||১১||
#তোমার_অস্তিত্ব
#মুসলিমা_ইসলাম
হাসপাতাল থেকে কেউ বাসায় যায়নি সবাই বসে আছে ডক্টর বের হতেই ছুঁটে গেলো মালিহা আমার ছেলে কেমন আছে? কি অবস্থা এখন।এক এক করে সবাই শুনে যাচ্ছে আরিয়ানের অবস্থা সম্পর্কে।
দেখুন আপনারা শান্ত হোন, রুগি অনেকটাই ভালো। বলেই চলে গেলো ডক্টর,আরিয়ান ভালো আছে শুনে আকরামের বুকের ভার একটু কমে আসছে,একটাই ছেলে তাদের, যদি কিছু হয়ে যেতো নিজেকে ক্ষমা করতে পারতো না।ছেলের গায়ে কখনোই হাত উঠাইনি কিন্তু আজ সে তুলেছে। এই শিক্ষা সে তার ছেলেকে দেইনি, সুস্থ হোক পরে বিষয়টা বুঝানো যাবে সে যেটা চাচ্ছে সেটা কখনোই সম্ভব নয়।ডক্তরের কাছ থেকে অনুমতি নিয়ে আরিয়ানের সাথে দেখা করতে গেলো মালিহা বেশি মানুষ যেতে নিষেধ করছে।আরিয়ান তখন চোখ বন্ধ করে শুয়ে ছিলো মালিহা ছেলের এমন অবস্থা দেখে ডুকরে কেঁদে উঠলো চোখের পানি মুছে আরিয়ানের পাশে বসলো মাথায় হাত রেখে।
‘এখন কেমন লাগছে বাবা।’
আরিয়ান কারো স্পর্শ পেয়ে চোখ মেলে তাকাতেই দেখলো তার মা তার মাথার কাছে বসে আছে।
‘একটু ভালো মা’
‘এমন পাগলামি কেনো করছো বাবা, তুমিত বাচ্চা নও।’ পাশে আরিয়ানের বাবা দাড়িয়ে ছিলো দুজনই আসছে ছেলেকে না দেখা পর্যন্ত শান্তি হচ্ছিলো না আকরামের।
‘এসব কথা এখন রাখো মালিহা।’ ছেলেটা সুস্থ হোক।
আরিয়ান আবারো চোখ বন্ধ করে নিলো।
“তোমাকে না পাওয়ার ক্ষত যতটা পুড়াচ্ছে, সেখানে শরীরের ক্ষত তো কিছুই না মহুয়া।”
_______________
মহুয়া ইমনের ঘাড়ে মাথা ঠেকিয়ে বসে আছে গাড়ির ভিতরে, গ্ৰামে একটু রাত হলে আর গাড়ি পাওয়া যায় না পেলেও তাদের ভাড়া বেশি দেওয়া লাগে।ইমন বেশি রাত না করে গাড়ি ভাড়া করছিলো। কিছু সময়ের ভিতরেই ইমনদের বাসার সামনে গাড়িটা থামলো, মহুয়াকে বের হতে বলে ইমন ভাড়া মিটিয়ে দুজনই বাড়ির দিকে যেতে লাগলো।
মহুয়ার ভয় করছে ভীষন, মনে মনে চিন্তা করছে কি হবে? আরিয়ান ভাই সুস্থ হওয়ার পর যদি এখানেও আসে তাহলে তার সংসার ভাঙ্গবে। না এটা হতে পারেনা সে কখনো এটা হতে দেবেনা। সে মায়ের আদর পাইনি, ভালোবাসা পাইনি, কিন্তু এখানে এসে শাশুড়ির পেয়েছে। সবে সংসার শুরু তার পথেই যদি শেষ হয়ে যায়? ভাবতে ভাবতে হাটছিলো তখনি ইটের সঙ্গে ধাক্কা খেয়ে পড়ে যাচ্ছিলো ইমন ধরে নিলো।
“কি হয়েছে মহুয়া, দেখে হাটবে না।” মহুয়ার পা জ্বলছে নিচু হয়ে তাকিয়ে দেখলো অনেকটাই কেটে গেছে। ইমন ও পাশে বসে দেখলো রক্ত বের হচ্ছে।
‘এতো বেখেয়ালি হলে হবে মহুয়া। পায়ের অবস্থা দেখছো?’
