#তুই_আমার_শেষ_ক্ষুধা
#শারমিন_প্রিয়া
#পর্ব-২৫
সকাল হয় কায়ানের প্রাসাদে। এ সকালটা অন্যদিনের তুলনায় একদম আলাদা। রুদ্রাণী ছাড়া বাড়িটার যেন প্রাণই নেই। চারদিক কেমন নিস্তব্ধ, নিস্তরঙ্গ,নিঃশ্বাসহীন।
আরশী রাতে আর ঘুমায়নি। অরাইয়াকে নিয়ে চিন্তা করে কাটিয়ে দিয়েছে বাকি রাত। অরাইয়া শান্তিতে ঘুমাচ্ছে। আরহামও খাটের ওপর ঘুমাচ্ছে। শুধু আরশী বসে আছে। জানলা দিয়ে সকালের মিঠে রোদ এসে গায়ে পড়ছে আরশীর। তার মন চাচ্ছে না উঠে নাশতা বানাতে, কিছু রান্না করতে। মনে হচ্ছে, জীবনটা এখানেই শেষ হয়ে গেলে ভালো হতো।
নজরুল উঠে হাঁটছেন বারান্দায়। উনার মুখ শুকনো। কী করবেন, কোথায় যাবেন—কিছুই উনি বুঝতে পারছেন না। উনার চিন্তা হচ্ছে মেয়েকে নিয়ে। উনি মরলে সমস্যা নেই, কিন্তু উনার সামনে আরশীর কিছু হলে উনি সামলাতে পারবেন না।
আরশী পায়ের শব্দ পেয়ে উঠে দাঁড়ায়। ড্রেসিং টেবিলে চোখ পড়তেই নিজের বিধ্বস্ত চেহারা দেখে চমকে ওঠে সে। রুক্ষ আর মলিন মুখ, উসকোখুসকো চুল। চোখের নিচে কাঁদতে কাঁদতে কালো হয়ে গেছে। মুখ ফুলে গেছে। মাথাটাও বেশ ভার লাগছে। সে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বাইরে বের হয়। নজরুল আরশিকে দেখে থামেন।
বাবাকে ইশারায় নিচে নিয়ে যায় আরশী। উঠোনে কাঠের বেঞ্চে বসে চুপচাপ। গতরাতের রক্তের ছোপ ছোপ দাগ এখনও উঠোনে রয়েছে। আরশী রক্তের মাঝখানে গিয়ে নিশব্দে কতক্ষণ বসে থাকে। তারপর উপরে তাকায়—যেদিক দিয়ে রুদ্রাণী ছাই হয়ে উড়ে গিয়েছিলেন। অনেকক্ষণ ঝিম মেরে বসে থেকে আরশী বেঞ্চে উঠে বসে। বাবাকে জিজ্ঞেস করে,
“কী সিদ্ধান্ত নিলে, বাবা?”
“কিছু না। তুমি যা নেবে, তাই।”
“এখান থেকে চলে যাবে?”
“কোথায় যাব?”
আরশি তিক্ত হাসে, “সেটাই তো, বাবা। কোথায় যাব? যেখানে যাব, সেখানেই রাক্ষস পিছু নেবে।”
“আমার মনে হয়, আরহাম আমাদের আর ক্ষতি করবে না।”
আরশী হেসে ওঠে।
“তুমি বড্ড বোকা, বাবা। ও হলো হিংস্র রাক্ষস। ওর মনে দয়া-মায়া নেই। ও তোমাকে, আমাকে—কাউকেই ছাড়বে না।
তারপর একটু থেমে বলে, “আমাকে ভাবতে দাও, আমি ভেবে জায়গা বের করব। এখন কী খাবে বলো?”
