#তুই_আমার_শেষ_ক্ষুধা
#শারমিন_প্রিয়া
১৯.
অগ্নীমা আর দ্রোহান পরদিন গুহায় চলে যায়। গুহায় গিয়েও অগ্নীমা কাঁদতে থাকে। কিছু খায় না। দ্রোহান আর কিছু বলে না অগ্নীমাকে। কী বলবে সে? মেয়েটা যে বড্ড আঘাত পেয়েছে। সর্দার যাচাই–বাছাই না করে হুদাই কেন চড়াও হলেন মেয়েটার উপর কে জানে। মেয়েটা সকালে খায়নি, দুপুরে খায়নি, সন্ধ্যা হতে গেল তাও কিছু খায়নি। দ্রোহান একবার বলেছিল, কিন্তু তাতে কাজ হয়নি। উপুড় হয়ে শোয়া ছিল অগ্নীমা। সে জায়গাতেই একসময় ঘুমিয়ে পড়লো। দ্রোহান কতক্ষণ সময় নিয়ে তারপর এসে অগ্নীমার উপর কম্বল টেনে দেয়। অগ্নীমার উসকোখুশকো চুল আর মলিন মুখ দেখে মায়া লাগে দ্রোহানের। মনে মনে ভাবে, পৃথিবীতে ভালো রাই বোধহয় কষ্ট পায় বেশি।ি
কায়ান গতকাল থেকে টেনশনে আছে। ভাবছে, কে হতে অদৃশ্য শত্রু? যে পরপর দু’বার আরশীকে আঘাত করতে এসেছে। এ টেনশনে কাহিল সে। গুহায়ও যায়নি। সে সেই অদৃশ্য শত্রুকে ধরার জন্য একটা উপায় ভেবেছে। ভাগ্য সহায় থাকলে আজই শত্রুকে হাতেনাতে ধরবে।
রাতের খাওয়া–দাওয়া শেষে প্রাসাদ নীরব হয়ে পড়ে। আরশী কায়ানকে জড়িয়ে ধরে শুয়ে আছে। কায়ান ঘুমোয় না। অপেক্ষা করে আরশী ঘুমানোর আর মাঝরাত হওয়ার।
ঘণ্টা দু’এক পর ঘড়িতে যখন রাত একটা বাজে, কায়ান ধীরে আরশীর মাথাটা বালিশে রাখে। তারপর সে উঠে চেহারা পরিবর্তন করে আরশীর রূপ নেয়। দরজা খোলে বারান্দায় যায়। বারান্দার রেলিংয়ে হাত ভর দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। এদিক–ওদিক তাকায়। এমন ভাব করে যেন সে সত্যি আরশী। প্রায় দশ মিনিট পার হলো, কোনও কিছু টের পেলো না কায়ান। তবু সে ফিরে যায়নি, দাঁড়িয়ে রইলো। মুখ দিয়ে একটু স্পষ্ট করেই বলল, ‘কই যে গেলেন বাবা। এত রাত হলো, এখনও ফেরার নাম নাই।’
কাজের খালার ঘরে এতক্ষণ লাইট জ্বালানো ছিল, হুট করে সেটা বন্ধ হলো। কায়ান মনে মনে বলল, ‘বাড়িতে এত বিপদ। এই মহিলার এতরাত অব্দি জাগার কি দরকার ছিলো? যদি কিছু হয়…’
এই ভাবনা শেষ হওয়ার আগেই কিছু একটা টের পেলো কায়ান। ছায়ার মতো এগিয়ে আসছে কিছু। কায়ান সেদিকে ভ্রুক্ষেপ না করে শাড়ির আঁচল দিয়ে গা ভালো করে ঢেকে সিঁড়ির দিকে এগুলো, করিডোরের সামনে গিয়ে উঁকি দিতে লাগলো অন্যদিকে। কায়ান টের পেলো পেছন থেকে কিছু একটা তাকে ধাওয়া করছে। সে ফিরে তাকাতেই লম্বা একটা হাত তার গলা ধরে টেনে নিয়ে গেল পেছনে। কায়ান অজ্ঞান হওয়ার ভান করে মাথা কাত করে শরীর ঢিলে করে ফেলল। হাতটা কায়ানকে কাবু করে গেট পেরিয়ে নিয়ে গেল বিলের ধারে। ছুড়ে ফেলে দিল নিচে। কায়ানের কানের কাছে মুখ নিয়ে অট্টহাসি দিয়ে বলল, ‘আজ তোকে কাবু করে ফেলেছি। তোকে এবার এই আমি জ্যান্ত খাব। তোর কোনও চিহ্ন এই পৃথিবীতে রাখব না। তোর জন্য আমার রাজ্যে ঝামেলা হবে—এটা তো আমি মেনে নেবো না।’
কায়ান আরশীর বেশে সব শুনে। নারী কণ্ঠ শুনে সে চমকায়। খুব চেনা তার এই কণ্ঠ। অনেক আপন। মহিলাটা দাঁত বড় করে কায়ানের গলায় কামড় বসাতে যাবে, তখনই কায়ান আসল রূপে আসে। আচমকা ছিটকে পড়ে মহিলাটা। চোখ বড় বড় করে তাকায় সে। এরকম আশ্চর্য সে জীবনে খুব কম হয়েছে। কায়ান উঠে যখন দেখলো সামনের রাক্ষসকে, সে-ও হতভম্ব হয়ে গেল। এটা কীভাবে সম্ভব! তার মুখ দিয়ে কথা বের হচ্ছে না। গলা শুকিয়ে আসছে। সামনের রাক্ষসটা যে তারই আপন মা।
ক’সেকেন্ড স্তব্ধ থাকার পর কায়ান এগিয়ে গিয়ে কাঁপা গলায় বলে, ‘আ…প…নি… আপনি এখানে কেন মা? কীভাবে এসেছেন?’
