#স্মৃতির_ধারে
#পর্ব_২
#মৌরিন_জিনাত_জাহিন
আমরা সেদিন ফুচকা খাওয়াতেই থেমে রইলাম না। ঝালমুড়ি, গোলা, ঝুড়ি ভাজা – একেএকে সবকিছু খেলাম। মারুফ সাহেব একটারও টাকা আমায় দিতে দেননি। নিজে থেকে মিটিয়েছেন সবটা। আমি অবশ্য ভেবেই রেখেছি,একসঙ্গে তাকে সবকিছুর টাকা দিয়ে দেবো, সে যতটা চাইবে তারচেয়ে বেশিই দেবো।
এত খাওয়াদাওয়া শেষেও সময়টা যেন থেমেই রইলো! ঘড়িতে তাকিয়ে দেখলাম সাতটা বাজতে আরো দশমিনিট বাকি। মারুফ সাহেবের দিকে চোখ তুলতেই দেখলাম তিনি ফোনের দিকে একদৃষ্টে চেয়ে পড়ছেন কিছু। কী পড়ছেন তা বুঝলাম না, তবে বাহবা দিয়ে বললাম,
“বাহ বাহ! রাস্তায় বসেও পড়ছেন! বাবা দেখলে জড়িয়ে ধরে আপনাকে দুটো চুম..”
তার শীতল দৃষ্টি এদিকে পড়তেই থেমে গেলাম আমি। ধীরেধীরে মুখটা স্বাভাবিক করে বললাম,
“এভাবেই পড়তে থাকুন। জীবনে অনেক উন্নতি করবেন।”
“ফর ইয়োর কাইন্ড ইনফরমেশন,এটা গল্পের বই।”
“বই?”
“পিডিএফ।”
আমি অবাক দৃষ্টে চেয়ে শুধাই,
“কী বই পড়ছেন?”
“নাম বললে বুঝবেন? বই টই পড়েন আদেও? মনে তো হয়না।”
কথাটা বলে হালকা হাসলেন বলে মনে হলো। অবশ্য ভুল কিছু বলেন নি। আমি সোজা হয়ে বসে চুলগুলো কানের পিঠে গুঁজে বলি,
“তা পড়িনা ঠিকই,তবে সাজেস্ট করলে তো পড়তেও পারি। আর আমার অ্যাকাডেমিক বইতেই মন বসে না, গল্পের বই তো বিলাসিতা।”
মারুফ এবার সত্যিই হাসলেন! আমি তাকিয়ে দেখলাম,ছেলে হলেও হাসলে তার বামগালে সামান্য একটা টোল পরে। দেখতে বেশ সুন্দর লাগে। তিনি তাকাতেই আবারো চোখ সরিয়ে নিলাম। এই প্রথম বুঝি বিরক্তিহীন স্বরে বললেন,
“এই নেশাতে একবার ডুবলে বেরোনো মুশকিল হয়ে যায়। না পড়লে সাজেস্ট করবো না। কখনো ইচ্ছে হলে নিজের পছন্দমতো কোনো বই পড়ে দেখবেন। এক্ষেত্রে কবিতা থেকেও শুরু করতে পারেন; যদি মন টানে তো।”
বেশ ভালো লাগলো তার সাধারণ কথাটা। সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেললাম,পরেরবার লাইব্রেরিতে গেলে কেবল ছবি তুলেই চলে আসবো না। বসবো,পছন্দসই একটা বই নিয়ে পড়ে দেখবো।
তার আরো কিছু কথা শুনতে শুনতে সাতটা বেজেই গেল। যাওয়ার সময় হয়ে এসেছে… বিদায়ের উদ্দেশ্যে উঠতেই যাচ্ছিলাম আমরা। এমন সময়ে শরীর স্পর্শ করলো কিছু শীতল জলকণা। উপরে তাকাতেই দেখলাম সন্ধ্যার আকাশটা ধূসর মেঘে ঢেকে গেছে। ল্যাম্পপোস্ট এর আলোতে পিচঢালা রাস্তায় পড়তে থাকা বারিধারার মাত্রা বাড়তেই মারুফ তাড়া দিয়ে স্কুলের ভিতর নিয়ে গেলেন আমায়। যদিও ভিতরে প্রবেশ করলাম না। বড় গেইটের সামনের ছাদ দেওয়া জায়গাতে গিয়ে আশ্রয় নিলাম দুজন। মারুফ আমার পাশে দাঁড়িয়ে চুল ঝেড়ে নিলেন। জানিনা কেন, সেই সময়টাতে আমার নিজেকে বড্ড উদাসীন মনে হচ্ছিলো। সচরাচর এমনটা হয়না!