“তুমি রান্না করার মতো অবস্থায় নও এখন। বরং আমাকে বলো, কী খাবে। আমি বানিয়ে দিচ্ছি।”
আরশী দৃঢ় কন্ঠে বলে, “পারব, বাবা। আমাকে পারতেই হবে। মায়ের শূন্যতা পৃথিবী হাতের মুঠোয় এলেও পূর্ণ হবে না। তাই বলে আমরা থেমে থাকলে হবে না। দুনিয়া বড় নিষ্ঠুর, বাবা। কারও জন্য কারও জীবন থেমে থাকে না। তুমি থাকো, আমি যাই।”
আরশী ওয়াশরুমে ঢুকে ট্যাপ ছেড়ে দেয়। অনেকক্ষণ গোসল করে। বের হয়ে রান্নাঘরে যায়। সকালের নাশতা বানায়, খাবার রান্না করে।
হাঁড়ি-পাতিলের টুংটাং শব্দে আরহামের ঘুম ভাঙে। সে উঠে রান্নাঘরে উঁকি দিয়ে দেখে, আরশী রান্না করছে। আরহাম নিশব্দে ফিরে আসে। শুয়ে শুয়ে ভাবে—যে মেয়েটা সারারাত কান্নাকাটি করল, সে সকাল হতেই রান্নাঘরে! বিশ্বাস হচ্ছে না তার।
আরহাম ফ্রেশ হতে হতে এক ঘণ্টা যায়। ঘণ্টাখানেক পর সে আরশীকে ডাকে। আরশী উত্তর দেয় না। সে রুমে আসে। আরহাম আরশীর দিকে এক পলক তাকিয়ে বলে,
“আমাকে নাশতা দেবে না? খিদে লাগছে তো।”
আরশী উত্তর দেয় না, ফিরেও তাকায় না।
অস্বস্তি হওয়া সত্ত্বেও আরহাম এসে আরশীকে বুকে চেপে ধরে। বুকের সঙ্গে বুক মেশায়। গতকাল থেকে তার বুকের ভেতর আগুন জ্বলছে আরশীর জন্য। কোনো অবস্থাতেই সে আগুন নিভছে না।
আরশী দূরে ঠেলে দিতে থাকে আরহামকে, কিন্তু পারে না। আরহাম ছাড়ে না। বরং কাঁধে মুখ রেখে বলতে থাকে,
“দূরে ঠেলে দিও না, আরশী। যা করেছি, সব তোমার জন্য। যাতে তুমি আমাকে ভুল না বোঝো, ছেড়ে না যাও।”
আরশী গর্জে ওঠে,
“ছাড়ুন আমাকে। যুক্তিহীন কথা বলবেন না। ঘৃণা করি আপনাকে—ঘৃণা। বুঝতে পেরেছেন? আমাকে ভুলেও ডিস্টার্ব করবেন না। এভাবে জড়িয়ে ধরবেন না। আপনি আমার কেউ নন। আপনি শুধু আমার শত্রু। এর বেশি কিছু না। আপনি জানেন, আপনি সব ভুল করেছেন—এমন ভুল যার কোনো ক্ষমা নেই। আর আমাকে কষ্ট দিয়েছেন। তারপরেও দাবি করেন, ভালোবাসেন! জানি না, কোন মতলবে আমাকে এত ভালো ভালো কথা বলছেন।”
আরহাম চুপ করে যায়। সে জানে, তার পক্ষে কিছুই নেই। প্রকৃতি, ভাগ্য—সব তার বিরুদ্ধে। আরশী হয়তো তাকে আর কোনোদিন ক্ষমা করবে না, বিশ্বাস করবে না। ঘৃণাই করবে। আর করবে না কেন? সবকিছুর জন্য সে দায়ী।
সে আরশীকে ছেড়ে দেয়। রান্নাঘরে যায়। সত্যি তার খিদে পেয়েছে, কিন্তু কোথাও কোনো নাশতা পায়নি। পরে বিস্কুট আর পানি খেয়ে বেরিয়ে আসে। গুহায় চলে যায়।
গুহার সবার মনমরা ভাব দেখে আরহাম জিজ্ঞেস করে,
“তোদের কী হয়েছে?”
দ্রোহান শুকনো গলায় বলে,
“রুদ্রাণী মারা গেছেন। আপনার আর সর্দারনীর মধ্যে কিছু ঠিক নেই—এ কথা আমরা সবাই জেনে গেছি।”
“কীভাবে জানলে?”
“রাক্ষসদের কেউ আক্রমণ করলে বা মারলে আশেপাশের রাক্ষসরা সব টের পায়। আমরাও পেয়েছিলাম। পরে ওই জায়গায় অদৃশ্য হয়ে গিয়েছিলাম। সব দেখেছি। বিষয়টা খুব দুঃখজনক, সর্দার।”
কায়ান কিছু বলে না। আসনে গিয়ে বসে। সবাই চুপচাপ বসে থাকে। কায়ান কারও সঙ্গে কথা বলে না। কিছুক্ষণ পর কায়ানও উঠে চলে যায়।
_____
এভাবে কাটতে থাকে আরহাম আর আরশীর দিন। আরশী একবারও ভালো করে কথা বলে না আরহামের সঙ্গে। ভালো করে কথা বলা তো দূরের কথা, নিজ থেকে কখনো কথাই বলে না। আরহাম কিছু জিজ্ঞেস করলেও উত্তর দেয় না।