কায়ানের মা কঠিন মুখে উঠে দাঁড়ায়। আগুনঝরা চোখে বলে, ‘তুমি যা মন চায় করবা। মানুষ মেয়েকে—শত্রুর মেয়েকে—বিয়ে করবা। আমার বাবার খুনিদের বংশের মেয়েকে বিয়ে করবা, আমি সব মেনে নেব? মেয়েটাকে টুকরো–টুকরো করে ছিঁড়ে খাব আমি।’
কায়ানের মাথা আগুন হয়ে উঠে। চোখ বন্ধ করে ফোঁসতে–ফুঁসতে বলে, ‘ব্যাস মা! আরশীকে নিয়ে এমন কথা দ্বিতীয়বার বলবেন না।’
মা তেড়ে আসেন কায়ানের দিকে, ‘এই মেয়েটার মধ্যে কী দেখেছিস তুই! আমার রাজ্যে কি মেয়েদের অভাব? তোর তো বউ–ও আছে, অগ্নীমা। আরও বিয়ে করতে চাইলে আরও দিতাম। তুই কেন মানুষের বাচ্চাকে বিয়ে করলি?’
কায়ান দৃঢ় গলায় বলে, ‘সে যেই হোক মা, আমি তাকে ভালোবাসি। পুরো পৃথিবীর থেকে বেশি ভালোবাসি আমি আমার আরশীকে। আপনি দয়া করে তার দিকে হাত বাড়াবেন না। তার বাচ্চা হবে মা… দয়া করে তার ক্ষতি করবেন না আপনি।’’
‘চুপ থাকো কায়ান। বুদ্ধি লোপ পেয়েছে তোমার। মানুষের মেয়েকে বিয়ে করেছো জানলে রাজ্যে তুমুল যুদ্ধ শুরু হবে। আমাদের সবার বিপদ আসবে। বুঝে–শুনে কেন এমন করব আমরা? তুমি মেয়েটাকে ত্যাগ করো, নয়তো সত্যি মেরে ফেলব তাকে।’
‘মা…’ বলে চিৎকার করে উঠে কায়ান। ‘বলছি না, এসব বলবেন না! আরশীকে ভালোবাসি আমি। আরশীর কিছু হলে আমিও মরে যাব মা।’
কায়ানের মা চোখ–মুখ শক্ত করে উঠেন। ‘তোমার জন্য আমাদের কারও ক্ষতি হোক চাইব না। মেয়েটাকে আমি শেষ করেই ফেলব।’ এই বলে কায়ানের মা চলে যেতে লাগলেন।
কায়ান দৌড়ে গিয়ে মায়ের পায়ে পড়ে। তার মা পা টানলেও পা ছাড়ে না কায়ান। দামড়া এক যুবক, রাক্ষস রাজ্যের রাজা হয়েও কান্নায় ভেঙে পড়ে কায়ান। ছেলের কান্নায় মায়ের বুক কেঁপে উঠে। তিনি থামতে বাধ্য হন। তাকে টেনে তুলে বুঝান, ‘তুমি আগামীতে বড় রাজা হবে। রাজ্যের সবাই এখনও তোমাকে রাজা ভাবে। সেই তুমি কেন অপথে যাচ্ছো? এর সমস্যা কি হবে বুঝতে পারছো না? এত অবুঝ হয়ো না কায়ান। সময় আছে, বুঝার চেষ্টা করো।’
কায়ান তার কথায় অটল। সে ভেজা চোখে মাকে বলে, ‘ওকে ছাড়া আমার চলবে না মা। জীবন কি নিয়মের বাঁধনে চলে মা? মনের উপর কি কারও নিয়ন্ত্রণ থাকে? মন কি কারও কথায় থামে? আপনি তো আমার মা হন… জগতের সবার থেকে আপনি আমায় ভালো বুঝেন। আপনি আমার ভালোটা—আমার সুখটা দেখবেন না? আমার এই পাথরের মতো কঠিন মনে সে প্রেম জাগিয়েছে মা… আমি কীভাবে তাকে ছাড়া থাকব? মরে যাব মা… সত্যি মরে যাব! আপনার দোহাই মা… আপনি অনেক শক্তিশালী… আপনি আমার আরশীর কোনও ক্ষতি করবেন না মা। মেনে নিন তাকে। আপনি সব সামলাতে পারবেন… দোহাই আপনার…’
