#চেনা
#পর্ব_৭
পরেরদিন সকালে উঠে বেয়ানের হাতে তৈরি গরম গরম ফুলকো লুচি আর কালোজিরে ফোড়ন দেওয়া সাদা আলুর চচ্চড়ি খেয়ে মেয়ে জামাইয়ের কাছ থেকে বিদায় নিলেন গার্গী সরকার| একটা রাত কাটল এবার তাঁকে ফিরতে হবে নিজের ডেরায়| নিজের মতো করে একলা বাঁচতে একবার যারা অভ্যস্ত হয়ে যায়, তারা সহজে আর কারোর সঙ্গে অ্যাডজাস্ট করতে পারে না| অসুবিধা না থাকলেও অসুবিধা মনে হয়…
হাত দিয়ে গার্গীকে লুচি ছিঁড়তে দেখে অবাকের চূড়ান্ত সীমায় পৌঁছে গেল সম্রাজ্ঞী, মা তুমি লুচি খাচ্ছ যে… তুমি যে বলতে লুচি খেলে তোমার নাকি শরীর খারাপ করে, তাই আমার আবদারে বানিয়ে দিলেও তোমাকে কখনো লুচির টুকরোটাও মুখে দিতে দেখি নি| কিন্তু আজ… তুমি কি বদলে গেলে?
সন্তান যখন ভবিষ্যতের ক্ষেত্রে সঠিক সিদ্ধান্ত নেয়, তখন বাবা-মায়েদের ভীষণ আনন্দ হয়| ধরে নে সেই আনন্দেই আজ বহুদিনের এক নিয়ম ভাঙলাম| অভি বাবা তোমাদের ফ্ল্যাটে এসে আজ ভারী আনন্দ পেয়েছি| একটাই কথা বলব, এমন মা সবার ভাগ্যে জোটে না, যত্ন করে আগলে রেখো| আসলে কি জানো বাবা, মূল্যবান জিনিসকে অবহেলা ভরে ফেলে রাখলে ঈশ্বরও কিন্তু তা সহ্য করেন না… তুমি বুদ্ধিমান, বুঝবে আশা রাখি|
মাকে বিদায় দিতে কমপ্লেক্সের গেট পর্যন্ত এল সম্রাজ্ঞী| তার প্রশ্নের উত্তর এখনো যে পায় নি সে| প্রশ্নবোধক দৃষ্টিতে তাকাতেই হাসলেন গার্গী, ওই যে বললাম, মন| মনকে প্রশ্ন কর, দেখবি মন তোকে সঠিক রাস্তা চিনিয়ে দেবে| আর একটা কথা, অতীতের ক্ষ ত বর্তমানে টেনে আনিস না… সে শুধু ভা ঙনকেই ত্বরান্বিত করে| মানুষটা বড় ভাল রে, মনে রাখবি ভাল মানুষের ভাল থাকার জন্য কাউকে দরকার পড়ে না, কিন্তু সেই মানুষটাকে বাকিদের দরকার পড়ে আর একটু ভাল থাকার জন্য|
আগামাথা কিছু না বুঝলেও এটা জানে সম্রাজ্ঞী, এর চাইতে বেশি একটা কথাও মা তাকে বলবে না| সিদ্ধান্ত নেওয়ার পরিস্থিতি এলে মা বরাবরই তাকে হেঁয়ালি মাখা জগতে ঠেলে দেয়, মাঝেমধ্যে মনে হয় তার আর মায়ের মাঝে একটা ধূসর পর্দা আছে… মাঝেমধ্যে সেই পর্দা সরে গেলে মানুষটার চেনা ঝলক উঁকি দেয়, আবার কখনো কখনো ধূসরতার আচ্ছাদনে ঢেকে দেয় সবটা, তখন চেনা মানুষটাই হয়ে যায় অচেনা| তবে সম্রাজ্ঞী এটা নিশ্চিতভাবে জানে, তাকে মা পাগলের মতো ভালোবাসে| আর ভালবাসে বলেই ছোট থেকে ঠিক হোক বা ভুল নিজের সিদ্ধান্ত তাকে নিজে নিতে শিখিয়েছে| প্রয়োজনের সময় সিদ্ধান্ত নিতে পারাটা একটা মানুষের জীবনে যে কি ভীষণ জরুরি তা সম্রাজ্ঞীর চেয়ে ভাল কেই বা জানে? সঠিক সময় সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পেরেছিল বলেই না আজ অভি আর তার সুখের সংসার|
