#দ্বিতীয়_বউ
#পর্ব_১
Alviya Samrin Raya – আলভিয়া সামরিন রায়া
“আজকাল মনে হয় আমার হাসবেন্ড আমাকে বাজে ভাবে দেখে…”
এই কথাটা আয়েশা নিজের বুকের ভেতর চেপে রাখে প্রতিদিন। কারও সাথে শেয়ার করে না, কারও কাছে বলে না। পাঁচ বছর হলো তার বিয়ে হয়েছে, অথচ এই পাঁচ বছরে সে কখনোই স্বামীর চোখে নিজের জন্য কোনো ভালোবাসার ছাপ খুঁজে পায়নি।
স্বামীর নাম রায়হান। বয়স তেএিশ পেরিয়েছে , সুঠাম দেহ, সাদা ফর্সা রঙ, আর দৃষ্টি সবসময় গম্ভীর। রায়হানের প্রথম বিয়ে হয়েছিলো তার কলেজ জীবনের প্রেমিকার সাথে। সেই সংসার থেকে তার একমাত্র কন্যা সন্তান—“রোহিনী”। মিষ্টি নাম, কিন্তু মেয়েটির আসল নাম তাসনিম। বয়স ছয় বছর।
আয়েশা যখন রায়হানের ঘরে আসে, তখন বাবু অনেক ছোট্ট। বাচ্চাটা তখনো মায়ের জন্য কাঁদে। কিন্তু ভাগ্যের নির্মমতায় সে মাকে পায় না। রায়হানের প্রথম স্ত্রী স্বেচ্ছায় সংসার ভেঙে দিয়ে চলে যায়। বিদেশে পাড়ি জমায় আর কোনোদিন ফিরেও তাকায়নি সন্তানের দিকে।
কিন্তু রায়হান কখনোই নতুন বিয়ের জন্য প্রস্তুত ছিলেন না।
অন্যদিকে আয়েশার পরিবারও তাকে খুব বেশি বুঝতে দেয়নি। সে তখন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করছিলো, নিজের স্বপ্ন ছিলো চাকরি করবে, নিজের মতো করে বাঁচবে। কিন্তু বাবার একরোখা সিদ্ধান্তে তাকে তুলে দেওয়া হলো রায়হানের হাতে।
বিয়ের দিন আয়েশা কাঁদছিলো, কিন্তু তার অশ্রু দেখেও যেন কারও মন নরম হয়নি। শুধু একটা কথাই সবাই বলেছিলো—
“রায়হান ভালো মানুষ। তোর সাথে বিয়ে হলে মেয়েটা মা পাবে।সংসারটাও আবার গুছিয়ে যাবে।”
কিন্তু সত্যিই কি সংসারটা গুছালো?
আয়েশার ভেতরে সবসময় একটা শূন্যতা রয়ে গেছে। রায়হান কখনো তার সাথে খারাপ ব্যবহার করেনি, কিন্তু ভালো ব্যবহারও করেনি। যেন একদম নির্লিপ্ত—
না ভালোবাসে, না ঘৃণা করে।
তবু আয়েশা ভেবেছিলো সময়ের সাথে হয়তো সব বদলে যাবে। অন্তত রোহীনির জন্য হলেও তাকে একটু সম্মান, একটু ভালোবাসা দেবে রায়হান।
কিন্তু আজ পাঁচ বছর হয়ে গেছে। বাবু এখন স্কুলে পড়ে, খুব মিষ্টি মেয়ে। রোহীনির সাথে আয়েশার সম্পর্কটা আস্তে আস্তে গভীর হয়ে গেছে। রোহীনি তাকে মা বলে ডাকে, আঁকড়ে ধরে, কোলের মধ্যে ঘুমায়। কিন্তু রোহিনীর বাবার কাছে আয়েশা যেন শুধু “একটা দায়িত্ব”।
রাতগুলোতে আয়েশা প্রায়ই মনে মনে ভাবে—
“এই ঘরে আমি আসলে কে? স্ত্রী? না শুধু একটা ছায়া, যে ঘরের কাজ করে, বাচ্চাকে সামলায়, সমাজের চোখে একটা ‘মা’ হয়ে বেঁচে থাকে?”
রায়হান আর আয়েশার এখনো কোনো সন্তান হয় নি। হয়নি বলতে রায়হান নিতেই চায়নি। আয়েশা অনেক ইচ্ছা ছিল কেউ একজন আসলে রোহীনির সাথে খেলার সাথী হবে। কিন্তু এই কথাটা কোনদিন ও রায়হানকে বলা হয়নি। কখনো কখনো আয়েশা চুপিচুপি আয়নায় দাঁড়িয়ে নিজের দিকে তাকায়। ফর্সা গায়ের রঙ, লম্বা কালো চুল,চেহারায় বয়সের ছাপ এখনো পড়েনি। কিন্তু রায়হান কেন তার দিকে ভালো করে তাকায় না? কেন অন্য মেয়েদের মতো তার হাত ধরে না, কেন তার চোখে ভালোবাসা জমে না?
