শেষ_বেঞ্চের_মা
#আরেব্বা_চৌধুরী
#পর্ব_সংখ্যা_০১
তোমার মা’কে বৃদ্ধাশ্রমে রেখে আসো নাহিদ, আমি আর পারবো না উনার দেখাশোনা করতে। সারাদিন খ্যাক খ্যাক, ভালো লাগে না একদম। সব সময় ডাকতেই থাকেন, বউমা এটা দাও, বউমা ওটা দাও! আমি কি মেশিন নাকি? আমারও তো বিশ্রাম দরকার! তাছাড়া, বৃদ্ধ মানুষ বৃদ্ধাশ্রমেই ভালো থাকবেন, ওখানে উনার সমবয়সী অনেকেই আছে, গল্প করবেন, সময় কেটে যাবে ভালোই।
ক্লান্ত নাহিদ দরজার কপাট ঠেলে ভেতরে ঢুকতেই নিশি তার স্বভাবসুলভ গলার সুরে অভিযোগের খাতা মেলে বসলো।
নাহিদ চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইলো। চোখে ক্লান্তি, মুখে কোনো প্রতিক্রিয়া নেই। অফিসের ধুলো-ঘাম এখনো গায়ের ওপর থেকে শুকায়নি, অথচ নিশির কথাগুলো যেন ছুরির ধার হয়ে বুকের ভেতর কেটে যাচ্ছে।
সে নিঃশব্দে জুতা খুলে রুমের দিকে এগিয়ে গেলো। পেছন থেকে নিশি আবারও তার কানে বিষ ঢালার মতো মিষ্টি স্বরে বললো,
-নিজের ভালোটা কবে বুঝবে তুমি? দুটো ছেলেমেয়ের ভবিষ্যৎ নিয়ে একটুও কি ভাববে না? তোমার বুড়ো মায়ের পেছনে এত খরচ করে লাভটা কি! এমনিতেই তো বয়স হয়েছে, আজ না হোক কাল তো উনি মারা…
কথাটা শেষ না করেই নিশি নাহিদের শার্টের বোতাম খুলে দিতে লাগলো, মায়ামাখা কণ্ঠে বলতে লাগলো,
-দেখো, বৃদ্ধাশ্রমে দিলে অন্তত আমাদের ঘরটা শান্ত থাকবে। আমি একটু নিজের মতো থাকতে পারবো, বাচ্চাদেরও সময় দিতে পারবো, তাছাড়া তোমার আর আমার ও তো একান্তে কিছু সময় কাটানো দরকার।
নাহিদ থমকে দাঁড়ালো। চোখ দুটো ভারী হয়ে এলো। অন্যঘর থেকে ভেসে এলো মায়ের কণ্ঠ,
”নাহিদ, খেয়েছিস তো বাবা? সন্ধ্যা হয়ে গেল।”
নাহিদ রুম থেকেই জোরে বললো,
- হ্যাঁ, অফিসেই খেয়েছি।
নুরজাহান বেগম আবারও ডেকে বললেন,
- নাহিদ, এদিকে একটু আসবি বাবা?
- হ্যাঁ, মা আসছি।
নাহিদ মায়ের ঘরের দিকে পা বাড়াতেই পেছন থেকে নিশির তির্যক কণ্ঠ,
- ছেলে এসেছে, উনি ঠিক টের পেয়ে গেছেন। এখন শুরু হবে আমার নামে মিথ্যা অভিযোগের পাহাড়!
পা থেমে গেলো নাহিদের। ধীরে ঘুরে দাঁড়িয়ে নিশির দিকে তাকালো সে। চোখে ক্লান্তি, শীতল কণ্ঠে বললো,
- মা কখনো তোমার নামে একটাও খারাপ কথা বলেননি নিশি। নিজের মনের খচখচগুলো ঝেড়ে ফেলো, নাহলে সেটা একদিন তোমাকেই কষ্ট দেবে।
নিশি মুখ বাঁকিয়ে অন্যদিকে ঘুরে গেলো। নাহিদ কিছু না বলে নিঃশব্দে মায়ের ঘরের দিকে এগিয়ে গেলো।
নাহিদ ঘরে ঢুকতেই নুরজাহান বেগম শোয়া থেকে তাড়াতাড়ি উঠে বসলেন, মুখে স্নেহভরা হাসি।
- কেমন আছিস বাবা?