হাত বাড়িয়ে একবার ছুঁয়ে দেখলাম বৃষ্টির বড়বড় কণাগুলো। মুহূর্তেই তারা সম্পন্ন করে নিলো আমার হাত ভিজিয়ে দেওয়ার কাজ। আমি তেমন উদাস কণ্ঠেই বলি,
“এখানে এলেন কেন? ভিজতাম একটু!”
তার নিকট হতে উত্তর পেলাম না কোনো। তবে কয়েক সেকেন্ড বাদে আমার ছোট্ট হাতটার পাশে একটা পুরুষালী হাতের উপস্থিতি লক্ষ্য করলাম। তার দিকে না ফিরে আমি চেয়ে রইলাম তার হাতখানার দিকেই। সঙ্গে শুনলাম তার ভারী গলায় বলা কয়েকটি শব্দ,
“চৈত্রমাসের বৃষ্টি। কী অবাক কাণ্ড!”
আমি আনমনে হেসেছিলাম তখন। কেন হেসেছি,জানা নেই। জানতে চাইও নি। কিছু হাসির কারণ অজানা থাকাই শ্রেয়। জেনে গেলেই বিপদ! মাঝে একবার মনে হলো, মারুফ বোধ হয় তাকিয়ে আছেন আমার দিকে। যে দৃষ্টিতে বিরক্তির রেশমাত্র নেই। বাচাল আমি সেদিন শেষ সময়ে এসে বাক হারিয়ে বসলাম। মুখে আমার একটাও কথা এলোনা! মারুফ নিজের হাতটা সরিয়ে হুট করে বললেন,
“থাকুন। আমি আসছি একটু।”
“কোথায় যাচ্ছেন?”
আমার কণ্ঠে ভয় মিশে ছিল। একা একা পুরো শহর চষে বেড়ানো চৈতির তখন মনে হলো,এই ছেলেটি ব্যতীত সে কোনোক্রমেই বাড়ি ফিরতে পারবেনা। মারুফ কী বুঝলেন জানা নেই। তবে তার চোখগুলো কিঞ্চিৎ হেসে উঠলো, আমার দিকে চেয়ে অভয় দিয়ে বললেন,
“এতক্ষনে যখন পালিয়ে যাইনি,এখনও যাবোনা। ওয়াশরুমে যাচ্ছি,অপেক্ষা করুন। বৃষ্টি কমলে ভালো। আর নাহলে এর মাঝেই বেরোতে হবে।”
এপর্যায়ে আমি যেতে দিলাম তাকে। নিজে গিয়ে বসলাম নিচু চওড়া সিঁড়িতে। স্কুলটা তখন জনশূন্য, কেচিগেইট বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। মারুফ কোনদিক থেকে কোন ওয়াশরুমে গেলেন তাও জানিনা। তবে দশমিনিট পেরিয়ে যাওয়ার পরও তাকে ফিরতে না দেখে এবার ভয় হলো আমার। মেইন গেইটের সামনে থাকা দারোয়ান এবং আমি ব্যতীত আশেপাশে আর কাউকে দেখতে না পেয়ে রিতীমতো চোখ ভিজে এলো। পরক্ষণেই ভাবলাম, এতটা সময় সে ব্যতীত আশেপাশে তেমন কেউ ছিলোনা। এক অপরিচিত ব্যক্তি,অথচ সামান্যতম ভয় জাগ্রত হয়নি আমার মাঝে। কেন হয়নি?
প্রশ্নের উত্তর খোজার মাঝেই মারুফের দেখা মিললো। আমি উঠে দাঁড়িয়ে তেজি স্বরে বলে উঠলাম,
“কোথায় ছিলেন এতক্ষন? জানেন,কত ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম আমি?”