কায়ানের এহেন কর্মকাণ্ডে কায়ানের মা কিংকর্তব্যবিমূঢ়। এ ছেলে সত্যি উনার তো? রাক্ষস রাজ্যের রাজা কায়ান রাত্রেশ তো? সে–ও কাঁদতে পারে? কাউকে চাইতে পারে ভিক্ষার মতো? এ স্বপ্ন না বাস্তব? কায়ানের মা দীর্ঘশ্বাস ফেলেন, ‘আমার ছেলের এত পরিবর্তন কীভাবে হলো? মেয়েটার মধ্যে কি আছে?’ কায়ান আবার অনুনয় করে, ‘বলুন না মা। কথা দিন। আরশীকে ছেড়ে দিবেন… আমার জন্য… প্লিজ। মনে করুন সে আমার অক্সিজেন। তাকে ছাড়া শ্বাস–প্রশ্বাস বন্ধ হয়ে যাবে আমার। আমাকে বাঁচতে দিন। আরশীকে সাথে নিয়ে বাঁচতে দিন।’
কায়ানের কান্নায় কায়ানের মায়ের কঠিন হৃদয়ে আঘাত লাগে। ছেলের কান্না দেখে উনার চোখের কোণায় জল আসে। তিনি সাবধানে সেটা মুছেন। ছেলেকে বুঝতে দেন না। হাত বাড়িয়ে তুলেন কায়ানকে। কঠিন কণ্ঠে বলেন, ‘কান্না বন্ধ করো বলছি। এত দামড়া ছেলের এভাবে কান্না মানায়?’
‘আপনি আগে বলুন আরশীর ক্ষতি করবেন না। ছেড়ে দিবেন।’
কায়ানের মা গভীর নিশ্বাস ফেলেন। ‘আমি না হয় ছেড়ে দিলাম… যখন রাজ্যে জানাজানি হবে তখন? সেটা আপনি সামলাবেন। আপনি লুকিয়ে রাখলে কেউ জানবে না।’
কায়ানের মা গম্ভীর গলায় বলেন, ‘ঠিক আছে। এবার উঠো। কান্না বন্ধ করো। আমি চেষ্টা করব সামলাতে।’
কায়ান উঠে দাঁড়ায়। চোখ মুছে। মায়ের হাতে চুমু খায়। মা হাসেন। কতদিন পর ছেলেকে এত কাছে পেয়েছেন তিনি। সবার বড় ছেলে উনার, ভীষণ ভালোবাসেন তিনি ছেলেকে।
ছেলের দীর্ঘদিন ধরে রাজ্যে না ফেরায় তিনি খোঁজ শুরু করেন। তখন দ্রাভীনার কাছে শুনতে পান কায়ান অন্য গুহায় আছে। তারপর তিনি আরও খোঁজ নিয়ে যখন জানতে পারেন কায়ান মানুষ মেয়েকে বিয়ে করেছে, তখন মাথায় বাড়ি পড়ে তার। তারপর অনেক দিন পর খুঁজে পান কায়ানকে। তারপর তিনি ছদ্মবেশে কায়ানের কাছে আসেন। ধীরে ধীরে পরিকল্পনা করেন আরশীকে মেরে ফেলার। সফল হতেও যাচ্ছিলেন, কিন্তু বাধা হয়ে দাঁড়ালো কায়ান।
কায়ান জিজ্ঞেস করে, ‘তুমি কীভাবে খবর পেলে? আর এখানে কীভাবে আসলে?”
‘ খুঁজে বের করেছি সব! তোমার কাছে থেকেছি এতদিন?’
কায়ান চমকায়, ‘কাছে থেকেছো কীভাবে?’
‘তোমার বাসার কাজের খালা হয়ে।’
কায়ান এবার মাথায় হাত দিয়ে বসে পড়ে। ‘তুমি এতদিন কাজের লোক হয়ে থেকেছো! আশ্চর্য! তুমি আমার সাথে কথা বলতে পারতে! কাজের লোক হয়ে থাকার কি দরকার ছিল মা?’
