#থাকো_আমার_পাশে
লেখনীতে:#তাবাসসুম_তোয়া
শেষ.
ইন্ডাস্ট্রি ভিজিট ছিল BSRM-এর স্টিল রড ম্যানুফ্যাকচারিং ইউনিটে।আমাদের গাড়িতে যাওয়ার কথা ছিলো নিশিতা ম্যামের কিন্তু দেখলাম সৌহার্দ্য স্যার এসে উপস্থিত। নিশিতা ম্যাম মৃদু বিদ্রোহের স্বরে বললেন।
” স্যার মেয়েদের বাসে ছেলে এলাও না। ”
তিনি মুচকি হেসে বললেন,
” ড্রাইভার সাহেব নেমে আসুন মেয়েদের বাসে ছেলে এলাও না। ”
মেয়েরা সবাই হেসে উঠলো, স্যারকে পেলে এমনিতেই সবাই খুশী। আমার সামনের সিটে ছিলো ঐশী। স্যার সেখানে এসে দাঁড়িয়ে বললেন
” এখানে বেশ,খোলামেলা বাতাস দেখি ঐশী ঐপাশের সিটে যাও। ”
ঐশী মনঃক্ষুণ্ন হয়ে উঠে গেল৷ স্যার বসে দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে মাথার চুলগুলো কে ঠিক করলেন। ডাবল ডেকার। সেজন্য তার কাঁধ শার্টের কলার সব আমার নজরে এলো। সে মাঝে মাঝেই তার কাঁধে হাত বুলাচ্ছিলো। অন্যদের সাথে পেছনে গল্পের ছলে আমার দিকেও দেখছিলো।
আমি পড়ে গেলাম ভীষণ অস্বস্তিতে। পুরো জার্নিটাই কেটে গেল এক অদ্ভুত অপ্রস্তুত অনুভূতিতে।
মনে হচ্ছিল,স্যার সবসময় আমাকে চোখে চোখে রাখতে চান!কিন্তু কেন? কে জানে এর উত্তর! এই বাসে না এলে কি এমন ক্ষতি হতো তাঁর!
যাই হোক, হাসি-আড্ডা আর আনন্দ করতে করতেই আমরা পৌঁছে গেলাম BSRM-এ! সেখানে ঢুকেই প্রথমে সেফটি ব্রিফিং হলো। একজন স্টাফ আমাদের প্রয়োজনীয় সেফটি গিয়ার কীভাবে পরতে হয়, কীভাবে ব্যবহার করতে হয়—সব বুঝিয়ে দিলেন। ফ্যাক্টরি ভিজিটের বিভিন্ন জায়গায় অসংখ্য সাইনবোর্ড লাগানো থাকে, প্রতিটির অর্থও বিস্তারিত বুঝিয়ে দেওয়া হচ্ছিলো।
যদিও গত তিন বছরে এসব সাইন বইয়ের পাতায় বহুবার পড়েছি, তবু সেদিন প্রথমবার সেগুলো বাস্তবে সামনে থেকে দেখার সুযোগ পেলাম। সেই অনুভূতিটাই ছিল আলাদা।
সবাইকে প্রয়োজনীয় সেফটি গিয়ার দেওয়া হলো,হেলমেট, কোট, সেফটি গ্লাস, সেফটি বুট
সহ আরও কিছু সরঞ্জাম। আমরা একে একে সেগুলো পরে নিলাম। মুহূর্তেই আমাদেরকে ছাত্রছাত্রী কম, ছোটখাটো ইন্ডাস্ট্রিয়াল টিমের সদস্য বেশি বলেই মনে হচ্ছিল।
এরপর আমাদের কয়েকটি গ্রুপে ভাগ করে আলাদা আলাদা সেকশনে পাঠানো হলো, যাতে সবাই কাছ থেকে পুরো ম্যানুফ্যাকচারিং প্রসেস দেখতে পারে। আমরা ধীরে ধীরে ফ্যাক্টরির ভেতরের দিকে এগোতে লাগলাম। চারপাশে বিশাল দানব আকৃতির যন্ত্রপাতি,
বড় বড় মেশিনের শব্দ, ব্যস্ত কর্মপরিবেশ—সব মিলিয়ে এক ভিন্নরকম অভিজ্ঞতা।
সৌহার্দ্য স্যার যথারীতি আমার সামনেই হাঁটছিলেন।হাঁটতে হাঁটতেই তিনি ঘোষণা দিলেন ,
“ যার যার মূল্যবান জিনিস নিজেরা চোখে চোখে রাখুন। ”
ম্যাম হাসলেন। আমি চলছি ম্যামের পিছনে পিছনে স্যার চলছেন ঠিক আমার সামনে৷ আমি উনার থেকে মুক্তি পেতে ধীরে ধীরে যাচ্ছি,যেন উনি আগে চলে যান,আমি পেছনে পড়ি৷ কিন্তু দেখলাম উনিও থেমে গেলেন, আমি আগে তার অব্দি পৌঁছাচ্ছি তারপর উনি আমার সামনে সামনে যাচ্ছেন।
আমাদের নিয়ে যাওয়া হলো রিহিটিং ফার্নেস ডিসচার্জ এরিয়ায়। যেখান থেকে উত্তপ্ত লাভার মতো রড গুলোকে টেনে বের করা হয়!
