#চেনা
তোমার মা আসবেন? আমাদের এখানে? হঠাৎ? জানতে পারি কেন? ভুরু কুঁচকে ওঠে সম্রাজ্ঞীর| মুখের ভাবই বলে দিচ্ছে এই অযাচিত উৎ পাতে সে ভীষণই বিরক্ত| কথা দেওয়ার আগে আমাকে জানানো উচিত ছিল তোমার, গম্ভীর মুখে বলল সে, রেজিস্ট্রি ম্যারেজের আগে আমাদের মধ্যে যে ডিল হয়েছিল তা নিশ্চয়ই ভুলে যাও নি অভি? তাহলে…. এক্ষেত্রে কিন্তু ডিল ব্রেক হচ্ছে| আর ডিল ব্রেক হচ্ছে তোমার তরফ থেকে| সেক্ষেত্রে কিন্তু তোমার সঙ্গে থাকার কথাটা আমায় নতুন করে ভাবতে…
আই নো বেবি, অসহায় কন্ঠে বলে অভিজিৎ| এটুকু শুনেই সে বুঝে গেছে কি বলতে চাইছে সম্রাজ্ঞী| আমিও কি চাই কখনো মা এখানে আসুক? কিন্তু মায়ের লিভারে একটা সমস্যা ধরা পড়েছে| সমস্যাটা একেবারে ছোটখাট নয়, তাই খানিকটা বাধ্য হয়েই… তুমি তো জানো আমি ইচ্ছে করে কখনোই এমনটা!
বয়স হলে অসুস্থ হবে মানুষ, এটাই স্বাভাবিক ব্যপার| কিন্তু তার জন্য আমাদের ফ্ল্যাটেই কেন? যেখানে উনি থাকেন সেখানে কি চিকিৎসা ব্যবস্থা নেই? সেখানকার মানুষজন কি বিনা চিকিৎসায় বেঁচে আছে?
আসলে কি জানো তো অভি, গ্ৰামের মানুষজনের একটাই সমস্যা…. শহরের বুকে চেনা পরিচিত, আত্মীয় স্বজন থাকলেই নানা ছুতোয় তাদের বেড়াতে আসতে ইচ্ছে হয়… চিকিৎসা তো সামান্য একটা ছুতো!
বলতে ইচ্ছে করল অভিজিতের, এই মানুষটা অন্য কেউ নয়, আমার নিজের মা| আমার গর্ভধারিনী| ছোট থেকে এই মানুষটাই আমাকে বড় করেছে, নিজে খেয়ে না খেয়ে আমার মুখে অন্ন তুলে দিয়েছে| তাছাড়া বারোতলার ওপরে সাউথ ফেসিং ফ্ল্যাটটা কেনার সময় আমার কন্ট্রিবিউশন তোমার থেকে অনেকটাই বেশি ছিল, মান্থলি ইএমআইয়ের বেশিটা আমিই দিই| তাই আমার মাকে বাইরের লোক বলে দেগে দেওয়ার আগে অন্ততঃ বার দুই ভাবা উচিত তোমার| কিন্তু সংসার করতে গেলে সব কথা সব সময় মুখের ওপর বলা যায় না| তাই অভি চুপ করে গেল| এই মুহূর্তে তার একটাই উদ্দেশ্য ঝামেলার হাত থেকে রেহাই পাওয়া| সময় লাগলেও সে নিশ্চিত সম্রাজ্ঞী ওর সিদ্ধান্তটা মেনে নেবে|
কি হল? চুপ হয়ে গেলে যে? দ্যাখো অভি অনেকরকম ভাবনা চিন্তা করে, দিনের পর দিন নামী ইন্টিরিয়রের সঙ্গে কনসাল্ট করে এই ফ্ল্যাট আমি সাজিয়েছি| এখানে কারোর কোনরকম হস্তক্ষেপ বর দাস্ত করব না আমি…. সে তোমার মা’ই হোন আর যেই হোন| অভি প্র মাদ গুণল| বিষয়টা যতখানি সোজা হবে ভেবেছিল… ততটা নয়| সম্রাজ্ঞী বোধহয় পণ করেছে সহজে মানবে না|
বেশিদিন এখানে মা থাকবে না সোনু| গ্ৰামের ডাক্তারবাবু শুভাশিস আচার্যিই যেমন চিকিৎসা করছেন, তেমনিই করবেন| আমার সঙ্গে ওভার ফোন ওঁর কথা হয়েছে| জাস্ট কয়েকটা টেস্টের ব্যপার, ওগুলো হয়ে গেলে উনি নিশ্চিন্ত হতে পারেন| রিপোর্ট হাতে পেলেই মা গ্ৰামে ফিরে যাবেন| মা নিজেই প্রথমটায় আসতে চাইছিলেন না| নেহাত ডাক্তার আচায্যি অনেক করে বুঝিয়েছেন তাই শেষপর্যন্ত! গ্ৰামের খোলামেলা পরিবেশে যে মানুষ গোটা জীবন কাটিয়েছে, সে এই কংক্রিটের খাঁ চায় চাইলেও বেশিদিন থাকতে পারবে না| তা সে যতই সাজানো গোছানো হোক না কেন… নিশ্চয়ই তুমিও সেটা বুঝতে পারছ|
বাঃ! মায়ের নাম শুনে তোমার মুখে বেশ বুলি ফুটেছে দেখছি| ব্যঙ্গের সুরে বলল সম্রাজ্ঞী, তা এতদিন তুমি এই ইঁটের খাঁ চায় থাকছ কিভাবে? তোমারও দমবন্ধ হয়ে আসে নাকি মাঝেমধ্যে? আসতেই পারে| তুমিও তো খোলামেলা উদার পরিবেশে মানুষ!