কথাটা বলে নিজের কাছেই লজ্জিত ছিলাম। তার কীসের দায় আমার সঙ্গে থাকার? ভাবলাম তিনি বোধহয় দু চারটে কড়া কথা শুনিয়ে দিবেন। সে অনুযায়ী প্রস্তুতিও নিলাম। তবে তিনি কিছুই বললেন না। বরং আরো একবার হাত বাড়িয়ে বৃষ্টির মাত্রা দেখে আওড়ালেন,
“প্রায় সাড়ে সাতটা বাজে। যেতে যেতে আটটা বেজে যাবে। বেরোনো উচিৎ আমাদের।”
আমিও সম্মতি জানাই তার সঙ্গে। ঝিরিঝিরি বৃষ্টির মাঝে আমরা দুই নরনারী পাশাপাশি হেঁটে গেলাম। ধীর পায়েই; ছোটছোট কদম ফেলে বাইক অবধি পৌঁছালাম। তিনি হেলমেট পরলেন, আমাকেও দিলেন। অত:পর তার পিছনে বাইকে চেপে বসলাম আমি, আলতোভাবে হাত রাখলাম কাঁধের উপর। বৃষ্টি নেই তেমন, তবে আমার মাঝে যে অদ্ভুত ভালোলাগা কাজ করছিলো তখন!
আকাশপানে চেয়ে চোখ বুজতেই বিন্দু বিন্দু জলে ভিজে পেল চোখের উপরের অংশ, বারেবারে কেঁপে উঠলো চোখের পাতা।
আসার সময় মারুফকে যতটা বিরক্ত করেছি আমি, ফিরে যাওয়ার বেলায় ঠিক ততটাই শান্ত রইলাম। পথের কোনো অংশে চৈতির গলার স্বর শোনা গেলনা। ক্ষনিকের সেই সময়টুকুতে আমি হারিয়েছিলাম এক অন্য জগতে। অনেকটা সময়ের যাত্রা শেষে বাইকে ব্রেক কষতেই ফিরে আবার এলাম বাস্তবে। চোখ মেলে দেখলাম সেই সুপারশপ,যেখান থেকে মারুফের বাইকে উঠেছিলাম আমি।
বৃষ্টি থেমে গেছে ততক্ষনে। আমি নেমে দাঁড়াই বাইক থেকে, হেলমেটটা সিটের উপর রেখে নিজের পার্স থেকে হাজার টাকার দুটো নোট বের করে এগিয়ে দেই মারুফের দিকে। তিনি কিয়ৎক্ষন তাকিয়ে থেকে হাতে নিলেন টাকাটা। মানিব্যাগ থেকে খুচরো বের করতেই বললাম,
“যতটা প্রয়োজন রাখুন। রাইড ব্যতীত সময়ের মূল্যটাও।”
মারুফ আমার দিকে একনজর তাকালেন,শান্তস্বরে বললেন,
“সময়ের মূল্য মেটানো কি এতই সোজা? যদি তেমনটাই হতো,তাহলে তো জগতে এই ক্ষুদ্র বস্তুকে কেউ পরোয়াই করতো না। সকলেই নিজের দরকার অনুযায়ী সময় কিনতে পারতো।”
তার দিকে তাকিয়ে থাকায় মানিব্যাগের দিকে আর নজর দেওয়া হয়নি। কত টাকা রাখলেন,কত দিলেন জানা নেই আমার। হাতে নিয়ে ফেরত দেওয়া টাকাগুলো ব্যাগে ঢুকিয়ে নিলাম। মারুফ বাইক স্টার্ট দেওয়ায় উদ্যত হতেই স্মিত হেসে বললাম,
“ধন্যবাদ,মারুফ সাহেব। নিজের মূল্যবান সময়টুকু এই অপরিচিতাকে দেবার জন্য।”
মারুফ চট করে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলেন,
“নাম জানলেন কী করে আমার?”
“জার্সিতে যে স্পষ্ট অক্ষরে লিখে রেখেছেন,খেয়াল নেই?”
আমার কথা শুনে হেলমেট এর আড়ালেই মুচকি হাসলেন তিনি, আমি স্পষ্ট বুঝলাম তা। কিছুক্ষন ভাবলেন বোধ হয়,অত:পর আমি পিছু ঘুরতেই বললেন,
“ইউ আর মোস্ট ওয়েলকাম… চৈতি সাহেবা।”
এবারে আর পিছু ঘুরে তার দর্শন পেলাম না। সঙ্গেসঙ্গে বাইক ছুটিয়ে নিজের পথ ধরলেন, দৃষ্টির আড়ালে হারিয়ে যেতে সময় নিলেননা মোটেই। এদিকে আমি ঠায় দাঁড়িয়ে রইলাম হা করে। তিনি আমার নাম কী করে জানলেন? ওহ! আপুকে বলেছিলাম যে!