‘এখন এসব বাদ। আমি কালই ফিরে যাব। আর হ্যাঁ… তুমি রাজা হতে পারবে না। মানুষ মেয়েকে বিয়ে করায় এ অধিকার তুমি হারিয়েছো। তোমার বাবার পরিবর্তে তোমার ছোট ভাই হবে রাক্ষস রাজ্যের রাজা।’
কায়ান মাথা নত করে বলে, ‘সমস্যা না তাতে আমার।’
কায়ানের মা এক দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলেন, ‘আমি কালই চলে যাব। যতটুকু সম্ভব সামলাব। বাকিটা বলতে পারছি না।’
কায়ান মাথা নত করে বলল, ‘যা করেছেন তাতেই আমি খুশি। আপনার কাছে কৃতজ্ঞ আমি মা।’
কায়ানের মা মাথায় হাত বুলিয়ে দিলেন কায়ানের। বললেন, ‘আমার আশীর্বাদ সবসময় তোমার সাথেই থাকবে। ভালো থেকো তুমি।’
দু’জনেই ফিরে গেলেন প্রাসাদে। কায়ান রুমে ঢুকে স্বস্তির শ্বাস ফেলল। অনেক বড় বোঝা নেমেছে তার উপর থেকে। সাথে কিছুটা দুশ্চিন্তাও কমেছে। মা সাথে আছেন তো অনেকটা বিপদ কেটে গেছে আরশীর। তিনি ম্যানেজ করবেন সবকিছু।
রাত প্রায় শেষের দিকে। আরশী হাতের উপর মাথা রেখে ঘুমাচ্ছে। এক–দু’গাছি চুল এসে পড়েছে কপালে। কায়ান খাটের উপর উঠে আলতো করে চুল সরিয়ে কপালে একটা চুমু খেলো। তারপর আরশীর মাথাটা নিজের বুকে এনে রাখল। মাথায় হাত বুলাতে বুলাতে মনে মনে বলল, ‘তোমার সঙ্গে যতক্ষণ আমি আছি, কেউই তোমার ক্ষতি করতে পারবে না আরশী।’
চলমান….!
#তুই_আমার_শেষ_ক্ষুধা(ফ্যান্টাসি রোমান্টিক)
#শারমিন_প্রিয়া(২০)
সকালে রান্না-বান্না করে কাজের খালা আরশীর কাছে বিদায় নিতে যান। আরশী অবাক হয়ে বলে, “হঠাৎ আপনি চলে যাচ্ছেন কেন? কিছু হয়েছে?””
কায়ানের মা জবাব দেন, “না, গেলে হবে না। আপনি অন্য কাউকে খুঁজে নেন।”
আরশী এ কথা শুনে হা হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। রুদ্রাণী বললেন, “দেখছিস, ঝট করে কি বলে গেল মহিলা। কাজ ছাড়ার কয়েকদিন আগে জানাতে হয়। সেটা উনি জানেন না।”
কায়ান রুদ্রাণীকে থামিয়ে বলল, “উনি গেলে সমস্যা কী মা? অন্য কাউকে খুঁজে নেব।”
“অন্য কাউকে কেন খুঁজবে আরহাম। মানুষ হলাম আমরা এ কয়জন। রান্না-বান্না সব আমি সামলাব। আর কাজের লোকের দরকার নেই।”
“কিন্তু আম্মু?”
কায়ানকে থামিয়ে রুদ্রাণী বললেন, “কোন কিন্তু নেই। আগে আরশী একা ছিল, তাই কেউ দরকার ছিল। এখন তো আমি আছি।”
কায়ান মাথা নিচু করে বলে, “ঠিক আছে, আপনারা থাকুন। আমি খালাকে একটু এগিয়ে দিয়ে আসি।”
কায়ান মায়ের কাছে আসে। মা এখনও কাজের লোকের বেশে হাঁটছেন। কায়ানকে দেখে দাঁড়ান। কতক্ষণ স্থির থাকার পর মাথায় হাত বুলিয়ে বলেন, “গুহায় যেও মাঝেমধ্যে। মায়ের মন বোঝো তো। তোমাকে দেখতে মন চায়। বাবা ও তোমার কথা বলে। কদিন পরপর গেলেই তো পারো।”
কায়ানের গলা ভারী হয়ে আসে, “যাব মা। আপনি শুধু মোনাজাতের রাখবেন আমাকে।”
মা হাসিমুখে ছেলের হাত ধরে চুমু খান। চুলে হাত বুলান, তারপর অদৃশ্য হয়ে যান।
কায়ানের খারাপ লাগে। বুকটা মোচড় দিয়ে উঠে। আর কতদিন পর মাকে দেখতে পাবে সে নিজেও জানে না।
দীর্ঘশ্বাস ফেলে সে বাড়ি যায় না। সোজা গুহায় যায়। অগ্নীমাকে সেদিন খামাখা বকা দিয়েছে। মেয়েটাকে আঘাত করেছে। সময়ের অভাবে অগ্নীমার কাছে আর মাফ চাওয়া হয়নি। এখন কায়ানের খারাপ লাগছে।
রাভান কবে ফিরবে কে জানে। এতদিন তো থাকার কথা নয়। আরশীর কথা আবার রাজ্যে ফাঁস না করে দেয়।
দ্রোহান রান্না করছে। অগ্নীমা গুহার শেষ মাথায় দাঁড়িয়ে আছে, চুপচাপ। আনমনে কি ভাবছে কে জানে?