আরশী তার প্রাণের ভয় ছেড়ে দিয়েছে। মেনে নিয়েছে—রাক্ষস যখন তখন তাকে আর তার বাবাকে মেরে বা খেয়ে ফেলতে পারে। তাতে আর ভয় পাওয়ার কিছু নেই। সব উত্তরসূরি তো রাক্ষসের কাছেই শেষ হয়েছে। তারা দু’জনও না হয় শেষ হলো।
আরহাম অনেক চেষ্টা করে আরশীর সঙ্গে মেশার, সঙ্গ দেওয়ার, কাছাকাছি যাওয়ার। কিন্তু আরশী কোনো পাত্তাই দেয় না। এতে আরহামের খুব কষ্ট হয়। রাতে যখন ঘুমন্ত আরশীর দিকে সে তাকায়, আরশীর মলিন মুখ দেখে তার বুক মোচড় দিয়ে ওঠে। সে হাত বাড়িয়ে আরশীর কপাল আর মুখে হাত বুলিয়ে দেয়। খুব ইচ্ছে করে তার আরশিকে আঁকড়ে ধরতে, কাছাকাছি যেতে। তার কাঙ্খিত নারীকে আদর করতে কিন্তু পারে না। প্রায় অর্ধেক রাত সে আরশীর মুখের দিকে তাকিয়ে কাটিয়ে দেয়।অরাইয়া জ্বালাতন করলে ঘুম থেকে উঠে তাকে সামলায় আরহাম।
অরাইয়া দ্রুত বড় হচ্ছে—অস্বাভাবিক দ্রুত। পাঁচ মাসেই সে আশেপাশের সবকিছু লক্ষ্য করে। মানুষের চোখের দিকে স্থির তাকিয়ে থাকে। কখনো কখনো এমন দৃষ্টিতে তাকায়, যেন বুঝতে পারে—এই মানুষটা কী ভাবছে। সে কাঁদলে বা হাসলে পরিস্থিতি পাল্টে যায়। আরশীর বুক তখন ধুক করে ওঠে। আরশী চোখ সরিয়ে নেয়, ফিরে তাকায় না। অরাইয়ার লালন-পালন পুরোপুরি আরহামই করছে, মায়ের মতো। আরশী মাঝেমধ্যে অরাইয়ার দিকে তাকায়—এই যা।
ছয় মাস পড়তেই অরাইয়া হাঁটতে শেখে। আরশী এতে অবাক হয় না। এ বাচ্চার সবকিছুই তো অদ্ভুত! এ আর নতুন কী!
অরাইয়া টলোমলো পায়ে হাঁটে। কায়ান হাত বাড়িয়ে বলে,
“আসো।”
অরাইয়া মাঝপথে পড়ে যায়। কায়ান হেসে ওঠে। অরাইয়াও হাসে। আরশী দূর থেকে সব দেখে দীর্ঘশ্বাস ফেলে আর ভাবে,
“আমি তোর মা হয়েও মা হতে পারলাম না।”
একদিন কায়ান বাড়িতে নেই, গুহায় গিয়েছে। অরাইয়া টলোমলো পায়ে হাঁটছে। হঠাৎ হোঁচট খেয়ে পড়ে যেতে যাচ্ছিল। আরশী দৌড়ে গিয়ে তাকে বুকে তুলে নেয়। অরাইয়া অবাক হয়ে মায়ের মুখের দিকে তাকায়। ছোট্ট হাত দিয়ে মায়ের গাল ছুঁয়ে দেয়। তারপর মুচকি হেসে ওঠে।
আরশীর কলিজা ছিঁড়ে যায়। চোখের কোণায় পানি জমে। সে অরাইয়ার ছোট্ট হাতে চুমু খায়। মেয়েটাকে সে দূরে রাখতে চায়, কিন্তু ঘৃণা করতে পারে না। করবেই বা কী করে—নাড়ির ধন যে সে। সে বুঝে, হয়তো ঘৃণা করা যায় কিন্তু নাড়ীর টান কখনও অস্বীকার করা যায় না।
চলমান….!
#তুই_আমার_শেষ_ক্ষুধা
#শারমিন_প্রিয়া
২৬.
সুনসান নিরবতায় ভরে আছে কায়ানের প্রাসাদ। বড় বড় নারকেল গাছের পাতাগুলো ঝিরিঝিরি করে নড়ছে। হালকা বাতাস বইছে। বাড়িতে চারজন মানুষ থাকা সত্ত্বেও কারও কোনো টু শব্দ নেই। যেন বহুবছর আগের পরিত্যক্ত কোনো রাজপ্রাসাদ এটা। মানুষ শূন্য, নিস্তব্ধ!
কায়ান শুয়ে আছে অরাইয়ার পাশে। চোখ বন্ধ তার। ইদানীং সে বেশিরভাগ সময় চোখ বন্ধ করে রাখে। চোখ বন্ধ করলেই তার সামনে ভেসে ওঠে তার আর আরশীর সুখের স্মৃতিগুলো। সে সেগুলো উপভোগ করে। একা একা হাসে। বাস্তবের চেয়ে এখন তার কল্পনা আর স্মৃতির ভেতর ডুবে থাকতে ভালো লাগে। মনে মনে ভাবে—আগের মতো সুখের সময় কি আমার জীবনে আবার আসবে? আমার আরশী কি আমাকে আবার ভালোবাসবে? সব ভুলে যাবে?
