#মালিহা
#অন্তিম_পর্ব (১ম অংশ)
#ইলোরা_ফারদিন
রাত প্রায় চারটা,
কিন্তু ঘুম নেই মালিহার চোখে। আজ সে জিতেছে। সজীবের চাকরিটা গিয়েছে অবশেষে।কিভাবে জানি সেদিন মিডিয়াতে আসার পর একটা বছর কেটে গেল। আজ পুরো একটা বছর পর তার আইনী লড়াই শেষ হলো। সজীবকে সে তার কর্মের শাস্তি দিতে পেরেছে।অবশ্য এরজন্য মালিহা কিছু মিথ্যা প্রমাণও যুক্ত করেছিল। নাহলে সরকারি চাকরি এতো সহজে যায় না। তাও ফের এতো বড় পদের একজনের!
সজীবের পরকীয়ার ঘটনা মালিহা জেনেছিল আজ থেকে তিন বছর আগে, যখন তার বাচ্চাটার বয়স মাত্র এক বছর। সে সময় শুধু মিলা না, সে তার অফিসের তার চেয়ে জুনিয়র কিছু স্টাফের সাথেও অবৈধ সম্পর্কে লিপ্ত ছিল।
মালিহা বরাবরই ঠান্ডা মাথার মেয়ে। স্বামীর পরকীয়ার কথা জেনেও সে চুপ ছিল। কারণ সে জানত, সেদিন যদি রাগারাগি করে মালিহা বাড়ি ছেড়ে চলে যেয়ে সজীবকে ডিভোর্স দিত, মাত্র এক মাসের মাথায় সজীব তার চেয়েও সুন্দরী কম বয়সী মেয়েকে বিয়ে করে ঘরে তুলতো। কারণ একজম ক্যাডার পাত্রের দাম অনেক বেশি সমাজে।
আর এই চাকরিটাই সজীবের অহংকরের মূল। সুতরাং তাকে ভাংতে হলে তার এই সম্মান আর চাকরি আগে শেষ করতে হবে।
তারপর আর কি? নিজের বান্ধুবিদের সাথে মিলে আর উকিলকে সাথে নিয়ে দুটো বছর পরিকল্পনা করে, অজস্র প্রমাণ জোগার করে শেষ দান টা খেলেছিল।
মালিহার কাছে যখন সব প্রমাণ রেডি, তখন সে একদিন হুট করে মিলাকে ফোন দেয়, তারপর বলে,” এই মিলা শুন, তুই তোর দুলাভাই থেকে দূরে থাকবি। আর কখনো ওকে ফোন দিবি না। আজকাল কি ক্যাডার জামাই সবার কপালে জুটে। তুই যদি আবার লোভে পরে যাস। তোর তো আবার যোগ্যতা নেই ক্যাডার জামাই পাওয়ার।”
এরকম কিছু উসকানি মুলক কথা বলেছিল মালিহা। কারণ সে তার বোনকে চেনে। বয়স কম রক্ত গরম।
হলোও তাই!
সজীবকে বিয়ে করার জেদ চেপে বসল তার মাথায়। তারপরের ঘটনা তো জানা সবার।
অতীতের কথা মনে করেই চোখে পানি এলো মালিহার। যে যাই বলুক, সজীবের প্রতি তার ভালোবাসাটা তো মিথ্যা ছিল না।
সজীব কেন এতো বড় পাপে জড়ালো। সে কি পারতো না এই একটা জীবন স্ত্রী সন্তানকে নিয়ে কাটিয়ে দিতে…!
।।।।।।।।
ক্যাফেতে সামনাসামনি বসে আছে মালিহার উকিল রণিত আর মালিহা।
কথা বলা প্রথমে রণিতই শুরু করলো। রণিত হালকা কেশে বললো,” দেখো মালিহা। আমি ওতো বেশি ভণিতা করে কথা বলা পছন্দ করি না।। যা বলি সরাসরি।
তুমি তো জানোই চার বছর আগে আমার ডিভোর্স হয়েছে। কারণ হলো আমি বাবা হতে অক্ষম। এদিকে আমার বাবা মাও প্রায় আট বছর হলো পরলোকগমন করেছেন। ধরতে গেলে আমি একা। কিন্তু আমার নিজের একটা পরিবার চাই মালিহা।”
একটু থেমে আবার বলতে শুরু করলো, ” এদিকে তুমিও এখন ডিভোর্স, তোমার চার বছরের একটি সন্তানও আছে।
আমি বিশ্বাস করি আমি একজন ভালো বাবা ও স্বামী হতে পারব। যদি তুমি চাও তবে আমরা নিজেদের একটা পরিবার গড়তে পারি।”
রণিতের কথা শুনে মালিহা মোটেও অবাক হলো না। কারণ সে অনুভব করেছিল রণিত তার প্রতি দুর্বল। আর মালিহা নিজেও বুঝে তার নিজেরো একটা শক্ত অবলম্বন প্রয়োজন। কান্না করার একটি কাধ দরকার। মাথার উপর হাত দরকার। অন্যদিকে সে আর কখনোই তার স্বার্থপর বাবা মায়ের কাছে ফিরবে না। তাই মালিহাও কোনো প্রকার ভণিতা না করেই উত্তর দিল, ” আমাকে সাতটি দিন দাও রণিত। আমি ভেবে জানাবো।”
বলে মালিহা চলে গেল।
এদিকে রণিত ক্যাফেতে বসে ধৈর্য্য সহকারে নিজের কফি শেষ করলো..
চলবে..