এই প্রশ্নের উত্তর আয়েশা আজ-ও পায় নি।
রাত সাড়ে দশটা।
রায়হান অফিস থেকে ফিরেছে। খাওয়া-দাওয়া শেষ করে টিভির সামনে বসে খবর দেখছে। আয়েশা চুপচাপ রান্নাঘর গুছাচ্ছে। হঠাৎ রোহীনি দৌড়ে এসে আয়েশার আঁচল ধরে বলল,
— “মা, তুমি কি আমাকে ঘুম পাড়াবে আজ?”
আয়েশা হাসিমুখে বলল,
— “অবশ্যই, মা। চলো।”
রোহীনি কে নিয়ে সে রুমে চলে গেল। বাবু বুকের ভেতর মাথা গুঁজে ঘুমিয়ে পড়ল, কিন্তু আয়েশার চোখে ঘুম এলো না। কেমন অদ্ভুত এক শূন্যতা তাকে গ্রাস করল।
মনে মনে বলল,
“আমি কার জন্য এতো দিন এ সংসারে আছি? রোহীনির জন্য? নাকি সমাজের ভয়ে? নাকি সেই অদৃশ্য ভালোবাসার অপেক্ষায়, যা হয়তো কোনোদিন আসবেই না?”
বাইরে হঠাৎ বৃষ্টি শুরু হলো।
বৃষ্টির টুপটাপ শব্দে মনে হলো যেন তার বুকের ভেতরের কান্নাই আকাশে মিলিয়ে যাচ্ছে।
কিন্তু সেই রাতেই ঘটলো একটা ছোট্ট ঘটনা—যা হয়তো ভবিষ্যতের অনেক কিছু বদলে দেবে।
আয়েশা রোহীনিকে ঘুম পাড়িয়ে রুম থেকে বেরিয়ে বারান্দায় দাঁড়িয়েছিলো। হঠাৎ দেখল, রায়হানও সেখানে এসে দাঁড়িয়েছে।বৃষ্টির ফোঁটা পড়ে কাঁধ ভিজে যাচ্ছে, চোখে,মুখে ক্লান্তি রেশ ফুটে উঠছে। আয়েশা একবার তাকিয়ে আবার মুখ ঘুরিয়ে নিল। কিন্তু ঠিক সেই মুহূর্তে রায়হান ধীরে ধীরে বলল—
— “আজকের খাবারটা ভালো হয়েছিলো… ধন্যবাদ।”
এমন সাধারণ একটা কথায়ও আয়েশার বুক কেঁপে উঠলো। কারণ পাঁচ বছরে সে প্রথমবার শুনলো স্বামীর মুখে কোনো প্রশংসা!
সে কিছু বলতে পারলো না, শুধু চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইলো। আর মনে হলো, এই শুষ্ক মরুভূমির সংসারে হয়তো এক ফোঁটা বৃষ্টির পানি পড়লো আজ।
চলবে….?
#দ্বিতীয়_বউ
#পর্ব_২
#আলভিয়া_সামরিন_রায়া
রাত গভীর হয়ে এসেছে। বৃষ্টির শব্দে চারপাশ ভিজে এক অদ্ভুত নীরবতা নেমে এসেছে। বারান্দায় দাঁড়িয়ে থাকা আয়েশার বুকের ভেতরটা এখনো কাঁপছে। রায়হানের একটুখানি প্রশংসা— “আজকের খাবারটা ভালো হয়েছিলো…” কথাটা কি এতোটাই মূল্যবান?
হ্যাঁ, পাঁচ বছরের সংসারে এই একটা কথাই যেন আয়েশার কাছে ঝড় তুলেছে।
সে ধীরে ধীরে নিজের রুমে ঢুকে পড়লো। রোহীনি তখন গভীর ঘুমে। বাচ্চার মুখের দিকে তাকিয়ে আয়েশার বুক ভরে গেলো। ভাবলো, “হয়তো এই সংসারে আমার আসল সম্পর্ক রোহীনির সাথেই। রায়হানকে যদি না-ই পাই, অন্তত রোহীনির জন্য এই ঘরটা আমার।”
কিন্তু তারপরই মনে হলো, আজ যে ছোট্ট প্রশংসাটা সে পেয়েছে, ওটা কি কেবল সৌজন্য? নাকি আসলেই রায়হানের মনের ভেতর জমে থাকা কোনো বরফ গলতে শুরু করেছে?
পরদিন সকালবেলায়,
শহরের আকাশ এখনো মেঘলা। রায়হান নাস্তা টেবিলে বসে চুপচাপ খবরের কাগজ পড়ছে। আয়েশা রুটি-ডাল-ডিম সাজিয়ে দিলো। রোহিনী পাশেই বসে স্কুল ড্রেস পরে খেতে লাগলো।
হঠাৎ রোহিনী উচ্ছ্বাস নিয়ে বললো,
“মা, তুমি কি বিকেলে আমাকে স্কুল থেকে নিতে আসবে? আজকে আমাদের আঁকাআঁকির প্রতিযোগিতা!”
