Friday, June 5, 2026







বাড়ি"ধারাবাহিক গল্প"তুই আমার শেষ ক্ষুধাতুই আমার শেষ ক্ষুধা পর্ব-১৫+১৬

তুই আমার শেষ ক্ষুধা পর্ব-১৫+১৬

#তুই_আমার_শেষ_ক্ষুধা(ফ্যান্টাসি রোমান্স)
#শারমিন_প্রিয়া

১৫.

নজরুলের জ্ঞান ফেরে। চোখ মেলে সাদা দেয়াল, অ্যান্টিসেপটিকের গন্ধ, মনিটরের বিটবিট শব্দ আর হাসপাতালে দেখতে পেয়ে আঁৎকে উঠেন তিনি। চার-পাঁচ দিন আগে দু’জন মুখোশধারী তাকে ধরে নিয়ে গিয়েছিল। চোখ বেঁধে কোথা থেকে কোথায় নিয়ে আসছিল, তা তার মনে নেই। তবে জায়গাটা যে ভয়ংকর আর অন্ধকার ছিল সেটা নিঃসন্দেহে বলতে পারেন। অন্ধকারের মাঝেই কেউ একজন কড়া মেজাজে ভিলেনের সুরে তার সাথে কথা বলেছিল। যেমন-তেমন সুর না তা, ভয়ংকর। এই রকম সুর নজরুল আগেও শুনেছেন। তিনি তখনই তাদের রাক্ষস ভেবে ভয়ে ধুকধুক করে কাঁপছিলেন। তাকে জর্জরিত করা হয়েছিল প্রশ্নের পর প্রশ্ন করে—ে
“কেন পাগল বেশে লুকিয়ে ছিলেন?”
“কেন? কেন? কেন রাক্ষসের রাজাকে মারছিলেন?”

নজরুল ভয়ে আত্মা শুকিয়ে আসছিল। তিনি কিছু উত্তর দিতে পারেননি। পরে তার উপর অত্যাচার করা হয়। অত্যাচার সইতে না পেরে তিনি জ্ঞান হারান। এরপর আর কি হয়েছে মনে নেই নজরুলের।

নিজেকে হাসপাতালে দেখে, পাশে আরহামকে দেখে বুকের ভারটা একটু হালকা হয় নজরুলের। তিনি এখন সেফ আছেন। আরহামকে পাশে দেখে ভাবেন, আরহাম এখানে কেন? আমার মেয়ে কি জেনে গেছে আমি তার বাবা? জানলে কে বলল তাকে?

নজরুল ডাকলেন জামাইকে। বললেন,
“আরশী কই? তোমরা কি আমাকে এখানে নিয়ে এসেছো?”

আরহাম বলল,
“জি, আমরা নিয়ে এসেছি।”

“আরশী কি জেনে গেছে আমি ওর বাবা? নাকি এমনি নিয়ে এসেছো?”

তখনই আরশী আর রুদ্রাণী হাসপাতালে ঢোকেন। বাবা কথা বলছেন দেখে আরশী খুশি হয়ে যায়। চোখে পানি জমে উঠে। সে দৌড়ে গিয়ে বাবার পাশে বসে। নজরুল ড্যাবড্যাব করে তাকিয়ে থাকেন আরশীর দিকে। আরশী বাবার মাথায় হাত বুলিয়ে বলে,
“আমি জেনে গেছি তুমি আমার বাবা।”

রুদ্রাণী আরহামকে নরম গলায় বলেন,
“তুমি অনেকক্ষণ কষ্ট করেছো বাবা, এখন রেস্ট নাও। বাইরে গিয়ে কিছু খেয়ে আসো।”

আরহাম জানে তাকে সরানো হচ্ছে। তবু সে উঠে চলে যায়।

আরশী কিছু আঁচ করতে পেরে সময় নেয়। আরহাম বের হয়ে গেলে আরশী বাবাকে বলে,
“তুমি আগে কেন আমাকে পরিচয় দাওনি বাবা? আমাকে তো বলতে পারতে! সবার বাবা ছিল, শুধু আমার ছিল না। কতটা অসহায় লাগতো আমাকে। এটা ঠিক করোনি বাবা।”

বাবা হাত চেপে ধরলেন আরশীর। কিছু বলতে গিয়ে থেমে গিয়ে রুদ্রাণীর দিকে বারবার তাকাচ্ছিলেন। আরশী বুঝতে পেরে বাবাকে আশ্বস্ত করে বলল,
“বাবা, মা-ই আমাকে বলেছেন তুমি আমার বাবা। মায়ের সামনে নির্দ্বিধায় সব বলতে পারো। মন খুলে কথা বলতে পারো। কোনো ভয় নেই।”

নজরুল রুদ্রাণীর দিকে তাকান। রুদ্রাণী মুচকি হাসেন। নজরুল জানেন, রুদ্রাণী রাক্ষস তবুও রুদ্রাণীর ভেতর মায়া-মমতা আছে। আরশীকে আগলে রেখেছে। এমনকি তিনি নিজেও রুদ্রাণীর সাহায্যে আরশীর কাছাকাছি থাকতে পেরেছেন। তিনিও বিশ্বাস করেন রুদ্রাণীকে।

“আমাকে কোথায় পেয়েছো আরশী?”

“বাবা, আমার বাড়ির করিডোরে তোমাকে পেয়েছি। ওখানে তুমি কীভাবে গেলে?”

নজরুল অবাক হলেন, মেয়ের বাড়িতে কীভাবে গেলেন তিনি? আরশীকে জানালেন কীভাবে তাকে কিডন্যাপ করা হলো, কীভাবে নির্যাতন করা হলো, সব বললেন।

রুদ্রাণী ও আরশী দু’জনেই এসব শুনে আৎকে উঠলেন । কথাগুলো শুনে মনে হচ্ছে রাক্ষস কায়ান নজরুলকে ধরে নিয়ে এসেছিল। কিন্তু যেই হোক, কেউ নজরুলকে বাঁচিয়েছে। নজরুলের চেনা-পরিচিত আর কেউ নেই, তবুও কে বাঁচালো নজরুলকে? তার মানে কেউ একজন চায় নজরুল সুস্থ-স্বাভাবিক বেঁচে থাকুক। কিন্তু আরশীর বাড়িতে কেন রাখলো? তিনজনের মাথায় গোলকধাঁধাঁ ঘুরতে লাগলো।

রুদ্রাণী বললেন,
“অত ভেবে লাভ নেই। উত্তর আমরা পাবো না। যে বাঁচিয়ে রেখেছে তাকে ধন্যবাদ। আর এখন থেকে আমরা বেশি সতর্ক থাকব। রাক্ষসরা আমাদের খোঁজ পেয়ে গেছে। তাই সবসময় চোখ-কান খোলা রাখতে হবে।”

কয়েক দিন গেলে নজরুল সুস্থ হন। আরশী প্রথমে তাকে নিজের বাড়িতে নিয়ে যেতে চাইছিল। কিন্তু রুদ্রাণী বারণ করলেন, বললেন,
“তোমার বাবার উপর বিপদ আছে। আমি একজন রাক্ষস, তোমার বাবা আমার কাছে থাকলে নিরাপদে থাকবেন। রাক্ষসদের সাথে যুদ্ধ করার ক্ষমতা আমার আছে।”

মায়ের কথাটা সঠিক মনে হয় আরশীর। সে বলে,
“মানুষ কি বলবে মা?”