আরশী মায়ের ঘরে যায়। ঘরটা ভালো করে ঝাড় দেয়, সুন্দর করে গুছিয়ে রাখে। দেয়ালে টাঙানো তার আর মায়ের কয়েকটা ছবি। একটায় মা অনেক বড়, একদম একটা যুবতী মেয়ের মতো। মায়ের কোলে পাঁচ-ছয় মাসের আরশী। এই ছবিতে মাকে যে কত সুন্দর লাগছে, বলার মতো না। মায়ের গড়ন আর মুখ অসম্ভব সুন্দর। আরেকটায় আরশী বড় হওয়ার পর মায়ের সঙ্গে তোলা ছবি—মা তার গলা জড়িয়ে ধরে আছেন। আরেকটায় সে হাঁটছে, আর মা তার আঙুল ধরে আছেন।
আরশী সবগুলো ছবি নিচে নামায়। যত্ন করে মুছে, হাত বুলিয়ে মায়ের ছবিতে চুমু খায়। দীর্ঘশ্বাস ফেলে। তারপর ফুপিয়ে কেঁদে কেঁদে ছবিগুলোর সঙ্গে কথা বলে—
“মানুষ মারা গেলে কফিন বা কবরে রাখে। তার আপনজনেরা চলে যাওয়া মানুষটার সেই জায়গায় গিয়ে একটা অস্তিত্ব পায়। আমি এত দুর্ভাগা কেন মা? তোমার তো কোনো অবশিষ্ট কিছুই নেই। কোথায় গিয়ে আমি তোমাকে একবার দেখে আসব? তুমি কোথাও নেই মা—কোথাও নেই। তোমার একটা নির্দিষ্ট জায়গা থাকলে আমি রোজ গিয়ে তোমার সঙ্গে আলাপ করতাম। আমার বুকের কষ্ট কমত মা, আমি শান্তি পেতাম।”
আরশী চোখ-মুখ মুছে ছবিগুলো আগের জায়গায় রাখে।ওয়ারড্রব খুলে কাপড় বের করে গুছিয়ে রাখার জন্য। হঠাৎ তার নজরে পড়ে ওয়ারড্রবের একদম ভেতরে রাখা একটা বাক্স। এটা মায়ের বাক্স—সে চেনে। মা কোনোদিন এটা খুলতে দেননি। তবে বলে গিয়েছিলেন, তিনি মারা যাওয়ার পর যেন আরশী এটা খুলে দেখে। এতে অনেক প্রয়োজনীয় জিনিস আছে।
আরশী পরিত্যক্ত কাপড় দিয়ে বাক্সটা ভালো করে মুছে নেয়, তারপর খুলে। ভেতরে নানান রকমের ছুরি, চাকুসহ আরও কয়েকরকমের লোহার অস্ত্র রাখা। সঙ্গে একটা পুরনো বই—অনেক পুরনো, পাতাগুলো ক্ষয়ে গেছে। আরশী বইটা বের করে। সূচিপত্র দেখে বুঝতে পারে, বইয়ের সবকিছুই রাক্ষসদের নিয়ে লেখা। সে আগ্রহ নিয়ে এক-দু’পেজ পড়ে। রাক্ষসদের ভবিষ্যৎ, বর্তমান, অতীত—সব লেখা আছে এতে।
আরশী বইটা বের করে নেয়, পরে বাক্সটা রেখে দেয়। মায়ের খাটে শুয়ে পাতার পর পাতা পড়ে। এক পৃষ্ঠায় গিয়ে তার চোখ স্থির হয়ে যায়। সে চমকে ওঠে। সেখানে লেখা আছে রাক্ষস রাজ্যের এমন এক শিশুর কথা—যার সব গুণ অরাইয়ার সঙ্গে মিলে যায়। এই শিশু রাক্ষস রাজ্য ধ্বংস করার ক্ষমতা রাখে। সব ছারখার করে দিতে পারে। সে সবচেয়ে শক্তিশালী।
আরশীর বুক ধক করে ওঠে। সামনে কী হতে যাচ্ছে? এই বাচ্চা যদি সত্যিই অরাইয়া হয়, তাহলে…?
