেয়।
“সুস কোন কষ্ট দাওনি। আমি সবটা জেনে গিয়েছি। উল্টে আমায় ক্ষমা করো তোমাকে থাপ্পড় মেরেছি সবার সামনে তার জন্য।”
মাইরা আলভিকে জড়িয়ে ধরে। আলভি ওর কপালে চুমু খেয়ে বলে,
“বিয়ে করব কাল আমরা।”
মাইরা, তাকায় আলভির দিকে।
“তোমার বাবাকে ভুলে যাও মাইরা। যে লোকটা টাকার জন্য তোমায় একটা নেশাখোড় ছেলের সাথে বিয়ে দিয়ে দিতে পারে তার জন্য আমার আর কিছুই বলার নেই। ”
মাইরা, আলভিকে জড়িয়ে রাখে। আলভির কথায় সে রাজি।
——–
কেটে গেছে ৫ বছর।
আলভি মাইরার সংসারে এখন ২ সন্তান৷ এজটা মেয়ে ২ বছরের আর একটা ছেলে ৪ বছরের। মাইরা আর নিজের মা বাবার সাথে দেখা করেনি। কারণ আলভি তাকে যে ভালোবাসা দিয়েছে তাতে করে ওদের মনেই পড়েনি। আর বাবার সেই আচরণ আজও মাইরার মনে দাগ ফেলে।
আপাততঃ তারা সমুদ্রে ঘুরতে এসেছে আলভি তাদের নিয়ে একটা প্রাইভেট রিসর্টে উঠেছে।
মাইরা বাচ্চা দুটোকে নিয়ে বিচের কোণায় খেলছে।
আলভি পেছন থেকে হেটে আসে পরিবারের সামনে।
“কি হচ্ছে এখানে?”
মাইরা মিষ্টি হাসে,
” আপনার ছেলে মেয়ে বালির প্রাসাদ বানাচ্ছে। ”
আলভি গিয়ে ওদের পাশে বসে।
জিছান ওদের ছেলে এবং রোশনাই ওদের মেয়ে।
দু ভাই বোন প্রাসাদ বানিয়ে বাবা মায়ের দিকে এগিয়ে গিয়ে বলে,
“এটা আমাদের প্রশাদ আমাদের, বোন আমি আর মম ড্যাড৷”
আলভি এবং মাইরা, জিছানের কথা শুনে হেসে দেয়।
আলভি ওদের সুন্দর একটা ছবি তুলে নেয়।
মাইরার সাথে তার প্রতিটি দিনই সুন্দর এবং স্বচ্ছ।
সমাপ্ত।
