#শেষ_বেঞ্চের_মা
#আরেব্বা_চৌধুরী
#পর্ব_সংখ্যা_০২
নুরজাহান বেগম নিঃশব্দে চোখের কোণ ভিজিয়ে দিচ্ছিলেন অশ্রুতে।
মৃত স্বামীর ছবির দিকে তাকিয়ে ভাঙা হৃদয়ের কাঁপা কণ্ঠে বলতে লাগলেন,
- আপনি কেনো আমায় একা করে চলে গেলেন? জানেনই তো, আপনি ছাড়া এই পৃথিবীতে আমার কেউ ছিলো না। একমাত্র ছেলে আছে, কিন্তু সেও এখন তার নিজের সংসারের ব্যস্ততায় ডুবে গেছে। আমার কথা ভাবার সময় কোথায় তার?
আমার খুব কষ্ট হয়, মাঝে মাঝে মনে হয় মরে গিয়েই যদি একটু শান্তি পেতাম! মরে মরে বাঁচাটাও এক ভয়াবহ শাস্তি। এই বন্ধ ঘর, এই চার দেয়ালের নিঃশ্বাসহীন শূন্যতা, কতদিন হলো আমি বাইরের আকাশ দেখিনা! আপনিই যদি আমায় সাথে নিয়ে যেতে পারতেন, একা এই বিশাল জগতে আমাকে ফেলে গেলেন কেনো? আমার পাপ কি এতটাই ছিলো? হয়তো, তাই রোজ একটু একটু করে ধুঁকে ধুঁকে মরছি।
ধীরে চোখের পানি মুছে, কাঁপা হাতে তসবিহ তুলে নিলেন তিনি এই ক্লান্ত মনকে একটু শান্তি দেওয়ার আশায়।
ওদিকে নিশি ছেলে-মেয়েকে আলাদা ঘরে শুইয়ে রেখে নাহিদের কাছে ফিরে এলো। কোনো কথা না বলে নাহিদের পাশে বসলো। ঘরের ভেতর নীরবতা, দুজনের মাঝে যেন একটা অদৃশ্য দেয়াল।
নাহিদ নরম স্বরে বললো,
- তুমি না বলেছিলে, এবছর ছেলের জন্মদিনটা একটু বড় করে করবে?
এই এক বাক্যেই নিশির মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠলো। চোখেমুখে খুশির ঝিলিক,
- হ্যাঁ, আগামী পরশুই তো! আমি সব ঠিকঠাক করেই ফেলেছি। প্রায় ত্রিশ-চল্লিশ জন অতিথি আসবে। দু’দিনের জন্য একটা কাজের বুয়ারও ব্যবস্থা করেছি। এমন একটা বিশেষ দিনে নিজের হাতে ছাই মাটি মাখা ভালো লাগে না আমার।
নাহিদ সংক্ষেপে উত্তর দিলো,
- ভালো।
নিশি আবার বললো,
- আচ্ছা, এখন ঘুমাও। কাল তোমার অফিস আছে। আর হ্যাঁ পরশুদিনের জন্য অবশ্যই ছুটি নিয়ে নিও। আর তোমার কারও দাওয়াত করার থাকলে তুমি করে নিতে পারো।
নাহিদ ছোট করে উত্তর দিলো,
- আচ্ছা।
সকালে অফিসে যাওয়ার আগে নাহিদ মায়ের জন্য ওষুধ নিয়ে এলো।
তারপর তাড়াহুড়ো করে ব্যাগটা কাঁধে ঝুলিয়ে অফিসের উদ্দেশ্যে বেরিয়ে গেলো।
নিশিও ছেলেমেয়েকে স্কুলে পৌঁছে দেওয়ার জন্য দরজা টেনে তালা লাগিয়ে বের হলো।
স্কুলে অন্য অভিভাবকদের সাথে গল্পগুজব করে কিছু সময় পার করলো সে।
তারপর ধীরে ধীরে বাড়ির দিকে ফিরলো নিশি।
দরজা খোলার শব্দ পেয়েই নুরজাহান বেগমের প্রতীক্ষায় ভেজা কণ্ঠ শোনা গেলো,
-বউমা, তুমি ফিরেছো?
