#যাঁতাকল (পর্ব ৪)
প্রায় দশ মিনিট কেউ কোনো কথা বলল না। নীলাদ্রি ডাইনিং টেবিলের ওপর মাথা নামিয়ে দিয়ে বসে ছিল। ওর পিঠটা মাঝে মাঝে হেঁচকি তোলার মতো কেঁপে উঠছে। রিয়া ধীর পায়ে এগিয়ে এল। মেঝেতে পড়ে থাকা কাঁচের টুকরো আর ভাতের ওপর দিয়েই ও নীলাদ্রির পাশে এসে দাঁড়াল। ও একবার মায়ের দিকে তাকাল— যে মানুষটার সাথে গত দু-বছর ধরে ওর গৃহযুদ্ধ চলছে। আজ সেই মানুষটাকে খুব অসহায় দেখাল রিয়ার চোখে। রিয়া নীলাদ্রির কাঁধে হাত রাখল, ওর হাতটা কাঁপছিল।
“নীলাদ্রি … তুমি হাত-মুখ ধুয়ে নাও। আমি মেঝেটা পরিষ্কার করে আবার খাবার বেড়ে দিচ্ছি,” রিয়া খুব নিচু গলায় বলল। ওর গলায় আগের সেই জেদ নেই।
নীলাদ্রি মাথা তুলল না। অস্ফুট স্বরে বলল, “কী হবে খেয়ে? কাল থেকে তো হয়তো এই অন্ন জোটাতেই কালঘাম ছুটে যাবে। জানো রিয়া, আজ দুপুরে স্টেশনের ধারের দোকানে বসে ভাবছিলাম— আমার অফিসের বস আমাকে যে ভাষায় অপমান করে, সেটা যদি তোমরা শুনতে পেতে, তবে হয়তো বাড়িতে আমার ওপর এই মানসিক অত্যাচারটা করতে না। বাইরের লোকের লাথি-ঝাঁটা খেয়ে যখন ঘরে ফিরি, তখন যদি আপনজনরা সেই ক্ষতে নুন ছিটিয়ে দেয়, তখন বেঁচে থাকার ইচ্ছেটা মরে যায়।”
মা এবার উঠে এলেন। ওনার হাঁটুতে খুব ব্যথা, কিন্তু আজ যেন সেটা ভুলে গেছেন। উনি ধীর পায়ে নীলাদ্রির অন্য পাশে এসে বসলেন। ছেলের চুলে হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বললেন, “আমাকে ক্ষমা কর নীলু। আমি বুড়ো মানুষ, আমার বুদ্ধিশুদ্ধি সব লোপ পেয়েছে। আমি ভাবতাম এই বাড়িতে আমার কর্তৃত্ব বজায় না রাখলে হয়তো আমি ব্রাত্য হয়ে যাব। তাই অকারণে বউমার খুঁত ধরতাম, ওকে কথা শোনাতাম। আমি বুঝতে পারিনি আমার এই আধিপত্যের লড়াই তোকে ভেতরে ভেতরে শেষ করে দিচ্ছে।”
রিয়া মায়ের দিকে তাকাল। মায়ের এই স্বীকারোক্তি ও আশা করেনি। ও রান্নাঘর থেকে একটা কাপড় আর ঝাঁটা নিয়ে এল মেঝেটা পরিষ্কার করতে। কাজ করতে করতে রিয়া বলল, “দোষ আমারও কম নয় মা। আমি ভেবেছিলাম আপনি আমাকে সহ্য করতে পারেন না, তাই আমি সবসময় একটা ঢাল নিয়ে যুদ্ধের জন্য তৈরি থাকতাম। আপনার ছোট ছোট কথাগুলোকেও আমি তীরের মতো বিঁধিয়েছি নিজের মনে। আপনার ছেলে বাইরে কতটা লড়াই করছে, সেটা ভাবার চেয়ে আমার ইগোটা আমার কাছে বড় হয়ে গিয়েছিল।”
নীলাদ্রি এবার মাথা তুলল। ওর চোখে জল থাকলেও মুখটা এবার কিছুটা শান্ত। ও রিয়ার দিকে তাকিয়ে বলল, “রিয়া, আমার বস কাল আমাকে ডেকেছে চাকরি থেকে বরখাস্ত করার জন্য। আমি জানি না কাল কী হবে। হয়তো কয়েক মাস আমাদের খুব কষ্টে কাটাতে হবে। মায়ের ওষুধ, তোমার শখ, আমাদের এই ছোট ছোট স্বাচ্ছন্দ্য— সব হয়তো থমকে যাবে।”