আরশী হতভম্ব হয়ে বসে থাকে কিছুক্ষণ। তারপর বইটা তোশকের নিচে রেখে বেরিয়ে যায়। বাকিটুকু সে সুযোগ করে আবার মায়ের ঘরে এসে পড়বে।
সকাল থেকে খাওয়া হয়নি তার। কারোরই হয়নি। খিদেয় পেটে ইদুর দৌড়াচ্ছে। আরশী রান্নাঘরে যায়। ঝটপট ভাত-তরকারি রান্না করে বাবাকে ডাকে। বাবা-মেয়ে বসে খেয়ে নেয়। খাওয়া শেষে নজরুল বাইরে হাঁটতে বের হন।
আরশী আবার মায়ের ঘরে ফিরে আসে। বইটা হাতে নিয়ে পড়তে বসে। অরাইয়া সেই কখন থেকে ঘুমাচ্ছে। এই মেয়ে ঘুম পড়লে তিন-চার ঘণ্টার আগে ওঠে না। আবার একবার ঘুম ভাঙলে সহজে ঘুমায় না।
আরহাম উঠে গোসল সেরে নেয়। একটু আগে সে টের পেয়েছিল, আরশী রান্নাঘরে ছিল, কিন্তু এখন আর তার উপস্থিতি বুঝতে পারছে না। সে টি-শার্ট গায়ে দিয়ে আয়নার সামনে গিয়ে চুল সেট করে। গায়ে হালকা বডি স্প্রে দিয়ে বারান্দায় বের হয়।
আরশীকে খুঁজতে খুঁজতে শেষ মাথায় যায়। আটটা রুমের প্রায় সবগুলোর দরজা বন্ধ। একটি জানালা আধখোলা দেখে—ওটা রুদ্রাণীর ঘর। আরহাম বুঝে যায়, এই ঘরেই আরশী আছে।
সে ডাক দেয়,
“আরশী! আরশী, শুনতে পাচ্ছো? দরজা খুলো।”
আরশী কোনো উত্তর দেয় না। বারবার ডাকেও দরজা না খোলায় আরহাম দরজায় লাথি মারে। আরশী বইটা তোশকের নিচে রেখে নির্বিকারভাবে বসে থাকে।
আরহামের রাগ প্রচণ্ড হয়ে ওঠে। সে আরশীকে শক্ত হাতে ধরে বলে,
“ কতদিন ধরে নিজে রান্না করো, বাপ-মেয়ে খাও! আমাকে খাবার দাও না কেন? আমার কি খিদে পায় না? আমার জন্য খাবার রাখো না কেন?”
আরশী ভাবলেশহীন গলায় বলে,
“আপনার খাওয়ার মতো কিছু তো আমরা খাই না। আপনি মানুষ খান—আমরা মানুষ পাব কোথায়? ওহ সরি! এ বাড়িতে তো দু’জন মানুষ থাকে। আপনি চাইলে আমাদেরই খেয়ে নিতে পারেন।”
আরহামের চোখ অগ্নিবর্ণ হয়ে ওঠে। সে ফোঁস করে দম ছাড়ে, তারপর বলে,
“তবে তাই হোক। আমি তোমাকেই খাচ্ছি।”
এই বলে আরহাম এক ঝটকায় আরশীকে খাটের ওপর ফেলে দেয়। টান দিয়ে ছিঁড়ে ফেলে আরশীর জামা।
আরহাম কী করছে, প্রথমে আরশীর বোধগম্য হয় না। কিন্তু যখন আরহাম তার ঠোঁটজোড়া আরশীর ঠোঁটে ডুবিয়ে দেয়, তখন সব পরিষ্কার হয়ে যায়। আরশী ছটফট করতে শুরু করে, বেরিয়ে আসার চেষ্টা করে, কিন্তু ব্যর্থ হয়। সে নিজেও জানে—আরহামের সঙ্গে সে পেরে উঠবে না।
আরহাম ঠোঁট ছেড়ে ঘাড়ে নামে। জিহ্বা ঘষাতে থাকে। ঠোঁট ছুঁইয়ে ছুঁইয়ে আরশীকে পাগল করে তোলে। আরশী অসহায় হয়ে পড়ে। তার ইচ্ছে করে আরহামকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরতে, তার আদরে সায় দিতে—কিন্তু পারে না। চোখ ভিজে ওঠে।
সে নিজেকে সামলে কঠিন গলায় বলে,
“কি করছেন এসব?”
আরহাম আরশীর বক্ষজোড়া খাবলে ধরে বলে,
“বলেছিলে তোমাকে খেতে। খাচ্ছি।”
“এটা… এটা খাওয়া বলে না। ছাড়ুন আমাকে।”
“যতক্ষণ না আমার ক্ষুধা মিটছে, ছাড়ছি না। পারলে ছাড়িয়ে দেখাও।”
আরহাম যেখানে হাত আর ঠোঁট ছোঁয়াচ্ছে, সেখানে দাগ রেখে যাচ্ছে। আরশী গুঙিয়ে বলে,
“আমার লাগছে… ছাড়ুন আমাকে।”
আরহাম শোনে না। সে আরও গভীরে যায়। আরশীর সহ্যসীমা ছাড়িয়ে যায়। বাসর রাতে যেমন করেছিল আরহাম, আজও ঠিক তেমনই করছে।
আরহাম ফিসফিস করে বলে,
“কিছু মনে পড়ছে? প্রথম রাতের কথা? এত এত স্মৃতি রেখে কীভাবে পারো আমার থেকে দূরে থাকতে?”