জায়গাটা ছিল অসহ্যরকমের গরম।
বিশাল মেশিনের ভেতর থেকে জ্বলন্ত রড গুলো আরেকটি রডের সাহায্যে টেনে বের করে বাইরে ফেলা হচ্ছিল। দৃশ্যটা বেশ ভয়ঙ্কর।
ঐসব শ্রমিকদের পায়ের সেফটি বুট ছিলো অনেক লম্বা একদম হাটু সমান।
উনারা সারাদিন ঐ উত্তপ্ত লোহার তরলের মধ্যে থাকেন! কি সাংঘাতিক অবস্থা!
শ্রমিকরা রড টান দিচ্ছিলো আমরা দেখছিলাম।আমরা একদম কাছে ছিলাম।
হঠাৎ একটা রড টান দিতেই আমি ভয় পেয়ে খানিকটা পাশের দিকে সরে গেছি। কিন্তু বুঝতেই পারিনি, উত্তপ্ত রডের অপর প্রান্ত ঘুরে এসে আমার বোরকায় লেগে গেল।
মুহূর্তের মধ্যে পাশের একজন শ্রমিক দ্রুত আমাকে সরিয়ে দিলেন। আমাকে দিব্য ধরলো। একটুর জন্য বড় বিপদ থেকে বেঁচে গেলাম।
সৌহার্দ্য স্যার তখন পাশে ছিলেন না। আমি নিজেই ইচ্ছে করে দূরত্ব রেখে রেখে একদম সরে গিয়েছিলাম। কিন্তু ঘটনা বুঝতে পেরে তিনি প্রায় দৌড়ে চলে এলেন। এসে প্রথমেই মাথা নিচু করে আমার পায়ের পাশটা দেখলেন, যেখানে বোরকার কাপড় হালকা পুড়ে গেছে।
সেফটি বুট ছিলো তাই তেমন সমস্যা হয়নি। তবে
খানিকটা তাপ পেয়েছি এই যা। যেটা কাউকে বুঝতে দেইনি!
সেই পা নিয়ে হাঁটলাম পুরো ইন্ডাস্ট্রি! তবে ফোস্কা পড়ে গেছে। হাঁটলাম খুব কষ্টে। তিনি হয়তো বুঝলেন। ভিজিট শেষে ব্রিফিং হলো। কয়েকজনের অভিমত বলতে বলা হলো। সৌহার্দ্য স্যার বরাবরের মতো আমার নাম বললেন। বাধ্য হয়ে আমাকেও বলতে হলো।
তখন সবাই চা নাস্তা করছিলো আমি আর হাঁটতে পারছি না দেখে বাসে এসে বসলাম। বাসে বসে ছোট্ট ফ্যানটা ছেড়ে বাতাস খাচ্ছি, বুঝলাম বাসটা ঝাঁকুনি খেলো, কেউ উঠলো বাসে। তাকিয়ে দেখি সৌহার্দ্য স্যার। আমার দিকে একটা আইস ব্যাগ বাড়িয়ে দিয়ে বললেন,
” পায়ে লাগাও। ”
বলেই নেমে গেলেন। আমি স্তব্দ হয়ে বসে থাকলাম।
উনি টের পেলেন কখনো! আর এখানে আইস ব্যাগ ম্যানেজ করলেন কিভাবে?
দুই পায়ের গোড়ালিতে ব্যাগ চেপে রাখছি। শান্তি লাগছে।
তারপর আবারও খানিকটা সময় পর আমার পাশের জানালায় নক করলেন কেউ। আমি জানালা দিয়ে নিচে তাকিয়ে দেখি স্যার৷
নাস্তার প্যাকেটটা বাড়িয়ে দিয়ে বললেন।
” নাস্তা না করে চলে এসেছো কেন? ”
আবারও হতবিহ্বল হলাম। এই স্যারের কি সমস্যা?
