#যাঁতাকল (পর্ব ৩)
মা আর রিয়া দুজনেই নীলাদ্রির মুখের দিকে তাকিয়ে রইলো, যেন সে বিচারক, এক্ষুনি রায় দেবে। নীলাদ্রি আর কোনো কথা না বাড়িয়ে সোজা বাথরুমে চলে গেলো। কল ছেড়ে দিয়ে ঠান্ডা জলে মাথা টা ভিজিয়ে ভাবতে লাগলো জীবনটা যদি এই জলের মতোই সহজ হতো???
মাথা মুছে ডাইনিং টেবিলে বসতেই রিয়া এল। কোনো কথা না বলে ওর সামনে ভাতের থালাটা প্রায় নামিয়ে দিয়ে চলে যাচ্ছিল। নীলাদ্রি শান্ত গলায় ডাকল, “রিয়া, এক গ্লাস জল দাও।”
রিয়া ঘুরে দাঁড়িয়ে বলল, “হ্যাঁ দিচ্ছি কিন্তু তার আগে তোমার মাকে সাবধান করে দাও আমার কোনো জিনিসে যেন চোরের মতো হাত না দেয় “।আমি হাঁপিয়ে উঠেছি নীলাদ্রি, তোমার এই সংসার আর তোমার মায়ের প্রতিদিনের গোয়েন্দাগিরি সামলাতে সামলাতে আমি ক্লান্ত।”
মা এবার ঘুরে দাঁড়ালেন, ওনার চোখে জল কাঁদো কাঁদো গলায় বললেন , “গোয়েন্দাগিরি? তোমার আলমারিতে আমি চাদর খুঁজতে গিয়েছিলাম, কারণ কাল রাতে আমার ছেলের হাল্কা ঠান্ডা লাগছিলো । মা হিসেবে ছেলের একটু আরাম দেখা কি আমার অপরাধ? আর তুমি যে ডায়েরিতে আমার নামে লিখে রেখেছো — ‘বুড়িটা কবে যাবে’, সেটা কি খুব সম্মানের কাজ?”
রিয়া চিৎকার করে উঠল, “আমি ওসব লিখিনি! আপনি মিথ্যে কথা বলছেন! আপনি আমার গোপনীয়তায় হস্তক্ষেপ করেছেন, এটা অপরাধ।”
“অপরাধ? আমার ছেলের বাড়ি, এখানে আমার কোনো অধিকার নেই?” মায়ের গলা কাঁপতে শুরু করল।
নীলাদ্রি ভাতটা মাখছিল, ও হঠাৎ থমকে গেল। মাছের ঝোলটা আজ একটু বেশিই তেতো লাগছে। ও মাথা নিচু করেই বলল, “রিয়া, মা কি সত্যিই ডায়েরি পড়েছেন?”
রিয়া নীলাদ্রির দিকে ফিরে রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে বলল, “তুমি কি আমাকে সন্দেহ করছো? তোমার মা গত দু-দিন ধরে তক্কে তক্কে ছিলেন। আজ আমি স্কুল থেকে ফিরতে দেরি করেছি বলে উনি আমার ঘরে ঢুকে হাতড়েছেন। ডায়েরি থাক বা না থাক, পারমিশন ছাড়া কারো ঘর ঘাঁটা কি ঠিক? তুমিই বলো!”
নীলাদ্রি কিছু বলার আগেই ওর ফোনটা বেজে উঠল। স্ক্রিনে ভেসে উঠল বসের নাম। এই অসময়ে বসের ফোন মানেই কোনো দুঃসংবাদ। নীলাদ্রি ফোনটা কানে নিতেই ওপার থেকে গর্জন শোনা গেল— “নীলাদ্রি বাবু, আপনার ওই সল্টলেকের ক্লায়েন্ট কিন্তু পলিসিটা ক্যান্সেল করেছে। তারা বলছে আপনি নাকি ঠিকমতো পেপারস বোঝাতে পারেননি। ইউ আর এ লায়ার! আপনি কি অফিসকে ডোবাতে বসেছেন? কাল সকালে ইমিডিয়েটলি অফিসে আসুন, আপনার সেটেলমেন্ট লেটারটা আমরা রেডি রাখছি।”
নীলাদ্রির হাত থেকে ফোনটা ডাইনিং টেবিলের ওপর পড়ে গেল। চাকরিটা কি সত্যিই গেল? এই বাজারে নতুন চাকরি মানে তো মরুভূমিতে জল খোঁজা। সামনে মাসের কিস্তি, মায়ের চিকিৎসা, সংসার খরচ — সব যেন তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ছে।
কিন্তু বাড়ির ভেতরে যুদ্ধ থামার কোনো লক্ষণ নেই। মা রিয়াকে লক্ষ্য করে বললেন, “আমি জানি রিয়া, তুমি চাও আমি এ বাড়ি থেকে বিদেয় হই। আজ থেকে আমি আর এ বাড়িতে অন্ন গ্রহণ করব না। দেখি আমার ছেলে আমাকে খেতে দেয় কি না।”