সুপারশপে আরো একবার ঢুকলাম তখন। নিলাম কিছু চিপস,চকলেট,জুস। রাতে এগুলো ছাড়া পড়তে বসা হয়না। তবে দাম পরিশোধের বেলায় ব্যাগে হাত দিতেই ভ্রুকুঞ্চিত হলো আমার। তাকে আমি দু হাজার টাকা দিয়েছিলাম। তিনি সেটাকেই পাঁচশো,দু’শো,একশো টাকার নোটে রূপান্তরিত করে ফিরিয়ে দিয়েছেন আমায়। আশ্চর্য! তিনি একটাকাও রাখেননি কেন? টাকাগুলো হাতে নিয়ে গুনতে যাবো এমন সময় আরো একটি বস্তু চোখে পড়লো। টাকার পাশেই ব্যাগে ছোট্ট একটা কাগজ। হাতে নিয়ে বোঝা গেল বড় একটা কাগজকে যথাসম্ভব ভাঁজ করে ছোট করা হয়েছে।
ক্যাশিয়ার এর তাড়া দেওয়ায় চিন্তাচ্যুত হতে হলো আমায়। দ্রুত টাকা পরিশোধ করে বেরিয়ে এলাম সেখান থেকে। সাদা রঙের কাগজটা ওখানে দাঁড়িয়েই খুললাম ধীরেধীরে। অনেকগুলা ভাঁজ থাকায় সময় লাগলো, এরপর বুঝলাম সেখানে একটা নয় দুটো কাগজ ছিলো। শেষ ভাঁজটা তবুও খোলা হলোনা। ব্যাগে থাকা ফোনটা অনবরত ভাইব্রেট হতে আরম্ভ করলো; কেউ কল করছে। আমি ধরেই নিলাম মায়ের কল। মারুফ ওয়াশরুমে থাকাকালীনই খুলেছিলাম ফোনটা।
দেখবো না দেখবো না করেও ফোনটা হাতে নিলাম। কি কিন্তু নাহ,মায়ের কল নয়। একটা আননোন নম্বর। ভ্রু কুঁচকে রিসিভ করে কানে ধরলাম ফোনটা। তৎক্ষণাৎ অপর পাশ থেকে চেঁচামেচির আওয়াজ কানে এলো। এর মাঝেই একজন লোক দ্রুতগতিতে বললেন,
“এই ফোনের মালিক কে হয় আপনার? যেখানেই আছেন দ্রুত বারো নম্বর সেক্টরের দিকে আসুন। তিনি বেশ গুরুতর অ্যাক্সিডেন্ট করেছেন। আমরা তাকে…”
তার কথা শেষ হওয়ার পূর্বেই টুট টুট শব্দ তুলে কেটে গেল কলটা। হসপিটাল এর নাম আর শোনা হয়ে উঠলোনা। ফোন ধরে থাকা হাতটা আমার কেঁপে উঠলো থরথরিয়ে। নম্বরের শেষ কিছু ডিজিট দেখে মনে হলো এটা মারুফের নম্বর। অকস্মাৎ এহেন খবরে জ্ঞানশুন্য হয়ে পড়লেও দ্রুত কলব্যাক করতে চেয়েছিলাম। ঠিক সেই মুহূর্তেই আরেকটা কল এলো মামার নম্বর থেকে। আমি তুলতে চাইনি। ভুলবশত আঙুলে চাপ লেগে রিসিভ হলো কলটা। কানে না ধরলেও মামার উচ্চস্বরে বলা কথাগুলো শ্রবণেন্দ্রিয়ে আঘাত করলো আমার।
“চৈতি, কোথায় তুই? দুলাভাই হুট করে অসুস্থ হয়ে পড়েছেন,জ্ঞান হারিয়ে ফেলেছেন। কোনো রিসপন্স করছেন না। হসপিটালে যাচ্ছি আমরা। তোর মা কে সামলানো যাচ্ছেনা।”
আমি নিস্তব্ধ হয়ে গেলাম সেই মুহূর্তে। মামার কথা আর কানে গেল না। বাবার হার্টে সমস্যা রয়েছে। সঙ্গে এর আগে দুবার মিনিস্টোক করেছেন।
মারুফ,বাবা দুজনের কথা ভাবতেই পায়ের নিচের মাটি একটু একটু করে সরে যেতে লাগলো। মনে হলো আমি এখানেই জ্ঞান হারাবো,দেহের ভর ধরে রাখা সম্ভব হচ্ছেনা আর। এই মুহূর্তে কী করা উচিৎ আমার? কোথায় যাবো আমি? কার খবর নেবো? জন্মদাতা বাবার…নাকি অপরিচিত মারুফের?
#চলবে?