আমি যে উইয়ার্ড ফিল করি সেটা উনি টের পাননা?
.
ইন্ডাস্ট্রি ভিজিট থেকে ফিরে গ্রুপ ভিত্তিক প্রজেক্ট ভাগ করে দেওয়া হলো।
আমি আমার প্রজেক্ট সৌহার্দ্য স্যারের আন্ডারে করতে চাইনি। মাথা খারাপ। ঐ পাগলের আন্ডারে কে যাই৷ কিন্তু অতীব দুঃখের বিষয় স্যার আগেই আমার নাম জমা দিয়েছিলেন। সেদিন ক্যাম্পাসে পৌঁছাতেই তিনি প্রজেক্টের কাগজ আমার হাতে ধরিয়ে দিলেন। আমাকে সহ দিব্যকে।
তারপরের পনের দিন খাটালেন সেই খাটুনী! তবে আমাদের প্রজেক্টটা বেস্ট হলো। সেটাও স্যারের অবদান। খানিকটা রেজাল্ট না মিললেই উনি আবারও পাঠাচ্ছিলেন সেই কাজটা করতে। হয়তো এজন্যই!
.
নিয়ম করে প্রত্যেকটা পরীক্ষার আগে আমার মেইলে অনেকগুলো মেইল আসতো। খুলে দেখতাম, Showhardo.me.buet .ac.bd থেকে মেইল!মেইলটা এতো পরিচিত হয়ে উঠেছিলো।সেটাতে থাকতো পরীক্ষা সংক্রান্ত সকল ফাইল কিংবা নোট! যেগুলো খুব কাজে দিতো। সেগুলো প্রিন্ট করে আমি পড়তাম। সাথে আমার নোট গুলো। তার মেইলের জবাবে শুধু একটা মেইল সেন্ড করতাম।
” থ্যাঙ্ক ইউ স্যার! ”
.
চার বছর কেটে গেল খুব দ্রুত। থিসিসের জন্য বাইরে যাওয়ার চেষ্টায় ছিলাম। তবুও ভর্তি হয়ে গেলাম নিজ ক্যাম্পাসে! থিসিস পড়লো আবারও স্যারের আন্ডারে! স্যার নিজেই নাম মেনশন করেছেন। স্যার মানেই গাধার খাটুনি তবে ১০০% আউটপুট! উনার নিজস্ব ল্যাবে শুরু হলো আমার থিসিসের পদযাত্রা! সাথে আমাদের ব্যাচের তুখোড় কয়েকজন।
.
সেদিন ল্যাবে দূর্ঘটনা ঘটলো। ল্যাবে আমার একটা কেমিক্যাল রাখার জন্য টু নেক রাউন্ড বোতলের দরকার ছিলো। অনেক খুঁজলাম কারো কাছে নেই! কিন্তু আমি সলুশনটাকে ভ্যাকুয়াম করতে হতো। শেষে IR & NMR নিতে হবে। কিন্তু ভ্যাকুয়াম করবো রাউন্ড বোতলই নেই। আবার অর্ডার দিলে আসতে লাগবে এক সপ্তাহ। শুধু শুধু এক সপ্তাহ অপেক্ষা কেন? আমি ল্যাবের স্টোরে খুঁজলাম, পুরনো কোন বোতল পাওয়া পসিবল কিনা। এবং অনেক খোঁজা খুঁজি শেষে একটা বোতল পেলাম একটা কর্কশিটের ভেতর। কিন্তু সমস্যা সেটার দুইটা নেক-ই র্কক দিয়ে আটকানো ছিলো এবং ভেতরে একটা স্বচ্ছ কেমিক্যাল। যেহেতু লেবেলিং করা নেই তাই বুঝতে পারছিলাম না কেমিক্যল টা কি? তবে যেহেতু স্বচ্ছ তার মানে এখনও কেমিক্যালটা ঠিক আছে৷ আমি সেটা ওয়াশ করতে আনলাম বেসিনে।
ঠিক তার দুই মিনিট আগে আমি বেসিনে আমার চেহারাটা ক্লিন করেছি সেজন্য নেকাব নামানোই ছিলো। ব্যস বেসিনের এদিকে কেউ তখন ছিলোও না৷ আমি বোতলটাকে খুলতে কর্ক ধরে ঘুরাচ্ছি কিন্তু এতো টাইট কিছুতেই খুলল না। একেবারে গ্রিজ দিয়ে আঁটা। আমার হাতে তখনও সেফটি গ্লাভস! এজন্য বোতলটাকে পেটের সাথে লাগিয়ে মোচড় দিলাম। সাথে সাথে বাম্প করলো। আর ধোঁয়ায় একদম অন্ধকার হয়ে গেল চারিপাশে। মূহুর্তে সেই কেমিক্যাল ঢুকে গেল আমার নাকে মুখে। অথচ বোতল থাকা সলুশনটা একদম স্বচ্ছ ছিলো সে হিসেবেই আমি ভেবে ছিলাম বাম্প করার কোন কারনই নেই! জীবনে কি ততদিনে কম কেমিক্যাল খেলাম! আর কি বাকি ছিলো!
