#রিক্ততার_সুর
#ইসরাত_সুলতানা_আশা
#সূচনা_পর্ব
#অনু_গল্প
৩ বছর ধরে ওনাকে ভালোবাসিস তুই আর মুখ ফুটে বলতে পারছিস না যে;— “শান্ত ভাই আমি আপনাকে ভালোবাসি? শান্ত ভাই ঠিকই বলে তুই আসলেই সব কাজে অষ্টরম্ভা কিচ্ছু পারিস না!”
চারু মাইশার দিকে রাগে তাকিয়ে বললো; হু আমি তো অষ্টরম্ভাই কিছু পারি না তাহলে আমার হয়ে নাহয় তুই-ই শান্ত ভাইকে গিয়ে বলে আয়—— “ভাইয়া চারু আপনাকে ভালোবাসে তাহলেই তো হয়।”
চারুর কথা শুনে মাইশা বেঞ্চের উপর থেকে নেমে সরাসরি ওর সামনে এসে হাতজোড় করে বলে—“ ভাই আমি মাফ ও চাই দোয়াও চাই এইসব আমাকে বলতে বলিস না শান্ত ভাইকে দেখলে আমার ভয়ে কলিজা শুকিয়ে যায়, না.. না.. আমি এইসব পারবো না তুই ভালোবাসিস তুই গিয়ে বল!”
চারু মাইশার মাথায় একটা থাপ্পড় দিয়ে বলে—“ নিজেও পারবি না তাহলে আমাকে অষ্টরম্ভা কেন বললি? আমি কিছু পারি না ওনাকে ভালোবাসার কথা বলা ছাড়া সবই করতে পারি; ওনাকে দেখলে আমার হাত-পা হিম হয়ে আসে মনে হয় এখনই এসে স্কেল দিয়ে দু ঘা বসিয়ে দিবেন বাপরে বাপ!”
“ বুঝেছি বুঝেছি কিন্তু এভাবে আর ক’দিন চলবে বল? অনার্স শেষ হয়ে যাবে আর এক বছরের মাঝে এরপরই দেখবি কাকা আর অপেক্ষা করবে না তোকে বিয়ে দেওয়ার জন্য আগে না-হয় পড়াশোনার কথা বলে সামলে নিয়েছিস কিন্তু এখন কিভাবে সামলাবি? আর তারওপর শান্ত ভাইয়ের যদি কিছুদিনের ভিতরে জব হয়ে যায় ওনার অসুস্থ মা কি বসে থাকবে ছেলের বিয়ে দিয়ে দেবে দেখেনিস!”
—“ মাইশা তুই সব ঠিকই বলেছিস কিন্তু আমি কি করবো বল?? ওনাকে কিভাবে বলবো ভালোবাসার কথা তারওপর ওনি আমার আপন বড় চাচার ছেলে সম্পর্কে ভাই হয় কিন্তু মন যে মানে না ৩ বছর ধরে ওনার প্রেমে হাবুডুবু খেয়ে যাচ্ছি। ”
আরে গাধা তোরা চাচাতো ভাই-বোন আপন ভাই-বোন তে আর না তাহলে এতো হেজিটেডের কি আছে। মনে সাহস জুগিয়ে বলে দে আজ বাদে কালই তো ওনার বার্থডে এইটাই মহা সুযোগ।
—“ শান্ত ভাইয়ের মতো ছেলে আজকাল পাওয়াই যায় না, মানছি একটু গম্ভীর কম কথা বলে কিন্তু ছেলে হিসেবে লাখে একটা। আর একটা কথা জানার ছিলো ওনি কি কাউকে ভালো-টালো ভাসে কিনা সেই ব্যাপারে জানিস?”
—“ নাহ! এমন কিছু তো কখনো খেয়াল করিনি তবে মনে হয়না প্রেম করেন কিন্তু একটা জিনিস দিয়ে ক্লেয়ার হওয়া যাবে আমার শান্ত ভাই প্রেম করে কি না!”
“ কিভাবে জানতে পারবি??”