“কি আর বলবে! বলবে তোমার বাবা হারিয়ে গিয়েছিলেন, ফিরে এসেছেন।”

“তোমার বাবার নিরাপত্তার জন্য এটুকু মিথ্যে বলাই যায়।”

রুদ্রাণীর আরশীকে নিয়েও চিন্তা হয়। তিনি তার পুরনো কাঠের বাক্স খুলেন। সেখানে পুরনো অনেক যন্ত্রপাতি রাখা, যেগুলো খুব কাজের। সেখান থেকে তার বাবার দেওয়া একটা বড় ছুরি বের করেন। আরশীর হাতে দিয়ে বলেন,
“এটা যাদুর ছুরি। এটা দিয়ে শুধু রাক্ষসদের মারা যায়। আমাদের বংশের সাথে অনেক যুদ্ধ হতো, আমাদের সবার কাছে এরকম অনেক ছুরি-কাঁচি আছে। তুমি আর জামাই তো একলা থাকো। এটা তোমার কাছে সবসময় রাখবে। এর কথা কাউকে বলবে না। যখনই বিপদ বুঝবে বা কোনো রাক্ষস আক্রমণ করবে, তখনই সাহস করে আক্রমণ করবে, দেখবে ঘায়েল হয়ে যাবে রাক্ষসটা।”

তারপর তিনি আরেকটা ছোট পকেট-ছুরি বের করে দিলেন আরশীর হাতে। বললেন,
“এটা জামাইকে দেবে। শত্রু যেই হোক সে চেনে আমাদের সবাইকে। চিনে বলেই তোমার বাবাকে তোমার বাড়িতে পেয়েছে। তার মানে আশেপাশেই কোথাও বেঁধে রেখেছিল তোমার বাবাকে। জামাই বাইরে থাকে, জামাইও বিপদে। তাই এটা সবসময় সাথে রাখতে বলবে। কোনো বিপদ বা ভয়ংকর দানব দেখলে যেন সে কুপ বসায়। নিরাপদে থাকবে।”

আর এই বাক্সে দেখো আরও অনেক কিছু আছে। এখান থেকে তোমার বাবাকেও দেবো। আর বাকিগুলো সিন্দুকে ভরে রাখবো। যখন আমি থাকবো না, তখন সব তোমার দায়িত্বে রেখো। রাক্ষসের ছায়া যখন তোমার উপর আছে, যতদিন বেঁচে থেকো এইসব যন্ত্রপাতি তোমার লাগবে।”

___________

আরশী বাবাকে নিয়ে সেলুনে যায়। দাড়ি কাটে, চুল ছোট করে, শেভ করায়। তারপর তার বাবার সুন্দর মুখ ভেসে ওঠে। আরশী হেসে বলে,
“তুমি তো অনেক সুন্দর বাবা। কি সুন্দর লাগছে তোমাকে!”

“জানো বাবা? তোমার উপর অনেক অভিমান হয় আমার।”

“কেন?”

“তুমি আমার কাছাকাছি থেকেও পরিচয় দাওনি।”

“আমি তোমাদের সাথে মিশলে রাক্ষসদের সন্দেহ হতো। আমাকে তাড়াতাড়ি মেরে ফেলতো। তাই পাগলের বেশ নিতে হয়েছিল। তবুও তো তোমার কাছাকাছি থাকতাম মা।”

“যখন আমরা বাসা পাল্টালাম, তুমি কীভাবে জানলে?”

“তোমার মা বলেছিলেন।”

আরশী হাসল।
“মা অনেক ভালো তাই না বাবা?”

“হুম।”

“রাক্ষসরাও কি ভালোবাসতে পারে বাবা? তাদের মনেও কি দয়া-মায়া থাকে?”

“হয়তো থাকে। নয়তো রুদ্রাণী এত ভালোবাসতো না তোমায়। তোমার জন্য সব ছেড়ে দিত না।”

দেরি হয়ে যাচ্ছে দেখে আরশী বাবাকে মায়ের কাছে রেখে চলে আসে নিজের বাড়ি। দু’দিন ধরে সে মায়ের ওখানে ছিল। আরহাম কল করে বারবার আসতে বলছিল, কিন্তু আসা হয়নি।

দুপুরের মিঠে রোদ প্রাসাদে পড়ে ঝলমল করছে। আমগাছের ডালে একটা ডাহুক পাখি বসে আছে—অল্প পর পর কু-কু করে ডাকছে। বাড়িটা বরাবরের মতো নিরিবিলি, শান্ত। আরশী ভেতরে ঢোকে। উপরে উঠে দেখে খালা রান্না বসিয়েছেন। তিনি আরশীকে দেখে বললেন,
“এসেছো মা?”

“জি খালা। তোমার কি ভয় লাগছিল ক’দিন?”

“না না মা। ঠিক আছি।”

আরশী রুমে ঢুকে দেখে আরহাম নেই ঘরে। খালাকে জিজ্ঞেস করে,
“আমার বর কই খালা?”

“ঘরে ছিলেন তো—হয়তো বাইরে গেছেন।”

আরশী কল করলো। আরহাম জানালো সে কলেজ ক্যাম্পাসে।

“ওখানে কেন আপনি?”

“এমনি ঘুরতে এসেছি।”

“মেয়ে দেখতে গেছেন?”

আরহাম হেসে উঠলো।
“হুঁ। চারদিকে কি সুন্দর সুন্দর মেয়ে! চোখ জুড়িয়ে যায়!”