আমার কথা আলাদা সোনা, গলাটা কি একটু উদাস হল অভিজিতের? পড়াশোনার সূত্রে বহুদিন হল গ্ৰাম ছাড়া| থাকতে থাকতে এই পরিবেশের সঙ্গে দিব্যি খাপ খাইয়ে নিয়েছি, পাঠ্যবইয়ে পড়া ডারউইনের বিবর্তনবাদ তত্ত্বের মতো| আজকাল বরং গ্ৰামে গেলেই কেমন নিজেকে অতিথি অতিথি বলে মনে হয়| কতদিন আর ডুব সাঁতারে সবচাইতে বড় পুকুরটা এপার ওপার করা হয় না, কতদিন আর মাছ ধরি না ছিপ ফেলে, পুকুরের সেই ট্যাংরা, সরপুঁটির কি স্বাদ… শহরের বাজারে চালানি মাছ সেই স্বাদ পাবে কোথায়?
হঠাৎই চুপ করে যায় অভিজিৎ| বোধহয় স্মৃতির পাতায় নিজেকে হারিয়ে ফেলে ক্ষণিকের জন্য| দেখে দুটো তীব্র দৃষ্টি যেন বলছে আর কত? আর কত অতীতচারণে ডুববে তুমি! অনুরোধের সুরে বলে সে, দুটো দিন সোনা, মাত্র দুটো দিনের তো ব্যপার| প্লিজ এটুকু অ্যাডজাস্ট করে নিও, আমি কথা দিচ্ছি তোমার সংসারে মা কোনরকম সমস্যা তৈরি করবে না| রাইস কুকারে ভাত করা আছে, সঙ্গে মাছ ভাজা আর ডাল| ফ্রেশ হয়ে এসো তুমি, দুজনে একসঙ্গে খেতে বসব|
দিন তিনেক বাদে অফিস থেকে বাড়ি ফিরে অবাক হল সম্রাজ্ঞী|সস্তা দামের শার্ট প্যান্ট পরা এক ছেলে তাদের দামী সোফায় বেশ গুছিয়ে বসে আছে, মুখ চলছে অনর্গল| সেন্টার টেবিলে বড় দুটো প্লেট জুড়ে একগাদা মিষ্টি, সিঙাড়া, ভেজিটেবল চপ সাজানো| উল্টোদিকের সোফায় বসে হাসিমুখে দিব্যি বকবক শুনছে অভিজিৎ| সায়ও দিচ্ছে মাঝেমধ্যে| সম্রাজ্ঞীকে ঢুকতে দেখে উঠে দাঁড়াল ছেলেটা|
মুখটা বেশ হাসি হাসি করে বলল, বৌদি আপনার জন্যই এতক্ষণ অপেক্ষা করছিলাম| অভিটা যে কি করে না, দুম করে এত মিষ্টি সিঙাড়া আনিয়ে বসল| আমি কি একা এত খেতে পারি? বললাম বৌদি এলে সবাই একসঙ্গে খাব… কিন্তু শুনলে তো! কি যে করে না পাগলটা! ছোটবেলার সেই বন্ধুত্ব এখনো ভোলে নি… সব মনে আছে ব্যাটার| আমি তো শুধু মাসিমাকে এখানে পৌঁছে দিতে এসেছিলাম| আচ্ছা বৌদি চলি এবার তাহলে….