কায়ানকে দেখে দ্রোহান দাঁড়িয়ে সম্মান জানায়।
কায়ান জিজ্ঞেস করে, “কি রান্না করছো?”
“অগ্নীমা ম্যাডামের জ্বর আসছে, কিছু খাচ্ছেন না দু’দিন ধরে। উনার জন্য অগ্নি-কচ্ছপের স্যুপ বানাচ্ছি।”
“জ্বর আসছে?” ঘাবড়ে বলল কায়ান।
দ্রোহান মাথা নাড়ালো।
কায়ান অগ্নীমার দিকে দৃষ্টি দিলো। সে ঠাই এখনও দাঁড়িয়ে। কায়ানের কথা শুনছে তাও ফিরে তাকাচ্ছে না।
কায়ান অগ্নীমার সোজা সামনে গিয়ে দাঁড়ায়। লাল হয়ে আছে অগ্নীমার চোখ-মুখ, ফোলা ও। চোখের কোণে কয়েক ফোটা পানি জমা। দেখেই বোঝা যাচ্ছে খুব অসুস্থ। অগ্নীমার চোখ ঘুরানো। কায়ান হাত নেড়ে বলল, “আমার দিকে তাকাচ্ছিস না কেন? এই? তাকাবি না?”
অগ্নীমা কথা কয় না।
কায়ান এবার অগ্নীমার গালদুটো আলতো চেপে মুখটা ঘুরিয়ে নেয় নিজের দিকে। ধমকে বলে, “তাকা বলছি।” তারপর কণ্ঠ নরম করে বলে, “এখনও রাগ করে আছিস। একটা ভুল বোঝাবুঝি হয়েছিল। আমার মাথা ঠিক ছিল না। কি যা তা বলে ফেলছি তোকে। দয়া করে সেসব ভুলে যা।”
অগ্নীমা ফুঁপিয়ে বলে, “বলতে বাধ্য হচ্ছি, তোমার মাথা এতটা অঠিক ছিলো যে, জানোয়ারের মতো ধরেছিলে আমায়। শুধু সন্দেহ করে। আমার সাথে এরকম আচরণ তুমি কখনও করো নি। তুমি ধারাবাহিকভাবে আমার সাথে অন্যায় করেই যাচ্ছ। করেই যাচ্ছ।”
কায়ান বিনীত গলায় বলে, “আর কখনও এমন হবে না, কথা দিলাম। এবারের মতো ভুলে যা, প্লিজ।”
অগ্নীমা ততক্ষণে গুহার ভেতরে চলে আসে। মাথা যন্ত্রণা হচ্ছে তার, সে মাথা হেলিয়ে দেয় বালিশে।
স্যুপ রান্না শেষ। দ্রোহান সেটা বাটিতে তুলে। কায়ান তার জন্য বরাদ্দ করা রাজকীয় চেয়ারে বসে। দ্রোহানকে বলে, “ও অসুস্থ, তুমি খাইয়ে দাও।”
দ্রোহান থমকে যায়, “আমি!”
“হ্যা। অসুস্থ মানুষের সেবা করা উচিত।”
দ্রোহান আর কথা ফিরায় না। সর্দার বলে কথা। সে বাটি নিয়ে অগ্নীমার কাছাকাছি বসে, বলে, “উঠুন। আমি খাইয়ে দিচ্ছি।”
অন্য সময় হলে অগ্নীমা দূর দূর করে তাড়িয়ে দিতো দ্রোহানকে। কখনও খেতো না। কিন্তু কায়ান এখানে উপস্থিত, তাই কায়ানকে দেখানোর জন্য সে দ্রোহানের হাতে স্যুপ খেলো।
কায়ান অগ্নীমাকে নিখুঁতভাবে চেনে। অগ্নীমার বর্তমানের এই অভিনয় দেখে সে মুখ টিপে হাসে আর মিনমিন করে বলে, “পাগলী একটা।”
তখনি রাভানের এন্ট্রি হয়। দ্রোহান রাভানকে দেখে হেসে বলে, “এতদিনে আসার নাম হলো!”