আরশীর মাথা গরম হয়।
“ঠিক আছে, দেখেন!”—বলে চট করে ফোন কেটে দেয়।

আরহাম হাসে। সে গুহায় ছিল। হাসতে হাসতে মানব-চেহারায় ফিরে যথাসম্ভব দ্রুত বাড়ি ঢুকে রুমে আসে।

আরশী গাল ফুলিয়ে বসে আছে। সে জানে আরহাম ফাজলামো করেছে, তবু তার রাগ হয়েছে। আরহামই বা কেন ফাজলামো করে এসব বলবে? আরহামকে সে বাস্তবে তো দূরের কথা—কল্পনায়ও অন্য মেয়ের সাথে ভাবতে পারে না। এমন হলে মরে যাবে সে।

আরহাম মুখ টিপে হাসতে হাসতে পেছন থেকে জড়িয়ে ধরে আরশীকে। আরশী বুঝেও পাত্তা দেয় না। আরহাম এবার আরশীকে ঘুরায়। চোখের দিকে তাকিয়ে বলে,
“মহারাণী দেখি সত্যি সত্যি রাগ করেছেন! আরে, আমার দুই চোখে শুধু তুমি থাকো—আর কেউ নয়। যেখানে যাই, সেখানেই শুধু তোমাকেই দেখি।”

আরশী অভিমান নিয়ে বলে,
“ফাজলামো করেও তুমি এসব বলবে না। আমার হার্টে লাগে।”

“এত যদি লাগে, তাহলে আমাকে রেখে তিন দিন বাপের বাড়ি কেন থেকেছো? বলো তো?”

“দরকার ছিল—জানেনই তো।”

“এইবার অভিমান ঝেড়ে আমার দিকে একটু সদয় হও বউ।”

“হচ্ছি—একবার ছাড়ুন আমাকে। একটা গুরুত্বপূর্ণ জিনিস আপনাকে দেওয়ার আছে।”

আরহাম আরশীকে ছেড়ে বলে,
“কি সেটা?”

আরশী ওয়ারড্রব থেকে বের করে ছোট্ট সেই পকেট-ছুরিটা। আরহামের হাতে দিয়ে বলে,
“এই নিন। এটা সবসময় সাথে রাখবেন। রাতে-দিনে কখনও কেউ আক্রমণ করলে এটা দিয়ে নিজেকে বাঁচাবেন। দেখবেন বাঁচতে পারবেন।”

আরহাম ছুরিটা হাতে নিয়ে নাড়াচাড়া করে। সে চিনতে পারে এটা রাক্ষসদের শক্তিশালী যন্ত্র। এর গুণ অনেক। এটা নিশ্চয়ই রুদ্রাণীর কাজ। আরহাম মনে মনে হাসে—রুদ্রাণী যার থেকে বাঁচাতে যন্ত্রটা দিচ্ছেন, সেটা তার হাতেই পড়ছে।

আরশীকে বলল,
“ঠিক আছে, সাথে রাখবো।”

আরশী ওয়ারড্রবে তালা লাগাতে যায়। আরহাম স্থির দাঁড়িয়ে আরশীকে দেখে। অদ্ভুত কিছু একটা কাজ করে আরহামের ভেতর। তাকে নিয়ে এত আতঙ্ক সবার মনে। আরশী নিজেও ভয়ে আছে। আরহাম এগিয়ে গিয়ে আরশীর কাছে দাঁড়ায়। জিজ্ঞেস করে,
“ওইটা কি?”

“কোনটা?”

“ওই যে যেটা রাখলে।” মা বলেছেন কাউকে না বলতে, না দেখাতে। তবু আরশী ফিসফিস করে বলে,
“এটা মা আমাকে দিয়েছেন, বিশেষ জাদুকরী ছুরি। এটা দিয়ে কাউকে আঘাত করলে সে তাড়াতাড়ি ঘায়েল হয়ে পড়বে।”

আরহাম চোখ উল্টে বলে,
“তাই।”

“হুম।”

আরহাম লুকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলে। রুদ্রাণীর মতে আরশীর একমাত্র শত্রু কায়ান রাত্রেশ—অর্থাৎ সে নিজেই। আর তাকে মারার জন্যই আরশীকে এই ছুরি দেয়া হয়েছে। সত্যি, এ ছুরি দিয়ে তাকে আঘাত করলে সে শেষ হয়ে যাবে। কিন্তু এটা কি কখনও বাস্তব হবে? আরশী কি নিজ হাতে তাকে মেরে ফেলতে পারবে?

আরহাম মাথা ঝাঁকিয়ে কেঁপে উঠে, না, না! এরকম হবে না। আরশী আমাকে ভালোবাসে। সে আমাকে মারতে পারবে না। আর মারা তো দূরের কথা৷ সে কখনই জানতে পারবে না আমার আসল পরিচয়।

এক বিচিত্র কারণে হুট করে আরহামের মন খারাপ হয়ে যায়। সে খাটে উঠে শুয়ে পড়ে।

আরশী আরহামকে এক পলক দেখে রান্নাঘরে যায়। দু’কাপ কফি বানিয়ে নিয়ে আসে। আরহাম চোখ বুজে শুয়ে আছে। আরশী কাছে গিয়ে মুখে হাত বুলিয়ে ডাকে,
“মাথা ধরছে?

আপনার জন্য গরম কফি এনেছি। উঠুন।”

আরহাম আরশীর হাতে চুমু খায়, তারপর উঠে কফির কাপে চুমুক দেয়। আরশীর দিকে তাকিয়ে মিষ্টি হেসে বলে,
“খুব ভালো হয়েছে।”

আরশী কফির কাপ নিয়ে উঠে যেতে যেতে বলে,
“একটা খুশির সংবাদ আছে আপনার জন্য।”

আরহাম চমকে উঠে, “কি?”

“এসে বলছি।”

আরহাম হাত বাড়িয়ে ধরে আরশীর হাত।
“এখনই বলে যাও, কাজ পরে।”

আরশী হাসে।
“এটা শুনলে তুমি খুশিতে পাগল হয়ে উঠবে।”

“ও বাবা! কি এমন যে, খুশিতে পাগল হয়ে উঠব?”

আরশী আরহামের হাত চেপে ধরে, তারপর ধীরে ধীরে তার পেটের কাছে নিয়ে যায়। আরহামের হাত তার পেটের উপর চাপিয়ে বলে,
“এখানে কেউ আছে।”

আরহামের আর বুঝতে বাকি থাকে না। তার চোখেমুখে খুশির ঝলক ফুটে ওঠে। খুশিতে দম আটকে আসে। পেটে আলতো চাপ দিয়ে বলে,
“সত্যি নাকি? আমার বংশধর আসছে…!”