- ভালো আছি মা।
- তোর মুখটা কেন যেন শুকিয়ে গেছে, কি হয়েছে সত্যি করে বল তো?
- কিছু হয়নি মা। সবেমাত্র অফিস থেকে ফিরেছি তো তাই এমন লাগছে, ডাকলে যে কিছু দরকার ছিলো?
নুরজাহান বেগম একটু ইতস্তত করে বললেন,
- এ মাসে মনে হয় তোর হাতে টাকা কড়ি একটু কম পড়েছে, তাই না রে?
- এমন বলছো কেনো মা?
- না, এই মাসে তো ওষুধ আনিসনি। ভেবেছিলাম আগেরটুকু দিয়েই চালিয়ে নেবো, কিন্তু দুইদিন হলো শরীরটা যেন একদমই সাড়া দিচ্ছে না, যদি সাত দিনের ওষুধ এনে দিতি।
মায়ের কথায় নাহিদের বুকের ভেতর কেমন যেন ভারী হয়ে এলো। গত মাসের শেষ দিকেই তো সে নিশির হাতে ওষুধের টাকা তুলে দিয়েছিল। অফিসের ব্যস্ততায় ওষুধ আনার সময় হয়নি, তাই বলেছিল,
বাচ্চাদের স্কুলে নিয়ে যাওয়ার সময় মায়ের ওষুধটা নিয়ে আসতে।
চোখ নামিয়ে ধীরে নিঃশ্বাস ফেললো নাহিদ। নিজের মনকে প্রশ্ন করলো,
- নিশি ওষুধটা কিনে দেয়নি?
মনটা কেমন যেন হাহাকার করে উঠলো। কিন্তু মুখে কিছু বললো না। মায়ের সামনে স্ত্রীকে ছোট করতে পারে না সে।
নাহিদ মৃদু হেসে বললো,
- ঠিক আছে মা, কাল সকালেই ওষুধ নিয়ে আসবো। তুমি চিন্তা করো না।
নুরজাহান বেগম মৃদু হাসলেন,
- আল্লাহ তোকে ভালো রাখুক বাবা, তুই থাকলে আমার সব কষ্টও যেন অর্ধেক কমে যায়।
নাহিদ কিছু না বলে চুপচাপ বসে রইলো। জানালা দিয়ে ভেতরে আসা সন্ধ্যার আলোয় মায়ের মুখটা আরো ফ্যাকাশে লাগছে। মনটা ভার হয়ে গেলো।
এই ঘরের নীরবতার পেছনে লুকিয়ে আছে এক গভীর নিঃসঙ্গতা যেখানে নুরজাহান বেগম প্রতিদিন অপেক্ষা করেন এক টুকরো কথার, এক চিলতে স্নেহের।
নাহিদ মায়ের দিকে তাকিয়ে নরম স্বরে বললো,
- আচ্ছা মা, আমি যাই, মাত্রই অফিস থেকে ফিরেছি।
নুরজাহান বেগম হালকা হেসে বললেন,
- যা বাবা, একটু জিরিয়ে নে। তোকে এখন ডাকা আমার উচিত হয়নি।
মায়ের ক্লান্ত মুখের দিকে একঝলক তাকিয়ে নাহিদ মৃদু হাসলো। চোখে যেন মমতার ছায়া লেগে রইলো কিছুক্ষণ। তারপর নিঃশব্দে ঘর থেকে বেরিয়ে এলো।
রুমে ঢুকতেই নিশি আয়নার সামনে বসে চুল আঁচড়াচ্ছিল। নাহিদ জিজ্ঞেস করলো,
- ছেলে-মেয়ে কোথায়?
