#চেনা
#শেষ_পর্ব
ভালোবাসাই পারে অভিমানকে ভে ঙে দিতে, গভীর রাতে সম্রাজ্ঞী বসে ক্রিম মাখছিল আর ল্যাপটপে মুখ গুঁজে নিজেকে ব্যস্ত রেখেছিল অভির| হঠাৎ পেছন থেকে সে আলতো করে গলা জড়িয়ে ধরল| অভিও বু কে টেনে নিল তাকে, আদরে আদরে ভরিয়ে দিল| সেও যে এতদিন এমনই এক সুমধুর স্পর্শের জন্য মনে মনে অপেক্ষা করছিল, তার বুকেও জমেছিল উপেক্ষার উষর মেঘ| আজ স্পর্শ সুখের উল্লাসে আকাশ ছেঁচা বৃষ্টি নামল, ভেসে গেল দুজনে| ভালোবাসার জাদু স্পর্শ মেখে সম্রাজ্ঞী যেন অনুভব করল, ‘ আনন্দ হি কেবলম| ‘
তুমুল বর্ষণের শেষে পাশাপাশি শুয়ে অভি বলল, এর আগে যতবার মান অভিমানের পালা হয়েছে তুমি কখনোই মানিয়ে নিতে এগিয়ে আসো নি, প্রতিবারই এসেছি আমি… আজ তবে হল কি?
ভালোবাসার ছোঁয়া পেয়েছি… দূরে গেছে ঘৃ ণা| বাড়ি ফিরে অনেক ভাবলাম জানো, অযথাই এতদিন কঠিন হয়ে থেকে দুজনের সম্পর্কের গভীরতা মাখা দিনগুলো নষ্ট করছি| তুমি তো হাত বাড়িয়েই ছিলে চিরদিন, আমি একটু এগোলেই সব ঠিক হয়ে যেত… সময়ের চাকা ঘুরছে নিরন্তর, কেন যে তাকে অনুভব করতে পারি না, আর পরে সে সময় বয়ে গেল হা হাকার করে কেঁদে বলি, কেন সেদিন বুঝল না সে… কোন অভিমানে ফিরিয়ে নিলে মুখ!
উঠে বসে নিজের দু হাতের চেটোয় সম্রাজ্ঞীর মুখখানা নিল অভি| গভীর দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলল, আজো তোমার দু চোখের পাতায় বিষাদের মলিন ছায়া| এত বিষাদ কেন সোনু? কিসের এত কষ্ট?বুকের গভীরে কোন যন্ত্র ণা জমিয়ে রেখেছ তুমি… কেন লালন করছ একাকী? আমি কি পারি না সেই কষ্টের সামান্য ভাগ নিতে…
এটুকুরই অপেক্ষা ছিল বোধহয় নিমেষে খুলে গেল আগল| শুনতে লাগল সে… কত যে সময় বয়ে গেল, খেয়ালই রইল না| মুক্তোর দানার মতো ফোঁটা ফোঁটা জল ঝরে পড়তে লাগল দুজনের আঁখি বেয়ে| অশ্রুর সুকোমল স্পর্শে এতদিনকার ভালোবাসা যেন পূর্ণতা খুঁজে পেল|
বুকের গভীরে এমন যন্ত্র ণার অতীত দিনলিপি চেপে রেখেছিলে? এতটা সহ্য করেছ একাকী? কেন… কেন সোনু কেন? একবার তো বলতে পারতে আমাকে! এতটাই কি নিষ্ঠুর বলে মনে হয় আমায়? এতটা অনুভূতিহীন?
আমি ভ য় পেয়েছিলাম| সে কি ভীষণ ভ য় যদি তুমি জানতে… অতীতের কথা জেনে যদি আমায় ছে ড়ে চলে যাও… চলে যাও অন্য কারোর কাছে| খুঁজে নাও নতুন ভালোবাসা, কোথায় যাব আমি? আসলে তো আমি এক ভা ঙা মানুষ ছাড়া কিচ্ছুটি নই, যে বড় ভয় পায় হা রতে, ভেতরের নরম হৃদয়কে বাঁচাতে বাইরে শক্ত আবরণে মুড়ে রাখি নিজেকে, যাতে নতুন করে দুঃখ আমায় আ ঘা ত না হা নতে পারে!
