#স্মৃতির_ধারে
#পর্ব_৩ [অন্তীম পর্ব]
#মৌরিন_জিনাত_জাহিন
রিক্সাটা গিয়ে থামলো বিশ্বসাহিত্যকেন্দ্র ভবনের সামনে। আমি নেমে গেলাম,যথাযথ ভাড়া মিটিয়ে প্রবেশ করলাম ভবনে। এরপর সোজা চলে গেলাম সপ্তম তলার বাতিঘরে। এই প্রথম এখানে বন্ধুবান্ধব ব্যতীত একা এসেছি। আরো একটা বিষয়, ছবি তুলতে আসিনি আজ। বই পড়তে এসেছি নাকি অন্য কাজে তা ঠিক জানা নেই।
বহু মানুষের মাঝেও মোটামোটি একটা ফাঁকা জায়গা খুঁজে বসলাম। প্রতি মুহূর্তে চারিপাশে নজর রাখলাম,পাছে কাঙ্ক্ষিত এক ব্যক্তির দর্শন পেয়ে যাই!
সেদিন বাবা এবং মারুফের কথা বিবেচনায় রেখে আমি ছুটে গিয়েছিলাম বাবার কাছেই। যেই মানুষটা আমায় সাহায্য করলেন,তাকে সাহায্য করতে যাইনি আমি, যাওয়া সম্ভব হয়নি। ইচ্ছে ছিলো বাবার অবস্থা বুঝে তার ব্যপারে খোঁজ নিবো। তবে তা আর হলো কই! হসপিটালে যাওয়ার কিছুক্ষন পরেই ডাক্তার এসে জানালেন মিনিস্টোক নয়, বাবা এবার সরাসরি ব্রেইন স্টোক করেছেন। চব্বিশ ঘণ্টার আগে কিছু বলা যাচ্ছেনা। এর মাঝে জ্ঞান না ফিরলে কোমায় চলে যাওয়ার বিস্তর সম্ভাবনা রয়েছে।
শুনতে খারাপ লাগলেও সত্য এটাই, সেই সময়টাতে আমি ভুলেই বসেছিলাম মারুফের কথা। কিছুক্ষন পূর্বে যে মারুফ নামক এক ব্যক্তির সঙ্গে পরিচয় হয়েছিলো আমার,খুবই স্বল্প সময়ের পরিচয় তবে এক বিশেষ অনুভূতি… সবটা বিদায় নিয়েছিলো মস্তিষ্ক থেকে। আমার তাকে মনে পড়েনি; ততদিন অবধি মনে পড়েনি যতদিন বাবা কোমায় ছিলেন।
তাকে ব্যাংকক নিয়ে যাওয়া হয় চিকিৎসার জন্য। প্রায় দু-মাস দিন দুনিয়া ভুলে খোদার কাছে প্রার্থনা করে যাই তার সুস্থতা কামনায়। পরিশেষে দোয়া কবুল হলো আমাদের সকলের। বাবা চোখ খুলে চাইলেন ঠিক দু-মাস তিনদিন পর। সৃষ্টিকর্তার রহমতে সবাইকে চিনতে পেরেছেন। এমনকি জ্ঞান ফেরার পর সর্বপ্রথম আমার নামই উচ্চারিত হয়েছিলো তার মুখ থেকে।
আর ঠিক সেদিনই আমার মনে পড়লো মারুফের কথা। কেমন আছেন তিনি? বুকের ভেতরটা মুচড়ে উঠলো ক্ষনিকের মাঝেই। তৎক্ষণাৎ ফোন হাতে নিয়ে ডায়েল করলাম তার সেই নম্বরটাতে। কিন্তু বিপরীতে শোনা গেল, ‘আপনার ডায়েলকৃত নম্বরটি এই মুহূর্তে বন্ধ আছে’। আমি আবার কল করলাম, কিন্তু একই উত্তর।
ব্যাংককে থাকাকালীন আরো শতবার সেই নম্বরে ডায়েল করেছি আমি। তবে এই এক বাক্য ব্যতীত আর কিছু শোনার সৌভাগ্য হয়নি।
সেদিনের ব্যাগটা বাড়িতে ছিলো, আর তার মধ্যেই সেই অর্ধ ভাঁজখোলা কাগজ। আমি রিতীমতো মরিয়া হয়ে উঠেছিলাম সেই কাগজটা খোলার জন্য; তার মাঝের লেখাগুলো পড়ার জন্য।
