#চেনা
#পর্ব_৪
বাড়ি ফিরে দেখল সম্রাজ্ঞী ঘরদোর সব গোছানো, বেডরুমে বসে অভি ল্যাপটপ ঘাঁটছে| তাকে ঢুকতে দেখে হাসিমুখে বলল, মায়ের টেস্টগুলো হয়ে গেছে বুঝলে, পরশু রিপোর্ট পাব| তারপরই মা ব্যাক টু প্যাভেলিয়ন| তপন আসবে বলেছিল, আমি অবশ্য মানা করে দিয়েছি… নিজেই মাকে পৌঁছে দিয়ে আসব| বুঝতে পেরেছি না বলে কয়ে হঠাৎ তপনের ফ্ল্যাটে চলে আসাতে তুমি খুব বিরক্ত হয়েছ, আমার উচিত ছিল তোমার অনুমতি নিয়ে তবে ওকে রাতে থেকে যেতে বলা… কিন্তু সেই মুহূর্তে পরিস্থিতি…
কি? সম্রাজ্ঞীর গলায় উষ্মার ছোঁয়া আছে কিনা বুঝতে পারল না অভিজিৎ|
হোটেলে রাত কাটানোর মতো টাকা নেই ওর কাছে আমি জানি, অথচ আমার মাকেই পৌঁছতে এসে এই দুর্ভোগ| কি করে ছেরেটাকে ওয়েটিং রুমে রাত কাটাতে বলি, তুমিই বলো| তাছাড়া তপন আমার ছোটবেলার বন্ধু, নেহাত বন্ধুত্বের খাতিরেই| তুমিও ক্লান্ত ছিলে, ঘুমোচ্ছিলে সম্ভবতঃ, তাই আর ঘুম ভাঙিয়ে বিরক্ত করি নি….
অপর প্রান্ত থেকে কোন উত্তর এল না| একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে অভি দেখল, সম্রাজ্ঞী কখন যেন ঘর লাগোয়া বাথরুমে ফ্রেশ হতে ঢুকে পড়েছে|
বিদেশী কফি মেকারে দু কাপ কফি বানিয়ে ঘরে এসে বসল সে, হঠাৎ সেই সকালের চেনা ছায়া দরজায়| একইরকম কুন্ঠিত ভঙ্গি, যেঞ নিজেকে সবার কাছ থেকে লু কিয়ে রাখার প্রচেষ্টা| প্রায় শোনা যায় না এমন স্বরে বললেন সুকুমারী, অফিস থেকে ফিরলে তো এখুনি, ক্লান্ত লাগছে নিশ্চয়ই? আলু, চিকেন আর সেদ্ধ ডিম মেখে বল বানিয়ে ডিপ ফ্রাই করেছি| খাবে? খেলে তোমাদের দুজনের জন্য নিয়ে আসছি|
কেন যেন আজ কিছুতেই আর না বলতে ইচ্ছে হল না সম্রাজ্ঞীর| চলেই তো যাবেন মানুষটা পরশুদিন| তার আগে যদি বৌয়ের ছুতোয় ছেলেকে কিছু ভালোমন্দ খাওয়াতে ইচ্ছে হয় মায়ের, তাতে সে বাধা দেওয়ার কে? ছোট্ট হ্যান্ডমেড প্লেটে দুটো বল তুলে টুথপিক গেঁথে খেতে খেতে বলল সে, তোমাদের যে একসময় চায়ের দোকান ছিল কখনো বলো নি তো…
কেমন যেন অদ্ভুত ভঙ্গিতে হাসল অভি, তুমিও তো কখনো জানতে চাও নি|
কথাটা মিথ্যে নয়, অভির অতীতের গল্প কবেই বা জানতে চেয়েছে সে…
অসময়ে বাবা চলে যাওয়ার পর মা চায়ের দোকান চালিয়ে আমাকে পড়াশোনা করিয়েছে| ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের খরচা দিয়েছে, যদিও সরকারি কলেজে খরচা লাগত নামে মাত্র, তবু হোস্টেলে থাকা, খাওয়া মিলিয়ে মায়ের পক্ষে তা অনেকটাই| অনেকরকম রান্নাবান্না জানত মা, চায়ের পাশাপাশি সেগুলোও রাখতে শুরু করেছিল দোকানে| বিক্রি বাটা বেড়েছিল খানিক, অন্ততঃ আমার পড়াশোনায় কোন বাধা আসে নি| অভাব ছিল নিশ্চয়ই, কিন্তু আমি টের পাই নি, মা কখনো টের পেতে দেয় নি| আসলে বড়লোক বাড়ির একমাত্র মেয়ে তো, তখন কোথায় যেন জমিদার বলে সম্বোধন করা হত দাদুকে| বাবাকে ভালোবেসে মা এক কাপড়ে ঘর ছেড়েছিল| আমি জন্মানোর পর দাদু নাকি নিজে পায়ে হেঁটে আমাদের কুঁড়ে ঘরে এসেছিল মেয়ে আর নাতিকে নিয়ে যাবে বলে, কিন্তু কিছুতেই মাকে রাজি করাতে পারে নি| স্বভাবে বড্ড জে দি যে…আরো বার দুই এসেছে দাদু, আমি দেখেছি| তখন আমি খুব ছোট তবুও মনে পড়ে| কিন্তু মা’র অভিমানের পাহাড় ডিঙোতে পারে নি| এমনকি দাদু চলে যাওয়ার পরও মামারা এসেছিল মায়ের ভাগের পঞ্চাশ লক্ষ টাকার চেক নিয়ে, তাতেও হাত দিতে মা রাজি হয় নি|