আরশী মাথা ঝাঁকায়।
“হ্যাঁ।”

আরহাম একদম উচ্ছ্বসিত হয়ে আরশীকে কোলে তুলে নেয়। চুমু খায়।
“I love you! I love you!” বলে ঘুরে আরশীকে নিয়ে।

আরশী চিৎকার করে,
“নামান আমাকে! পড়ে যাব! পড়ে গেলে বিপদ হয়ে যাবে!”

আরহাম থামে। আরশীর দিকে তাকিয়ে হাঁপাতে হাঁপাতে বলে,
“আমি সত্যি খুশিতে পাগল হয়ে যাচ্ছি আরশী।”

চলমান…..!

#তুই_আমার_শেষ_ক্ষুধা(ফ্যান্টাসি রোমান্স)
#শারমিন_প্রিয়া

১৬.
দ্রোহানের অবস্থা ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হচ্ছে। রাভান রাতদিন তার সেবা করে যাচ্ছে। রাভান ধীরে জিজ্ঞেস করে,
“তুমি কেন আরশীর জন্য নজরুলকে বাঁচাতে গেলে বলো তো?”
দ্রোহান নিঃশ্বাস ফেলে বলল,
“সর্দারকে আমি বুঝতে পারি না জানিস তো? তিনি আরশীকে ভালোবাসেন, অথচ তার বাবাকে মেরে ফেলতে চান। ভালোবেসে মানুষ পাল্টায়, কিন্তু উনি উল্টো।”
রাভান গম্ভীর হয়ে বলে,
“মারলে তোমার কি? আরশীর বাবা রাক্ষস রাজাকে খুন করেছেন।”
দ্রোহান চোখ তুলে তাকাল,
“আর রাক্ষসরা মিলে যে আরশীর পুরো বংশ মেরে ফেলল, তাদের বাড়ি দখল করল, সেই হিসেব?”
রাভান চুপ হয়ে যায়। তারপর খুব আস্তে বলে,
“আমরা এ নিয়ে আর কথা বলব না। তুমি এসবেও ঢুকো না। সর্দারের মতিগতি বোঝা যায় না—কখন কি হয়।”

তখনই দেয়াল পেরিয়ে গুহায় কালো ছায়া থেকে কায়ান রাত্রেশ আসল চেহারায় আসে। রাভান আর দ্রোহান দেখতে পায়, রাক্ষস রাজ্যের ভয়ংকর রাজার মুখে আশ্চর্যভাবে ফুটে আছে এক অদ্ভুত হাসি।
তারা কিছু বলার আগে কায়ান এক হাত দিয়ে জামা সরিয়ে বড় চেয়ারে রাজকীয় স্টাইলে বসে। পা নাচাতে নাচাতে হালকা স্বরে বলল,
“দ্রোহান, কেমন আছিস? ভালো লাগছে?”
রাভান–দ্রোহান দুজনে একে অপরের মুখ চাওয়াচাওয়ি করে। সর্দারের আজ হলো টা কি? এত মিষ্টি করে কথা বলার ব্যক্তি নয় উনি।

তাদের বিস্ময় আর বাড়তে দেয়নি কায়ান রাত্রেশ। সে বলে ফেলল,
“রাক্ষস রাজ্যে নতুন অতিথি আসতে চলেছে। আমি বাবা হতে চলেছি।”

চমকে উঠে রাভান–দ্রোহান। শুয়ে থেকে উঠে বসে দ্রোহান। মনে দ্বিধা নিয়ে কায়ানকে বলে,
“আপনি অভয় দিলে কথা বলতে পারি?”
“আজ যা খুশি বলো, কোন বাধা নেই। মুড অনেক ভালো আছে।”

“সর্দার, বাচ্চা কি রাক্ষস হবে? হওয়ার তো কথা। আর হলে সর্দারনী জানতে পারবেন। তখন আপনাকে কি মেনে নেবেন? আপনি তো বাচ্চাকে নিয়ে ভবিষ্যৎ রাজ্য চালানোর স্বপ্ন দেখছেন।”

কায়ান দ্রোহানের কথা শুনে চিন্তায় পড়ে যায়। সত্যি তো—বাচ্চাকে ভবিষ্যৎ রাজা বানাতে চাইলে প্রকাশ্যে আসতে হবে সব। আর প্রকাশ্যে আসলে আরশী কি করবে?
আর যদি আরশীর জন্য বাচ্চার আসল পরিচয় লুকিয়ে রাখতে হয়, তাহলে তো ভবিষ্যৎ রাক্ষস রাজ্যের রাজা কে হবে?
আরশীকে ছাড়া অন্য কাউকে বিয়ে করার কথা ভাবতেও পারে না কায়ান।

দীর্ঘশ্বাস ফেলে চুপচাপ বসে থাকে কায়ান। সত্যিই তার টেনশন হচ্ছে—কি করবে সে? তাছাড়া বাচ্চা জন্ম নেওয়ার পর যদি সে বাচ্চা রাক্ষস হয়, তখন আরশী কি করবে?

কায়ান রাত্রেশ উঠে। গুহার শেষ মাথায় যায়। ঘন অন্ধকার গুহায় মশালের শা শা শব্দে আগুন কাঁপছে। কায়ান হতাশ চোখে এদিক–ওদিক তাকায়। তার সত্যি খুব অসহায় লাগছে নিজেকে। তার মস্তিষ্ক কিছু একটা হারানোর টের পাচ্ছে সামনে। যা ঘটার সবচেয়ে বেশি ভয় পেত কায়ান, ভবিষ্যতে বোধহয় সেটাই হয়ে যাবে।

কায়ান আচমকা হেসে উঠে, দাঁত বের করে জোরে জোরে হাসে। গুহা কাপিয়ে উন্মাদ হাসি হাসে। হাসতে হাসতে চোখে পানি আসে তার।
সে যখন প্রথম মানুষ হতে চেয়েছিল, তখন দ্রোহান বলেছিল,
“আপনি মানুষ হতে পারবেন, কিন্তু মানুষ হওয়ার বরদান আপনার নেই। বরদান ছাড়া মানুষ হলে আপনার আয়ু কমে যাবে।”
তখন সে বলেছিল,
“আরশীকে ছোঁয়ার জন্য মৃত্যুকেও সেচ্ছায় ডেকে নেব আমি।”

সেই কথাটা কি সত্যি হয়ে যাচ্ছে? এমনিতেই তো তার আয়ু ফুরিয়ে যাচ্ছে—তার উপর তার সত্যতা আরশীর সামনে যখন তখন খুলে যেতে পারে। আরশী যখন জানবে, তখন কি রুদ্রাণীর ছুরি দিয়ে আঘাত করবে? নাকি কায়ানের ভালোবাসার গভীরতা দেখে মেনে নেবে, যেমন রুদ্রাণীকে মেনে নিয়েছে?