- ওরা পড়ছে।
- ওহ, ঠিক আছে, তুমি মায়ের ওষুধটা কিনে দাওনি কেনো?
নিশি মুখ ঘুরিয়ে ঠোঁট বাঁকিয়ে বললো,
- জানতাম, উনি আমার নামে তোমায় কানপড়া দেওয়ার জন্যই ডেকেছেন!
নাহিদের মুখে রাগের ছায়া ফুটে উঠলো। গলা খানিকটা ভারী করে বললো,
- অহেতুক কথা বলো না নিশি, আমি যে প্রশ্ন করেছি, তার উত্তর দাও।
নিশি চোখ নিচু করে বললো,
- ছেলের স্কুলের বেতন এসেছিল তিন হাজার টাকা। আমি ভেবেছি আগে ওর বেতনটাই দিয়ে দিই, তাই ওই টাকাটা ছেলের স্কুলেই দিয়ে দিয়েছি।
মুহূর্তেই নাহিদের মুখ গাঢ় লাল হয়ে উঠলো। গলায় রাগ ও আক্ষেপের মিশ্র ধ্বনি,
- ছেলের বেতনের কথা আমায় বলা যায় না? কী এমন অন্যায় আমি করেছি যে তুমি এখন নিজের মতো সিদ্ধান্ত নিচ্ছো?
নিশি চমকে উঠলো, মুখ শুকিয়ে গেলো। কাঁপা কণ্ঠে বললো,
- আ… আসলে, আমি ভেবেছিলাম তুমি অফিসে ব্যস্ত ছিলে, তাই।
-কি তাই? নাহিদের কণ্ঠ ঘরের দেয়ালে প্রতিধ্বনিত হলো।
ব্যস্ত থাকলেই কি দায়িত্ব ভুলে যাই আমি? মায়ের ওষুধের টাকা অন্য কাজে লাগাও, আর আমাকে জানাও না এটাই এখন স্বাভাবিক হয়ে গেছে নিশি?
চারপাশ নিস্তব্ধ, নিশির চোখে জল এসে গেলো, কিন্তু নাহিদের বুকের ভেতরেও এক অদ্ভুত শূন্যতা জন্ম নিলো। সে জানে, রাগটা শুধু টাকার জন্য নয় এই বাড়ির ভেতর কোথাও একটা সম্পর্ক প্রতিদিন একটু একটু করে ক্ষয়ে যাচ্ছে।
হনহনিয়ে নাহিদ গিয়ে ছেলেমেয়ের পাশে বসে পড়লো। দু’জনেই বই খুলে পড়ছে, কিন্তু তাদের মুখে সেই প্রাণচাঞ্চল্য নেই বাড়ির টানটান পরিবেশ যেন নিঃশব্দে ঢুকে পড়েছে তাদের ছোট্ট জগতে। নাহিদ মৃদু গলায় বললো,
- তানিয়া, তাহসান পড়া শেষ হলে একটু বাইরে হাঁটতে যাব আমরা, কেমন?
তানিয়া মাথা নাড়িয়ে সম্মতি জানালো।
ওদিকে নিশি কান্নাভেজা চোখে ফোনটা কানে তুললো।
- হ্যালো মা।
ওপাশ থেকে সামিরা বেগমের স্নিগ্ধ কণ্ঠ,
- হ্যাঁ নিশি, বল মা, কী হয়েছে?
- আমি আর পারছি না মা। নাহিদ একদম আমার কথা শুনে না। সব সময় তার মায়ের কথায় ওঠে-বসে! যেন আমি এই বাড়ির কেউ-ই নই। আজ তার মায়ের জন্য আমাকে বকল, ভাবতে পারো মা? দুই ছেলেমেয়ের ভবিষ্যৎ নিয়ে সে একটুও চিন্তা করে না, শুধু ওই বুড়ি মাকে নিয়েই সারাক্ষণ ভাবনা। আমি যদি একটু কিছু বলি, মনে হয় তার শরীরে আগুন ধরে যায়!