বাবাকে নিয়ে বাড়িতে ফেরামাত্রই দরজা আটকে প্রথম সেই কাগজটা খুলেছিলাম। আর তারপর…
তারপর গত একবছরে শতাধিকবার এই দুহাতে মেলে ধরেছি চিঠিখানা। কখনো সপ্তাহে একবার; কখনো দুদিনে একবার; আবার কখনো দিনে কয়েকবার। তেমনই আজও খুললাম। পড়তে পড়তে মুখস্ত হয়ে যাওয়া পত্রটির প্রতিটি শব্দ সময় নিয়ে পড়লাম আবারো। একবার…দুবার…অনেকবার…
‘চৈত্রের চৈত্রিকা,
অপ্রত্যাশিত হলেও আপনার সঙ্গে আমার প্রথম দেখার সময়টা আজ নয়। আপনি জানলে অবাক হবেন, প্রথমবার আপনার দর্শনটা আমি পেয়েছিলাম বাতিঘরে। যদিও সে দেখা একপাক্ষিক, আপনি দেখেননি আমায়। মারুফ নামক কেউ যে আপনার খানিক পাশের চেয়ারটাতেই বসেছিল তা আপনি লক্ষ্য করেননি। করবেন কী করে? তখন যে আপনার চোখেমুখে হাসিত ফোয়ারা নেমেছে। শ’খানেক ছবি তোলা শেষেও বন্ধুদের দ্বারা আরো ছবি তুলিয়ে নিচ্ছেন নিজের।
জানেন চৈতি? এমন ধরণের ব্যক্তি আমার খুব একটা পছন্দের নয়। গ্রন্থাগার হলো বই পড়ার জায়গা, জ্ঞানার্জনের জায়গা। সঙ্গে দু একটা ছবি মেনে নেওয়া যায়। কিন্তু তাই বলে এত! প্রথমবার তাকিয়ে বিরক্তিতে চোখ সরিয়ে নিয়েছিলাম আমি। তবে বইয়ের পাতায় মনোযোগ আর ধরে রাখতে পারলাম কই! একজোড়া চোখ যে আমায় ক্রমশ বাধ্য করলো নির্লজ্জের ন্যায় চেয়ে থাকতে। অপলকভাবে,একদৃষ্টে…
চৈতি,আপনার চোখজোড়ায় কী আছে বলুন তো? কোনো ভিনগ্রহ হতে উঠে আসা জাদুকরী বলে মনে হলো আমার আপনাকে। একদিনের সেই ক্ষনিকের দর্শনে আমি এভাবে মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে গেলাম! চোখ বুজলেই আধারের মাঝে ধরা দিতো সেই ঘন পাপড়িতে আবদ্ধ টানাটানা চঞ্চল চক্ষুযুগল এবং তার মালকিন। তার হাস্যজ্জ্বল চোখে এমন এক ধরনের আনন্দের ঝিলিক ছিল, যেন সে এক জীবনের সব সুখ পেয়ে গেছে! এখন তার কাজ কেবল সুখ বণ্টন করা। তার কোমন দৃষ্টি যেন জানান দিলো,
‘তুমি আমায় ভাবনায় স্থান দিও
আমি তোমার স্বপ্নে স্থান নেবো’
আপনি সত্যিই আমার স্বপ্নের রোজকার অতিথি হয়ে গিয়েছিলেন চৈতি। সেদিন আনমনে একটা ছবি তুলেছিলাম আপনার। নাক অবধি বই ধরে রাখা,কেবল চোখদুটো দেখা যায়।
এরপর বাতিঘরে যাওয়ার মাত্রা বাড়িয়ে দিলাম। মাসের বদলে সপ্তাহে একবার করে যাওয়া শুরু করলাম। এই এক আশায় যে কোনো একদিন আবারো দর্শন পাবো ঐ চোখদুটির, তাকে আর একটিবার দেখার তৃষ্ণা আমার মিটবেই।
তবে প্রতিবার আশাহত হয়ে ফিরতে হয় আমাকে। হাল ছাড়িনি কিন্তু! গতকালও গিয়েছিলাম তার খোঁজে। আবার যেতাম আগামী সপ্তাহে। কিন্তু কে জানতো,ভাগ্য আমায় এতবড় এক চমক দেবে!
