#রিক্ততার_সুর
#ইসরাত_সুলতানা_আশা
#অন্তিম_পর্ব
মেঝেতে বসে থাকা চারুর চোখের পানি যেন আর থামতেই চাইছে না। গাল দুটো এখনো জ্বলছে শান্তর থাপ্পড়ে, কিন্তু তার থেকেও বেশি জ্বলছে অপমান আর ভাঙা বিশ্বাসের দগদগে ক্ষত।
সেদিনের পর থেকে চারু বদলে গেছে; যে মেয়েটা সবসময় হাসিখুশি থাকতো, শান্তকে দেখলেই যার চোখ ঝলমল করে উঠতো—সে এখন শান্তকে দেখলেই চোখ নামিয়ে নেয়।
কথা বলা তো দূরের কথা, সামনে পড়লেও এড়িয়ে চলে।
ওদিকে শান্ত…
প্রথম কয়েকদিন সে নিজের ইগোতেই ছিল—
“ও ভুল করেছে, আমি ঠিক করেছি।”
— কিন্তু সময় যত গড়ালো, ততই চারুর নীরবতা তাকে কুরে কুরে খেতে লাগলো। চারুর সেই আগের মতো “শান্ত ভাই” বলে ডাক না পাওয়া…
—“ তার সামনে এসে অকারণে কথা না বলা…সবকিছু যেন অদ্ভুত শূন্যতা তৈরি করলো তার ভেতরে।”
একদিন রাতে শান্ত আবার ডায়েরিটা খুলে বসে পাতাগুলো উল্টাতে উল্টাতে হঠাৎ তার চোখ আটকে যায় একটা জায়গায়—
“তোমাকে না বলেও ভালোবাসা যায়…
কিন্তু না বুঝে যদি তুমি দূরে ঠেলে দাও, তখন সেই ভালোবাসাটাই সবচেয়ে বেশি কষ্ট দেয়…”
শান্তর বুকটা ধক করে উঠলো। সে থমকে গেল।
এই লাইনগুলো সে লিখেছিল… কিন্তু আজ মনে হচ্ছে যেন এই কথাগুলো চারুর জন্যই লেখা।
হঠাৎ সবকিছু যেন পরিষ্কার হয়ে গেল তার কাছে। চারুর ডায়েরি নেওয়া…ওর চোখের পানি…ওর নীরবতা…
সবকিছুর মানে একটাই—চারু তাকে ভালোবাসে!
পরদিন সকাল…
চারু ছাদে দাঁড়িয়ে ছিল। হালকা বাতাসে তার চুলগুলো উড়ছে, কিন্তু তার মনটা ভারী। পেছন থেকে শান্ত ধীরে ধীরে এসে দাঁড়ালো।
—“চারু…”
চারু থমকে গেল, কিন্তু ঘুরে তাকালো না।
—“কিছু বলার আছে?” ঠান্ডা গলায় জিজ্ঞেস করলো সে।
শান্ত কিছুক্ষণ চুপ করে থাকলো, তারপর বললো—
—“আমি খুব বড় ভুল করেছি।”
চারু মৃদু হেসে বললো—
—“ভুল তো সবাই করে।”
—“না চারু… আমি শুধু ভুল করিনি, আমি তোকে না বুঝে অপমান করেছি।”
চারু এবার ধীরে ধীরে ঘুরে দাঁড়ালো। তার চোখে পানি নেই, কিন্তু একটা অদ্ভুত শূন্যতা আছে—
—“আপনি তো ভাবেন আমি চোর… তাই না?”
শান্ত তাড়াতাড়ি মাথা নাড়লো—
—“না! আমি জানি তুই তা না… আমি রাগের মাথায়—”
—“রাগের মাথায় মানুষের আসল চেহারাটা বের হয়ে আসে।”
চারুর কথায় শান্ত থেমে গেল; তার কাছে কোনো উত্তর নেই।
শান্ত ধীরে ধীরে বললো—
—“তুই আমার ডায়েরিটা কেন নিয়েছিলে?”
চারু কিছুক্ষণ চুপ করে থাকলো।
তারপর একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললো—
—“জানতে চেয়েছিলাম… আপনি কাউকে ভালোবাসেন কিনা।”
শান্তর বুক কেঁপে উঠলো;—“কেন জানতে চেয়েছিলে?”
চারু হালকা হেসে বললো—
— চারু আজকে কোনো দ্বিধা ছাড়ায় শান্তকে বলে দেয়—“কারণ আমি তিন বছর ধরে আপনাকে ভালোবাসি…”
কথাটা বলেই চারু চোখ নামিয়ে নিলো।
—“কিন্তু এখন মনে হয় বলাটা উচিত হয়নি… কারণ আপনি আমাকে বিশ্বাসই করেন না।”
শান্ত নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে রইলো। তার মনে হচ্ছিল—
এই মুহূর্তে যদি সে কিছু না বলে, তাহলে হয়তো সবকিছু চিরদিনের জন্য হারিয়ে ফেলবে।
সে ধীরে ধীরে বললো—
—“আমি কখনো বুঝতেই পারিনি…”
চারু কষ্টের হাসি দিলো—
—“বুঝবেন কিভাবে? আমি তো বলিনি…”
—“আর তুই না বললে আমি কি করে বুঝবো?”
—“ভালোবাসা সবসময় বলে দিতে হয় না…”
চারুর কথাটা বাতাসে ঝুলে রইলো। কিছুক্ষণ নীরবতার পর শান্ত এগিয়ে এসে বললো—
—“আমি জানি, আমি তোর বিশ্বাস ভেঙে দিয়েছি…
কিন্তু একটা সুযোগ কি পেতে পারি?”
চারু তাকালো তার দিকে—
—“কিসের সুযোগ?”
—“সবকিছু নতুন করে শুরু করার।”
চারু কিছুক্ষণ চুপ করে রইলো। তার চোখে আবার পানি চলে এলো—
—“ভাঙা জিনিস কি আগের মতো হয় শান্ত ভাই?”
শান্ত ধীরে বললো—
—“না… আগের মতো হয় না।
কিন্তু নতুনভাবে গড়া যায়… যদি দুজনেই চাই।”চারু চোখ বন্ধ করলো এক মুহূর্তের জন্য।
তার তিন বছরের ভালোবাসা… কষ্ট… অপমান—সবকিছু যেন ভেতরে ভেতরে লড়াই করছে।
কিছুক্ষণ পর সে ধীরে ধীরে বললো—
—“আমি জানি না ভবিষ্যতে কি হবে…কিন্তু একটা জিনিস জানি—আমি আর আগের সেই চারু না…”
শান্ত মাথা নিচু করে বললো—
—“আমি অপেক্ষা করবো…” চারু কিছু বললো না।
শুধু একবার তাকালো শান্তর দিকে—
সেই চেনা মানুষটা, কিন্তু সম্পর্কটা আর আগের মতো নেই।
আকাশে হালকা বাতাস বইছে…দুজন মানুষ পাশাপাশি দাঁড়িয়ে, তবুও দূরত্বটা স্পষ্ট।
ভালোবাসা আছে…কিন্তু বিশ্বাসটা এখনো পুরোপুরি ফেরেনি।
হয়তো সময় লাগবে…হয়তো আবার সব ঠিক হবে…
অথবা—
এই না বলা অনুভূতিগুলোই থেকে যাবে “রিক্ততার সুর” হয়ে…
সমাপ্ত