কায়ান এইসব ভাবতে ভাবতে গুহায় অনেকক্ষণ কাটায়। ভাবনায় এত মত্ত ছিল যে, বাড়ি ফিরবে, আরশীর কাছে ফিরবে, মনেই ছিল না।

___________

ঘড়ির কাটায় রাত তখন ১টা বাজে। আরশী ঘরে–বাইরে হাঁটছে, কায়ানের অপেক্ষা করছে। ফোন বন্ধ। অজানা ভয়ে, চিন্তায় তার মাথা কাজ করছে না। সাহস হচ্ছে না নিচে যাওয়ার। এত বড় প্রাসাদ, কার সাহস আছে একা একা বাইরে যাওয়ার?
কাজের খালাও অদ্ভুত আচরণ করেন। একেকদিন লাইট জ্বালিয়ে শুয়ে থাকেন আবার একেকদিন অন্ধকারে। আজ উনার ঘরে কোনো আলো দেখা যাচ্ছে না। আরশী ঠিক করল,
“কাল খালাকে জিজ্ঞেস করব— আপনার ভয় কি একদিন থাকে আবার একদিন উড়াল দেয়?”

দূরে বিলের ধারে শেয়াল ডাকছে। শা শা শব্দে নড়ছে বাড়ির নারকেল গাছের পাতা। শেয়ালের ডাক আর পাতার ফিসফাস শব্দ মিলে নিরিবিলি রাত্রিকে আরও ভৌতিক করে তুলছে। গা শিহরন দিয়ে উঠছে আরশীর।

কেমন একটা ভয়–ভয় অনুভূতি হচ্ছে। সে দ্রুত পেছনে সরে রুমের দরজা ধরে দাঁড়ায়। ঠিক তখনই অদ্ভুত কিছু একটা তার সামনে দিয়ে চলে যায়। কেঁপে উঠে আরশী। চিৎকার করতে গিয়ে গলা শুকিয়ে যায়।

সে কোনোমতে ঘরে ঢুকে ওয়ারড্রবের ওপর থেকে ছুরিটা হাতে নেয়। যে হোক—কুপ বসাতে হবে, মা বলেছেন। কিন্তু ছুরি হাতে নিয়েই তার হাত থরথর করে কাঁপছে। পুরো শরীর কাঁপছে। হৃদপিণ্ড ধুকপুক করছে জোরে জোরে। মনে হচ্ছে—তার সামনে যে-ই আসুক, সে আঘাত করতে পারবে না। বরং তাড়াতাড়ি অজ্ঞান হয়ে লুটিয়ে পড়বে।

ছায়াটা আবার বামদিক থেকে ডানদিকে দৌড়ে গেল। আরশী এবার হিমশীতল হয়ে উঠল।
হাতের যাদুকরী ছুরিটা চপাৎ করে পড়ে যায় মেঝেতে। মাথা টলছে তার। আবছা চোখে দেখে, একটা লম্বা হাত তার দিকে এগিয়ে আসছে। ভয়ংকর সেই হাত। লম্বা লম্বা নখ। হাতের গায়ে ভাঁজভাঁজ কুঁচকানো দাগ।

আরশী মাথা ঘুরিয়ে পড়ে যেতেই আরহাম দৌড়ে এসে তাকে কোলে নেয়। অস্থির হয়ে বলে,
“কি হয়েছে আরশী? আরশী? কি হয়েছে? চোখ খুলো। আমি আরহাম।”

আরহাম আরশীকে কোলে নিয়ে বিছানায় রাখে। আরশীর হাত–পা ঠান্ডা বরফের মতো হয়ে গেছে। আরশীকে কম্বল দিয়ে ঢেকে রাখে। চোখে হালকা পানি ছিটিয়ে দিলে আরশী ধীরে ধীরে চোখ খুলে।

আরহামকে দেখতে পেয়ে চিৎকার করে বুকে ঢুকে আরহামের। বাচ্চাদের মতো জড়িয়ে ধরে—বুকের একদম গভীরে গিয়েও আরও গভীরে ঢোকার জায়গা খুঁজে। কান্নায় ভেঙে পড়ে।

আরহাম হতবাক হয়, এত ভয় পেল কি করে আরশী?
নিজেই অনুতাপ করে,
“আমারই তো দোষ… নিজের ভবিষ্যতের ভাবনায় এতটা বেপরোয়া হয়ে গিয়েছিলাম। সময় কোনদিকে চলে গেছে টের পাইনি।”

কিন্তু… আরশীর সাথে হয়েছে কি?
আরশীকে নরম গলায় জিজ্ঞেস করে,
“এত ভয় পেয়েছো কেন আরশী? কি দেখেছো? কি হয়েছে?”
আরশী কেঁদে দেয়।
“আপনি না আসায় অপেক্ষা করছিলাম আপনার জন্য। হঠাৎ একটা ছায়া দেখতে পাই। অস্বাভাবিক সেই ছায়া। তারপর আবার। তারপর দেখি একটা লম্বা হাত আমার দিকে এগিয়ে আসছে। আর কিছু বলতে পারি না। আমি ভয় পেয়েছি ভীষণ।”

আরহাম আরশীর মাথায় হাত বুলিয়ে সান্ত্বনা দিয়ে বলে,
“আর ভয়ের কিছু নেই। আমি আছি এখন। আর এই পৃথিবীর কারও সাহস নেই আমার বউকে কিছু বলার বা করার। বড়জোর ভয় দেখাতে পারবে। আমি চলে এসেছি—কোনো ভয় পেয়ো না। নিশ্চিন্তে ঘুমাও।”

আরহাম বালিশে রাখে আরশীর মাথা। তারপর আরশীর শিয়রে বসে আরশীর মাথায় হাত বুলাতে থাকে আর ভাবতে থাকে, কার এত বড় সাহস আমার আরশীর সাথে এরকম করবে?
আরশীর বর্ণনা অনুযায়ী মনে হচ্ছে রাক্ষস হবে।
কিন্তু কে আরশীর ক্ষতি চায়? কে হতে পারে?