মহুয়া চুপচাপ শুনে যাচ্ছে, সে বা কি বলবে হঠাৎ কখন ধাক্কা খেলো নিজেও বুঝলো না। ইমন কোনো রকমে ধরে উঠানে নিয়ে আসলো, বাহিরে থেকে তার মাকে ডাক দিলো। গ্ৰামের মানুষ সন্ধ্যার পর পরি খেয়ে শুয়ে পড়ে যত দ্রুত সম্ভব। রাহেলাও শুয়ে ছিলো হঠাৎ বাহিরে থেকে ডাক শুনে উঠে পড়লো পাশে মিনু শুয়ে আছে ফোন দেখছে, কানে ইয়ারফোন এই জন্য হয়তো সে শুনতে পাচ্ছে না।
‘এই মিনু, উঠ তো।’ মিনু তবুও শুনলো না রাহেলা উপায় না পেয়ে একটান দিয়ে ফোন নিয়ে নিলো।
‘উঠ তাড়াতাড়ি বাহিরে কে ডাকছে চল।’
‘এখন আবার কে ডাকবে মা।’ তখনি ইমন আবারো ডেকে উঠলো।
মিনু, রাহেলা এক সঙ্গে বের হয়ে দেখলো, মহুয়া আর ইমন এসেছে, মহুয়ার পা উচু করে দাড়িয়ে আছে তা দেখে রাহেলা ছুটে গেলো।
‘একি এই অবস্থা কেনো? কি হয়েছে ওর।’ ইমনকে প্রশ্ন করলো।
“আসার সময় ইটের সঙ্গে ধাক্কা লেগেছে মা।” ভিতরে চলো। রাহেলা মহুয়াকে ধরে নিয়ে রুমের ভিতরে গেলো রক্ত বন্ধ হওয়ার জন্য কাপড় দিয়ে বেধে দিছিলো ওটা ওভাবেই আছে। মিনু তাদের পিছনে দাড়িয়ে আছে মহুয়া খেয়াল করেই।
‘আপা কেমন আছেন? এখানে এসে বসুন।’ মিনু কোনো কথা বললো না তার রুমে ঔষধ আছে ওটা আনতে চলে গেলো, এনেই মহুয়ার পায়ের কাছে বসে পড়লো পা ধরতেই।
‘আপা কি করছেন? পায়ে হাত দিবেন না।’
‘চুপ করে বসে থাকো, পরিষ্কার করে ঔষধ লাগিয়ে দিচ্ছি।’ মিনু ঔষধ লাগিয়ে দিচ্ছে মহুয়া চেয়ে দেখছে।বোনের ভালোবাসা কেমন হয় সেটাও জানতো না আজকে বুঝলো মহুয়ার চোখ ভিজে উঠলো এই সংসার, এই মানুষগুলাকে সে কখনোই হারাতে চাইনা। রাহেলা জানতো না হুট করে ইমনরা চলে আসবে ভাত যা ছিল খেয়ে পানি দিয়ে রাখছিল। ইমন পানি দেওয়া ভাত পছন্দ করেনা উপায় না পেয়ে তিনি তখনি রান্না ঘরে চলে এলো। ময়দা ছিলো সেটা দিয়ে রুটি বানাবে, আর আলু ভাজি করলেই হবে। ইমন হাত মুখ ধুয়ে মায়ের কাছে আসলো।
‘এখন রান্না করছো কেনো মা।’
তোরা আসবি আমাদের বলে আসবি না?কিছু খেয়েছিস? ইমন কিছু বললো না খাওয়ার মতো পরিস্থিতি ছিল নাকি তাদের,ওখানে যা হয়েছে বাড়ি বলা ঠিক হবেনা বলে মনে করলো ইমন।
‘আসলে তোমাদের জন্য মনটা কেমন করছিল মা,না খেয়েই চলে এসেছি।’ বলছিলো খেয়ে আসতে আমিই না করেছি।
“এমন করলে খারাপ মনে করে না। এবার থেকে এমন করবি না।”
‘আচ্ছা মা।’ রাহেলা নিজের কাজে মন দিলো ছেলে মেয়ে দুজনে ঠিকভাবে চলে আইছে এটাই যথেষ্ট। তার ও মন ব্যাস্ত হয়েছিলো।
মিনুর ঔষধ লাগানো শেষ হলেই বক্স থেকে আরেকটা ঔষধ বের করে মহুয়ার হাতে দিলো।এটা ব্যাথার ঔষধ খাওয়ার পর খেও, ব্যাথা কমে আসবে। মহুয়া কথা বলতে পারছে না কান্না বের হয়ে আসতে চাইছে অনেক কষ্টে আটকে রাখছে।মিনু একটু হলেও বুঝলো, এমন করে সে কত কান্না লুকিয়েছে।
‘তোমার চোখে পানি কেনো? কি হয়েছে।’
“কিছু হয়নি আপা,আমার তো বোন নেই, কেউ নেই।” আর বলতে পারলো কেঁদে ফেললো হুহু করে। মিনু একটু কাছে যেয়ে মহুয়ার মাথায় হাত রাখলো অতি যত্নে বললো।
‘কে বলছে কেউ নেই? আমরা আছি।’ কেদো না।ইমন আসছিলো রুমে এসে এমনটা দেখে তার ভীষণ ভালো লাগলো তার আপা অবশেষে মহুয়াকে বুকে টেনে নিলো। সে জানতো তার আপা ওমন না। রাগ অভিমান করে খারাপ ব্যবহার করছিলো।
‘আমাকে আর কেউ চোখে দেখেনা। আমি তো পর হয়ে গেছি।’
ইমনের কথা শুনে মিনু ঘুরে তাকালো, মহুয়াও চোখের পানি মুছে তাকিয়ে পড়লো।
‘তুই কে? তোকে তো চিনতে পারছি না।’ মহুয়া তুমি এটাকে চিনো?