আপনি খেয়াল করেননি চৈতি, আপনি ধরতেই পারেননি আমার সেই বিস্ময়কর দৃষ্টি যে আপনার কথার ফলে সৃষ্টি হয়নি। আপনার কথাতো আমার কানেই যায়নি সেভাবে! আমিতো বিস্মিত ছিলাম আপনার দর্শন পেয়ে, ঐ গভীর চোখদুটির দেখা পেয়ে।
স্কুলের সামনে এসে আমি বাইক থামিয়েছিলাম কেন জানেন? আপনার কথায় বিরক্ত হয়ে নয়, আপনাকে দেখার তীব্র তৃষ্ণায়। অমনোযোগী হয়ে কোনো দুর্ঘটনা না ঘটিয়ে ফেলি সেই চিন্তায়। পিডিএফ এ বইয়ের একটি বাক্যও পড়িনি আমি। তা তো ছিলো কেবল স্ক্রিনে আপনার প্রতিচ্ছবি দেখার মাধ্যম।
জীবনে একবার ব্যতীত কখনো ফুচকা খাইনি আমি। সিগারেট – ওটা খাওয়া হয় মাঝেসাঝে। ঠান্ডার সমস্যা আছে খুব,বরফের সেই গোলা খাওয়ায় নিশ্চিত সপ্তাহখানেক টনসিল এর ব্যাথায় ভুগতে হবে। ঝালমুড়িতে ঝাল খেতে পারিনা তেমন,জিভ জ্বলে যায়। তবে আজ এসব কিছুই অনুভব করিনি। ফুচকা,ঝালমুড়ি,গোলা সবকিছুই আজ অমৃত মনে হলো আমার কাছে। এর চেয়ে সুস্বাদু খাবার বুঝি আর পৃথিবীতে দুটো নেই!
অসময়ের এই বৃষ্টির প্রতি আজ আমার কৃতজ্ঞতা ব্যক্ত করা উচিৎ, তাইনা? এমন অসম্ভব এক সুন্দর মুহূর্তকে স্মৃতিবদ্ধ করার জন্য হলেও, তার প্রতি আমার কৃতজ্ঞ থাকা উচিৎ। বিশ্বাস করবেন না চৈতি! আমি আজও লাজ লজ্জা ভুলে তাকিয়ে ছিলাম আপনার পানে। তবে আজ বেশ উদাসীন দেখালো আপনাকে। হাত বাড়িয়ে বৃষ্টি উপভোগ করা উদাসিনীকে যে আমি প্রাণ ভরে দেখে নিলাম, আপনি বুঝলেন না তা?
ওয়াশরুমে যাওয়াটাও তো কেবল বাহানা ছিলো। আমিতো এসেছি চিঠি লিখতে। কে বলতে পারে,যদি আপনাকে কথাগুলো জানানোর সময় কিংবা সুযোগ আর না হয়!
চৈতি,আমার কাছে সবটা স্বপ্ন হয়ে ঠেকছে এখনো। মনের ভ্রম মনে হচ্ছে। তবে আমি খুব করে চাই,এটা ভ্রম না হোক। আজকের এই মুহূর্তটা বাস্তব হোক,যা চিরকালের জন্য রয়ে যাবে আমার কল্পরাজ্যে।
প্রথম আপনাকে দেখেছিলাম যেদিন,সেদিনও আকাশে মেঘ করেছিলো। তবে বৃষ্টি হয়নি। আজকের দেখায় সামান্য হলেও বৃষ্টির দেখা মিললো। যদি আবারো দেখা হয়, সেবার বুঝি মুষলধারে বৃষ্টি নামবে? জলকণার ভারে চোখ বুজে আসতে চাইবে বারংবার? যদি তাই হয়, তবুও আপনাকে দেখার তৃষ্ণায় জোরপূর্বক খুলে রাখবো এই চক্ষুদ্বয়, সত্যি বলছি!