যেই হোক—হাতে নাতে ধরতে পারলে ছাড়ব না আমি।

এই সময় ভয় পেলে চলে না। আরশী এত ভয় পেয়েছে তাকে একা রাখা ঠিক হবে না বাসাতে। আরহাম ভাবতে থাকে, কতক্ষণই বা চোখে চোখে রাখা যায়? গুহায় তো যেতেই হবে, আর না গেলে চলবে না। যে একবার আরশীর দিকে হাত বাড়িয়েছে সে আবারও বাড়াতে পারে। এসব চিন্তা করতে করতে আরহাম ভাবলো রুদ্রাণীর কাছে আরশীকে দিয়ে দেওয়া যায় কিনা। পরক্ষণেই মনে হলো—রুদ্রাণী অবশ্যই আরশীকে সেফ রাখবেন, কিন্তু তার নিজ শক্তির কাছে আরশী আরও বেশি নিরাপদ থাকবে। তার মতো শক্তিশালী কাউকে সহজে কেউ টেক্কা দিতে পারবে না। সব বিবেচনা করে সে শেষমেশ সিদ্ধান্ত নিল রুদ্রাণীকে এ বাড়িতে নিয়ে আসবে। আরশীর বাবা-মা দুজনেই এখানে থাকবেন, আর রুদ্রাণী থাকলে আরহাম বাইরে থাকলেও তিনি আরশীকে দেখে রাখতে পারবেন।

রুদ্রাণী এ কথা শুনে থমকে গেলেন। বললেন, “মেয়ের বাড়িতে কীভাবে এতদিন থাকব?”
আরহাম বলল, “আপনারা একেবারে চলে আসুন মা। এত বড় বাড়ি খালি পড়ে থাকে। আরশী, আপনি, বাবা—সবাই একসাথে থাকলে আরও ভালো হবে।”

আরশী যখন ভয় পাওয়ার কথা জানালো, রুদ্রাণীর মুখ শুকিয়ে গেল। তিনি বুঝলেন, এমন কেউ আছে যে আরশী আর তার বাবার ক্ষতি চাইছে। বিপদের আভাস পেয়েই বললেন, “আমি বরং চলে যাই, সবাই ওখানে বিপদে আছে।”

রুদ্রাণী আর নজরুল মেয়ের বাড়িতে চলে এলে তাদের জন্য উপরতলার শেষ মাথায় আলাদা আলাদা রুম দেওয়া হলো। মাকে কাছে পেয়ে আরশী নিশ্চিন্ত হলো।

আরশী তখন আরহামকে আবদার করে বলল, “আপনার তো টাকার অভাব নেই, আমার সন্তান আসার খুশিতে তার মঙ্গলের জন্য অসহায় মানুষদের দাওয়াত দিয়ে খাওয়ান। আয়োজন করুন।”
আরহাম খুশি হয়ে বলল, “কেন নয়। অবশ্যই হবে। কালই সব আয়োজন হবে।”

সকালে বিশাল আয়োজন শুরু হলো। তিনটে গরু জবাই হলো মানুষের জন্য। ডেকোরেশন করতে লোকজন এলো। রান্না শুরু হলো। মাইক দিয়ে এলাকায় ঘোষণা হলো, দলে দলে মানুষ এল খেতে।

আরহাম উপরতলার বারান্দায় আরামদায়ক চেয়ার এনে আরশীকে বসাল। উঠোনে মানুষ খাচ্ছে। আরহাম আরশীর গলা জড়িয়ে ধরে বলল, “তুমি চেয়েছিলে তাই করেছি। এখানে বসে মন ভরে দেখো। আমাদের বাচ্চাটা যেন সুস্থভাবে দুনিয়াতে আসে।”

আরশীর চোখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল। সে আবেগে আরহামের হাত ধরে বলল সামনে আসতে। আরহাম সামনে গিয়ে হাঁটু গেড়ে বসল। আরশী তার মুখে হাত বুলিয়ে বলল, “আমার শত জন্মের ভাগ্য যে, আপনাকে পেয়েছি। আপনাকে পেয়ে আমি সত্যিই ভাগ্যবতী। এত ভালোবাসেন, এত যত্ন করেন… আজকাল এমন বর পাওয়া যায় না।

আরহাম হাসল। বলল, “তুমিও তো সেরা বউ। আজকাল কোন মেয়ে এক পুরুষে আসক্ত থাকে? তুমি থেকেছো। ভালোবেসেছো। আরহাম চোখ সরু করল,… এই বাসোতো সত্যি?”
আরশী দীর্ঘশ্বাস ফেলল। বলল, “সীমাহীন। আপনাকে ভালোবাসা আমার শ্বাসের মতো।”

আরহাম কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল, “আচ্ছা আরশী, তোমার কাছে কিছু জানতে চাই।”
“ কি?”
“আমার এক বন্ধু আছে। সে তার বউকে অসম্ভব ভালোবাসে। কিন্তু বউয়ের অগোচরে সে একজন ভয়ংকর অপরাধী—খুনি। এমন কোন পাপ নেই যা সে করেনি।কিন্তু তার একমাত্র দুর্বলতা তার বউ। বউয়ের জন্য পৃথিবী উলটপালটও করে দিতে পারে। এখন তুমি বলো, যদি বউ কখনো সব সত্যি জেনে যায়, তাহলে বউয়ের কি করা উচিত? স্বামীকে ছেড়ে যাওয়া? নাকি স্বামীর ভালোবাসার গভীরতা দেখে থেকে যাওয়া?”

আরশী চিন্তায় পড়ে গেল। অনেকক্ষণ ভেবে বলল, “আমি জানিনা। ওই সময়ে কী বলা উচিত, ওই মানুষটাই বুঝবে।”
“তোমার নিজ থেকে কিছু বলো।”
“সরি, সত্যি কিছু মাথায় আসছে না।”

আরহাম মৃদু হেসে উঠে দাঁড়াল। বলল, “আর ভাবতে হবে না। আমি তোমার জন্য খাবার নিয়ে আসছি।”

মানুষ খাওয়ানোর জন্য তিনটে গরু জবাই করা হয়েছে। আরেকটা গরু গুহায় পাঠানো হয়েছে নিজেদের জন্য। রায়ান খেয়ে অসন্তুষ্ট হয়ে বলল, “কতদিন মানুষ খাইনি। তরতাজা রক্ত পাই না।”
দ্রোহান গরুর কলিজা খেতে খেতে বলল, “আমার তো অভ্যাস হয়ে গেছে। মানুষ না খেলেও চলে। এখন কেন জানি মানুষদের ওপর মায়াই কাজ করে।”

