জোড়াতালি [পর্ব-২]
প্রভা আফরিন
সাজুর সারাদিনের কাজ নির্দিষ্ট। সকালে ঘুম থেকে উঠে সে উনুনের কাছে যায়। বাঁ হাতের তালু ভরে ছাই নেয়। এরপর ডান হাতের মধ্যমা দিয়ে দাঁত মাজতে মাজতে বিলের ঘাটে যায় হাত-মুখ ধুতে। দুবার কুলি করে ফিচ করে পানিটা ছুড়ে ফেলে বিলের এক টুকরো অংশ ঘোলা করে ফেলে। এরপর সেই ঘোলাটে ছাই কীভাবে পানিতে মিশে যায় তা মন দিয়ে দেখে। ছাই মিলিয়ে যেতে সাজুর আগ্রহও মিলিয়ে যায়। ছুটে আসে মায়ের আঁচলে মুখ মুছতে। আজ আঁচলে মুখ মুছতে গিয়ে লক্ষ্য করল বিশাল এক ছেড়া অংশ। সাজু সেই ছেড়া অংশে মাথা গলিয়ে দিয়ে বলল, “তোমার কাপড় ছিড়া গেছে মা।”
সামিনা হায়হায় করে উঠল, “করোস কী! আরো ছিড়া যাইব তো। মাথা বাইর কর।”
সাজু মাথা বের করল। পেটে হাত বুলিয়ে বলল, “খাইতে দেও।”
সামিনা থালাতে ভাসমান কিছু পানতা ভাত ভালো করে নুন দিয়ে চটকে মাখিয়ে দিলেন। সাজু থালা উঁচু করে ঠোঁটে ঠেকিয়ে সুরুৎ সুরুৎ করে সবটুকু খেয়ে নিল। তাতে ভাতের চেয়ে পানির পরিমাণটাই যেন বেশি। তবুও পেট তো ভরল! এই সান্ত্বনাতেই সুখী হলো মন। এরপর সাজু যাবে স্কুলের মাঠে। দুপুর অবধি স্কুলের মাঠে ছেলেমেয়েদের ছড়াছড়ি থাকে। তারা পড়তে যায় নাকি খেলতে তা বোঝা দায়। মাঠে গরু, ছাগলও চড়ায় অনেকে। সাজু অবশ্য পড়তে যায় না। সে খেলতেই যায়। কেউ যদি খেলায় নেয় সে মহা খুশি। না নিলেও অসুবিধা নেই। দূরে বসে দিব্যি খেলা দেখে বেলা কাটিয়ে দেয়। ঝোপের মাঝে বল হারিয়ে গেলে খুঁজে দেওয়ার দায়িত্বটা গুরুত্বের সঙ্গে পালন করে।
ঝোপঝাড়ে সাজুর ভয় নেই। মশার কামড়ে তার গায়ে গুটি গুটি লাল দাগ সর্বদাই ছেয়ে থাকে। তাতে তার হেলদোলও থাকে না। তবে গরমে ঘামাচি ভীষণ চুলকায়। সারা শরীরে তিল ধারণের জায়গা থাকে না। মা রাতের বেলা ঘুমের সময় কুটকুট করে ঘামাচি গেলে দেয়। সাজুর আরাম লাগে। দিনের বেলা মায়ের কাছে দুদণ্ড বসার ফুরসত ওর নেই। তবে বিকল্প পন্থা আছে। বালিতে শুয়ে গড়াগড়ি করলে আরাম পাওয়া যায়৷ তাই গরমের দিনে সাজুকে বালিতে গড়াগড়ি করতে দেখাটা রোজকার দৃশ্য। এরপর দুপুরের সূর্য মাথায় নিয়ে সমবয়সীরা সব হই হই করে নদীতে ঝাপিয়ে পড়বে গোসল সেরে নিতে।
সাজু ভালো সাঁতার জানে। অনেক সময় বন্ধুরা মিলে প্রতিযোগিতা করে দ্রুত সাঁতারের। সাজু প্রতিবারই জিতে যায়। নদীর কিনারার আম গাছের সবচেয়ে উঁচু ডাল থেকে লাগ দেওয়ার সাহসটাও সাজু ব্যতীত কেউ করতে পারে না। সকলের চেয়ে সাজুর সাহস বেশি এ কথা সবাই মানতে বাধ্য। তাই অন্যকোনো বিষয়ে উপেক্ষিত হলেও নদীর বুকে সাজুই রাজা। দুই ঘণ্টা পানিতে ঝাপিয়ে চোখ লাল হয়ে যায় ওর। মায়ের ধমক খেয়ে পাড়ে ওঠে সাজু। এরপর রোদে গা শুকিয়ে নেয়। দুপুরে ভাত জোটে কদাচিৎ। মাঝে মাঝে পেটকে সান্ত্বনা দিতে আলু, লাউ, পেঁপে বা শাক সেদ্ধ খেয়ে নেয়। সাজু খাওয়া নিয়ে অভিযোগ করে না। উঠতি বয়স ওর। যা খায় তাতেই মজা পায়।
ফলের দিনে অবশ্য চিন্তা কম। এর ওর গাছের কুড়িয়ে পাওয়া আম, জাম, ডেউয়া, বরই, কামরাঙা এসব দিয়েই পেট ভরে যায়। তাল পাকার দিনে অনেকে পাকা তালের রস দিয়ে পিঠা বানায়। তালের বড়াটা ফেলে দেয়। সাজু সেসব তালের বড়া কুড়িয়ে এনে ঘরের পেছনের ভাঙা ঝুঁড়ির নিচে জমিয়ে রাখে। কিছুদিন পুরোনো হয়ে শেকড় দেখা যাওয়ার পর সেই তালের বড়া কেটে দুই ভাগ করে ভেতর থেকে সাদা শাস বের করে দেয় সামিনা। মিষ্টি সেই শাস সাজু আনন্দ করে খায়।