নাইট্রিক এসিড কিভাবে ইনহেল করলাম টেরই পেলাম না। যতক্ষনে সেন্সলেস হয়ে গেছি ততক্ষণে দেখছি আমাকে ধরে দাড় করিয়ে বার বার পানির ঝাপ্টা দেওয়া হচ্ছে। আর সেটা করছেন সৌহার্দ্য স্যার নিজে। আমি ঐ অবস্থাও ভীষণ ভীষণ অস্বস্তি হচ্ছিল! বলতে চাচ্ছিলাম উনি কেন? কোন কি মেয়ে নাই। কিন্তু বলতে পারলাম কই?
জ্ঞান ফিরলো হাসপাতালে। নাকে মুখে ঝাঁঝ ভর্তি! গলা ভর্তি কেমিক্যাল! কি যে অস্বস্তি হচ্ছে! আমার সাথে বান্ধবী দিব্য। ছেলেরাও অনেকে ছিলো। তখন সৌহার্দ্য স্যারকে দেখলাম ডাক্তারের সাথে কথা বলতে বলতে কেবিনে ঢুকলো। দিব্যকে বললো,
” শান্তরা ক্যান্টিনে যাচ্ছে তোমাকেও ডাকছে। যেতে পারো আমি আছি। ”
দিব্য লাফাতে লাফাতে চলে গেল। বেডি একদম পেটুক। সারাদিন খায় খায়৷ আমি যে বেডে পড়ে কাতরাচ্ছি আমারে ফেলে সে লাফ দিয়ে চলে গেল!
ডাক্তার আমাকে পরীক্ষা করলেন। একটা ইনহেলার দিয়েছেন কিছু ঔষধপত্র। সৌহার্দ্য স্যার বললেন,
” সাজিদ,কি অবস্থা মনে করছো? ”
” আলহামদুলিল্লাহ, সমস্যা নাই আর কোন। শুধু বাচ্চা কাচ্চা সব কেমিক্যাল হয়ে জন্মাবে। ”
সৌহার্দ্য স্যারকে দেখলাম এমন লাজুক হাসলো।
চোখ বড় বড় করে একদম খেয়ে ফেলা দৃষ্টি দিলেন ডা: সাজিদের দিকে।
ডাক্তার সাজিদ হাসতে হাসতে বেরিয়ে গেলেন, উনিও চুপচাপ বেরিয়ে গেলেন তার পিছু পিছু। তখন শব্দ করে একটা মার পড়লো কারো পিঠে। আমি ঠিক শুনলাম ডাক্তার সাজিদ বলল
” মারিস কেন? আমি কি ভাবী কে কিছু বলেছি? বলেছি তোকে! তোর কেমিক্যাল বাচ্চা হবে। ”
আবারও মার পড়লো!
” যা মারলি বদদোয়া দিলাম,এক ডজন কেমিক্যাল বাচ্চা পয়দা হবে তোদের! ”
তখনই শুনলাম হুটোপুটির শব্দ।
” থাম বলছি! থাম! ”
উনারা এতো বড় হয়েও মারামারি, দৌড়াদৌড়ি করেন!
আমার তখন কথাগুলো মাথায় ধরলো! কিহ! ভাবী কে?
আমি?
কেমনে?
মাথা ভনভন করলো! কি বলে এসব!
স্যার ডিসচার্জ নিয়ে চললেন। সাথে দিব্য ছিলো। স্যার বাসায় নামিয়ে দিলেন। শুধু নামালেন না বাসায় আম্মুর সাথেও কথা বলে গেলেন। কি কি থেকে দূরে থাকতে হবে সেগুলোও বললেন। আমি রুমের দরজায় দাড়িয়ে চুপচাপ তার কথা গুলো শুনলাম!