আরশীর অবস্থা কাহিল দেখে আরহাম সরে যায়। ধপাস করে খাটে পড়ে, আরশীর পাশে। আরশীর মাথাটা টেনে এনে তার বুকে রাখে। পাশ থেকে কাপড় এনে ঢেকে দেয় আরশীকে। তারপর বলে,
“আমাকে খেতে না দিলে, রোজ এমন চলবে।”
আরশী ব্যথায় অস্থির হয়ে ওঠে। নড়াচড়া করতে পারে না। কাচুমাচু হয়ে শুয়ে থাকে। আরহামের বুকে তার মাথা রাখা। মাথাটা সরানোর শক্তিও তার অবশিষ্ট নেই। আরহাম ধীরে আরশীর মাথাটা সরিয়ে উঠে দাড়ায়। কাপড় গায়ে দিয়ে নিজের রুমে গিয়ে স্পেশাল ওষুধটা এনে আরশীর ক্ষতস্থানে লাগিয়ে দেয়। তারপর আরশীকে কোলে করে নিয়ে যায় গোসলে। নিজ হাতে গোসল করিয়ে দেয়। পানিতে ভিজে জবুথবু যখন আরশীর শরীর, তখন আরহামের ভেতর আবার সেই ক্ষুধা জেগে ওঠে। আরশীর ক্লান্ত মুখের দিকে তাকিয়ে সেটা আর বাস্তবায়ন করে না। তবে ঝরনা ছেড়ে আরশীকে কোলে নিয়ে দুলাতে থাকে আর ঠোঁটে আলতো কামড় দেয়।
আরশী গর্জে ওঠে,
“ ছাড়ুন আমাকে, বলছি!”
আরহাম হেসে আরশীকে বের করে নিয়ে আসে। আরশীর সামনে জামা দিয়ে বলে,
“ পরে নাও।”
আরহাম বাইরে গেলে আরশী ভাবতে থাকে। তার মাথার ভেতর ঘূর্ণি উঠে। এই লোকটার প্রতি তার প্রচণ্ড রাগ, ক্ষোভ, ঘৃণা জন্মেছে। তবু কেন সে টের পায়, এই রাক্ষসটার প্রতি তার অদ্ভুত এক টান আছে। রাক্ষসটার চোখে সে চোখ রাখতে পারে না। রাক্ষসটা তার জীবনের প্রথম পুরুষ ছিল। প্রথম ছোঁয়া, প্রথম আদর—সব সে এই রাক্ষসটার কাছ থেকেই পেয়েছে। রাক্ষসটাই বুঝিয়েছে ভালোবাসার মানে কী, ভালোবাসা কাকে বলে।
এত এত এত কিছুর পরেও এত সহজে তো রাক্ষসটাকে সে দূরে রাখতে পারে না। কাছেও রাখা শোভা পায় না। যে তার মায়ের খুনি, হাজার হাজার মানুষের খুনি—তার বংশ যার বংশের জন্য শেষ হয়ে গিয়েছে—সেই রাক্ষসকে সে আপন করতে পারে না। এত কিছু জানার পরেও তাকে আপন করলে মায়ের সঙ্গে, দাদা-দাদী, পুরো বংশের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করা হবে।
ওই ঘটনার পর থেকে আরশী নাশতা বানালে আলাদা করে আরহামের জন্য রাখে। ডিনার হোক বা লাঞ্চ—যা বানায়, সবসময় আরহামের জন্য বেড়ে রাখে। আরহাম এটা লক্ষ্য করে মিটিমিটি হাসে।
অরাইয়া আধো আধো করে মা-বাবা ডাকা শিখছে। এটার জন্য আরহাম যে কী খুশি!
আরশী অরাইয়া এলহাকে পছন্দ না করলেও, যখন সে আধো আধো করে “মা” বলে ডাকে, তখন তার বুক ভরে ওঠে। ইচ্ছে করে মেয়েটাকে জড়িয়ে বুকে শক্ত করে ধরতে, চুমু খেতে। কিন্তু সে সেটা করে না।
একদিন আরহাম আরশীকে প্রশ্ন করে,
“অরাইয়াকে তো তুমিই জন্ম দিয়েছো, তাই না? তাহলে ওকে অবহেলা করো কেন আমার মতো? ও রাক্ষস সন্তান বলে?”
আরশী রাগান্বিত চোখে তাকায়, কিছু বলে না।
আরহাম আবার বলে,
“রুদ্রাণী কিন্তু রাক্ষস ছিল। তাও সে তোমাকে ভালোবাসত, আর তুমি তাকে।”
আরশী ধমকে ওঠে,
“ আমার মায়ের নাম মুখে আনবেন না আপনি। মুখে আনলে জিহ্বা…” থেমে যায় আরশী।
আরহাম হেসে ঠান্ডা গলায় বলে,
“মুখে আনলে কী করবে? জিহ্বা ছিঁড়ে ফেলবে?”