“কতদিন পর গিয়েছি, মা ছাড়ছিলেন না।” কায়ান বলে, “ভালো করেছিস থেকে। ওখানের অবস্থা কী? ভালো সব?”
“সব ভালো। তবে আপনার মা কোথায় যেন বেড়াতে গেছেন, কয়েকমাস ধরে উনি রাজ্যে নেই।”
কায়ান বলল, “ঠিক আছে।”
“আপনার বাবা বলেছেন, একবার রাজ্যে যেতে। আপনাকে দেখবেন।”
কায়ান মাথা কাত করল, সে যাবে।
কথা চলতে চলতে রাভান অগ্নীমাকে দেখে দ্রোহানকে চোখ ইশারা করে জিজ্ঞেস করলো, “কে?”
কায়ান সেটা দেখতে পেয়ে দ্রোহান কিছু বলার আগে উত্তর দিলো, “আমার ছোটবেলার বন্ধু।”
অগ্নীমা মুখ ভার করে বলল, “আমি কারো বন্ধু না।”
কায়ান হা-হা করে হেসে উঠলো।
দ্রোহানের অস্বস্তি হচ্ছিল। অগ্নীমার খাওয়া শেষ হলে সে উঠে আসে। কায়ান অগ্নীমার সাথে গিয়ে কথা বলার চেষ্টা করলে অগ্নীমা বলল না। কায়ান চলে গেল। কায়ান চলে গেলে অগ্নীমা নাক টেনে আবার কাঁদতে লাগল।
রাভান ফিসফিস করে দ্রোহানকে বলল, “এই মেয়ে কাঁদছে কেন ভাই?”
দ্রোহান চোরাচোখে অগ্নীমাকে দেখে বলে, “লম্বা কাহিনী ভাই। মেয়েটা সর্দারের মামাতো বোন আর ছোটবেলার বউ।”
রাভান চমকায়, “ছোটবেলার বউ আবার কী?”
“কী আবার। বিয়ে হয়েছিল। কিন্তু সর্দার সেটা মানেন না। মেয়েটা খুব নরম মনের। যখন জানতে পারলো আরশীর সাথে সর্দারের বিয়ে হয়েছে, সে কি কান্না রাতদিন। এখন একটু ভালো। তাও যখন তখন কেঁদে উঠে।”
রাভান মুখ বাকা করে বলল, “তাহলে চলে যাচ্ছে না কেন?”
“থাকলে তোর অসুবিধা কী? সর্দারের আত্মীয় বলে কথা। যখন মন চায় যাবে। সর্দার খুব স্নেহ করেন মেয়েটাকে।”
“তুমি দেখলাম স্যুপ খাইয়ে দিচ্ছো, ব্যাপার কী?”
দ্রোহান কোন উত্তর না দিয়ে অগ্নীমার পেছনে গিয়ে দাঁড়ায়। নরম গলায় বলে, “এভাবে কাঁদবেন না। আপনি অসুস্থ, আরও অসুস্থ হয়ে পড়বেন। চলুন, বিশ্রাম নিন।”
অগ্নীমা শয়নমঞ্চের উপর এসে বসে, চোখ-মুখ মুছতে মুছতে বলে, “আমি চলে যাব। আর কোনদিন এখানে কায়ানের সামনে আসব না।”
“আপনি চলে যাবেন?” অসহায় কণ্ঠে জিজ্ঞেস করলো দ্রোহান।
অগ্নীমা মাথা নাড়ালো।
দ্রোহান আর কিছু বলল না, ভেতরে ভেতরে একটি দীর্ঘশ্বাস ফেলল। সে না চাইতেও অগ্নীমার যাওয়ার কথা শুনে ভেতরে কেমন একটা চিনচিনে ব্যথা অনুভব করল।
গভীর রাত । আকাশে শুক্লপক্ষের চাঁদ উঠেছে। নরম, দুধসাদা আলো ছড়িয়ে দুনিয়াকে যেন অন্য এক জগৎ বানিয়ে দিয়েছে। পুরো প্রকৃতি জোৎস্নায় ভিজে আছে। উঁচুতে থাকা গাছগুলোর পাতাও রুপালি আলোয় চকচক করছে। চারদিক সুনসান নীরবতা।এই রাতকে দেখে মনে হচ্ছে, পৃথিবীর সব শব্দ ঘুমিয়ে পড়েছে।