মহুয়া কি বলবে ভেবে পেলো না। আপা মজাও করতে পারে? এতো কিছু না ভেবে সে জবাব দিলো “না আপা”
‘দেখছিস তোরে কেউ চিনেনা।’ যাহ
আপা….
‘কে তোর আপা?’ ইমন এসে মিনুকে একপাশ দিয়ে জড়িয়ে ধরলো।
‘আপা বেশি করছো কিন্তু।’
হয়েছে, এবার থাম। চল খেয়ে নিবি অনেক রাত হয়ে গেছে। তিনজনই একসাথে রান্না ঘরে চলে আসলো।রাহেলা গরম গরম রুটি আলু ভাজি, সাথে দুইটা ডিমও ভেজে দিয়েছে।এগুলা দেখে ইমন বললো
‘এতো কিছু করতে গেলে কেনো মা।’
কখন খেয়েছিস ঠিক নাই, খা আগে। মহুয়া খেয়ে নেও। এই মিনু তুই খাবি দেবো একটা।
শুধু রুটি দেও। খাওয়ার এক পর্যায়ে রাহেলা বলে উঠলো
‘তোমার দাদিকে আনলে না কেনো?’
মহুয়া সঙ্গে সঙ্গে উওর দিতে পারলো না ইমন দিয়ে দিলো।
“মা তোমাকে বলছিলাম না মহুয়ার চাচারা এসেছে, উনাদের সঙ্গে নিয়ে যাবে এই জন্য আমাদের সাথে আসেনি।”
‘উনাদের সবাইকে নিয়ে আসতি, ঘুরে যেতো।’
‘বলে এসেছি মা।’
ভালো করছিস। খাওয়া শেষ করে ইমন রুমে চলে আসলো, রাহেলা মিনুও যেয়ে শুয়ে পড়লো। মহুয়া তখন এসে ড্রেস পাল্টানোর সময় পাইনি এখন পাল্টানো লাগবে এত দূর জার্নি করে তার অসস্থি হচ্ছে।
“আপনি একটু বাহিরে যাবেন? আসলে ড্রেসটা পাল্টাতাম।” ইমন মাএ শুয়ে পড়ছে এখন উঠে বাহিরে যেতে হবে বলে বিরক্ত বোধ করলো।
‘তো করো, আমিত দেখছি না।’ মহুয়ার তবুও কেমন লাগছে উপায় না পেয়ে করতেই হচ্ছে।
‘তাকাবেন না প্লিজ।’ ইমন মুচকি হাসলো, এই মেয়ে আসলেই গাধা।মহুয়ার হয়ে গেলে ইমনের পাশে শুয়ে পড়লো টুকটাক কথা বলতে বলতে দুজনেই ঘুমিয়ে গেলো।
_________________
ঘড়ির কাটায় রাত ২:৩০ মিনিট আরিয়ান বসে আছে জানালার কাছে চেয়ার নিয়ে হাসপাতাল থেকে তাকে যেতে দেইনি ডক্টর,আজকে থেকে কালকে যেতে হবে, আজকে রেস্ট নিতে বলেছে। কিন্তু তার চোখে তো ঘুম নেই।সিগারেট খেতে ইচ্ছে করলো খুব কিন্তু কোনো উপায় পেলো না হাসপাতালেও এলাউ করেনা। বার বার চেষ্টা করেও মহুয়ার কথা মাথা থেকে বের করতে পারছে না। এক তরফা ভালোবাসা ভীষণ কষ্টের। যে মানুষ গুলার জন্য আমরা ছটফট করি সেই মানুষ টাই জানেনা। তার পাশে অন্য কেউ ভাবলেই আরিয়ানের শ্বাস আটকে আসছে নিজেকে বুঝানোর চেষ্টা করেও ব্যার্থ হচ্ছে। সির্ধান্ত নিলো সে চলে যাবে দূরে, যেখানে মহুয়ার কোনো অস্তিত্ব থাকবে না নিজেকে ব্যস্ত রাখবে।পাশ থেকে ফোনটা নিয়ে কল লিস্টে চেক করতেই পরিচিত নাম্বার পেয়ে কল দিলো,প্রথম বার ধরলো না দ্বিতীয়বার দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ধরলো যেনো দেরি করলে রক্ষে নেই।
“আমি ফিরছি, সব কিছু রেডি কর।”
“সব কিছু সবার জন্য নয়,যেটা আমার ছিলনা সেটা কিভাবে আমার করি?”
“এখন সুস্থ অনেকটাই, তোকে যেটা বলছি সেটা কর।”
“রাখছি তাহলে,দেখা হবে খুব দ্রুত।” বলেই ফোনটা কেটে দিলো আরিয়ান। মনের ভিতর থেকে একরাশ হতাশার নিশ্বাস বেরিয়ে আসলো।
“মন পুড়িয়ে সুখি হও, এই কামনা করি।
আমার না হওয়া, আমারি শখের নারী।’’
চলবে?