নিশি শুনেও না শোনার ভান করে রান্নাঘরের দিকে এগিয়ে গেলো।
কিন্তু বুড়ো বয়সী মানুষটার ডাক সেখানে থেমে গেলো না।
-বউমা, তুমি এসেছো?
-শুনতে পাচ্ছো আমার কথা?
বয়সের গভীর অসহায়তায় কাঁপা কাঁপা গলায় আবারও তিনি বললেন,
-সকালে কিছু খাইনি আমি, রাতেও পান্তাভাত ঠিক মতো গিলতে পারিনি। এই বয়সে কি শুধু পানি ঢেলে ভাত খাওয়া যায় বলো?
-বউমা শুনছো? আমার মাথা ঘুরছে, খুব খিদে পেয়েছে কিছু দাও আমাকে।
বিরক্তি মাখা মুখে নিশি বললো, আসছি।
একা একা বিড়বিড় করতে লাগলো নিশি, উফফ! এই মহিলার জন্য কানে তুলো গুঁজেও শান্তি নেই।
রান্নাঘরে গিয়ে দু’টো পাউরুটি আর এক কাপ গরম চা তৈরি করে এনে রেখে দিলো শাশুড়ির সামনে।
-নিন, খেয়ে নিন।
তারপর আবার নিজের কাজে ফিরে গিয়ে রান্নায় মন দিলো।
কিছুক্ষণ যেতেই নুরজাহান বেগমের আবার ডাক,
-বউ মা, আমার ওষুধটা দিয়ে যাও।
নিশি দ্রুত হেঁটে এসে ওষুধ নুরজাহান বেগমের হাতে দিয়ে বললো,
-কাল ছেলের জন্মদিনের আয়োজন আছে। আমাকে বারবার ডাকবেন না, আমার অনেক কাজ পড়ে আছে।
নুরজাহান বেগম মাথা নাড়িয়ে চুপচাপ সম্মতি জানালেন।
নিশি চলে যেতেই নুরজাহান বেগম ধীরে ধীরে লাঠির ভর নিয়ে উঠে দাঁড়ালেন।
অনেক কষ্টে আলমারির দিকে এগিয়ে গিয়ে দরজাটা খুললেন।
ভাঁজে ভাঁজে পুরোনো স্মৃতি গুটিয়ে থাকা শাড়িগুলোর মধ্যে হাত রেখে বাছাই করতে লাগলেন তিনি।
-কাল নাতির জন্মদিন, নিশ্চয়ই অনেক মানুষ আসবে।
যাক, বহুদিন পর মন খুলে সবার সাথে কিছুটা কথা বলতে পারবো।
দামি শাড়িটা চোখে পড়তেই নরম যত্নে নামিয়ে রাখলেন।
-কাল এই শাড়িটাই পরবো।
একটু ভালো কাপড় না পড়লে লোকজন হয়তো ভাববে আমার ছেলে আমায় অবহেলা করে ফেলে রেখেছে।
নিজের অজান্তে ঠোঁটের কোণে এক চিলতে হাসি ফুটে উঠলো।
মনে মনে কেমন যেন শিশুর মত আনন্দ বাসা বাঁধতে লাগলো,
কাল তো নিশ্চয়ই অনেক রকমের খাবারও থাকবে।
সেখান থেকে নিজের পছন্দের খাবারগুলো একটু করে তুলে নিবো।
ভাতের সাথে এক চামচ ঘি ও নেবো।
বয়স বাড়ার সাথে সাথে খাবারে রুচি কমে গেলেও,
জিভের ভেতর কোথাও যেন পুরোনো দিনের স্বাদের আকুলতা আজও মরে যায়নি।
বেল বাজার শব্দে দরজা খুলে দিলো নিশি।
বাইরে কাজের বুয়া দাঁড়িয়ে আছে, নিশি তাকে ভেতরে ডেকে দ্রুততার সাথে একে একে সব কাজ বুঝিয়ে দিলো।
রান্নার গ্যাস জ্বালিয়ে খাবার চড়িয়ে দিয়ে তারপর ঘর গুছানোয় ব্যস্ত হয়ে পড়লো সে।
আজ নাহিদও অফিস থেকে বেশ তাড়াতাড়ি ফিরেছে।
ব্যাগটা রেখে কিছুক্ষণ বসার ঘরে বিশ্রাম নিয়ে আবার বাজারে বেরিয়ে গেলো প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র কিনতে।
গোটা দুপুর, গোটা বিকেল পেরিয়ে গেলো,
এ বাড়িতে নুরজাহান বেগম যেন অদৃশ্য এক মানুষ হয়ে পড়ে রইলেন।
কেউ দরজা দিয়ে উঁকি মেরে দেখলো না তিনি কেমন আছেন, কিছু খেয়েছেন কিনা, মাথা ব্যথা করছে কি না,
এমন কি ছেলেও এখন আগের মতো না ডাকলেও কাছে আসে না, একটুখানি গল্প করে না।
ডাক না পেলে গোটা দিন পেরিয়ে যায় তাও দেখতে আসে না।
সন্ধ্যার আলো মুছে গিয়ে রাত নেমে এলো, নুরজাহান বেগম গলা উঁচু করে ডাকলেন।
-নাহিদ তুই চলে এসেছিস বাবা?
