#তুই_আমার_শেষ_ক্ষুধা(ফ্যান্টাসি রোমান্স)
#শারমিন_প্রিয়া
৫.
পৃথিবীর নিয়ম অনুযায়ী ভোর গিয়ে সকাল হয়। পাখিরা কিচিরমিচির করে ডাকে। আরশী সকাল বেলা উঠে রাস্তায় হাঁটতে যায়। কিছুদূর গিয়ে দেখে পাগলটা ঘাসের উপর লুঙ্গি বিছিয়ে কম্বল টেনে কাচুমাচু হয়ে শুয়ে আছে। দৃশ্যটা আরশীর ভেতরে লাগলো খুব। ঘাসের উপর শিশির জমে আছে। মানুষটার নিশ্চয়ই ঠান্ডা লাগছে। ইতস্তত করতে করতে সে ডাকল, “শুনছো, এই যে, তোমার ঠান্ডা লাগছে না?”
কম্বল সরিয়ে মুখ বের করল পাগলটা। এক গাল হেসে বলল, “আরে লাবনী! তুই আইছস? চোখ লাল কেন তোর? ঘুমাসনি?”
আরশী বলল, “তুমি উঠো। আমাদের বারান্দায় গিয়ে ঘুমাও। এখানে ঠান্ডা লাগবে।”
পাগলটা উঠে বলে, “যাব?”
“হ্যাঁ, যাবে।”
সঙ্গে সঙ্গে লুঙ্গি গুটিয়ে উঠে দাঁড়ালো সে। পথে যেতে যেতে আরশী হঠাৎ বলে উঠল, “আমরা খুব শীঘ্রই এখান থেকে চলে যাব। এখানে আর আসব না।”
পাগলটা থামে। আরশীর চোখের দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করে, “কোথায় যাবে তোমরা?”
“সেটা তো জানি না। মা জানে।”
“আচ্ছা, তুমি তো রাতে এখানে-সেখানে ঘুমাও। তোমার ভয় লাগে না?” পাগলটা দাঁত বের করে হাসল, বলল, “আমার যেখানে দিন, সেখানে রাত। আমার আবার ভয় কীসের? উপরওয়ালা আছেন তো।”
“তোমাকে কি বলে ডাকব? তোমার কোন নাম নেই?” আরশী জিজ্ঞেস করল।
পাগলটা কাঁধ ঝাঁকিয়ে বলে, “তোর যা মন চায় ডাক।”
“ভাই ডাকব?”
সে হো হো করে হেসে উঠল, “দূর লাবনী! আমাকে কি ভাইয়ের বয়সী মনে হয়? যা, তোর কিছু ডাকা লাগবে না।”
বাড়ির রাস্তায় এসে আরশীর চোখ গেল জঙ্গলের দিকে। সে পাগলটাকে বলল, “তুমি যাও, বাড়িতে গিয়ে ঘুমিয়ে পড়ো। আমি আসছি।”
আরশী জঙ্গলের আশপাশটা নতুন চোখে দেখে। সকালের পাখির শব্দে জঙ্গল মুখরিত। সূর্যের কিঞ্চিৎ আলো জঙ্গলের গাছগুলোর মাথা গিয়ে ছুয়েছে । আরশী এক পা বাড়িয়ে জঙ্গলের ভেতর ঢুকতে গিয়েও থেমে যায়। কেমন এক অনির্বচনীয় ভয় বুকের ভেতর ছোবল মারে তার। সে মুখ শক্ত করে বাড়ি ফিরে।
আরশী ভেবেছিল মা হয়তো পাগলটাকে তাড়িয়ে দেবেন। বাড়ি ফিরে দেখে পাগলটা বারান্দায় শুয়ে আছে। রুদ্রাণী উঠোনে মাটির চুলায় রান্না করছেন। আরশী অবাক হলো, এই প্রথমবার মা লোকটাকে বারণ করলেন না শুতে। তবে কি সত্যিই মায়ের পরিবর্তন হচ্ছে?
চুলায় আগুন হচ্ছে না। ধোঁয়া উড়ছে। ধোঁয়ায় ভরে গেছে উঠোনটা। রুদ্রাণী বারবার হাত নেড়ে ধোঁয়া সরিয়ে ফুঁ দিচ্ছেন চুলায়। আরশী কোমরে হাত রেখে দাঁড়িয়ে মাকে দেখে, যেন পৃথিবীর সবচেয়ে নির্ভেজাল মানুষটি তার মা। এরকম একজন মানুষ জ্যান্ত মানুষদেরকে রাক্ষসের মুখে ছেড়ে দিয়েছিল।এই কথা কি মেনে নেয়া যাবে? এটা আদৌ সত্যি?