#মালিহা
#অন্তিম
#ইলোরা_ফারদিন
কেটে গিয়েছে বারোটা বছর…
মালিহার চাচাতো বোনের বিয়ে আজ। সে তো ভেবেছিল আর কোনোদিন ওবাসায় পা রাখবে না। কিন্তুর তরুর অনুরোধ সে ফেলতে পারে নি। অবশ্য অতীত আকড়ে ধরে কি লাভ। জীবনে সে অনেক সুখী এখন। তার নিজস্ব কাপড়ের শো রূম আছে দুটো। অন্যদিকে রণকও ক্যারিয়ারে বেশ সফল। ঢাকার নামকরা উকিল সে।
অন্যদিকে দীর্ঘ সময় ট্রিটমেন্টের মাধ্যমে মালিয়া আর রণকের জমজ সন্তানও হয়েছে। তার মেয়ে রিনি আর ছেলে রিয়াদ। বয়স তাদের আট এখন। আর তার ছোট্ট শোভন এখন ষোল বছরের তরুণ। সময় যে কিভাবে এতো তাড়াতাড়ি গিয়েছে তা ভেবে পায় না মালিহা।
।।।।।।।।
বিয়েতে মিলা আর সজীবও এসেছে । সাথে তাদের একমাত্র মেয়ে মেহেরুন, বয়স তার চার। সজীবের চাকরি যাওয়ার পরেও ওর বিরুদ্ধে তদন্ত হয়, তারপর জেল হলেও পরবর্তীতে সে জামিনে বের হয়ে যায়। কিন্তু চাকরিটা আর ফিরে পায় নি।
পরে এলাকায় ফিরে সে তার পৈতৃক কিছু সম্পত্তি বিক্রি করে ছোটখাটো ব্যবসা শুরু করে।
এদিকে মিলাও বুঝে যায় যে সজীবের সাথে সংসার করা ছাড়া তার উপায় নেই। কোনো ভদ্র পরিবারের ছেলে তাকে আর স্ত্রী রূপে গ্রহণ করবে না। তাই সে সজীবের বাসায় ই থাকতে শুরু করে। মুরুব্বিদের পরামর্শে তাদের পুনরায় বিয়ে হয়। সজীবের মা এখনো মিলাকে সহ্য করতে পারে না। উঠতে বসতে মিলাকে কথা শোনায়। এলাকায়ও কেউ মিলাকে পছন্দ করে না। সবাই তাকে ঘর ভাঙানি মেয়ে হিসেবেই চেনে।
অন্যদিকে সজীবের সাথে তার সম্পর্কটাও কেবল দায়িত্বের আর শারীরিক চাহিদার। এর বাহিরে স্বামী স্ত্রীর যে ভালোবাসার একটা সম্পর্ক থাকে, সেটা তাদের মাঝে নেই। মাঝে মাঝে খুব কান্না পায় মিলার। চেহারায় আর আগের মতো সৌন্দর্য নেই। মধ্যবিত্ত সংসারের যাতাকলে পিষে তার শরীর অনেক আগেই ভেঙে গিয়েছে। অন্যদিকে সুদর্শন সজীবেরও একি অবস্থা। ব্যবসার চাপ, পরিবারের দায়িত্ব সব মিলিয়ে তাকেও এখন বুড়ো বুড়ো দেখায়। কিন্তু এসবে তার খেয়াল নেই। তার পুরো মনোযোগ ব্যবসার দিকেই।
।।।।।।।
দামি গাড়ি থেকে যখন মালিহা তার তিন সন্তান ও স্বামী নিয়ে নামলো, তখন মালিহার বাবার বাড়ির সবাই দৌড়ে আসলো। তাদের আধিক্ষেতা দেখে মালিহা হাসে। জানে সবই টাকার খেলা। আজ মালিহার টাকা আছে, তাই এরা মালিহাকে তেল মারছে। কাল যদি মিলার টাকা হয় তবে তার মিলাকে তেল মারবে।
এদিকে মিলা আর সজীব স্টেজের পাশে চেয়ারে বসে আছে। মালিহাকে এখনো আগের মতোই তরুণী মনে হয়। গায়ে তার দামী শাড়ি গহনা। তার স্বামীও যথেষ্ট সুদর্শন। হিংসে হয় মিলার। কিন্তু কিছু করার নেই তার।
অন্যদিকে মালিহাকে দেখে আফসোস হয় সজীবের। নিজের পাপে নিজের ক্যারিয়ার আর সুন্দর সংসার হারিয়েছে সে।
মালিহার পেছনে ষোল বছরের শোভনকে দেখে অবাক হয় সজীব। ছেলেটার তার, তার অংশ, তার বংশের উত্তরাধিকারী! ছেলেটা এতো বড় হয়ে গেল।
শোভন একটু দূরে দাঁড়িয়ে জুস খাচ্ছিল। আচমকা কেউ তার কাধে হাত রাখে। পেছনে ঘুরে শোভন দেখে একজন মধ্যবয়সী লোক দাঁড়িয়ে। যদিও সে জানে এটা তার জন্মদাতা পিতা,তবু না চেনার ভান করে।
অন্যদিকে সজীব অশ্রুসিক্ত নয়নে বলল, ” আমি তোমার বাবা শোভন।”
শোভন তাচ্ছিল্য হেসে বলল, ” আপনি সেই লোকটা না যে আমার মা প্রেগন্যান্ট থাকা অবস্থায় আমারি খালার সাথে অবৈধ সম্পর্ক স্থাপন করেছিলেন। তারপর আমার আর আমার মায়ের কথা না ভেবেই আমার মাকে তালাক দিয়ে আমার খালাকে বিয়ে করেছিলেন।
যাই হোক, দ্বিতীয় বার আমাকে নিজের ছেলে বলবেন না, আমার লজ্জা লাগে। আসি আসসালামু আলাইকুম। ”
সমাপ্ত