“ ডায়েরি পড়ার মাধ্যমে.. ”
“ ডায়েরি পড়ার মাধ্যমে মানে? কিছু বুঝতে পারছি না আমি বুঝিয়ে বল আমায়। ”
—“ আরে বোকা শোন শান্ত ভাই অনেক বইপত্র পড়েন আবার তার পাশাপাশি নিজের সঙ্গে বা আশপাশে যাই হোক না কেন ওনি ডায়েরিতে তা নিত্যদিন লিখে রাখেন; যদি কাউকে ভালোবাসে বা প্রেম করেন তাহলে ডায়েরি পড়লেই বুঝতে পারবো।”
“ আরে দারুন বললি তো তাহলে আজই বাসায় গিয়ে ওনার ডায়েরিটা ঘেঁটে দেখ কিছু পাস কিনা তারপর আমাকে জানাবি।”
চারু মুখটা গম্ভীর করে বললো;—“ কাজটা এতো সহজ নয় কারণ ওনার ডায়েরিতে কারো হাত দেওয়ার অনুমতি নেই এমনকি বড় মা’কে ও শান্ত ভাই ডায়েরিটা ধরতে দেয় না সবসময় ডায়েরিটা ড্রয়ারে রেখে তালা বন্ধ করে রাখে।”
মাইশা বেঞ্চে ধপ করে বসে বললো; তাহলে তো হয়েই গেলো আর কিছু জানা সম্ভব হবে না।
জানি সম্ভবনা কম বাট আমাকে কাজটা যে করেই হোক করতে হবে। আচ্ছা আজকে উঠি সন্ধ্যার দিকে ওনি বাসায় থাকেন না সেইসময়টা কাজে লাগাতে হবে বুঝলি।
আচ্ছা সাবধানে করিস আর আমাকে কিন্তু জানাতে ভুলবি না।
“ আচ্ছা। টাটা”
চারু বাড়িতে চলে আসে দুপুরে খাওয়া দাওয়া করে নিজের রুমে শুয়ে পড়ে।
চারুদের বাড়িটা দোতলা উপরের তলায় ওরা থাকে আর নিচের তলায় শান্ত আর ওর মা থাকে।
চারুরা এক ভাই এক বোন চারু বড় আর ভাই ছোট। সন্ধ্যার দিকে চারুর ঘুম ভাঙে তখন হঠাৎই মনে পড়ে ডায়েরির কথা। যেহেতু এখন সন্ধ্যা হয়ে গেছে নিশ্চয়ই শান্ত ভাই বাহিরে গেছে এটাই সুযোগ যা করার।
চারু আস্তে আস্তে নিচতলায় নামে চাচির রুমে উঁকি দিয়ে দেখে ওনি মোড়ায় বসে রাতের জন্য তরকারি কাটছেন।
—“ বড়মা তোমার শরীরটা এখন কেমন আছে??”
সুফিয়া বেগম তরকারি কাটা রেখে মুখে হাসি টেনে বলে; “ আরে চারু যে আয় আয় মা ভিতরে আয়; শরীরটা আজকে একটু ভালো দেখতে পাচ্ছিস কাজ করতে বসে গেছি শান্ত বাসায় নেই নয়তো আমাকে কথা শুনাতো কাজ করার জন্য! ”
আচ্ছা বড়মা আমি একটু দরকারে এসেছিলাম; শান্ত ভাইয়ের কাছ থেকে একটা বই নিতে এসেছি।
ওওহ শান্তর রুমে গিয়ে দেখ দরজা খোলাই আছে যা লাগে নিয়ে যা।
“ বড় চাচির অনুমতি পেয়ে চারু আর এক মুহুর্ত দেরী করলো না দৌড়ে শান্তর রুমে প্রবেশ করলো; শান্ত ভাইয়ের রুম দেখলে কেউ বুঝতেই পারবে না এখানে কোনো ছেলে থাকে সবকিছু এতো সাজানো-গোছানো থাকে! ”
প্রায় ১৫/২০ দিন পর আজকে আবার শান্ত ভাইয়ের রুমে এসেছে চারু! শান্তর টেবিলের ওপর চোখ যেতেই দেখতে পায় শান্ত ভাইয়ের বাঁধানো একটা ছবি।
বাস্তবের গম্ভীর শান্ত ভাই ছবিতে দাঁত খেলিয়ে হাসছে এমন একটা ছবি। ছবিটা হাতে তুলে নিয়ে শান্তর চোখে চোখ রাখে, চারুর মনে হচ্ছিল শান্ত ভাই ওর চোখের সামনে রয়েছে ওর হৃদয়ে আলাদা শিহরণ বয়ে যায়…
❝ মরণ দেখি আমার ওগো তোমার ওই চোখে..
পাগল দাও না করে এই রাতে আমাকে…❞
চারুর এইসব ভাবনার ছেদ ঘটে যখন ওর বড়মা ডাক দেয়;——“ চারু বই খুঁজে পেয়েছিস নাকি আমাকে আসতে হবে?”
চারু তাড়াতাড়ি ছবিটা জায়গায় রেখে বলে—“ না বড় মা পেয়ে গেছি তোমাকে আসতে হবে না।”
চারু ড্রয়ার থেকে ডায়েরিটা নিয়ে ওড়নার আঁচলে লুকিয়ে নেয়; এখানে খোলা ঠিক হবে না আমার রুমে নিয়ে যায় তারপর সব দেখা যাবে।
চারু বড়মাকে বলে; “ বড়মা আমি বইটা নিয়ে গেলাম! ”
ভিতরে এসে বস আমি চা করেছি খেয়ে যা..