রিয়া পাল্টা দিল, “নাটক করবেন না মা। এই ইমোশনাল ব্ল্যাকমেইল অনেক হয়েছে। নীলাদ্রি, তুমি কিছু একটা করো, নাহলে আমি আজই বাপের বাড়ি চলে যাব। আমি এভাবে শ্বাসরোধ করা পরিবেশে বাঁচতে পারব না।”
নীলাদ্রি হঠাৎ থালাটা সশব্দে মেঝের ওপর আছাড় মারল। কাঁচের থালাটা চুরমার হয়ে দানা দানা হয়ে ছড়িয়ে পড়ল মেঝেতে। সাদা ভাত আর মাছের ঝোল রিয়ার পায়ের কাছে ছিটকে পড়ল। মা আর রিয়া দুজনেই চমকে গিয়ে চুপ হয়ে গেল। নীলাদ্রি জীবনে কোনোদিন এই বাড়িতে হাত তোলেনি বা চেঁচায়নি।
নীলাদ্রি উঠে দাঁড়াল। ওর চোখ দুটো লাল, কপালে শিরাগুলো দপদপ করছে। ও দেয়ালে ঝোলানো ক্যালেন্ডারটার দিকে তাকিয়ে একটা অদ্ভুত হাসি হাসল। তারপর আর্তনাদ করে উঠল, “চুপ! একদম চুপ! তোমরা কি জানো আজকে আমার জীবনে কী হয়েছে? আজকে আমার ক্লায়েন্ট পলিসি ক্যান্সেল করেছে, আমার চাকরিটা প্রায় চলে গেছে। কাল থেকে এই বাড়িতে চাল ডাল আসবে কোত্থেকে আমি জানি না। আর তোমরা? তোমরা লড়ছো ডায়েরি নিয়ে?”
ও রিয়ার দিকে আঙুল উঁচিয়ে বলল, “রিয়া, তুমি শিক্ষিত মেয়ে, অথচ তুমি মায়ের বয়সটাকে সম্মান দিতে পারো না? উনি ভুল করলে কি একটু মানিয়ে নেওয়া যায় না? মা তোমার শাশুড়ি হতে পারেন, কিন্তু উনি তো এই বাড়িরই একজন অংশ।”
আবার মায়ের দিকে ফিরে বলল, “আর মা, তুমি? তুমি কেন বুঝতে পারো না যে রিয়া এই বাড়িটা আগলে রাখার চেষ্টা করছে? ও বাইরে কাজ করে এসে আবার রান্নাঘরে ঢোকে। তুমি কেন ওর ব্যক্তিগত বিষয়ে নাক গলাও? তুমি কি চাও না তোমার ছেলে শান্তিতে থাকুক?”
নীলাদ্রি এবার নিজের বুক চাপড়াতে লাগল, “আমি সারাদিন রাস্তায় রাস্তায় ঘুরি। লোকে আমাকে অপমান করে, কথা শোনায়। আমি ভাবি বাড়িতে গেলে অন্তত দুটো ডাল ভাত শান্তিতে মুখে দেব। কিন্তু না! তোমরা দুজনে মিলে আমার জীবনটা নরক বানিয়ে দিয়েছো। আমার এখন মনে হচ্ছে, এই চাকরি যাওয়ার চেয়ে তোমাদের এই অশান্তি থেকে মুক্তি পাওয়াটা বেশি জরুরি। আমি যদি আজ স্টেশনের নিচে গিয়ে শুয়ে পড়ি, তবে কি তোমরা শান্ত হবে?”
নীলাদ্রি ধপ করে চেয়ারটায় বসে পড়ল। ওর দুচোখ বেয়ে জল গড়িয়ে নামল। এক বলিষ্ঠ পুরুষ মানুষের এমন ভেঙে পড়া মা আর রিয়া আগে কখনও দেখেনি। ড্রয়িং রুমে এবার শুধু ফ্যানের আওয়াজ আর নীলাদ্রির চাপা কান্নার শব্দ। রিয়া অপরাধবোধে মাথা নিচু করে দেওয়ালে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকল, আর মা আঁচল দিয়ে মুখ ঢেকে ফুঁপিয়ে উঠলেন।
নীলাদ্রির এই ছোট ঘরে আজ যেন এক বিশাল স্তব্ধতা নেমে এল। যে টার্গেটের চাপে নীলাদ্রি বিধ্বস্ত ছিল, সেই চাপের চেয়েও বড় হয়ে উঠল প্রিয় মানুষদের অবহেলা আর অসহযোগিতা। নীলাদ্রি বিড়বিড় করে বলল, “আমি আর পারছি না। আমি সত্যিই আর পারছি না…”
চলবে…… (পরবর্তী পর্ব শীঘ্রই আসবে)
কলমে -#SupriyaGhosh