ক্যাব এসে গেছে| মেয়ের দিকে তাকিয়ে হাত নাড়ছেন গার্গী| পাল্টা সেও হাত নাড়ল| পলকেই মিলিয়ে গেল রাস্তার বাঁকে| একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে দ্রুত পা চালাল সম্রাজ্ঞী| অফিস যাওয়ার দেরি হয়ে যাচ্ছে, ফেরার পথে আজকেই শাশুড়ি মা’র রিপোর্টগুলো কালেক্ট করতে হবে| মানুষটা ঠিক থাকা দরকার, তাঁর নিজের জন্যই নয়, দরকার তাদের ভাল থাকার জন্য|
ফোনটা এল সম্রাজ্ঞীর অফিস থেকে ফেরার পথে| অভিজিৎ ফিরতে দেরি হবে আজ তাই সে ফোন করেছে, রিপোর্ট কেমন এল তা জানার জন্য… সে বলল অফিস থেকে বেরিয়ে প্যাথল্যাবেই যাচ্ছে, রিপোর্ট কালেক্ট করার জন্য| একটু থেমে বলল সে, আমরা কি মাকে বরাবরের জন্য নিজেদের কাছে রাখতে পারি না?
নিজের কাছে? চুপ হয়ে গেল অভিজিৎ| বেশ কিছুক্ষণ ফোনের ওপ্রান্ত থেকে আর কোন শব্দ পেল না সম্রাজ্ঞী| অবাক হয়ে ভাবল তবে কি সে ভুল কিছু বলল? নাকি অভিজিৎ তাকে বিশ্বাস করতে পারছে না| অজান্তেই একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এল…
উত্তর দিচ্ছ না কেন? আমার কথাটা কি তুমি কি শুনতে পাচ্ছ….
পাচ্ছি, কিন্তু তুমিই তো চাও নি সেদিন মা আমাদের বাড়িতে এসে থাকুক| বলার পর সবচাইতে বেশি আপত্তি তুমিই তো জানিয়েছিলে, এমনকি তপনের সঙ্গে সামান্য কথাটুকু বলতে পর্যন্ত রাজি হও নি|
বুঝতে পারি নি… সেইসময়| কিন্তু এটা ভাব গ্ৰামের বাড়িতে মানুষটা দিনের পর দিন একলাটি থাকে, কোন সমস্যা হলে… রাত বিরেতে দেখবে কে? তার চাইতে আমাদের কাছে থাকলে, শহরে উন্নত চিকিৎসা ব্যবস্থা, নিজেদের মানুষ… মনও ভাল থাকবে|
প্রকৃতির মাঝে যারা থাকে, তারা প্রকৃতিকেই আপন বলে মনে করে| তার চাইতে আপনার জন কেউ নেই তার… চায়ের দোকান সামলে মা ভাল আছে, ভালই থাকবে বলেই আমার বিশ্বাস| তুমি কেন প্রকৃতির কোল থেকে টেনে এনে মানুষটাকে নিজের কাছে রাখতে চাইছ?
এই ক’দিনে মানুষটাকে চোখের সামনে দেখে বুঝেছি এমন একজন মানুষকে আমি কিছুতেই হা রিয়ে ফেলতে চাই না, তুমি কি চাও না মা আমাদের কাছে থাকুক? দুপুরের কথাটা মনে পড়ল তার, লাঞ্চ বক্সটা খুলে যখন কাজু কিসমিস দেওয়া ভাজা সিমুইয়ের পোলাও দেখেছিল অজান্তেই চোখটা ভিজে উঠেছিল| মনে পড়ে গিয়েছিল রতুমাসির কথা… কতদিন হয়ে গেল মাসিকে একবার চোখের দেখা দেখে নি সে|
( ক্রমশ )
©️ Monkemoner dakbakso – Anindita
