জোড়াতালি [৩]
প্রভা আফরিন
দেখতে দেখতে বিশ রোজা চলে এলো। সাজুর এখনো ইফতারি খাওয়া হলো না। আর না পাওয়া হলো একটা নতুন জামা। পুরোনো যে জামাটা ইঁদুরে কেটেছে, সে খবর পেয়ে সাজু ঘণ্টাখানেক কেঁদে ভাসালো। তার একটাই ভালো জামা ছিল। বলতে গেলে ওটাই সাজুর এইটুকু বয়সের একমাত্র সঞ্চয় ছিল। সেটাও আর নেই। সর্বহারা সাজু অভিমানে মায়ের সঙ্গে গোটা একদিন কথাই বলল না। রাতে সামিনা ছেলের মান ভাঙাতে চাইলে সাজু রাগ দেখিয়ে বলল, “তুমি কিছু কিনা দেও না। আমি আব্বার কাছে চইলা যামু।”
সামিনা আঁতকে উঠে বলে, “তুই চইলা গেলে আমি ক্যামনে থাকমু? তোর নাহয় বাপ আছে। বাপের আরেক বউ আছে। আমার তো তুই ছাড়া কেউ নাই।”
“ক্যান তোমার বাপ কই?”
“আমার বাপ তো মইরা গেছে। এহন আমার বাপ হইলি তুই।”
“আমি তোমার বাপ?” সাজুর জেদের প্রসঙ্গ ঘুরে গেল।
সামিনা ছেলের কপালে চুমু খেয়ে বলল, “হ। পুতেরা বড়ো হইলে মা হইয়া যায় তার মাইয়া, আর সে হয় বাপ।”
“তাই তহন তোমারে আমার পালতে হইব?”
“হ, তহন তুই আমারে প্রত্যেক ঈদে নতুন জামা কিন্না দিবি। ইফতারি খাওয়াবি। দালানের ভিতরে রাখবি। আমি না পারলেও আমার বাপে ঠিকই পারব। কি, পারবি না?”
সাজু মাথা দুলিয়ে বলল, “হ, আমি পারমু। কিন্তু এইবার আমারে জামা কিন্না দেও। ওমা, আমি কি সবসময় তোমার কাছে চাই, কও? এইবার দেও। আমার খালি গায়ে ঈদগাহে যাইতে শরম লাগব। আমি কি ঈদের নামাজ পড়মু না?”
“পড়বি তো। নতুন জামা পিন্দা ঈদগাহে নামাজে যাবি এইবার।”
ছেলেকে আশ্বাস দিয়ে ঘুম পাড়িয়ে দিলেও সামিনা ঘুমাতে পারে না। শাড়ির ছেড়া আঁচলটা ছেলের ওপর বিছিয়ে দিয়ে অন্ধকারে মুখ চেপে কাঁদে। একটা নতুন জামার হাহাকার তাকে রাতভর পিষ্ট করে।
সকালে সামিনা তার পরনের কাপড়টা সেলাই করতে বসেছিল। উঠানের মাটিতে তখন মিষ্টি রোদ এসে গা এলিয়েছে। একেকটা ফোঁড় তুলতে তুলতে সামিনা তার জীবনের একেকটা পর্যায়ের কথা ভাবছিল। বুঝ হওয়ার পর বাবাকে দেখেনি সামিনা। মা তাকে নিয়ে পড়ে ছিল মামার বাড়িতে। সেখানে মামিদের কিল-চড় খেতে খেতে বিয়ের উপযুক্ত হয়ে গেছিল সে। এরপর কোত্থেকে মামা এক লোক ধরে এনে বলল সামিনার বিদায়ের সময় হয়েছে। সামিনা ভাবল, এ যেন তার মুক্তির পথ। বিয়ের পর নিজের সংসার হবে। আর কারো লাথি-ঝাটা খেতে হবে না।