আরশী কেঁশে ওঠে। কিছু বলে না।
“ সন্তান যেমনই হোক, মায়ের কাছে একই। অন্তত আমি এটা জানি। কিন্তু তোমার বেলায় দেখছি সব উল্টো। আচ্ছা বলতো আরশী, তুমি কবে থেকে এত কঠিন হলে?”
আরশী মনে মনে বলে, “আপনি যা প্রতারণা, বেইমানি করেছেন, আমি কঠিন হতে বাধ্য। আর রইলো অরাইয়ার কথা। সে শুধু রাক্ষস নয়, সে ভয়ংকর। আপনার মতো ভয়ংকর। সে পুরো রাক্ষস বংশের জন্য ভয়ংকর। অশুভ শক্তি তার মধ্যে। সে মায়ের মতো ভালো নয়। সে ধ্বংস ডেকে আনবে। আমি আমার আশপাশ থেকে সব রাক্ষস দূর করতে চাই। সব। সব সম্পর্ক ছিন্ন করতে চাই। তাতে স্বামী হোক বা সূন্তান, সবার সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করব।”
আরশীর থেকে কোনো উত্তর না পেয়ে আরহামও আর কথা বলে না। অরাইয়ার সঙ্গে খেলতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে।
_________
রাত গভীর হয়। প্রাসাদের আশেপাশে ঝিঁঝিঁ পোকারা ডাকছে। পেছনের বাগানে শেয়ালরা জোরে জোরে হাঁকছে। বিলের ধারে জ্বলছে নিভু নিভু লেমটন। নীরব প্রাসাদে ঘুমিয়ে আছে আরশী আর অরাইয়া। তাদের নিশ্বাসের শব্দ আরহাম শুনতে পাচ্ছে।
আরহাম পেছনের জানালা খুলে জানালার ধারে বসে আছে।বাইরে অনেকক্ষণ তাকিয়ে থেকে চোখ ঘুরিয়ে আরশীর দিকে নিবদ্ধ করে। আরশী গালে হাত দিয়ে ঘুমাচ্ছে। আরহাম একদৃষ্টিতে তাকিয়ে ভাবে— কী নিষ্পাপ লাগছে তোমাকে, আরশী। তোমার কি মনে আছে? একদিন তোমাকে বলেছিলাম, তোমাকে সামনে রেখে যদি সারাক্ষণ দেখি, দিন যাবে, মাস যাবে, বছর যাবে, যুগ যাবে—তবু আমার তোমাকে দেখার সাধ মিটবে না। দেখো, আজ কতদিন হলো তোমার সঙ্গে আমার পরিচয়ের। তবু তোমার প্রতি একটুও আগ্রহ কমেনি। বরং বারবার তোমার প্রেমে পড়তে মন চায়। আচ্ছা আরশী, তুমি তো বলতে—তুমি আমাকে ভালোবাসো। তার অনেক প্রমাণও পেয়েছি আমি। বলতে পারো? তোমার সেই ভালোবাসা এখন কোথায় হারালো? মানলাম, আমি যা করেছি তা বড় অপরাধ—যার কোনো ক্ষমা নেই। তাই বলে ভালোবাসা কি এতই সস্তা? কিছু অপরাধ হলেই ঘৃণা করতে হবে? আজ কতদিন হলো তুমি আমার সঙ্গে হেসে কথা বলো না। মন খুলে কথা বলো না। আড্ডা দাও না। যেচে এসে বুকে মাথা রাখো না। বলো না—’আমি আপনাকে অনেক ভালোবাসি।’ এতে কি তুমি স্বস্তি পাচ্ছো আরশী? তোমার কষ্ট হয় না আমার জন্য? কষ্ট হয় না আমার থেকে দূরে থাকতে? তুমি কি আমার চোখের ভাষা বুঝতে পারো না? এই আমি যে তোমার শূন্যতায় ধুঁকে ধুঁকে মরছি—এটা কি তোমার ভেতরে কোনো আলোড়ন সৃষ্টি করে না? কী দিয়ে বুঝালে তুমি বুঝবে যে, আমি তোমাকে ভালোবাসি আরশী? এতে কোনো মিথ্যা নেই।
আরহাম এসব ভাবছে, হঠাৎ বাইরে এক মর্মান্তিক শব্দ পেয়ে সে হকচকিয়ে যায়। চটজলদি উঠে বাইরে গিয়ে দাঁড়ায়। দেখে—উঠোনে উঁচুতে আগুনের মতো একটা চিহ্ন বাতাসে জ্বলে উঠছে। তাতে রক্তলাল অক্ষরে ভাসছে কিছু শব্দ—
“যুদ্ধ লেগেছে। রাজা পতনের পথে।
রাক্ষস রাজ্য আপনাকে ডাকে।
আপনি এখনই, এই মুহূর্তে চলে আসুন।
ফিরে না এলে আপনার সবচেয়ে প্রিয়জনকে ধ্বংস করা হবে—এটা রাজার আদেশ।”
আরহাম শক্ত হয়ে যায়।
কীভাবে যুদ্ধ লাগল? তার মানে তার বাবা-মা, রাজ্য—সব এখন বিপদের মুখে। আমাকে এখনই যেতে হবে। কিন্তু না গেলে? আমার সবচেয়ে প্রিয়জন তো আরশী। তার ক্ষতি করবে?
