#কার্সড_লাভ
#লামিয়া_রহমান_মেঘলা
#পর্ব____০২
[🚫কপি করা সম্পূর্ণ নিষেধ ]
সারাটা দিন রুমে বন্দি কেটেছে মাইরার৷
মন এবং শরীর উভয় খারাপ তার।
বিকালের দিকে হাত মুখ ধুয়ে রুম থেকে বের হয় সে।
মাইরার মা মেয়েকে দেখে এগিয়ে গেলেন,
“মাইরা এখন কেমন লাগছে? শরীর ভালো?”
“হ্যাঁ মা ভালো।”
“চল খেয়ে নিবি।”
“মা বাবা কোথায়?”
“তোর বাবা ফেরেনি এখনো।”
“ও।”
মাইরা খেতে বসে। প্লেটে অল্প কিছু ভাত আর মায়ের রান্না করা তরকারি তুলে নেয় সে।
মাকে দেখানোর জন্য খাবারটা খাওয়া।
আজ মনের আকাশে মেঘ করেছে।
যে কোন সময় তা চোখের কার্ণিস বেয়ে বৃষ্টি হয়ে ঝড়ে পড়তে চাইছে৷
মাইরা নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করে।
দু এক দানা ভাত খেয়ে উঠে পড়ে।
শান্তা পার্ভিন দেখতে পায়নি যে মেয়ে কতটা খেয়েছে। তখন তিনি অন্য কাজে ছিলেন৷
লোক দেখানো খাওয়া খেয়ে মাইরা মাকে বলল,
“মা আমি একটু হেঁটে আসি মাঠ থেকে।”
“ঠিক আছে।’
মাইরা মায়ের অনুমতি নিয়ে বেরিয়ে যায় বাড়ি থেকে।
তার মন খারাপ থাকলে সে মাঠের সাথে বিরাট কৃষ্ণচূড়া গাছটার নিচে যায়৷
সেখানে গিয়ে কিছুক্ষণ বসে থাকলে মনটা ভালো লাগে।
আজও সেদিকে যাচ্ছিলো মাইরা।
মাঠে প্রবেশ করার পর দুট থেকে গাছটার এমন দশা দেখে অবাক হয় মাইরা৷
সে দ্রুত পায়ে এগিয়ে যায়৷
একটা গোটা তাজা গাছ পুড়ে কয়লা হয়ে গিয়েছে।
অবশিষ্ট নেই কিছুই৷
কিছুক্ষণ আগে ফায়ার সার্ভিস থেকে লোক এসে আগুন নিভিয়েছে৷
নাহলে গাছের থেকে চারিদিকে আগুন ছড়িয়ে যাচ্ছিলো।
অনেক গুলো বৈদ্যুতিক তার পুড়ে গিয়েছে।
আশেপাশে বাড়ি গুলোর ভোগান্তি হলো।
মাইরার ভীষণ কষ্ট হতে লাগলো।
বুকের ভেতর চাপা কষ্ট অনুভব হচ্ছে তার৷
মাইরা আলতো হাতে চোখের পানি মুছে ফের বাড়ির দিকে চলে যায়৷
——–
সমুদ্রের ধারে নয়, পাহাড়ের কোলে নয়, নির্জন এক বিস্তৃত প্রান্তরে দাঁড়িয়ে আছে একটি ভিলা। যেন আলো আর ছায়ার মাঝখানে জন্ম নেওয়া এক রহস্যময় স্বপ্ন। নাম তার “ক্রিমশন হ্যাভেন”। নামের মধ্যেই যেমন মিষ্টি আর অন্ধকারের এক অদ্ভুত মিশ্রণ, তেমনি তার গড়নেও লুকিয়ে আছে আকর্ষণ আর আতঙ্কের সূক্ষ্ম খেলা।
দূর থেকে তাকালেই প্রথম যে জিনিসটা চোখে পড়ে, তা হলো ভিলার সম্পূর্ণ আলো রঙা আবরণ। সাদা নয়, নিছক সাদা না,এ যেন আলো দিয়ে গড়া দেয়াল। সূর্যের আলো পড়লে মনে হয় ভিলাটা নিজেই যেন জ্বলে উঠেছে, আর রাত নামলে নরম হলুদ আলোয় সে হয়ে ওঠে স্বপ্নের মতো কোমল। ঠিক যেন কোনো নীরব রাজপ্রাসাদ, যার প্রতিটি কোণ নিজের গল্প নিজেই বলে।
প্রবেশদ্বারটা বিশাল, কাঁচ আর ধাতুর মিশেলে তৈরি। দরজার দুই পাশে লম্বা পাম গাছ সারি বেঁধে দাঁড়িয়ে আছে, যেন নীরব প্রহরী। ভেতরে ঢুকতেই চোখ আটকে যায় ঝুলন্ত ঝাড়বাতিতে,হাজারো কাঁচের টুকরোতে প্রতিফলিত আলো যেন চারপাশে ছড়িয়ে দেয় ঝিকিমিকি স্বপ্নের আবহ।
শিড়ি বেয়ে উপরে গেলে ডান দিকের মাস্টার বেডরুমটাই আলভির।
আলভি তার রুমের বিরাট জানালার কাছে দাঁড়িয়ে।