সামিনার সে ধারণা বিয়ের সপ্তাহখানেক বাদেই নিঃশেষ হলো, আব্দুল জব্বার যেদিন তার ভাত খাওয়া নিয়ে খোটা দিলো। প্রথমবারের এক চামচ ভাত শেষ করে আরেক চামচ ভাত পাতে তুলতে চাইলে আব্দুল জব্বার বলে উঠেছিল, “মহিলা মানুষের এত খিদা থাকন লাগে না। জামাইর বাড়ির ভাত হিসাব কইরা খাইতে হয়।”
সামিনা হিসেব করেই খেয়েছে। এরপরেও তার কপালে বেশিদিন ভাত জুটল না। সামিনার গায়ের রঙ কালো। তার ঘরে সন্তান জন্মালো কালো। আব্দুল জব্বার নিজে কালো হলেও তার পরবর্তী উত্তরাধিকার সুন্দর হওয়ার সাধ হলো। তাই ফর্সা নতুন বউ ঘরে তুলল। সামিনার কোলের ছেলে শিশুটির কথা চিন্তা করে তাকে পুরোপুরি বিতাড়িত করতে পারল না। একটা কুড়েঘরে ফেলে রেখে গেল।
সেই থেকে সাজু ও সামিনা এখানেই পড়ে রইল। অনেকে বলেছে স্বামীর পা ধরে থাক। লাথি-উষ্টা দিলেও খাওয়ার কষ্ট হবে না। ছেলেটা তো বাপকে পাবে। সামিনা কারো কথা শোনেনি। জেদ ধরে কুড়েঘরেই পড়ে থেকেছে। রাতের পর রাত না খেয়ে থেকেছে। তবে এখন সামিনার জেদ কমেছে। মাঝে মাঝে আফসোস করে ভাবে স্বামীর পা ধরে থাকলেই ভালো হতো। অন্তত ভাত জোগাড়ের চিন্তা করতে হতো না। ছেলেটা না খেয়ে থাকত না। এসব হিসেব কষেই তার বেলা বয়ে যায় ইদানীং।
“করোস কী করোস কী? ও সামিনা, গায়ে রাইখা কাপড় সিলাইতে হয় না।”
হামিদা বুড়ি ছুটে এলো সামিনার কাছে। তিনি পেশায় একজন ভিক্ষুক। শহরে ভিক্ষাবৃত্তি করে পেট চালায়। সামিনা তাচ্ছিল্যের হাসি দিয়ে বলল, “গা থেইকা খুইলা সিলানির অবস্থাও যে নাই।”
হামিদা অবাক হয়ে বললেন, “তোর আর কাপড় নাই?”
“না গো বু, আমার কি আর সেই কপাল আছে যে একটার জায়গায় দুইডা কাপড় পিনমু! ছিড়া-ফাটা কাপড়ের লগে ছিড়া-ফাটা জীবনডারেও জোড়াতালি দিয়া চলি।”
হামিদা বুড়ি আফসোস করে উঠে গেলেন। ফিরে এলেন একটা পুরোনো রঙিন কাপড় নিয়ে। সামিনার কোলে গুজে দিয়ে বললেন, “এইডা পিন্দিস।”
সামিনা অবাক হয়ে বলল, “এত ভালা কাপড় তুমি কই পাইলা?”