দু দিন পর থেকে ল্যাব কন্টিনিউ করলাম। দেখি, নতুন রুলস রেগুলেশন টাঙানো প্রত্যেকটা ল্যাবে ল্যাবে- সেফটি প্রিকশন! আমি তো নেকাবী তবুও আমাকে নেকাব সরিয়ে মাস্ক পরতে বলা হলো। স্যার বললেন,
” বলা তো যায় না! দেখা যাবে সঠিক কাজের আগে ঠিক নেকাব খুুলে বসে রয়েছে! ”
তারপর থেকে সৌহার্দ্য স্যার ল্যাবে মাঝে মাঝেই ভিজিট দিয়ে যান। এমনিতেই থিসিসের সুপারভাইজাররা খুব কমই ল্যাবে আসেন অথচ সেই ঘটনার পর থেকে স্যার মাঝে মাঝেই ল্যাবে ঢু দিয়ে যান। আমার শান্তি গেল উধাও হয়ে! ল্যাব একমাত্র প্লেস ছিল যেখানে স্যার কম যেতেন!
.
এর মধ্যে একদিন সৌহার্দ্য স্যারের ফোন। এবার আর স্টুপিড সম্বোধন করেননি! খুব স্বাভাবিক কণ্ঠে বললেন,
” আয়রা, তোমার একটা অনুষ্ঠান রয়েছে। ইনভাইটেশন মেইল পাবে Registrar Office থেকে। যথাসময়ে উপস্থিত থাকবে। ”
পরেরদিন আমি গেলাম সেন্ট্রাল অডিটোরিয়ামে।
সাজানো ছিলো বেলুনের গেট দিয়ে। ভেতরে প্রবেশ করতেই ভীষণ সুন্দর সাজানো অডিটোরিয়াম।
Faculty of Engineering Academic Excellence Award Ceremony.
অনুষ্ঠান শুরু হওয়ার আগেই ভর্তি হয়ে গেল পুরো হলরুম।
সামনের সারিতে শিক্ষক, ডিন, বিভাগীয় প্রধানরা বসলেন। উপস্থাপক মাইকে স্বাগত জানালে পুরো হল নিস্তব্ধ হয়ে গেল। তারপর কোরআন তেলওয়াত, জাতীয় সংগীত, উদ্বোধনী বক্তব্যের মাধ্যমে অনুষ্ঠান শুরু হলো। আমার সাথে আমার বান্ধবীরাও ছিলো। এর ফাঁকে হলো সাংস্কৃতিক পরিবেশনা। একটা গ্রুপকে ডাকা হলো, তারা স্টেজে এসে গাইলো সেই অতি পরিচিত গানটা,
” স্বপ্নে আমার তোমার ছবি চুপটি করে আসে…
সকাল থেকে রাতের শেষে থাকো আমার পাশে… ”
যখনই তারা গাইছিলো, আমি আড়চোখে স্যারকে দেখলাম। সৌহার্দ্য স্যার বসে ছিলেন সামনের সারির ডান পাশে।
তিনিও আমার দিকেই তাকিয়ে ছিলেন আড়চোখে।চোখাচোখি হলো! এমন লজ্জা পেলাম। আর সেদিকে তাকালাম না। বেশ কিছু উপস্থাপনা, বক্তব্য শেষে আসলো নাম ঘোষনার পালা।নাম ঘোষণার সময় মূর্হমূর্হ করতালিতে ফেটে পড়ছিলো পুরো অডিটোরিয়াম! পুরষ্কার নিতে স্টেজে যাচ্ছিলো সবাই!
তখন হুট করেই আমার নাম ঘোষণা শুনে স্তব্ধ হয়ে গেলাম৷ বলে কি? সত্যিই আমি!
Vice Chancellor’s Academic Excellence Award.
undergraduate এর একাডেমিক পারফর্মেন্সের উপর!
আমি থরথর করে কাঁপছিলাম!সত্যিই আমার নাম? একবার চোখ তুলে তাকালাম। স্যার আমার দিকেই তাকিয়ে ছিলেন! কি ভীষণ খুশী তিনি! অথচ আমি কাঁপছি! কিভাবে সম্ভব! তিনি আমাকে ইশারা করলেন স্টেজে যেতে আমি কাঁপতে কাঁপতে গেছি স্টেজে! সিঁড়ি দিয়ে উঠার সময় মাথা ঘুরছিলো! মনে হচ্ছিল ঘুরে পড়েই যাবো। তিন স্টেপ সিঁড়িও যেন কত উঁচু!
ভাইস চ্যান্সেলার স্যার আমার হাতে এওয়ার্ড তুলে দিলেন! অভিহিত করলেন তুখোড় ছাত্রী হিসেবে!