ওপাশ থেকে সামিরা বেগম দীর্ঘশ্বাস ফেললেন, তারপর শান্ত স্বরে বললেন,
- এসব কথায় কান দিস না মা। সংসারে এমন একটু আধটু ঝড়-ঝাপটা থাকবেই। স্বামী কখনো বকবে, কখনো ভালোবাসবে এই দিয়েই তো সংসার টিকে থাকে। বেশি ভাববি না, ধৈর্য ধর। সময় সব ঠিক করে দেয়।
নিশি চোখ মুছে বললো,
- আচ্ছা মা, রাখি এখন। তানিয়া, তাহসানের খাওয়ার সময় হয়ে গেছে।
- ঠিক আছে মা, খেয়াল রাখিস, মান-অভিমান সব মিটিয়ে নিস। ভালো থাকিস।
ফোনটা রেখে নিশি গম্ভীর মুখে ডাইনিং টেবিলের দিকে গেলো। তানিয়া ও তাহসানের জন্য প্লেটে ভাত বেড়ে দিলো, আর নাহিদের সামনে রেখে বললো,
- খাও, দেরি কোরো না।
তারপর একটা পুরনো স্টিলের থালায় পান্তা ভাত তুলে শাশুড়ির ঘরের দিকে এগিয়ে গেলো।
পেছন থেকে নাহিদ বিস্ময়ে জিজ্ঞেস করলো,
- মা’য়ের জন্য পান্তা ভাত নিচ্ছো যে?
নিশি ঘুরে তাকিয়ে বিরক্ত স্বরে বললো,
- তো কী হয়েছে? তোমার কি মনে হয় আমি তোমার মা’কে খেতে দিই না?
- আহা, আমি তো তেমন কিছু বলিনি, এমনিই জিজ্ঞেস করলাম।
- উনার পেট খারাপ আজ। বলেছেন পান্তা ভাত খাবেন।
বলেই হনহনিয়ে শাশুড়ির ঘরে ঢুকে গেলো নিশি।
নুরজাহান বেগম খাটে আধশোয়া ছিলেন। নিশি থালা সামনে রেখে তিক্ত গলায় বললো,
- নিন, খেয়ে আমায় উদ্ধার করুন।
- পান্তা ভাত? বিস্ময়ে প্রশ্ন করলেন নুরজাহান বেগম।
নিশির মুখে তীক্ষ্ণ হাসি ফুটে উঠলো,
- তো আপনাকে কি খাসির মাংস এনে দিতে হতো?
নুরজাহান বেগম মৃদু স্বরে বললেন,
- নাহিদ তো বলেছিল, আমার জন্য কাল বোয়াল মাছ এনেছে।
নিশির কণ্ঠে তখন তীব্রতার ঝাঁজ,
- এসব বড় বড় খাবার আপনার পেটে হজম হবে? ঘরে প্রস্রাব-পায়খানা করলে তো সেই আমি পরিষ্কার করি, নাকি আপনার ছেলে করে? আপনার শরীরের জন্য এই পান্তা ভাতই ভালো নিন, খেয়ে ফেলুন, আর দিনভর আমায় জ্বালাবেন না!
নুরজাহান বেগম চুপচাপ বসে রইলেন। চোখদুটি নিস্তেজ, কিন্তু তাতে লুকিয়ে আছে এক গভীর ব্যথা। তাঁর কাঁপা হাতে যখন চামচটা ঠান্ডা পান্তার ভেতরে ছোঁয়, তখন যেন বাতাসে জমে ওঠে এক নীরব আর্তনাদ যার কোনো শব্দ নেই, কিন্তু তীব্র কষ্টের ভারে দেয়ালও যেন নিশ্বাস ফেলছে।
চলবে,,,,,