হামিদা হেসে বললেন, “এইবার অনেক কাপড় পাইছি। ছিড়া কাপড় পিন্দা শহরের বড়োলোক বাড়িতে গিয়া গিয়া কইতাম একটা পুরান শাড়ি থাকলে দেন। আমার পিন্দনের কাপড় নাই। শহরের মাইনষের টেকাপয়সার অভাব নাই। হেরা তো কাপড় একবার পিন্দাই ফালায় দেয়। এইবার নতুন, পুরান অনেক কাপড় পাইছি।”
সামিনা দেখল হামিদার পরনের কাপড়টাও নতুন। বলল, “তোমারই কপাল গো বু।”
হামিদা বুড়ি বলল, “কপাল কইরা লইতে হয়, এমনে এমনে মিলে না। আমি কই কী, এইবার আমার লগে চল।”
সামিনা আঁতকে উঠল, “না না, আমি মাইনষের কাছে হাত পাইত্যা ভিক্ষা করতে পারমু না। আমার সাজু বড়ো হইতাছে। ওয় যদি জানে ওর মায় ভিক্ষা করছে তাইলে শরমে মইরা যাইব।”
হামিদা বুড়ি সামিনার গালে ঠোনা মেরে বললেন, “ভিক্ষা আবার কী! রোজা রমজানে বড়োলোকেরা যাকাত, ফেতরা দেয়। এইডা তো ভিক্ষা না। গরীবের হক। এই গেরামে কয়জন দেয়? দিলেও কি ভাগে পাওন যায়? শহরে দেওয়ার মানুষের অভাব নাই। আমার কথা ভাইবা দেখ। যদি ইচ্ছা থাকে কাইল ফজরে লইস। একলগে রওনা দিমু।”
সামিনার দুই চোখে দ্বিধা। হামিদাকে সে সরাসরি কোনো জবাব দিতে পারল না। সারাটাদিন শুধু ভেবেই চলল। নিজের মনে যুক্তিতর্ক চালালো। সে তো ভিক্ষা নেবে না। যাকাত-ফেতরায় গরীবের হক আছে। সেটাই নেবে। হামিদা বুড়ি প্রতিবছর ঈদে ভালো পরিমাণে কাপড়, শস্য, অর্থ পায়। সামিনা কি একবার গিয়ে দেখবে?
রাতে সামিনা ছেলের কাছে কথা পাড়ল, “জানোস বাপ, শহরে নাকি ঈদের সময় অনেক ইফতারি বিলায়। আবার নতুন জামাকাপড়ও দেয়।”
সাজু অবাক হয়ে বলল, “ক্যান দেয়?”
“এইডা নিয়ম। যাগো অনেক টেকা হেরা গরীবেরে যাকাত দেয়, দান-সদকা করে। এইডা কিন্তু আবার ভিক্ষা না। হামিদা বুড়ি নাকি প্রত্যেকদিন ইফতারি খায়। আবার নতুন নতুন কাপড় পায়। চাইল, ডাইল, সেমাই, চিনি সব পায়। ভাবতাছি আমিও এইবার যামু।”
সাজুর চোখ চকচক করে উঠল, “শহর কত দূরে, মা?”
“নদী পাড় হইয়া যায়। তুই যাবি আমার লগে?”
সাজুর চোখের সামনে তখন ভেসে উঠল এক কাল্পনিক স্থান। সেখানে বড়ো বড়ো গাড়ি চলাচল করে, সব ভালো ভালো খাবার মেলে। পথেঘাটে নাকি টাকা পড়ে থাকে। কত যে খেলনা সেখানে! সেইসব দেখার বাসনা সাজুকে সবকিছু ভুলিয়ে দিলো। বলল, “হ আমি যামু।”
পরদিন ভোরে কাপড়ের পুটলিটা বেধে নিয়ে সাজুকে ঘুম থেকে তুলল সামিনা। সাজু চোখ ডলে বলল, “কই যাও?”
“শহরে যাবি না? চল। নাওয়ে উইঠ্যা ঘুমাইস।”
দরজার বাইরে হামিদা বুড়ি ডাকছেন, “দেরি করিস না লো, অনেকখানি পথ যাওন লাগব।”
সাজু ঘুমঘুম চোখে মায়ের আঁচল ধরে বের হওয়ার সময় কী ভেবে আবার ভেতরে ছুটে গেল। তক্তার ওপর থেকে তার সেলাই করা একমাত্র জুতোজোড়া নামিয়ে পায়ে দিয়ে যাত্রা শুরু করল অদেখা শহরের দিকে।
চলবে…