না। আমার যাওয়া উচিত। মোকাবিলা করা উচিত।
এক সেকেন্ড ভাবে আরহাম। তারপর সিদ্ধান্ত নেয়—আরশীকে সঙ্গেই নিয়ে যাবে।
লেখাটা মিলিয়ে যায়।
আরহাম সিঁড়ি দিয়ে নিচে নেমে গুহায় যেতে উদ্যত হলে দ্রোহান আর রাভানের মুখোমুখি হয়।
আরহাম কিছু বলার আগেই তারা হাঁপাতে হাঁপাতে বলে ওঠে, “সর্দার, যুদ্ধ লেগেছে। যুদ্ধ লেগেছে!’
“ তোমরা কীভাবে জানলে?”
“ একটা লেখা এসে ভেসেছে, সর্দার। এটা আপনার বাবার সহযোগীদের কাজ। বার্তাটা আপনার বাবাই পাঠিয়েছেন উনার মাধ্যমে।”
“ হ্যাঁ, আমিও পেয়েছি।”
“এখন আমরা কী করব, সর্দার? আপনি কি যাবেন?”
“ যাব। সব রেডি করো। সবাই মিলে এখনই রওয়ানা হব।”
“আর সর্দারনী?”
“সাথে নিয়ে যাব।”
রাভান আতকে ওঠে।
“উনি মানুষ, সর্দার! কীভাবে রাজ্যে নিয়ে যাবেন?”
“ ওকে সেফে রাখার দায়িত্ব আমার। তোমরা ঝটপট গুছিয়ে এসো।”
রাভান আর দ্রোহান চলে যায়।
আরহাম রুমে গিয়ে আরশীকে ডাকে।
আরশী চোখ কচলিয়ে জিজ্ঞেস করে,
“ কী হয়েছে?”
“ আমি এখনই রাজ্যে যাব। তুমি আর অরাইয়া আমার সঙ্গে যাবে। তোমার বাবাকে চাইলে নিতে পারো।”
আরশী অবাক হয়।
“রাক্ষস রাজ্যে আমি যাব কেন?”
“আমার ইমার্জেন্সি, আরশী।”
“তো যান না। আমি কী করব?”
“তোমাদের একা রেখে যাব না। এত প্রশ্ন করো না। ওঠো।”
“ আমি যাব না।”
“জেদ করো না। নইলে জোর করে নিয়ে যাব।”
আরশী চিৎকার করে ওঠে,
“আমি ওখানে গিয়ে করবটা কী? সবাই মিলে আমাকে খাবে?”
“ চুপ! বড্ড বেশি কথা বলো তুমি। রাজ্যে নয়, তোমাকে সেফ জায়গায় রাখব। কেউ তোমার ক্ষতি করতে পারবে না।”
আরশী বুঝে যায়, না গেলে আরহাম জোর করেই নিয়ে যাবে।
সে বাবার ঘরে গিয়ে নজরুলকে জাগিয়ে সব বলে।
নজরুল বলেন, “ আমার মাথায় কিছু কাজ করছে না। তুমি যা বলবে সেটাই করব।”
“আমি পালাতে চাই, বাবা। কিন্তু সে দেবে না।”
“আপাতত সাথে যাওয়া যাক। বিপদ হলে মেনে নেব।”
আরশী ফিসফিস করে বলে,” মায়ের ট্রাঙ্কে একটা বই আর অনেক ছোট অস্ত্র আছে। সব সাথে লীও বাবা।”
আরহাম অরাইয়াকে কোলে নিয়ে রওয়ানা হয় রাজ্যের উদ্দেশ্যে। সঙ্গে থাকে দ্রোহান, রাভান, আরশী আর নজরুল। সামনের জঙ্গলের গুহা থেকে আরও অনেক রাক্ষস যোগ দেয়। আরহাম মন্ত্র পড়ে, এক মুহূর্তে তারা মিলিয়ে যায় অন্ধকারে। রাক্ষস রাজ্যের পথে।
চলমান…..!