মা নীলাদ্রির হাতটা চেপে ধরলেন, “চাকরি গেলে যাবে নীলু। আমার আলমারিতে কিছু সোনার গয়না রাখা আছে, তোর বাবা ওগুলো আমার জন্য গড়ে দিয়েছিলেন। ওগুলো তো আমার সাথে স্বর্গে যাবে না। দরকার পড়লে ওগুলো দিয়ে আমরা লড়াই করব। কিন্তু দোহাই তোর, তুই ভেঙে পড়িস না। আমরা আজ থেকে আর কোনো অশান্তি করব না।”
রিয়া মেঝের ময়লাটা সরিয়ে নীলাদ্রির হাতের ওপর নিজের হাত রাখল, “আর আমার স্কুলের চাকরিটা তো আছেই। আমরা খরচ কমিয়ে দেব। মা আর আমি মিলে সব সামলে নেব। তুমি শুধু শান্ত হও। তোমার এই বিধ্বস্ত চেহারাটা আমরা আর দেখতে পারছি না।”
নীলাদ্রি দেখল, দীর্ঘ দুই বছর পর এই ঘরে যেন একটা স্বচ্ছ বাতাস বইছে। বাড়ির দেওয়ালগুলো যে আগে ওকে গ্রাস করতে আসত, সেগুলো এখন যেন ওকে আগলে রাখছে। ও মায়ের দিকে তাকিয়ে বলল, “মা, রিয়া সারাদিন বাইরে থাকে, ওর ওপর অনেক চাপ। তুমি যদি ওকে একটু স্নেহের চোখে দেখো, দেখবে ও তোমার মেয়ে হয়ে যাবে।”
মা মাথা নাড়লেন, “আমি বুঝতে পেরেছি রে নীলু। যে বউমা আমার ছেলের দুর্দিনে এভাবে ঢাল হয়ে দাঁড়াচ্ছে, সে তো আমার নিজেরই লোক।”
রিয়া মুচকি হাসল, যদিও সেই হাসিতে কিছুটা বিষণ্ণতা ছিল। ও উঠে গিয়ে মায়ের জন্য এক গ্লাস জল নিয়ে এল। “মা, জলটা খান। অনেক রাত হয়েছে, আপনার ওষুধ খাওয়ার সময় পেরিয়ে গেছে।”
মা জলটা খেয়ে রিয়ার মাথায় হাত রাখলেন। নীলাদ্রি দেখল, যে ছোটো ছোটো বিষয় গুলো নিয়ে যুদ্ধের দামামা বেজেছিল, সেগুলো এখন কত তুচ্ছ।বাইরে তখন বৃষ্টি থেমেছে, জানলা দিয়ে আসা হিমেল হাওয়ায় নীলাদ্রির ক্লান্ত শরীরটা একটু জুড়িয়ে এল। ও ভাবল, অফিসের লড়াইটা হয়তো ও কাল লড়তে পারবে, কারণ ওর বাড়ির রণক্ষেত্রটা আজ শান্ত হয়েছে।
নীলাদ্রি উঠল, তারপর মা আর রিয়ার হাত দুটো এক জায়গায় জড়ো করে বলল, “তোমরা যদি এভাবে হাত ধরে থাকো, তবে অফিসের একশটা টার্গেটও আমি হাসিমুখে পূরণ করে দেব। আমাকে একা করে দিও না।”
রাত এগারোটা। আজ প্রথমবার রিয়া আর মা মিলে রান্নাঘরে গিয়ে খাবার গরম করল। কোনো ঝগড়া নেই, কোনো অনুযোগ নেই। নীলাদ্রি যখন ডাইনিং টেবিলে বসল, দেখল রিয়া মায়ের পাতে মাছের সবচেয়ে বড় টুকরোটা তুলে দিচ্ছে, আর মা রিয়াকে বলছেন— “বউমা, তুমি একটু ঘি নাও, সারাদিন তো কিছুই খাওনি।”
মধ্যবিত্ত এই পরিবারে অভাব হয়তো আসবে, কিন্তু আজকের এই শান্তিটা যেন সেই অভাবের বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় অস্ত্র। নীলাদ্রি বুঝতে পারল, জীবনের টার্গেট শুধু অফিসে নয়, ঘরের কোণে ভালোবাসার টার্গেট পূরণ করাটাও সমান জরুরি।
চলবে…..