ছেলেটা বোধহয় ভেবেছিল সম্রাজ্ঞী রাতে তাকে খেয়ে যেতে অনুরোধ করবে, এত বড় উপকার করেছে তাদের| কিন্তু সেসবের কোন আয়োজন হবে না মুখের চেহারা দেখেই বুঝে গেল সে! মাথাটা বড্ড ধরেছে আমার, একটু শুতে যাচ্ছি| কোনরকমে কথা কটা ছুঁ ড়ে দিয়ে ঘরের ভেতর চলে গেল অভির দা পুটে বউ|সারাটা দিন আজ বড্ড হেকটিক গেছে, বসের সঙ্গে ক্লায়েন্ট মিটে গিয়ে প্রেজেন্টেশনের খুঁটিনাটি বোঝাতে গিয়ে ভুলেই গিয়েছিল সে, আজই বাড়িতে অভিজিতের মা আসছেন|
বাড়ি ফিরে সোফায় বসা ছেলেটাকে দেখেই মাথাটা আবারো গরম হয়ে গিয়েছিল, চোখদুটো দেখে স্পষ্ট বুঝেছিল আশায় আছে শহুরে বৌদি ডিনার করাবে যত্ন করে, তারপর রাতটুকু থেকে যেতে বলবে| হাসি পায়, বড্ড হাসি পায় সম্রাজ্ঞীর, এরা নিজেদের ভাবে কি? কাজকর্ম নেই, করার ইচ্ছেও নেই, সারাদিন কেবল আড্ডা দিয়ে বেড়ায়, আর যেচে পরোপকার করে নিজেদের মহান ভাবে| ভাবুক যে যাক…. ভাবনার ওপর কারই বা নিয়ন্ত্রণ আছে? কিন্তু তা বলে তাকেও যে এভাবেই ভাবতে হবে… সেটা বলল কে?
মাথাটা সত্যিই বড্ড ধরেছে| ফ্রেশ হয়ে নিজের জন্য কড়া করে এক কাপ কফি বানাতে বানাতে শুনতে পেল অভিজিৎ বলছে, আজ রাতটুকু এখানেই থেকে যা| এত রাতে তো বাড়ি ফেরার ট্রেনও পাবি না| মা গেস্টরুমে ঘুমোচ্ছে, তুই বরং সোফায় ঘুমিয়ে পড়| চিকেন কষা করেছি, ক্যাসারোলে রুটি রাখা আছে| কাল ভোরের ডাইরেক্ট ট্রেনটা ধরে নিস|
মনে মনে বোধহয় এমনটাই চাইছিল ছেলেটা| তবু গলায় একটু লজ্জার সুর ফুটিয়ে বলল, কিন্তু বৌদি? বৌদির কোনো অসুবিধা হবে না তো? আমাকে তো এই প্রথমবার দেখছে|
অসুবিধা কিসের? এই ফ্ল্যাটে কি জায়গার অভাব? জানিস তো না তোর বৌদি কতখানি অতিথি বৎসল| নেহাৎ আজ অফিস থেকে ক্লান্ত হয়ে ফিরেছে তায় মাথাটাও ধরেছে… আসলে মাইগ্ৰেনের একটু সমস্যা আছে তো| মাথা ধরলে কিচ্ছুটি করতে পারে না, তখন রান্নাবান্নাও এই অধমকেই সামলাতে হয়| ছুটির দিনে এলে বুঝতিস, তোকে নিজের হাতে কেমন কাবাব বিরিয়ানি রেঁধে খাওয়াত|
মাথায় কি ভিসু ভিয়াসের বি স্ফোরণ? মনে হচ্ছে মাথাটা যেন এবার ফেটে যাবে, চেয়ারে বসে নিজেকে শান্ত করার চেষ্টা করে চলে সম্রাজ্ঞী| কি ভেবে অভিজিৎ একের পর এক মিথ্যে বলে চলেছে? কেন করছে এমনটা? কি বোঝাতে চাইছে সম্রাজ্ঞী তার আজ্ঞাবহ? বাধ্য বধূ? নিজের ফ্ল্যাটে সে যাকে ইচ্ছে তাকে থাকতে দিতে পারে? চাইলেই যা খুশি তাই করতে পারে? এই ফ্ল্যাট যতখানি অভিজিতের ঠিক ততখানিই সম্রাজ্ঞীর| বোধহয় এবার সময় এসেছে সে কথা অভিজিতকে স্মরণ করিয়ে দেওয়ার….
( ক্রমশ )
©️ Monkemoner dakbakso – Anindita