আরশী দীর্ঘশ্বাস ফেলে ঘরে ঢুকে যায়। মাথা ভনভন করছে তার। গতরাত একফোঁটা ঘুমায়নি সে, সব একপাশে রেখে মাকে নিয়েই ভাবছিলো সারারাত। তার মায়ের কথাগুলো যদি সত্যি হয়, তাহলে মা যে অন্যায় করেছেন তা সাধারণ নয়। মানুষ খুন স্বাভাবিক হতে পারে না। কিন্তু এতকিছু তিনি যদি সত্যিই আমার জন্য করে থাকেন, তাহলে যেকোনো মায়ের দিক থেকে দেখলে তিনি আমাকে সত্যি স্নেহ করেন, ভালোবাসেন, স্বার্থপরভাবে। মায়ের যেমন এই পৃথিবীতে কেউ নেই আমি ছাড়া, আমারও মা ছাড়া পৃথিবীতে কেউ নেই। মাকে ত্যাগ করলে আমি থাকব কী করে?
মা বলেছেন, তিনি ভালো হয়ে যাবেন, নতুন জায়গায় বসবাস করবেন। আমি মায়ের সাথে সেখানে যাব। মা আর আমি থাকব। মায়ের চোখে আমার জন্য অনেক মমতা দেখেছি; মানুষের চোখ মিথ্যে বলে না। এইসব ভাবতে ভাবতে শেষমেষ সিদ্ধান্ত নিয়েছিল আরশী—মা যদি সত্যিই বদলাতে চান, আমি উনাকে ত্যাগ করব না। কিন্তু যদি কখনও আবার অন্ধকারে পা বাড়ান, তবে আমি মাফ করব না।
গতরাতের কথা ভাবতে ভাবতে চোখের পাতা ভারি হয়ে আসে আরশীর। সে আর চোখ খোলা রাখতে পারে না; গভীর ঘুমে তলিয়ে যায়।
এক সপ্তাহের ভেতর রুদ্রাণী শহরে নতুন বাসা ঠিক করলেন। এক সকালে তারা ট্রাকে মালপত্র বুঝাই করে নতুন বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা হলেন। আরশীর বারবার বুকে ধাক্কা লাগছিল, ছোট থেকেই সে এই জায়গায় হেসে খেলেই বড় হয়েছে। তার শৈশব কেটেছে এখানেই। এই বাড়ি, এই রাস্তা, এই ঘর, চিরচেনা উঠোন, গাছগাছালি সবকিছুর প্রতি তার অদ্ভুত টান। সব ছেড়ে যেতে তার খুব লাগছে। চোখে টলমল করছে পানি।
মাকে আস্তে করে জিজ্ঞেস করে, “আমাদের বাড়িটা কি হবে?”
রুদ্রাণী দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, “কি আর হবে? এভাবে পড়ে থাকবে। মন খারাপ করে লাভ নেই। ভালো কিছুর জন্য জায়গা ছাড়ছি। সময় লাগবে, ঠিক হয়ে যাবে সব। নতুন জায়গায় অভ্যস্ত হয়ে উঠবে।”
গাড়ি চলতে থাকল শা শা শব্দে। আরশী জানলার কাচে মাথা ঠেকিয়ে শেষবারের মতো সবকিছু দেখতে লাগল, তার বন্ধু-বান্ধব, স্কুল, বাড়িঘর; এগুলো ছেড়ে যেতে যেমন কষ্ট হচ্ছে। তেমনি অচেনা আগন্তুক পাগলটার জন্য ও তার সমান কষ্টে আছে। মনে হচ্ছে কোনো আপনজনকে ছেড়ে যাচ্ছে সে। টেনশন হচ্ছে, লোকটা কোথায় থাকবে? কী করবে? বাড়িটা ফাঁকা; যদি উঠোনে বা রাস্তায় শুয়ে পড়ে, যদি রাক্ষসরা তাকে খেয়ে নেয়?