আয়েশা হেসে মাথা নাড়লো, — “অবশ্যই আসবো মা। আমি জানি তুমি ভালো আঁকবে।”
রোহিনী খুশিতে হাততালি দিলো। এই ছোট্ট মেয়েটার আনন্দই আয়েশার সব দুঃখ ভুলিয়ে দেয়।
রায়হান তখনো চুপচাপ কাগজে চোখ রেখেছিলো। কিন্তু আয়েশা লক্ষ্য করলো, রোহিনী কথায় তার ঠোঁটের কোণে হালকা হাসি খেলেছে। খুব সূক্ষ্ম, তবে আয়েশার চোখ এড়ালো না।
সকালে রায়হান অফিসে চলে গেলো। রায়হানের মা সাহেরা বেগম সবসময়ই আয়েশার প্রতি একধরনের অদৃশ্য ক্ষোপ বজায় রাখেন।
আজও রান্নাঘরে গিয়ে বললেন,
— “শোনো আয়েশা, তুমি তো আমাদের ঘরে এসেই সব দায়িত্ব নিয়েছো। কিন্তু রায়হানের মন জয় করতে পেরেছো? পুরুষ মানুষকে খুশি রাখতে জানো তো? শুধু রান্না করলে সংসার টেকে না।”
কথাগুলো আয়েশার কানে বিষের মতো ঢুকলো। মাথা নিচু করে চুপ করে দাঁড়িয়ে রইলো। উত্তর দেওয়ার মতো শক্তি নেই।
কিন্তু ভেতরে ভেতরে একটা কষ্ট তীব্র হয়ে উঠলো— “আমি তো চেষ্টা করি, তবু কেন সবাই আমাকে অপরাধী ভাবে? আমি কেনো আছি এই ঘরের বোঝা হয়ে?”
বিকেলে প্রতিযোগিতা শেষে আয়েশা রোহিনী কে নিয়ে ফিরলো।রোহিনীর হাতে ছোট্ট একটা পুরস্কার—রঙিন পেনসিলের সেট। রোহিনী খুশিতে লাফিয়ে লাফিয়ে বলছে,
— “মা, আমি সেকেন্ড হয়েছি! দেখো!”
আয়েশা তাকে বুকে জড়িয়ে ধরলো, — “আমার কাছে তুমি সবসময় প্রথম, মা।”
সন্ধ্যার পর রায়হান বাড়ি ফিরলো। ক্লান্ত মুখ, তবে রোহিনী কে হাসিমুখে দৌড়ে আসতে দেখে থমকে গেলো।
রোহিনী চিৎকার করে বললো,
— “বাবা! আমি আজ প্রতিযোগিতায় সেকেন্ড হয়েছি!”
রায়হানের চোখে এক ঝলক আনন্দ ফুটে উঠলো। সে রোহিনী কোলে তুলে নিলো। তারপর প্রথমবারের মতো আয়েশার দিকে তাকিয়ে বললো,
— “তুমি গিয়েছিলে ওর সাথে?”
আয়েশা একটু ইতস্তত করে বললো, — “হ্যাঁ, আমি গিয়েছিলাম।”
রায়হান মাথা নাড়লো, — “ভালো করেছো।”
এই সামান্য কথাটা আবার আয়েশার বুক কাঁপিয়ে দিলো। ভালো করেছো—এত সাধারণ শব্দও তার কাছে যেন অমূল্য রত্ন।
রাতের খাওয়া শেষ হলে রোহিনী ঘুমিয়ে পড়লো। আয়েশা সব গুছিয়ে বারান্দায় এসে দাঁড়ালো। ঠাণ্ডা হাওয়া বইছে। হঠাৎ পাশেই রায়হান এসে দাঁড়ালো।
দুজনেই কিছুক্ষণ নীরব। তারপর রায়হান হঠাৎ বললো,
— “বাবুর জন্য তুমি অনেক কিছু করো। আমি জানি। তোমাকে ধন্যবাদ।”
আয়েশা অবাক হয়ে তাকালো। পাঁচ বছরে রায়হান প্রথমবার স্পষ্টভাবে তার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করলো।
কথাগুলো শুনে তার বুকের ভেতরে জমে থাকা কান্না হু-হু করে উঠলো, কিন্তু সে চোখ নামিয়ে নিলো। ভেতরে ভেতরে শুধু বললো, “হয়তো সময়ের সাথে সত্যিই কিছু বদলাবে…”
কিন্তু সে জানতো না, এ সংসারে তার জন্য এখনো অনেক পরীক্ষার পথ পড়ে আছে।
কারণ সাহেরা বেগম (শাশুড়ি) তার ছেলের সাথে আয়েশার সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ হয়ে যাক, এটা একেবারেই মেনে নিতে রাজি না..
চলবে…..?
ভুল_ত্রুটি ক্ষমা সুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন।