আমাকে দুই লাইনের সংক্ষিপ্ত বক্তব্য রাখতে বলা হলো। আমি বললাম বেশ কিছু কথা। সৌহার্দ্য স্যারকে ধন্যবাদ জ্ঞাপন না করলে সেটা ভীষণ অন্যায় হতো। তাই স্যারের নাম মেনশন করলাম।
স্যার চুপচাপ নিচের দিকে তাকিয়ে বসেছিলেন। স্যার যে ভীষণ খুশী সেটা আমি বুঝতে পারছিলাম!
সেদিন স্টেজে দাঁড়িয়ে সেই বিশাল জনসমুদ্রের সামনে
কথা বলতে আমার ভয় করেনি মোটেও। আমার সামনে বসে ছিলেন অসীম সাহসের ভান্ডার! যে তার সাহসের ঝুলি থেকে আমাকে অনেকখানি সাহস দিয়েছেন!
অনুষ্ঠান শেষে মন বললো তাকে ধন্যবাদ দেওয়া উচিত। খুঁজলাম স্যারকে কিন্তু তিনি ছিলেন না অডিটোরিয়ামে! ডিপার্টমেন্টে ফেরত এলাম। কেবিনে নেই এই ফ্লোর ঐ ফ্লোর সব খুঁজলাম! তিনি কোথাও নেই! শেষে দেখলাম ফ্যাকাল্টি বিল্ডিংয়ের সামনে আমার বন্ধুদের সাথে। এগিয়ে যেতেই বললেন।
” আয়রা, তোমার রিয়াকশনের কি খবর? কতদূর করেছিলে? ”
আমি তাকে বিস্তারিত বলতে শুরু করলাম!একটু আগে যে আমি এতো বড় অর্জন করেছি সেটা যেন উনি একদম ভুলে গেছেন।
আবারও প্রশ্ন করলো৷ তাকে ধন্যবাদ দেওয়ার চেষ্টা করলাম সে প্রসঙ্গ চেঞ্জ করে ফেললো। তাকে বোঝা বড্ড মুশকিল!কথা শেষে যখন চলে গেলেন তাকিয়ে তাকিয়ে শুধু দেখলাম। কি হলো এটা! কথা তো বলতেই পারলাম না৷ কিন্তু তাকে বলার ছিলো বেশকিছু কথা!
.
ক্রেস্ট আর সার্টিফিকেট নিয়ে যখন বাসায় পৌঁছেছি বাসার সবাই সে কি ভীষণ খুশী! বাবা সবাইকে দাওয়াত দিলেন। বাড়িতে শুরু হলো আয়োজন আর আমি সারা বিকাল পড়ে পড়ে ঘুমালাম। রাতের দিকে দেখি বাসা ভর্তি মানুষ! কারা এতো? মামা খালা চাচা চাচী সবাই। কাজিনরা অনেকেই এসেছেন৷ সবার সাথে অনেক আনন্দ হলো।
রাতের দিকে ওরা সবাই ছাদে গেছে,কখন গেছে টের পাইনি, কিছু লেখা বাকি ছিলো আমি রুমেই ছিলাম। জিসান এসে ডাকলো,
” আপু সবাই ছাদে তুমিও চলো! ”
হঠাৎ এ কারেন্ট চলে গেল। তাকিয়ে দেখলাম জোৎস্না রাত। কাজিনরা সবাই ছাদেই ছিলো। আর বাইরের ঘরে বেশ কিছু মেহমান।
গরমে অতিষ্ঠ হয়ে সবাইকে নিয়ে আব্বু ছাদে গেলেন৷ আমাদের ফ্লোরটা ছাদের এক ফ্লোর নিচে। আম্মু এসে আমার ওড়নাটা দিয়ে মাথা পিন আপ করে যেতে বললেন। তাই করলাম। চুপচাপ ছাদে গেলাম।
জেৎস্না রাত তাই সব দেখা যাচ্ছিল। দুই গ্রুপ বসে রয়েছে। আর ঐদিকে ছোট বাচ্চারা। আমি বড়দের গ্রুপের দিকে আসলাম। আমাকে দেখে ছোট মামা কৌতুক শুরু করলেন। সবাই গোল হয়ে চেয়ারে বসে। আমি গিয়ে দাঁড়াতেই সেজ ভাই দাঁড়িয়ে গেল।
আব্বু ভাইয়া মামা আর কে কে জানি ছিলো!ওতো খেয়াল করিনি? ভাইয়া বলল,
” বস এখানে! ”
ভদ্র বালিকার মতো বসলাম। মামা হাসির কমিকস বললেন সেটা শোনায় মনযোগী ছিলাম তাই আশেপাশে কে রয়েছে আর দেখা হলো না। সবাই এমন এমন কথা বলছিলেন আমরা হাসতে হাসতে শেষ। পাশের একজন আমার হাতে চায়ের কাপ দিলো। আমি খুশী হয়ে সেটা নিয়ে চুপচাপ খেতে শুরু করলাম। গল্প গুজবের মধ্যে আমারও বারি এলো,আমি যা পারতাম তাই বললাম।আমিও একটা কমিকস শুনালাম। মিশি বললো,
” আপু আরেকটা। ”
” উহু। ”
তখন মামা বললেন,
” সৌহার্দ্য, তুমি কিছু বলবে? ”
আমার মাথা এক মূহুতের মধ্যে ঘুরে গেল।
আৎকে উঠলাম! সৌহার্দ্য? কে?