কোনো উত্তর না পেয়ে আবার ডাকলেন,
-বাবা, নাহিদ!
নিশি রান্নাঘর থেকে উচ্চ স্বরে বললো,
-উনি বাজারে গেছেন।
-ওহ, সে কি দুপুরে খেয়েছে? ফিরেছিলো কখন?
-দুপুরেই ফিরেছে।
-খাবার খেয়েছে তো?
-হ্যাঁ।
ছেলে খেয়েছে শুনে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললেন নুরজাহান বেগম।
পরের দিন সকাল থেকেই ঘরজুড়ে ব্যস্ততার ঘূর্ণি।
কেউ সাজসজ্জায়, কেউ রান্নায়, কেউ ফোনে দাওয়াত নিশ্চিত করছে চারদিকে যেন উৎসবের এক অদ্ভুত উত্তেজনা।
এসবের মাঝে নুরজাহান বেগম নিঃশব্দে বসে রইলেন নিজের ঘরে।
মনে মনে ভাবছিলেন হয়তো একটু পরে নাহিদ এসে দরজায় দাঁড়িয়ে বলবে,
”মা এসো, তোমাকে ছাড়া এই অনুষ্ঠান অসম্পূর্ণ।”
তাহসান দৌড়ে এসে বলবে,
”দাদিমা তুমি ছাড়া তো আমি কেকই কাটবো না।”
কিন্তু না, কেউ এলো না।
তার দরজার সামনে দিয়ে মানুষ শুধু আসা-যাওয়া করলো,
হাসির শব্দ, গল্পের ঝলক, মেহমানের কোলাহল ভেসে আসছে,
তারপরেও যেন কেউ এই ঘরের আড়ালে বসে থাকা একা বৃদ্ধাটার অস্তিত্ব টেরও পেলো না।
মলিন হাসিতে ঠোঁট বাঁকলো নুরজাহানের,
এত মানুষের ভিড়ে আজও তার নাম জাগলো না কারো মুখে।
ওদিকে হলরুমে ভরপুর মানুষের উপস্থিতি
নিশির বাবা-মা, ভাই ও ভাবী, তাদের ছেলেমেয়েরা, তাহসানের বন্ধুরাও এসেছে।
নাহিদের সহকর্মীও যোগ দিয়েছে এই আনন্দঘন আড্ডায়।
নিশি দম ফেলার ফুরসত পাচ্ছে না এত আয়োজন, এত ব্যস্ততা!
সামিরা বেগম ধীরে মেয়ের পাশে এসে বললেন,
-তোর শাশুড়ি কোথায়?
নিশি ভ্রু কুঁচকে কিছুটা বিরক্তির সুরে বললো,
-আর কি বলবো মা ঘরেই আছেন। উনি বাইরে এলে মান-সম্মান কিছুই রাখতে পারব না! হাত বাড়িয়ে খাবার-দাবার নিয়ে বসে যাবেন। পরে সবাই মুখ টিপে হাসবে। মান-সম্মান তো যাবেই সাথে আনন্দ ও মাটি হবে।
-উনাকে কিছু খেতে দিয়েছিস?