কত টাকা বললে? অঙ্কটা বোধহয় চমকে দিয়েছে সম্রাজ্ঞীর মতো মেয়েকেও…
পঞ্চাশ লক্ষ| এখনকার সময় দাঁড়িয়ে দেড় দু কোটি টাকা তো হবেই| বাবাও মাকে বলে নি কখনো টাকাটা নিতে| অভাবের সংসার, তবু মায়ের প্রতিটা সিদ্ধান্তে পাশে থেকেছে বাবা| আস্তে আস্তে আমাদের চা-খানায় খদ্দের বেড়েছে, পাল্লা দিয়ে বেড়েছে সংসার খরচও| আমি মানুষ হওয়ার পর গ্রামে যেটুকু আরামের ব্যবস্থা করা যায়, করে দিয়েছি মা’র জন্য| তবু মা আজো সাবলম্বী হয়েই থাকতে চায়, প্রতিদিন সকাল বিকেল চায়ের দোকান খোলে, নিজের হাতে খাবার দাবার তৈরি করে| বয়সের কারণে মেনু হয়ত সংক্ষিপ্ত হয়েছে, কিন্তু দোকান চলে তার নিজস্ব ছন্দে| মা কি বলে জানো, যতদিন শরীরে ক্ষমতা আছে, বসে খাব কেন?
মুহূর্তে মুহূর্তে অবাক হচ্ছিল সম্রাজ্ঞী| এতদিন জীবনের একটা রূপই সে দেখেছে, কিন্তু আজ জীবনের এই নতুন রূপ তাকে বিস্মিত করছিল… এমনটাও হয়? হতে পারে? একজন মানুষ ভালোবাসার টানে সমাজ, সংসার, নিজের চেনা পরিচিত জীবন ছন্দ ছেড়ে একেবারে চলে আসতে পারে? ঘরে অভাবের সঙ্গে নিত্য ল ড়াই জেনেও সঙ্গীটি অপরের মর্যাদাবোধকে প্রাধান্য দিতে সম্বরণ করতে পারে পঞ্চাশ লক্ষ টাকার লোভ? সে নিজে কি পারত? বোধহয় নয়| কেমন মানুষ এরা? এভাবেও ভালোবাসা যায়? যায় পাশে থাকা? কতটা ভালোবাসলে এতখানি সহনশীল হতে পারে মানুষ? হতে পারে নিঃস্বার্থ?
রাতে খেতে বসে দেখল সে বোলে চিকেন স্ট্যু আর ক্যাসারোলে রুটি রাখা রয়েছে| আজকের সব রান্নাবান্না করেছেন সুকুমারী| নরম গলায় বললেন, বাবু বলল তুমি হাল্কা খেতে পছন্দ করো, তাই রাতের জন্য স্ট্যু করেছি| যদি এটা খেতে ভাল না লাগে তবে নিজের জন্য অন্য কিছু আনিয়ে নিতে পারো| জোর করে আমার ভাল লাগার জন্য অপছন্দের খাবার খেতে হবে না|
আপনি এসব করতে গেলেন কেন? রাতের রান্নার জন্য মাসি তো আছে| ঠিক কিছু একটা বানিয়ে রাখত, বলল বটে কিন্তু গলায় জোর ফুটল না তেমন| তবে কি সম্রাজ্ঞী নিজেকে হা রিয়ে ফেলছে? হাতের কাছে সব পাওয়ার লোভ জাঁকিয়ে বসছে মনের গভীরে…. নাকি অজান্তেই এই নিঃস্বার্থ, নির্লোভ মানুষটাকে সে শ্রদ্ধা করতে শুরু করেছে|
সে মেয়ে হাতে হাতে সাহায্য না করলে কি আর আমি একা একা এতকিছু বানাতে পারতুম? সে বয়স কি আর আছে আমার যে তোমাদের দুজনকে পোলাও, কালিয়া রেঁধে খাওয়াব? তুমি নিশ্চিন্তে খাও মা… আমি দেখি|
শেষের কথাটা খুব আস্তে বললেও সম্রাজ্ঞীর কানে গেছে| তার মুখ ফসকে বেরিয়ে গেল, আপনি নিজে খেয়েছেন?
কখন! আমি তো রাতে খই-দুধ খাই| শোওয়ার খানিকক্ষণ আগে খই, দুধ না খেলে ঠিকমতো হজম হয় না যে, লজ্জা লজ্জা মুখে বলেন সুকুমারী| তোমরা খেয়ে নাও, আমি একপাশটিতে দাঁড়িয়ে আছি|
( ক্রমশ )
©️ Monkemoner dakbakso – Anindita