“ চারু সিঁড়ি দিয়ে উঠতে উঠতে বলছে আরেকদিন না-হয় খাবো আজকে সময় নেই।”
চারু নিজের রুমে চলে এসে হাফ ছেড়ে বাঁচে—“ ডায়েরিটা হাতে নিয়ে উল্টে পাল্টে দেখে বেশ পুরোনো ডায়েরিটা বড় বাবা বেঁচে থাকতে নাকি জন্মদিনে উপহার দিয়েছিলো শান্ত ভাইকে।”
চারু ডায়েরিটা খুলে দেখতে যাবে ঠিক তখনই চারুর মা রুমা ওর রুমে আসে হাতে একটা বাটি আর ওখানে মাংস। চারু সঙ্গে সঙ্গে ডায়েরিটা টেবিলে রেখে দেয়।
—“ চারু একটু মাংসটা খেয়ে দেখতো নুন,মরিচে হয়েছে কিনা আমার মুখে পান তাই বুঝতে পারছি না। ”
চারু মায়ের কথা মতো মাংসটা খেয়ে দেখে বলে নুন কম হয়েছে আরেকটু দাও নাহলে ভালো লাগবে না।
আচ্ছা।
অন্যদিকে শান্ত বাসায় চলে আসে নিজের রুমে ঢুকে ফ্রেশ হয়ে টেবিলে বসে কিছু ভেবে ড্রয়ার খুলে ডায়েরিটা নিতে গিয়ে দেখে ওর ডায়েরিটা ওখানে নেই।
শান্ত আশেপাশে অন্য জায়গায় রেখেছে কিনা খুঁজতে থাকে কিন্তু কোথাও না পেয়ে মায়ের রুমে যায়——“ মা আমাী ডায়েরি কোথায় ড্রয়ারে ছিলো এখন সারা বাসায় খুঁজে পাচ্ছি না!”
“ ডায়েরি?? আমি তো বাবা তোর রুমে এখনো যায়নি আর ডায়েরি ও দেখিনি!”
শান্ত রাগে বলতে থাকে;——“ তাহলে আমার ডায়েরি কোথায় যাবে?? ওটার তো আর হাত পা নেই উড়ে উড়ে চলে গেছে। আমার রুমে কেউ এসেছিলো কি?”
শান্তর মা মনে করে বললেন——“ কিছুক্ষণ আগে চারু এসেছিলো একটা বই নিতে এ ছাড়া তো কেউ আসেনি বাবা!”
চারুর নামটা শুনে শান্তর মুখাবয়ব কঠিন হয়ে যায় ও আর এক মুহুর্ত দেরী করে না সিঁড়ি বেয়ে চারুদের বাড়িতে উঠে।
মা চলে যেতেই চারু ডায়েরিটা খুলে দেখে একটা কালারিং কলম দিয়ে সুন্দর করে কিছু লিখা পড়তে যাবে——তোমার…
বাকিটা পড়ার আগেই ইগলের মতো ছুঁ মেরে চারুর হাত থেকে ডায়েরিটা কেড়ে নেয় শান্ত আর রাগে ওর গালে পরপর দুইটা থাপ্পড় মারে! চারু হঠাৎ এমন হওয়াতে নিজেকে সামলাতে পারেনি মেঝেতে গিয়ে উপুড় হয়ে পড়ে…
—“ ইউ ইডিয়ট তোর সাহস কি করে হলো আমার রুম থেকে আমার পার্সোনাল ডায়েরিতে হাত দিয়েছিস চোর কোথাকারের!”
পাশের রুম থেকে চারুর মা দৌড়ে আসে;—“ শান্ত বাবা কি হয়েছে এইভাবে চিৎকার করছিস কেন??”
তোমার মেয়েকে জিজ্ঞেস করো ওর সাহস হয় কি করে আমার ডায়েরি চুরি করার?? কে দিয়েছে এতো বড় সাহস??
—“ ডায়েরি চুরি করেছে মানে??”
হু ছোট মা আমার অবর্তমানে আমার ডায়েরি নিয়ে এসেছে ও।
চারুর মা মেয়ের দিকে অগ্নি চক্ষু নিক্ষেপ করে বলে—“শান্ত যা বলছে তা ঠিক? ”
“ চারু আর কথা বলে না মেঝেতে বসে মাথা নিচু করে আছে রুমা যা বুঝার বুঝে গেছে ছিঃহ শেষ পর্যন্ত তুই চুরি করলি?”
না মা…
চুপপ আর একটা কথাও বলবি না; শান্ত চারুর দিকে ঘৃণার দৃষ্টি নিক্ষেপ করে ও চলে যায়।
চারু মেঝেতে বসে কাঁদতে থাকে অঝোরে…
চলবে…