-ওহ! ভালো কথা মনে করালে মা দাঁড়াও, বুয়াকে বলে পাঠিয়ে দিচ্ছি।
নিশি দ্রুত বুয়ার দিকে তাকিয়ে বললো,
-বুয়া, কিছু ভাত আর একপিস মাছ নিয়ে ওই ঘরে দিয়ে আসো তো আমার শাশুড়িকে।
-আচ্ছা মেডাম।
বুয়া থালায় সামান্য ভাত আর এক পিস বোয়াল মাছ নিয়ে নীরবে নুরজাহান বেগমের ঘরে ঢুকলো।
তার পাশে বসে ধীর গলায় বললো,
-আপনি মেডামের শাশুড়ি?
-হ্যাঁ।
-আহারে দুই দিন হলো এ বাড়ির কাজ করছি, অথচ মনেই হয়নি এই নির্জন ঘরেও একটি মানুষ এভাবে নিঃসঙ্গ পড়ে আছে। এরা আপনাকে এভাবে ফেলে রাখে?
নুরজাহান বেগম তড়িঘড়ি মাথা নাড়লেন,
-না না, ফেলে রাখবে কেন… সবারই তো কাজকর্ম থাকে।
বুয়া দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললো,
-থাক, বলতে হবে না। সব বুঝি আমি। বাইরে আজ উৎসবের রঙে বাড়িটা জমজমাট, এত মানুষ আর এত খাবার সবাই বেছে বেছে খাচ্ছে, আর এই ঘরে এক মানুষ নিঃশব্দে না খেয়েই পড়ে আছে।
জীবনটা দেখেন আমরা দুনিয়াকে সমাদর দিতে শিখি, অথচ ঘরের মানুষটিরই মূল্য সবচেয়ে কম দিয়ে ফেলি।
নুরজাহান চুপ করে থাকলেন।
চোখে একফোঁটা দুঃখ জমে উঠতে চাইলো, কিন্তু তিনি সেটুকু ফিরিয়ে নিলেন দ্রুত।
বুয়া আবার বললো,
-মেডামের মা-বাবা এসেছেন, খুব হৈ চৈ হাসাহাসিতে ঘর যেনো ভরে গেছে। মেডামের মা খাসির মাংস খুব পছন্দ করেন, তাই উনার জন্য আলাদা করে খাসির মাংস রান্না করা হয়েছে।
এই কথাটায় নুরজাহান বেগমের মনে অদ্ভুত এক ব্যথা ছুঁয়ে গেলো।
রাগ নয় অভিমানও নয়, শুধু এক ধরনের ক্ষুধা, কতদিনের দমিয়ে রাখা একটু আকুলতা।
-ইশ যদি এক পিস মাংস খেতে পারতাম!
তিনি থালা একটু দূরে সরিয়ে দিয়ে বললেন,
-আমি মাছ-ভাত খাবো না। তুমি গিয়ে আমাকে দুই পিস মাংস এনে দাও।
বুয়া তাঁর দিকে তাকিয়ে দুর্বল হেসে বললো,
-আগে শুনতাম বুড়ো মানুষ আর শিশুদের কোনো তফাৎ থাকে না। বয়সের শেষে নাকি সমস্ত অভিমান, বায়না, ভালোবাসা সব ফিরে আসে ঠিক বাচ্চাদের মতো। আপনি আজকের এই মুহূর্তেই তার সবচেয়ে বড় জীবন্ত প্রমাণ।
নুরজাহান বেগম বুয়ার কথা কানে না তুলে আবারও বললেন,
-যাও আমার জন্য মাংস নিয়ে এসো।
-কিন্তু ওটা তো মেডাম শুধু তার মায়ের জন্য আলাদা করে রেখেন। কাউকে দিতে বলেননি।
নুরজাহান বেগম কণ্ঠ নামিয়ে শ্বাস আটকে বললেন,
-তুমি লুকিয়ে নিয়ে এসো, দুই পিস খেলে কেউ টেরও পাবে না।
বুয়া কিছুক্ষণ তাঁর দিকে তাকিয়ে রইলো।
কুঁচকানো চামড়ার ভাঁজের ভিতরেও একসময়কার অপরূপ রূপ যেন টলমল করে উঠলো,
একটা বয়স কত কী কেড়ে নেয়, আর কত কী’কেই যে আবার শিশুর মতো ফিরিয়ে আনে।
তার চোখে খানিক মায়া জমলো।
নীরবে সায় দিয়ে সে উঠে বাইরে চলে গেলো।
চলবে,,,,,