রুদ্রাণীর হঠাৎ ঘুম ভেঙে যায়। আচমকা মন খারাপ হয় উনার। আজ কতগুলো বছর ধরে আত্মীয়দের থেকে বিচ্ছিন্ন তিনি। মা-বাবা, ভাই-বোন কাউকেই তিনি দেখতে পান না, কথা বলতে পারেন না। আরশীর জন্য তিনি সবাইকে ত্যাগ করেছেন। উনার বড় ভাই বলেছিল, রুদ্রাণী যেন আর কখনও রাজ্যে না ডুকেন। সেদিন কি যে কান্না রুদ্রাণীর মায়ের। মা হয়তো আজও মাঝেমধ্যে কান্না করেন রুদ্রাণীর জন্য। রুদ্রাণী ও তাদেরকে মিস করে। আজ একটু বেশিই মনে পড়ছে তার রাজ্যের কথা। ছোটবেলায় কত খেলাধুলা করতো তারা। বড় হয়েও কত বন্ধু ছিল। এক অন্যরকম আনন্দ ছিল রাজ্যে।
রুদ্রাণী ভাবেন, কোন মানুষকে হয়তো পুরোপুরি ভোলা যায় না। হঠাৎ কোন একদিন, কোন এক মুহূর্তে, চাঁদরাঙ্গা মাঝরাতে, কিংবা ঘুমের ঘোরে ফেলে আসা মানুষদের মনে পড়বেই। পড়তেই হবে।
রুদ্রাণী দীর্ঘশ্বাস ফেলে রুম থেকে বের হন। চাদর জড়িয়ে হাঁটেন উঠোনের এ মাথা থেকে ও মাথা। তার বুকের মধ্যে ব্যথা করছে। ফেলে আসা মানুষদের জন্য ব্যথা। তিনি কাঁদছেন, হাতের তালু দিয়ে মুছছেন। এক সময় গিয়ে বসে পড়েন বেলিফুল গাছের পাশে রাখা বেঞ্চে। চাঁদের আলোয় সাদা বেলি ফুল চকচক করছে, ম-ম করছে ঘ্রাণে। তিনি হাত বাড়িয়ে কয়েকটা বেলি ফুল তুলে নেন। হাটু তুলে বসেন বেঞ্চে। তারপর ফুলের পাপড়ি দিয়ে তৈরি করেন ছোট্ট একটা রাজ্য আর তার মা-বাবা, ভাই-বোনকে। কতক্ষণ সেটার দিকে তাকিয়ে, তারপর আবার দীর্ঘশ্বাস ফেলে এলোমেলো করে দেন। উঠে বাড়িটা পায়চারি করেন ভালো করে। আরশীকে যে এট্যাক করছিল দুদিন, সে কি চলে গেছে নাকি আছে? থাকলে তার আর খোঁজ নেই কেন? কিছু একটা মনে হতে পা থামে রুদ্রাণীর। ভাবেন, আরশীর দিকে যে হাত বাড়িয়েছিল, সে আবার কাজের ওই মহিলাটা নয়তো। তিনি মাথা ঝাকান, “যা তা ভাবছি কেন?”
নজরুলকে যেখানে বস্তাবন্দি অবস্থায় পাওয়া গিয়েছিল, সেই করিডোরে যান রুদ্রাণী। জহুরী চোখ সব কোণা দেখেন তিনি। তারপর করিডোরের পেছনে যান। পেছনে বড় জায়গা। এক বড় প্রাসাদ বানানোর মতো জায়গা। তিনি ভাবেন, “এই আরহামের বাবা না জানি কত বড়লোক ছিলেন। নয়তো এত বড় প্রাসাদ হওয়া চারটি খানি কথা না।”
তিনি পেছনের বড় জায়গায় হাঁটেন। নানান রকমের গাছপালা সেখানে। সব গাছগুলোর ডগা আলোয় ঝলমল করছে। মাঝেমধ্যে মৃদু নড়ছে পাতাগুলো। রুদ্রাণী হাটতে হাটতে শেষ মাথায় চলে আসলেন। দেয়ালের ওপারে বিল। বিলের পানি এখান থেকে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। ছোট্ট কুড়েঘরে জ্বলছে হলুদ স্ট্রেটলাইট।