রাভান হেসে উঠল। বলল, “তুমিও কি সর্দারের মতো কোন মেয়ের প্রেমে পড়েছো নাকি?”
দ্রোহান বিরক্ত হয়ে বলল, “এখানে কোন মেয়ে আছে নাকি? এসব না।”

এ সময় কায়ান হাজির হলো। জগে রাখা গরুর রক্ত ঢকঢক করে খেয়ে নিলো।
রাভানকে বলল, “তুমি আজ রাজ্যে যাবে। ওখানে কি অবস্থা, জানি না। মা-বাবা হয়তো আমাকে খুঁজছেন। বলবে আমি নতুন আস্তানায় আছি, মানুষ শিকার করছি। রাজ্যের সবাই ভালো আছে কিনা দেখে আসবে।”

হঠাৎ এক নারীকণ্ঠ শোনা গেল।
“রাজ্যের সবাই ভালো আছে, শুধু তুমি নেই বলে আমি ভালো নেই।”

সবাই চমকে উঠল। পেছন থেকে এক মেয়ে এসে কায়ান রাত্রেশের চোখ ধরে বলল, “বলো তো আমি কে?”

রাভান আর দ্রোহান তাকিয়ে দেখল, মেয়েটিও রাক্ষস।

কায়ান মেয়েটার হাতে হাত রাখল। লম্বা হাত, নখ, স্বর—সব বিচার করে বুঝল মেয়েটা মানুষ নয়।
সে এক ঝটকায় হাত সরিয়ে মুখোমুখি দাঁড়াল। কায়ান মুখোমুখি দাঁড়ালে মেয়েটা মুচকি হাসে।

কায়ান জিজ্ঞেস করল, “কে তুমি? এখানে এলে কীভাবে?”
মেয়েটি হেসে বলল, “দ্রাবীনার কাছ থেকে ঠিকানা নিয়েছি।”

কায়ানের চোখ রাঙা হয়ে উঠল।
মেয়েটি আবার বলল, “আর…. আর আমি হচ্ছি তোমার ছোটবেলার একমাত্র খেলার সাথী, অগ্নীমা। তোমার মামাতো বোন। চিনতে পেরেছো? মনে আছে আমাকে?”

নাম শুনেই কায়ানের চোখের আগুন নিভে গিয়ে আনন্দ ফুটে উঠল।
সে অগ্নিমার হাত ধরে বলল, “কেন চিনব না? তুই আমার একমাত্র বন্ধু। কত খুঁজেছি তোকে। কোথায় হারিয়ে গিয়েছিলি! তুই চলে গেলে আমি না ঘুমিয়ে কত রাত কাটিয়েছি। বিশ্বাসই হচ্ছে না তোকে আবার ফিরে পেয়েছি। তুই আগের মতোই আছিস।”

অগ্নিমা হাসল। কামানের দিকে তাকিয়ে চোখ নাচিয়ে বলল, “মনে আছে, ছোটবেলায় আমাদের বিয়ে হয়েছিল?”
কায়ান হাসল। বলল, “সব মনে আছে। তোর কি এখন বিয়ে হয়েছে? বাচ্চা আছে?”
অগ্নিমা অবাক হলো, “বিয়ে হবে কেন? বিয়ে তো হয়ে গেছে। মনে প্রাণে তো তোমাকেই স্বামী মানি। তোমাকে ছাড়া কাউকে বিয়ে করব কেন?”

কায়ানের মুখের ভাব পাল্টে গেল। বলল, “আমি বিয়ে করে ফেলেছি।”
এ কথা শুনে অগ্নিমা পাথর হয়ে যায়, “কি বলছো? আমাদের রাজ্যে একবার বিয়ে হলে আরেকটা হয় কিভাবে? কে সে?”
কায়ান তোতলাতে তোতলাতে বলল, “আ….মি একটা মানুষ মেয়েকে বিয়ে করেছি।”

অগ্নিমা এবার অসাড় হয় বসে পড়ল। মুখে অস্ফুট স্বর, “সর্বনাশ… মানুষ মেয়ে? এটা কি করলে?”
কায়ান বলল, “হয়ে গেছে। আমি তাকে ভালোবাসি। ভালোবাসা নিয়ম মানে না। জাত-পাত মানে না।”

অগ্নিমা গর্জে উঠল, “ব্যাস! আর নয়। তুমি আমার স্বামী। তোমাকে আমি চাই। তুমি শুধু আমার, অন্য কারোর নয়।”
কায়ান মাথা ঝাকায়, “হবে না শর্মিলা। তুমি নরম মনের, বুঝো ব্যাপারটা।”
অগ্নিমা কায়ানের কাছে এসে কপালে হাত বুলিয়ে বলল, “তুমি তো ছোটবেলা বলতে আমাকে ভালোবাসো। আর এখন অন্যতে মজে গেলে। কি করলে এটা?”

কায়ান থেমে থেমে বলে, “ওই বয়সে কি বুজতাম ভালোবাসার। হয়তো এমনি বলেছি। তোকে সত্যি ভালোবাসলে অন্য কাউকে ভালোবাসতে পারতাম না।”

“তুমি শুধু তোমারটা দেখলে, আর আমারটা? আমি কি মরে যাব? আমার অনুভূতির দাম নেই? প্লিজ কায়ান, আমাকে মরতে বাধ্য কোরো না। তুমি আমার। শুধু আমার।

যদি মানুষ মেয়েটাকে ছাড়তে না পারো, তাহলে সে থাকুক। কিন্তু আমাকে বউয়ের অধিকার দাও। আমি কারো কাছে বলব না তুমি দ্বিতীয় বিয়ে করেছো। সব গোপন থাকবে। শুধু আমাকে আমার অধিকার ফিরিয়ে দাও। আমাকে জায়গা দাও তোমার বুকে। না হলে আমি নিজেকে শেষ করে ফেলব।”

আরশী দেখার আগ অব্দি একটা সফট সুন্দর অনুভূতি ছিলো কায়ানের- অগ্নীমার প্রতি। কিন্তু আরশীকে দেখে সব উলটপালট হয়ে গেছে। অগ্নীমাকে সে কষ্ট দিতে পারে না, মৃত্যু চাইতে পারে না। অগ্নীমার সাথে তার ছোটবেলার সুন্দর সুন্দর স্মৃতি জমে আছে। যেগুলো এখনও ভাবলে হাসি পায়। অগ্নীমা এখনও তার জায়গায় আছে, তবে আরশীর জায়গা সবার উপরে। আরশীর জায়গা সে অগ্নীমাকে দিতে পারবে না। আবার অগ্নীমার মৃত্যু ও হতে দিতে পারে না। অগ্নীমা অভিমানী মেয়ে, যদি সত্যি এটা করে বসে। ভাবতে পারে না কায়ান। সবকিছু এত জটিল হয়ে যাচ্ছে কেন?