চোখ বন্ধ করে সিটে হেলান দেয় আরশী। বাতাস জানলার ফাঁক দিয়ে ঢুকে তার চুল এলোমেলো করে দেয়। কয়েক গুচ্ছ চুল চোখে এসে পড়ে। রুদ্রাণী আরশীর চুলগুলো সরিয়ে একটি ক্লিপ দিয়ে বেঁধে দিলেন। মেয়ের মাথা নিজের কাঁধে রাখলেন। মাকে শক্ত করে ধরে আরশী আচমকা হু হু করে কেঁদে উঠল।
*******
নতুন বাসাটা তেমন একটা খারাপ নয়। একতলা বাড়ির দুটি সুন্দর রুম। রুমের সাথে ছোট বারান্দা, আলাদা রান্নাঘর। আশেপাশে বিল্ডিং আছে; মানুষজনের উপস্থিতি এখানে অনেকটা। সব মিলিয়ে এক ব্যস্ত শহুরে পরিবেশ।
রুদ্রাণী এখানের কলেজে আরশীকে ভর্তি করালেন। মোটামুটি ভালো দিন কাটে তাদের। তবু ওই ঘটনার পর থেকে মা-মেয়ের সম্পর্কের মাঝেই এক অদৃশ্য দেয়াল দাঁড়িয়েছে। রুদ্রাণী মাঝে মাঝে মেয়ের সঙ্গে গল্প শুরু করতে চান, কিন্তু আরশী প্রতিবারই সামান্য দূরত্ব রেখে কথা বলে। রুদ্রাণী বুঝেন মেয়ের অভিমান এখনো কাটেনি। তিনি মনে করেন, সময়ই সব ঠিক করবে। যখন মেয়েটি দেখবে আমি সত্যি বদলে গেছি, তখন সব ঠিক হয়ে যাবে।
এক মাঝরাতে ঘুম ভাঙে আরশীর। রাত যত গভীর হয়, মানুষের ফেলে আসা কথা মনে পড়ে ভীষণ করে। আরশীর ও তেমন পুরোনো বাড়ির কথা মনে পড়ে।সব মিলিয়ে মনটা ব্যাকুল হয়ে ওঠে তার। ছটফট করে সে। একপর্যায়ে অসহ্য হয়ে শোয়া থেকে উঠে বেলকনিতে গিয়ে দাঁড়ায়।
শান্ত শহর। জোনাক-পোকার মতো টিমটিম আলো জ্বলছে বিল্ডিংগুলোতে। দূর থেকে মাঝেমাঝে গাড়ির হর্ণ শোনা যাচ্ছে। আকাশ আধো আলো-আধো অন্ধকার। তবু রাতটা আরশীর ভালো লাগছে। সে বেলকনির রেলিং ধরে ভাবুক দৃষ্টিতে তাকায় দূর বহুদূর। চোখ ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে নিচে তাকালে চমকে উঠে সে, কে যেন গুটিগুটি মেরে শুয়ে আছে গেটের পাশে। চট করে আরশীর মনের ভেতর আসে, এভাবে তো ওই পাগলটাই শুয়ে থাকতো! কিন্তু এখানে, এতদূর, সে কী করে এসেছে? মাথা নেড়ে নিজেকে বোঝায় আরশী, “দুনিয়ায় কি আর কোন পাগল নেই নাকি? কি সব ভাবছি!”
আরশী রুমে ফিরে যেতে উদ্যত হয় তখনি হঠাৎ চেনা সুরেলা কণ্ঠ ভেসে আসে—
“ও মন ঘুমাইও নারে, নাম জপো মাওলার…
একদিন ঘুমাইবা রে মন, কবরের মাজার…”
আরশীর শরীরে কাঁপন ধরে। স্তব্ধ হয়ে যায় সে। খুব ধীরে ঘাড় ঘুরিয়ে নিচে তাকায়, লোকটা বসে আছে। রাস্তার হেডলাইটের আলোয় স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে লোকটার মুখ। ভুল হওয়ার উপায় নেই—এ সেই পাগলটাই। কিন্তু এতদূর পাগলটা কীভাবে এসেছে? আতঙ্ক ভর করে আরশীর মনে। এই প্রথমবার আরশীর মনে হলো, ইনি কি আদৌ পাগল? আমাদেরকে কি উনি চোখে-চোখে রাখছেন? আরশী একবার নিচে নামতে চাইলো, পরে ভয়ে নামা হয়নি।
সকালে খেতে বসে সে মাকে বলল, “মা, ওই পাগলটাকে আমি দেখেছি। আমাদের আগের জায়গায় যে ছিল।”
রুদ্রাণী চমকে ওঠেন, “কোথায়?”
“গেটের বাইরে। রাতে শুয়ে থাকতে দেখেছি। মানুষটা এখানে কী করে এসেছে, মা?”
রুদ্রাণী কোমল কণ্ঠে বললেন, “কি করে বলব সোনা? তোমার রাতে ওখানে যাওয়ার কি দরকার ছিল? ঠাণ্ডা পড়ছে, ঠাণ্ডা লাগবে। আর হ্যা, ভয় পেয়ো না। পাগলরা সারা দুনিয়া ঘুরে বেড়ায়। তোমাকে ভালো চিনেছে সে, তুমি যত্ন করতে। তাই হয়তো পেছন পেছন চলে এসেছে।”
আরশী কলেজ যাওয়ার পথে ওই পাগলটাকে খুঁজলো রাস্তায়, কিন্তু কোথাও আর দেখতে পেল না।
চলমান….!