এবার কি কেটেছে ভ য়? আর বুঝি আমায় হা রানোর ভ য় নেই তোমার? বুকের গভীরে সম্রাজ্ঞীকে জড়িয়ে নেয় অভিজিৎ| তোমার কোনো চিন্তা নেই সোনু, কেউ পাশে থাকুক না থাকুক, এই অধম অভি সারাজীবন তোমার সঙ্গে থাকবে, তোমায় জ্বা লাবে, আর এই ছোট্ট পাখির মতো ভীরু মনটাকে আগলে রাখবে নিজের সমস্ত হৃদয় দিয়ে….
যাবে তো নিয়ে আমায় ফতেপুকুর? মামণি যে আমাদের দুজনের অপেক্ষায় আছে|
যাব তো, এই উইকেন্ডে| আমার পাখিকে কখনো কি কষ্ট দিতে পারি?
আনন্দ, হাসি মজায় কেটে গেল দিন দুটো| জীবনে প্রথমবার সম্রাজ্ঞী চাউমিন বানালো| নুন বেশি, মশলা কম তবু সবাই হইহই করে খেল| ফেরার দিন সম্রাজ্ঞীর কেবলই মনে হতে লাগল, আরো ক’টা দিন, আরো ক’টা দিন… যদি এই নিরিবিলি পরিবেশে মাটির সোঁদা গন্ধ মেখে কাটিয়ে দিতে পারত? কিন্তু তা যে আর হওয়ার নয়, ফিরতে তাদের হবেই| কংক্রিটের শহর হাজারো কাজের ডে ডলাইন নিয়ে অপেক্ষা করছে তাদের জন্য…. ব্যস্ত নাগরিক জীবনে অভ্যস্ত মানুষের ফেরা ছাড়া গতি নেই|
এবার কিন্তু আমিও তোদের সঙ্গে ফিরব, হাসলেন গার্গী| সেদিন আর উপহারটা আপনাকে দেওয়া হয় নি| সেরামিকের কাজ করা রঙিন পিরিচ, পেয়ালা, টিপট, মিল্ক-সুগার পট… গুছিয়ে সাজিয়ে রাখলেন, আপত্তি করতে পারবেন না কিন্তু| আমার বাড়ির আলমারিতে এতদিন সাজানো থাকলেও সেদিন আপনার সঙ্গে আলাপের পরপরই বুঝেছি মাটির গন্ধমাখা অনুভব নিয়ে এগুলো চিরকাল আপনারই অপেক্ষায় ছিল|
তুমি তো এবার একা হয়ে যাবে মামণি… আন্তরিকতা ফুটে ওঠে সম্রাজ্ঞীর কন্ঠস্বরে|
এই গ্ৰামের এত্তগুলো মানুষ আমার পাশে আছে| দেখলি তো এই দুদিন, কোনো কিছুর অসুবিধা কি হতে দিয়েছে তোদের? এতগুলো মানুষ ভালোবাসা যার পথ চলার সঙ্গী, সে কি কখনো একা হয়? না একা হতে পারে? তুই কিচ্ছু চিন্তা করিস না মা, সবার সঙ্গে মিলেমিশে আমি এখানে খুব ভাল থাকব|
আমরা সবাই যে চলে যাচ্ছি…
আমি বলি কি বেয়ান প্রাইভেসির সমস্যা হবে ভেবে আপনি যদি ওদের সঙ্গে থাকতে না চান, আমরা দুজন কিন্তু একসঙ্গে থাকতে পারি| আমার ফ্ল্যাটটা তো সবসময় ফাঁকাই পড়ে থাকে, দুই বেয়ানে মিলে গল্প করে কাটিয়ে দিতাম দিব্যি, সুকুমারীর হাতদুটো আলতো করে ধরলেন গার্গী সরকার|
শহর আমায় টানে না বেয়ান, মনের মরমী দোসর গাছপালাদের সেখানে খুঁজে পাই না যে… আমি এখানেই দিব্যি আছি| আর আপনারা সবাই তো রইলেন চিন্তা কিসের আমার? এই যে আপনি বার বার বেরিয়ে পড়েন দেশ বিদেশ ঘুরতে… কেন? সেও তো ফিরে আসার টান অনুভব করার জন্য… কি বেয়ান ঠিক বলছি তো? সামান্য থামলেন সুকুমারী,
এই চলে যাওয়া যে ফিরে আসারই নামান্তর|
( সমাপ্ত )
©️ Monkemoner dakbakso – Anindita