চলমান……!

গল্প পোকা
গল্প পোকাhttps://golpopoka.com
গল্পপোকা ডট কম -এ আপনাকে স্বাগতম......
RELATED ARTICLES

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে

- Advertisment -

Most Popular

Recent Comments

Md masrur Hasan mahi على অবুঝ_বউ পার্ট: ৫
আমিনুল ইসলাম على প্রয়োজন পর্ব: ৩০ ( অন্তিম)
সাজিবুল ইসলাম على ধর্ষিতাবউ২ ৯ তথা শেষ পর্ব
শাহিদুল ইসলাম على জীবন সঙ্গী ১ম পার্ট
শাহিদুল ইসলাম على জীবন সঙ্গী ১ম পার্ট
Nita Sarkar على স্বপ্নীল ৬৮
শিয়াসা ইসলাম হুরিজিহান على রহস্য শেষ_পর্ব
শিয়াসা ইসলাম হুরিজিহান على অলক্ষ্যে তুমি পর্ব-০৬ এবং শেষ পর্ব
Nazmun Nahar Akhi على Psycho_is_back? part_7
Nazmun Nahar Akhi على Dangerous_Villian_Lover part 2
শিয়াসা ইসলাম হুরিজিহান على জানালার ওপারে পর্ব-১৭ এবং শেষ পর্ব
শিয়াসা ইসলাম হুরিজিহান على লীলা বোর্ডিং ১২১৫ পর্ব-১১ এবং শেষ পর্ব
মিজানুর রহমান রাহুল على সেই তুমি পর্ব-০১
@feelings على প্রহেলিকা
Anamika Basu على সে পর্ব-১২
Anamika Basu على সে পর্ব-১২
Nusrat jahan على coffee & vanilla Part-10
Pallabi Roy على স্বপ্নীল ৬৮
M.D Mahabub على The_Villain_Lover Part_2
Labani sarkar على Dangerous_Villain_Lover part 23
MD Akas Apc على বিবেক
Tanisha Ahmed على Devil love part-18 
Aius Barmon shorob على নারীর দেহকে নয়
Chandan roy على স্বপ্নীল ৬৮
Chandan roy على স্বপ্নীল ৬৮
Riya Biswas على তুমি রবে ৬০
Priya Banerjee على devil love married life last part
Riya Biswas على তুমি রবে ৬০
Riya Biswas على তুমি রবে ৫২
Mohammad Adib على তুমি রবে ৬০
Avni Ayesha على তুমি রবে ২৮
গল্প পোকা على Love At 1st Sight Season 3 Part – 69
সুমিত على তুমি রবে ২৮
TANJIBA ZENIFAR على তুমি রবে ৫০
TANJIBA ZENIFAR على তুমি রবে ৫০
Samiah Begum على তুমি রবে ৫১
biddut das rocky على নর নারী
গল্প পোকা على নষ্ট গলি শেষ পর্ব
Md Jobayer Hossain Shohag على নষ্ট গলি পর্ব-৩০
গল্প পোকা على দুই অলসের সংসার
গল্প পোকা على মন ফড়িং ❤৪২.
A.J.S Rakib على মন ফড়িং ❤৪২.
গল্প পোকা على গল্পঃ ভয়
গল্প পোকা على গল্পঃ ভয়
গল্প পোকা على গল্পঃ ভয়
Samiya noor على গল্পঃ ভয়
Sadikul على গল্পঃ ভয়
Samia Islam على গল্পঃ ভয়
শূন্য মায়া على মন ফড়িং ❤ ৪০.
Sutapa biswas على মন ফড়িং ❤৩৯.
Foysal Mahmud على My_Mafia_Boss_Husband Part: 16
sutapa biswas على মন ফড়িং ❤ ৩৮.
sutapa biswas على মন ফড়িং ❤ ৩৭
Foysal Mahmud على My_Mafia_Boss_Husband Part: 16
Siyam على বিবেক
Sudipto Guchhait على My_Mafia_Boss পর্ব-৯
saptami karmakar على devil love married life last part
saptami karmakar على devil love married life last part
মায়া على মন ফড়িং ৩০.
মায়া على মন ফড়িং ৩০.
মায়া على মন ফড়িং ২৬.
Shreyashi Dutta على  বিয়ে part 1
Sandipan Biswas على  বিয়ে part 1
Paramita Bhattacharyya على অনুরাগ শেষ পর্ব
জামিয়া পারভীন তানি على নষ্ট গলি পর্ব-৩০
মায়া على মন ফড়িং  ২২
সুরিয়া মিম على খেলাঘর /পর্ব-৪২
গল্প পোকা على মন ফড়িং ২১
গল্প পোকা على নষ্ট গলি পর্ব-৩০
গল্প পোকা على Love At 1st Sight Season 3 Part – 69
গল্প পোকা على Love At 1st Sight Season 3 Part – 69
গল্প পোকা على খেলাঘর /পর্ব-৪২
Sahin ssb على মন ফড়িং ২১
মায়া على মন ফড়িং ২১
মায়া على মন ফড়িং ❤ ২০.
গল্প পোকা على মন ফড়িং ❤ ২০.
গল্প পোকা على খেলাঘর /পর্ব-৪২
গল্প পোকা على খেলাঘর /পর্ব-৪২
মায়া على মন ফড়িং ❤ ১৮. 
মায়া على মন ফড়িং ❤ ১৭.
Jannatul Ferdous على খেলাঘর পর্ব-৩৫
গল্প পোকা على মন ফড়িং ❤ ১৬. 
গল্প পোকা على ফাল্গুনের_ফুল last_part_8
মায়া على মন ফড়িং ❤ ১৬. 
গল্প পোকা على ছাত্রী যখন বউ পাঠঃ ১
গল্প পোকা على বাজির প্রেম পাঠঃ ১
Foujia Khanom Parsha على মা… ?
HM Ashraful Islam على অবুঝ_বউ পার্ট: ৮
HM Ashraful Islam على অবুঝ_বউ পার্ট: ৫
Ibna Al Wadud Shovon على স্বার্থ