ততদিন অবধি আমার চৈত্রের স্মৃতি হিসেবে রয়ে যাক আজকের সন্ধ্যাবেলাটা। আপনাকে ঠাই দিলাম আমার বিশেষ স্মৃতির পাতায়। সেথায় পরম যত্নে আপনাকে আগলে রাখবো চৈতি… কথা দিচ্ছি।
ইতি
এক সন্ধ্যার অপরিচিত যুবক’
এক পেজের এপিঠ ওপিঠ এবং অপর পেজ এর একাংশ জুড়ে এই বিশাল চিঠিখানা লিখেছেন তিনি। হাতের লেখা দেখে মনে হয় পৃষ্ঠাসংকটে ভুগছিলেন। জায়গা কম,অথচ লিখতে হবে অনেক কিছু। শেষের লেখাগুলো এতই ছোটছোট অক্ষরে লেখা যে চোখে ধরতে চায়না! অনেকবার পড়ায় এখন আর নিরিখ করে দেখতে হয়না,স্বাভাবিকভাবেই বুঝে যাই।
চিঠিটা পড়ে আমার প্রতিবার মনে হয়,তিনি পত্রলেখায় বেশ পটু। কী দক্ষ হাতের লেখা! আমিও মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে পড়ে যাই। হতে পারে এতটাও দক্ষ নন তিনি, তবে আমার নিকট এটাই শ্রেষ্ঠ হয়ে ধরা দেয়।
কাগজ কলম নিয়ে এসেছি আজ। তার দক্ষ হাতে লেখা চিঠির বিপরীতে অপটু হস্তে কলম ধরে আমিও কিছু লিখলাম। যা আমি বলতে চেয়েছি তাকে,অথচ বলা হয়ে ওঠেনি…
‘মারুফ সাহেব,
জানলে আপনিও অবাক হবেন, সেদিন আমায় পাত্রপক্ষ দেখতে আসার কোনো কথাই ছিলোনা। তা ছিলো এক নিছক বাহানা, তৎক্ষণাৎ মাথায় আসা অজুহাত। বারবার আপনাকে কথার ছলে বিরক্ত করাটাও ছিলো পরিকল্পিত,যেন আপনি বাইক থামিয়ে দেন।
আমি অভিজ্ঞতাপ্রেমী মানুষ। বলেছিলাম না,মুক্ত পাখি! এই মুক্ত পাখি চৈত্রিকার সেদিন শখ হয়েছিলো এক অন্যরকম অভিজ্ঞতা আরোহণ এর। অবাক করা কথা,তাইনা? আসলে আমি এমনি। হুটহাট সিদ্ধান্ত নিয়ে বসি। আগেপিছে কিছু ভাবার চেষ্টাও করিনা। নইলে কি আর অপরিচিত একজনকে এমন মিথ্যে কথা বলে বসিয়ে রাখতাম?
শুরুতে অবশ্য ভেবেছিলাম কিছুদূর যাওয়ার পর নেমে যাবো বাইক থেকে। তবে প্রথম আগ্রহের সৃষ্টি হলো আপনার জার্সির সেই অদ্ভুত রহস্যের মাধ্যমে। তারপর বাকিটা সময়ে যা যা হলো,সবটাই অপরিকল্পিত। সময়ের স্রোতে আমি ভেসে গেছি কেবল। ফোনে আমার টাকা ছিলো। তবুও আপনাকে রিচার্জের কথা বলেছি কেবল নম্বরটা নেওয়ার জন্য; অকারণেই।
আরো একটা জিনিস মিলে গেল আপনার সঙ্গে। আমারও ভীষণ ঠান্ডার সমস্যা। সত্যিই গোলা খেয়ে সপ্তাহখানেক গলা ব্যাথা ছিলো। অথচ আপনার প্রস্তাব নাকোচ করা হয়নি। তবে বৃষ্টির সময়ের সেই উদাসীনতা, তার কারণ আমি আজও উদঘাটন করতে পারিনি।
একটা জিনিস ভেবে দেখেছেন মারুফ? ঘণ্টা দুয়েকের সেই স্বল্প সময়ের মাঝেও আমাদের মনে রাখার মতো কতকত বিষয় ঘটলো! এতকিছুর অভিজ্ঞতা মানুষ দীর্ঘদিনের পরিচিতিতেও পায়না। প্রথমত বাইক নিয়ে ছুটে চলা। পাশাপাশি বেঞ্চে বসে থাকা,কথা বলা। ফুচকা,ঝালমুড়ি,গোলা! সন্ধ্যাবেলাতেও সেগুলো ছিলো স্কুলের পাশে,সচরাচর থাকেনা। তারপর বৃষ্টিবিলাস। স্বল্প মাত্রার বৃষ্টিই হোক,তবুও ছিলো তো! একটু হলেও ভিজিয়েছে আমাদের। পরিশেষে চিঠিপত্র,যা আজকাল সকলে পায়ও না।
আর কখনো দেখা হবেনা বলেই কি দু-ঘণ্টায় এতকিছু পেলাম আমরা? স্মৃতির পাল্লা ভারী হবেনা বলেই কি ক্ষনিকের স্মৃতি ছড়িয়ে রইলো মস্তিষ্ক জুড়ে?