রুদ্রাণী ফিরে আসবেন তখনি শুনতে পান মৃদু কথার আওয়াজ। একদম অস্পষ্ট, মনে হচ্ছে যেন কেউ ভূগর্ভ থেকে কথা বলছে। রুদ্রাণী খেয়াল করেন আবার, হ্যা, কতক্ষণ পরপর এরকম মৃদু আওয়াজ আসছে। সন্দেহ বাসা বাঁধে উনার মনে। চারদিকে খুঁজতে থাকেন, কিন্তু কোথাও কিছু খুঁজে পান না। এখানে বড় জায়গা আর করিডোরের দেয়াল সব। একটু ফাঁকফোকর নেই। তাহলে কোথা থেকে আসছে এই আওয়াজ? তিনি অস্থির হয়ে উঠেন। মনে শতশত বিপদ উঁকি দেয়। চোখের সামনে ভাসে নজরুল আর আরশীর সাথে ঘটে যাওয়া ঘটনা। দাড়িয়ে ভাবেন কতক্ষণ, তারপর হুট করে রাক্ষসী চেহারায় এসে দেয়াল টপকে বের হন। গাছ-গাছালিতে ভরা দেয়ালের ওইপার। তিনি হাঁটেন সেই জায়গায়। কোন ক্লু পান কিনা দেখেন। কোথাও কিছু পাওয়া যায়নি। সেই মৃদু আওয়াজটাও আর আসছে না।
সব মনের ভুল ভেবে তিনি আবার দেয়াল টপকে ভিতরে ঢুকতে যাবেন, তখনই উনার শাড়ি কিছু একটায় আটকে যায়। তিনি পা নামিয়ে সেটা ছড়াতে গেলে ছোট বৃত্তাকার লোহার কড়া দেখে তুলতে যান। তখনি দেখেন, কড়াটা কিছু একটায় লাগানো। টানতে গেলে খোলা যায় না। সন্দেহ আরও গাঢ় হয় তার। তিনি জাদুর ছুরি দিয়ে সেটায় আঘাত করলে সেটা খুলে যায়। তারপর সেটা টান দিলে জানলার মতো সরে যায়। অবাক হন রুদ্রাণী, “কি এটা? কারও পক্ষে কোনকালে বোঝা সম্ভব নয়, এ কড়া বড় একটা কিছুতে লাগানো আছে। সবাই তো কিছু একটা পড়ে আছে ভেবে, বা বিল্ডিংয়ের সাথে যুক্ত আছে বলে এড়িয়ে যাবে।”
তিনি কড়াটা যত টান দেন তত খুলতে থাকে। ভেতরটা অন্ধকার, কিছু দেখা যাচ্ছে না। হাত রাখলেও হাত দেখা যাচ্ছে না। তিনি পা নামান, বোঝার চেষ্টা করেন এটা কি। যতটুকু বুঝলেন, সেটা হলো অন্ধকারে সিড়ি রয়েছে। রুদ্রাণী হাত আর পায়ের ভরে আনুমানিক নিচে নামেন। বেশ কয়েকটা সিড়ি গেলে তিনি মশালের আলো দেখতে পান। সঙ্গে সঙ্গে তার রুহ কেপে উঠে। এক মিনিট দেরি না করে মনে পড়ে কায়ান রাত্রেশের কথা। ভেতর কাপতে তাকে তার। তিনি ভয়ে ভয়ে আরেকটু যান। এরকম করিডোরে তিনি দ্রোহানকে দেখতে পান। দেখেই শরীর হিম হয়ে যায় উনার। শ্বাস আটকে আসে। দ্রোহানরা এখানে কেমনে? দ্রোহান এখানে আছে মানে কায়ানরা সবাই আছে। কায়ান নিজে বলল, অন্য শহরে চলে যেতে, তার পরে কেন সে আমাদের পিছু নিয়েছে। কেন আমার মেয়ের দিকে আবার হাত বাড়িয়েছে। তার মানে আরশী আর নজরুলের সাথে সব কায়ানরা করছে। জানি না কতদিন ধরে তারা এ প্রাসাদে আছে। আর আমরা নিশ্চিন্তে ঘুমাচ্ছি, খাচ্ছি, কি ভয়ংকর, কি ভয়ংকর! কীভাবে এর থেকে আমার মেয়েকে বাঁচাব?
রুদ্রাণীর সামনে চলার শক্তি থাকে না। তবু তিনি নিজেকে যথেষ্ট সামলে পিছু হাঁটেন। উপরে উঠে যেভাবে লোহার কাটা ছিল সেভাবে রাখেন। ভয়ে ভয়ে চারপাশ দেখেন, কেউ তাকে দেখল কিনা। তারপর দ্রুত করিডোর পেরিয়ে মেইন বাড়িতে আসেন। মেয়ের ঘরে দেখেন ভেতর থেকে দরজা লাগানো। তিনি নিশ্চিন্তে ঘরে ঢুকেন। শ্বাস ছাড়েন একের পর এক। তারপর ভাবেন, “কালই এই বাড়ি ছেড়ে দিতে হবে। নয়তো আমার মেয়ে, জামাই, নজরুল, আমার সবার বিপদ।”
চলমান…..!