শীতের সময় যখন বিলের পানি শুকিয়ে যায়, সাজু মায়ের সঙ্গে কাদায় নেমে হাত দিয়ে মাছ ধরতে চেষ্টা করে। তার মা খালি হাতে কাদার গর্ত থেকে শিং মাছ ধরতে পারে। আরো ধরে টাকি, কৈ, বাইন, পুটি মাছ। সাজু ধরতে না পারলেও যথাসাধ্য চেষ্টা করে। যতদিন মাছ মেলে ওরা দুইবেলা মাছভাত খেতে পারে। বেশি মাছ হলে কিছু বেচে দিয়ে নগদ টাকাও মেলে।
এছাড়া ধানের সময় সামিনার হাতে কাজ থাকে। রাত জেগে মহাজনদের ধান সেদ্ধ করে দেয়। বিনিময়ে কিছু ফসল পায়। মহাজনদের বাড়িতে ছুটা কাজের দরকারে মাঝে মাঝে সামিনার ডাক পড়ে। সামিনা যেন কান পেতেই থাকে কখন কে ডাকে। একটু কাজ পাওয়ার জন্য সে মুখিয়ে। কিন্তু খরার সময় না মেলে কাজ, না জোটে খাওয়া।
এবার রমজান মাসে সামিনা তেমন কাজ পায়নি। ঈদের দুদিন আগে অবশ্য কাজের জন্য ডাক পড়বে। তখন ফসলের বদলে ছেলের জন্য ভালো জামা কেনার টাকা চাইবে সামিনা এমনটাই ভাবনা তার। কিন্তু দিন ফুরায় না। এদিকে সাজু প্রতিবেলা একবার করে মনে করিয়ে দেয় নতুন জামার কথা। সামিনা শুধু আশা দিয়ে রাখে।
সামিনার পরিধানের একটা মাত্র শাড়ি। প্রতিদিন বিকেলের আগে সে ঘাটে যায় নাইতে। নেয়ে এসে ভেজা কাপড়টা গায়ে নিয়েই সে রোদে শুকাতে চেষ্টা করে। এভাবেই এক কাপড়ে দিন পার হয় তার। তার এই করুণদশা দেখে কিছুমাস আগে শেফালি বুবু একটা পুরোনো শাড়ি দিয়েছিল তাকে। পুরোনো হলেও অবস্থা ভালো বিধায় সামিনা সেটা না পরে তুলে রেখেছিল। তা সেটা ইঁদুরের কাজেই লাগল। সামিনার অবস্থা একই রইল।
মাঝে মাঝে সামিনা যখন ভেজা কাপড় গায়ে শুকাতে দাড়িয়ে থাকে, মোতালেব মাঝি বেশ উঁকিঝুকি মারে। সামিনা তাকে দেখা মাত্রই পা চালিয়ে সরে যায়। মোতালেব অবশ্য ঘাটেই থাকে। নৌকাতেই তার ঘর। ফলে সুযোগ পেলেই সামিনাকে চোখ দিয়ে উত্যক্ত করতে ছাড়ে না। কখনো সুযোগ পেলে আফসোস করে বলে, “আহারে সামিনা, জব্বারে তোর মতো যুবতী ফালাইয়া কেমনে পারল আরেকটা হাঙ্গা করতে? তোর কষ্ট দেখলে বুকটা ফাইট্টা যায়।”
মোতালেবের বুক ফাঁটার পাশাপাশি জিবটাও যে লকলক করে তা সামিনার অজানা নয়। মোতালেব সুযোগের অপেক্ষায় আছে। সুযোগটা সহসা মিলেও গেল। দুপুরের পর ঘাট যখন ফাঁকা তখন সামিনা নেমেছিল গোসল করতে। মোতালেবও সেই সময় পানিতে ঝাপিয়ে পড়ল। সামিনা চমকে উঠে নিজেকে সামলে নেওয়ার আগেই মোতালেব পানির নিচে ওকে জাপটে ধরল। সামিনা চিৎকার দিয়ে ধস্তাধস্তি শুরু করল। মোতালেব বারবার তাকে শান্ত করতে বলতে লাগল, “আরে থাম থাম, আমি তো তোর ভালা চাই। জুয়ান মাইয়া কয়দিন একলা থাকবি। খাওন, পিন্দন, আনন্দ, ফূর্তির দরকার আছে না জীবনে? আমি একটা ভালা প্রস্তাব দিতাছি, আমারে বিয়া কর। তোর ভাতের কষ্ট হইব না। তোর পুতেরে ব্যাপারীর নৌকায় লগি ঠেলার কাম দিয়া দিমু। আর অভাব থাকব না।”
সামিনা মোতালেবকে কামড়, ঘুসি মেরে, তার মুখে থুতু মেরে সেখান থেকে কোনোমতে পালিয়ে আসে। কিন্তু পালিয়ে কতদূর! সামিনার যে নিরাপদ আশ্রয়টুকুও নেই।
চলবে…