ঘটনাগুলো খুব ভাবায় আমাকে। সেদিন গ্রন্থাগারে আমার দিকে আপনার মূল্যবান নজর না পড়লেও পারতো। অযথা আপনার বাইকের সামনে না গেলেও চলতো। সেদিন বৃষ্টি না হলেও চলতো। অপরিচিত দুই নরনারীর হৃদয়কে এতটা বাজেভাবে ভিজিয়ে না দিলেও চলতো। চৈতির মনে মারুফের বিচরণ না হলেও চলতো। পরিশেষে…আপনি হারিয়ে না গেলেও চলতো!
কেমন আছেন,কোথায় আছেন কিচ্ছু জানিনা আমি। আদেও আছেন কিনা… বাইকের নম্বরটাও দেখে রাখিনি। ফেইসবুকে কেবল মারুফ লিখে আপনার আইডি খুঁজতে বারবার অক্ষম হয়েছি। সবদিক থেকে ব্যার্থ হয়ে শেষ অবধি এই এক মাধ্যমই বেছে নিলাম। যেই বই হাতে আমার ছবি তুলেছিলেন বলে ধারণা করি,সেই বইয়ের মাঝেই রেখে গেলাম আমার এই অগোছালো পত্রখানা। যদি কখনো আসেন এই স্থানে, খুলে দেখেন বইটি, পড়েন এই এলোমেলো চিঠি, সেই আশায়। তা এক হাস্যকর ভাবনাও বটে। রোজ শতশত মানুষ আসে এখানে,খুলে দেখে এই বই। পত্রটা আপনি অবধি যাওয়ার সম্ভাবনা অতি ক্ষীন,নেই বললেই চলে। তবুও রেখে যাই।
যদি এটি পৌঁছায় আপনার হাতে, তবে একটিবার যোগাযোগ করবেন। প্রয়োজনে চিঠিই পাঠাবেন। জেনে রাখুন, কেবল আপনি নন, সেই তরুণী চৈতিও চায় আপনার দর্শন পেতে। হোক সে বৃষ্টিমুখর দিনেই…কোনো এক অচিনপুরে…
ইতি
চৈত্রের চৈত্রিকা’
সুন্দরভাবে ভাঁজ করলাম চিঠিখানা। রেখে দিলাম সেই নির্দিষ্ট বইয়ের তেইশ এবং চব্বিশতম পৃষ্ঠার ভাঁজে। অনুমান করে সেই চেয়ারটাতেই গিয়ে বসলাম, যেখানে মারুফ আমায় প্রথম দেখেছিলেন। প্রথমবারের মতো কোনো গল্পের বই খুলে তাতে চোখ বোলালাম। পড়লাম তিনটে পৃষ্ঠা। এটুকুতে নেশা না ধরলেও আগ্রহ জাগলো মনে। চতুর্থ পৃষ্টার দুটো লাইন পড়তেই কেন যেন হুট করে থমকে গেলাম আমি। মনে হলো কেউ এসে বসেছে আমার থেকে খানিকটা দূরে। সে তাকালো আমার পানে। চোখ সরিয়ে আবারো তাকালো! উহু, এবারে আর চোখ সরালো না।
সবটা আমার ভ্রম। হ্যাঁ,তাই হবে হয়তো। কিন্তু না, অবচেতন মন আমার আকুতি জানালো আজও। এটা ভ্রম না হোক! বাস্তবেই কেউ চেয়ে থাক চৈতির পানে,মন্ত্রমুগ্ধের ন্যায়। সেই মোহগ্রস্ত আঁখিদুটির মালিক মারুফ নামক ভাবুক যুবকটিই হোক…
ফিরে তাকানোর সাহস আর হলোনা আমার। তাকালাম না আমি। আড়চোখেও না…একবারও না! জায়গাটা মারুফের জন্য স্মৃতির উৎপত্তিস্থল। তারই স্মৃতির ধারে বসে বইয়ের পাতায় নজর রাখলাম পুনরায়। আনমনে গুণগুণ করে গাইলাম মস্তিষ্কে উঁকি দেওয়া পছন্দের গানের কিছু চরণ…
‘যদি আর কখনো কোথাও হঠাৎ
দেখা হয়ে যায়,
মনে প্রশ্ন জাগে বন্ধু তুমি
চিনবে কি আমায়?
সেই চাঁদ জাগা নিশী রাত
বসে পাশাপাশি হাতে হাত,
ও… সেদিনের সে স্মৃতি কি
ডাকেনা তোমায়?’
#সমাপ্ত