বিশাল গ্লাসের জানালা দিয়ে বাহিরের দৃশ্য স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে।
আলভির শরীরে একটা কালো রঙা সিলক নাইট ড্রেস পরা।
বুকের সামনের দিকটা খোলা।
তার সুঠাম দেহে জিম করে তৈরি করা এবস গুলো দৃশ্যমান।
আলভির ডান হাতে সিগারেট।
বাহিরের দিকে তাকিয়ে থেকেই ফের সিগারেটে টান দেয় সে।
এরপর অবশিষ্ট ধোঁয়া ছুড়ে বাহিরের দিকে।
তার চোখের সামনে কিছুদুরে একটি পাখি ভয়ঙ্কর ভাবে আহত হয়ে মাটিতে পড়ে আছে।
সে চাইলে পাখিটাকে সাহায্য করতে পারে কিন্তু সে তা না করে তাকিয়ে তাকিয়ে পাখিটার মৃত্যুর শেষ প্রহর গুলো দেখছে।
কিছু বছর আগের আলভি অবশ্য এমন ছিলোনা৷
সামান্য একটা পিঁপড়ের কষ্ট তার সহ্য হতোনা।
এখন চোখের সামনে জ্যান্ত একটা পাখি মরে যাচ্ছে অথচ ভেতরে কোন হেলদুল নেই তার।
আলভির চোখ জোড়া রক্তিম। যেন কোন ভয়ঙ্কর ঝড়ের পূর্বাভাস।
ভেতরে জ্বলতে থাকা সুপ্ত দাবানল কখন যেন বিশাল এক ফুটন্ত আগ্নেয়গিরিতে পরিণত হবে।
——–
রাতের খাবার খাওয়ার সময় মাইরা এবং তার মা বাবা এক সাথে ডাইনিং টাবিলে বসেছিলো৷
মাইরার বাবা জনাব সালাউদ্দিন ফিরোজ খাবার লোকমা গালে তুলতে তুলতে মাইরার দিকে তাকালেন।
আজ মাইরার খাওয়াতে কোন মনোযোগ নেই।
মাইরার বাবা সেটা বুঝতে পারলো।
খাবার খেতে খেতে তিনি প্রশ্ন করে উঠলেন,
“মাইরা খাচ্ছো না কেন? কি হয়েছে?”
মাইরা বাবার প্রশ্ন শুনে খানিকটা ভ্যাবাচেকা খেয়ে গেলো। সে খাবার মুখে তুলে উত্তর দিলো,
“খাচ্ছি বাবা।”
“কিছু হয়েছে কি তোমার?”
“জি না কাল একটা টেস্ট আছেত তাই৷’
” তাহলে দ্রুত খেয়ে পড়তে বসো। সময় নষ্ট করছো কেন?”
মাইরা মাথা নুইয়ে নেয়।
তার বাবা এমনি গম্ভীর আর ভীষণ রাগী।
তিনি মাইরাকে ভীষণ শাসনে রাখেন। তার একমাত্র মেয়ে মাইরা। তার কথা হচ্ছে তিনি সব দিবেন শুধু মাইরাকে ভালো রেজাল্ট করতে হবে।
মাইরা বাবার সামনে কিছুই বলতে পারেনা৷
বাহিরে মাইরা যাই করুক বাবার সামনে সে সব সময় চুপ থাকে।
বাবা তাকে সব দিয়েছে কিন্তু খারাপ রেজাল্ট করার স্বাধীনতা দেয়নি।
মাইরা খুব চেষ্টা করে বাবার আশার উপর দাঁড়াতে।
কিন্তু তার বাবার কাছে ব্যার্থতা বলতে কোন শব্দ নেই।
তার মতে ব্যার্থ হয় তারা যাদের কিছু নেই৷
মাইরা তাই সব সময় চাপে থাকে। পড়ালেখার বিষয়ে তাকে ভীষণ মনোযোগি হতে হয়।
——–
সে রাত কেটে পরদিন সকালে।
সালাউদ্দিন ফিরোজ রোজ সকালে হাটতে বের হয়।
বাড়িতে ফিরে তিনি মাইরাকে জাগিয়ে দেয়।
আজও বেতিক্রম নয়৷
মাইরা বাবার ডাকে ঘুম থেকে উঠে ফ্রেশ হয়ে নেয়।
একটু পর কলেজে যেতে হবে।
কিন্তু মাইরা আজ কলেজ যেতে চায়না৷
হাটুর ব্যথা বেড়েছে। ভয়ে বাড়িতে এসে ছিলে যাওয়ার কথা না বললেও রাতে ভীষণ করে ব্যথা বেড়েছে বুঝতে পেরেছে মাইরা।
কিন্তু বাবার সামনে সাহস করে যাবনা কথাটা বলতে পারলো না সে।
ব্রেকফাস্ট করে ভার্সিটির জন্য রওনা করতে হলো তাকে।
রিক্সা নিয়ে মাইরা ভার্সিটিতে আসার পর তার বান্ধবী রুহি এগিয়ে আসে,
“কিরে মাইরা কাল ওভাবে চলে গেলি এরপর কত ফোন করলাম ধরলি না যে?”