” না মামা, জ্ঞানী গুনিদের ভিড়ে আমি এক অখ্যাত কুখ্যাত নিরিহ মানুষ! ”
কন্ঠস্বর শুনে আমার নিশ্বাস বন্ধ হয়ে এলো। পাশ ফিরে দেখলাম আমার একদম পাশে সৌহার্দ্য স্যার৷ চেয়ারটা খানিকটা পেছনে তাই তাকে এতো সহজে দেখাও যাচ্ছিলো না। তিনি চেয়ারে হেলান দিয়ে বসে আয়েশ করে আমার দিকেই তাকিয়ে! চেহারা জুড়ে বিস্তৃত হাসি। উহু বিশ্বজয়ের হাসি!
তার মানে গত আধা ঘন্টা ধরে আমি তারই পাশে বসে। তিনিই আমাকে চা দিলেন! আমি সাথে সাথে দাড়িয়ে পড়েছি। দ্রুত সিড়ি ঘরের দিকে দৌড় দিলাম। সবাই যেন হেসে উঠলো! ব্যাপারটা কি ঘটলো বুঝতেই পারলাম না।
উনি কেন এসেছেন আমাদের বাড়িতে আর কখন এসেছেন। আল্লাহ!আর আব্বুরাই বা উনাকে চেনেন কিভাবে?
আমি ছুটে নেমে গেছি। সরাসরি কিচেনে,
” মা আমাদের ভার্সিটির একজন স্যার এসেছেন? ”
” বললাম না মেহমান এসেছে। ”
” এটা তে বলোনি আমার একজন স্যার এসেছেন। ”
” এসেছেন, তবে তিনি স্যার হিসেবে আসেননি এসেছেন হবু জামাই হিসেবে? উনার বাবাও এসেছেন! ” বললো নিশু আপু।
” কার জামাই হিসেবে? ”
” কার জামাই চাচী বলেন তো? আমার ছোট চাচীর একমাত্র জামাই! ” আপু কৌতুক করলেন। আম্মুর একমাত্র জামাই! মানে আমার….?
” স্যার তোর হাত চেয়েছেন চাচার কাছে। আর সেটার জন্যই আজকের এই আয়েজন। উপরে এতক্ষণ কনে দেখা চলছিলো। তুই টের পাসনি! ”
মাথায় বাজ পড়লো একটা। হায় আল্লাহ!
এতক্ষণ ধরে তার পাশে বসে হাসাহাসি করলাম। কিন্তু কিছুই টের পেলাম না। তারপর সব কিছু এতো দ্রুত হয়ে গেল। সব যেন মাথার উপর দিয়ে গেল!
ঠিক এক সপ্তাহের মাথায় তার নামের কবুল বলে তার সাথে বাধা পড়লাম আজীবনের বন্ধনে।
.
পুরোটা বিয়ের অনুষ্ঠান শেষ হয়েছে তার দিকে একবারও দেখিনি! শুধু শক্ত শক্ত কন্ঠস্বর শুনছি আর ভয় পাচ্ছি! স্যার হিসেবে কেমন কঠোর! স্বামী হিসেবে কেমন হবেন? আমি জানি না! ইয়া আল্লাহ! উনি সত্যি সত্যিই আমার হাসবেন্ড? আর আমি ডা: মুনতাসীর রহমান সৌহার্দ্যের ওয়াইফ!
বিশ্বাস হতে চাইলো না। অথচ উনিই আমাকে কোলে রেখে রুমে রেখে গেছেন! উনার রুমে বসে বসে আল্লাহ কে ডাকছি! জীবনের পরীক্ষা গুলো এতো ভয়াবহ কেন? পুরো স্টুডেন্ট লাইফ মনে হলো পরীক্ষা গুলোই সবচেয়ে কঠিন বিষয় অথচ স্টুডেন্ট লাইফ শেষ করে মনে হচ্ছে! আল্লাহ! এটা তো পরীক্ষার হল থেকেও কঠিন! এই পরীক্ষা থেকে কিভাবে পালাবো?
যখন প্রহর গুনছি এমন সময় উনি এলেন। ভেতরে প্রবেশ করে গেট লাগাতেই ভীষণ কাঁপছিলাম! দৌড়ে পালিয়ে গেলে ভালো হতো! এতোদিন অন্য সৌহার্দ্য স্যারকে দেখেছি আজ অন্য সৌহার্দ্য। ভয়ে হাত পা ঠান্ডা হয় আসছে। শুনলাম উনি বললেন।
” আয়রা, উঠে এসো। ”
নামতে চাইলাম কিন্তু লেহেঙ্গা চারদিকে বিছানো ছিলো সেটাতে পায়ে বেধে গেল। উনি এগিয়ে এসে লেহেঙ্গা ঠিক করে দিলেন।
চুপচাপ নেমে দাড়ালাম। আমার দৃষ্টি নিচে৷ তার পায়ের দিকে। সে আমাকে আদেশ দিলে যেন।
” ঘোমটা সরাও, আমাকে দেখো৷ ”
পারলাম না। আমি তো কাঁপছি তখনও অব্দি!
” আমি তোমাকে আমার সমকক্ষ হিসেবেই তৈরি করেছি, আয়রা। ওমন ভাবে কাঁপার জন্য নয় নিশ্চয়ই! ”
আমি শুধু শুনলাম। উনি আজ যতই লেকচার দিক কোন কাজ হবে না। এটা কোন শ্রেণিকক্ষ ছিলো না৷ বরং আমার জীবনের সবচেয়ে বড় কক্ষ। যেখানে আমি সবচেয়ে নাজুক অবস্থায়! আমার বুক কাঁপছে তো কাঁপছেই।
তিনি হাসলেন। উনি আমার হাত পায়ের কাঁপুনি দেখে বললেন,
” এতোদিন কি শিখালাম,আয়রা? হুম! সাত খন্ড রামায়ণ পড়ে সীতা রামের মাসি? ”
তিনি নিজেই ঘোমটা নামিয়ে দিলেন। চুলে টান পড়লো। তিনি আলতো হাতে সেফটি পিন থেকে চুল গুলো ছাড়িয়ে নিয়ে ওড়নাটাকে সরিয়ে রাখলেন বিছানায়! ঘেমে নেয়ে একাকার! তটস্থ হয়ে উঠলেন ”
” কি অবস্থা এটা? এসি চলছে না? ”
উনি রিমোট খুঁজে নিয়ে টেমপারেচার আরোও কমিয়ে দিলেন।
আমি ঘামছি, প্রেসারে। ফল করছে দ্রুত! আর উনি দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে পরীক্ষা নিচ্ছেন। ধুপ করে পড়ে গেলে বুঝবেন মজা! উনি আমার সামনে এগিয়ে এসে থুতনিতে হাত দিয়ে উঁচু করে বললেন,
” দেখি, তাকাও, সেদিন কিছু বলতে চেয়েছিলে আমাকে? ”
” ক..কবে ? ”
” এওয়ার্ডের দিন! ”
” জ্ব..জ্বি হ্যাঁ। ধন্যবাদ দিতে চেয়েছিলাম। ”
” কিন্তু আমার তো শুধু ধন্যবাদে চলতো না। সেজন্য নিই নাই! ” উনার চোখে দুষ্টু হাসি।
কি চায় জিজ্ঞাসা করার মতো সাহস নেই। ঠিক উল্টাপাল্টা উত্তর দেবেন তার থেকে এই ভালো চুপ থাকি। সে নিজেই প্রশ্ন করলো।
” কি চাই জিজ্ঞাসা করলে না? ”
আমি মাথা এপাশ ওপাশ করলাম, সে বলল,
” কেন? ”
কোনরকমে বললাম,
” আ..আমি জানি! ”
” কি চাই? ” উনিই প্রশ্ন করলেন। আমি হাসলাম। হেসে মাথা এপাশ ওপাশ করে নাড়ালাম।
তিনি মুখটাকে কানের কাছে আনলেন। ফিসফিস শব্দে পাথর হয়ে গেলাম,
” থ্যাঙ্কিউ গিফট হিসেবে তোমার গোটা জীবনটাকেই চাই! ”
তারপর তিনি হাত বাড়িয়ে দিলেন।
” থাকবে আমার পাশে? ”
কাঁপা হাতটা এগিয়ে তুলে দিলাম উনার হাতে, মুখে বলা হলো না। ‘ থেকে গেলাম! ‘
~ সমাপ্ত ~