“একটু ব্যস্ত ছিলাম রে সরি।”
“আচ্ছা আচ্ছা চল আলভি স্যারের ক্লাস একটু পর। সবাই চলে গিয়েছে আমি অপেক্ষা করছিলাম তোর জন্য। দেরি হলে স্যার বকবে।”
“ওকে চল৷’
মাইরা এবং রুহি দু’জন ক্লাসে চলে আসে। তবে তারা আসতে আসতে দু মিনিট লেট হয়ে যায়। স্যার ক্লাসে চলে এসেছে অলরেডি।
আলভিকে দেখে রুহি এবং মাইরা উভয় দাঁড়িয়ে যায় বাহিরে।
রুহি দ্রুত আলভিকে ডাকে,
” স্যার মে আই কাম ইন?”
আলভি ফিরে চায় দরজার দিকে।
মাইরা মাথা নামিয়ে নেয়।
আলভি পকেটে হাত দিয়ে গম্ভীর কন্ঠে জিজ্ঞেস করে,
“তোমরা পুরো ৩ মিনিট লেট। জানতে পারি এই অবহেলার পেছনের গল্পটা?”
রুহি সরল মনে উত্তর দেয়,
“মাইরার জন্য একটু দাঁড়িয়ে ছিলাম স্যার সরি আর হবেনা।”
“ও আচ্ছা তার মানে তুমি সঠিক সময়ে পৌঁছে গেছো। এই মেয়েটার জন্য লেট হয়েছে তাইত?”
রুহিত অবাক স্যারের কথাটা শুনে। সে এভাবে বলেনি। তবে এখান সে কি উত্তর দিবে ভেবে পায়না৷
আলভি ফের বলে ওঠে,
“তুমি আসতে পারো তবে যার জন্য লেট করেছো সে নয়।
আর মিস মাইরা ক্লাস রুমের বাহিরে হাত উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকুন। প্রত্যেকে দেখুক ক্লাসে সময় মত না আসার ফল কি হতে পারে’
রুহি শহ ক্লাসের সবাই অবাক হলো আলভির কথা শুনে। মাইরা ছলছল দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে আলভির দিকে৷
আলভি রুহিকে উদ্দেশ্য করে খানিকটা জোরেই বলে ওঠে,
” মিস রুহি ভেগরে এসো। আর তুমি নিজের পানিশমেন্ট পুরো করো নাহলে আমার কাছে আরও উপায় আছে।”
মাইরা আর অপমান সহ্য করতে পারেনা। সে ক্লাসের বাহিরে হাত উঁচু করে দাঁড়ায়।
এটাত বাচ্চা দের শাস্তিও না। একজন ভার্সিটিতে পড়ুয়া মেয়েকে এখন এসব শাস্তি দেবে আলভি ভাবতেই কষ্ট হচ্ছে মাইরার।
গোটা ১ ঘন্টা লেকচার শেষে আলভি ক্লাস থেকে বের হয়।
বের হয়ে সে দেখতে পায় ডান দিকে মাইরা তখনো হাত উঁচু করে দাঁড়িয়ে। ওর চোখ দিয়ে পানি পড়ছে।
আলভি মাইরার সামনে পকেটে হাত গুঁজে দাঁড়ায়।
মাইরা ভাবে হয়ত তাকে কিছু বলবে।
কিন্তু তাকে অবাক করে দিয়ে আলভি মাইরার বুকের কাছের ওড়নাটা হালকটা টেনে নিচু করে।
এরপর হিসহিসিয়ে বলে,
“শরীর দেখানোর যখন এতই শখ তখন ওড়না পরিস কেন? না পারলেই পারিস। তোদের মত মেয়েরাত সবই পারে করতে।
কাল থেকে টাইট জিন্স আর টপস পরে আসিস এসব না পরে। মন ভরে ছেলেদের শরীর দেখাতে পারবি। ননসেন্স।”
আলভি কথা গুলো বলেই সেখান থেকে চলে যায়। মাইরা তাকিয়ে রয় আলভির পিঠের দিকে।
মাইরা খেয়লা করেনি তার ওড়নাটা উঠে গিয়েছে।
আলভি এভাবে বলবে মাইরা বুঝতে পারেনি। বড্ড কষ্ট হচ্ছে তার।
অপমান গুলো সোজা বুকে গিয়ে লাগছে।
চলবে?
