গল্পঃ #পরের_মেয়ে
লেখিকাঃ #মিশু
পর্বঃ (২ ও শেষ)
সেদিন নানীশাশুড়ীর মুখে বলা “পরের মেয়ে” শব্দটা আমার মনে গভীর দাগ কেটে গিয়েছিল। মনে–প্রাণে প্রতিজ্ঞা করেছিলাম—এই পরিবারের প্রত্যেকটা মানুষের কাছে আমি আপন মেয়ের মতো হতে না পারলেও, কখনো পরের মেয়ে হবো না।
এই কথা মুখে নয়, আমার কাজ দিয়েই প্রমাণ করবো।
আলহামদুলিল্লাহ, সময় তার নিজ গতিতেই চলতে থাকলো।
শ্বশুরের সেই কথার পর বাড়িটা কিছুদিন বেশ চুপচাপ ছিল। নানীশাশুড়ী চলে গিয়েছিলেন, দাদীশাশুড়িও ধীরে ধীরে নীরব হয়ে গেলেন। তবে কথা পুরোপুরি থামেনি। সুযোগ পেলেই খোঁচা, ইশারা, তাচ্ছিল্য—সবই ছিল।
কিন্তু ততদিনে আমি শিখে গেছি—
সব কথার জবাব মুখে দিতে নেই।
কিছু জবাব সময় নিজেই দেয়।
স্বামী প্রবাসে থাকলেও আমাদের নিয়মিত কথা হতো। আমি কখনো তার কাছে অভিযোগ করিনি। শুধু বলতাম—
— “আমি ভালো আছি। আর তোমার পরিবারকেও ভালো রাখার চেষ্টা করছি।”
আমি তাকে মিথ্যে বলতাম না, আবার সব সত্যও বলতাম না। সংসারের ভালো চাইলে সব সত্য বলা যায় না—এই বাস্তবতা আমি ততদিনে ভালোই বুঝে গিয়েছিলাম।
সংসার চলতে লাগলো—
কখনো হাসি, কখনো কান্না, কখনো অভিমান।
শাশুড়ির সাথে বহুবার মনোমালিন্য হয়েছে। রাগ করে কথা বলিনি, আবার রাতের বেলা জ্বর এলে আমিই মাথায় পানি দিয়েছি, সেবা করে সুস্থ করে তুলেছি।
শ্বশুর অসুস্থ হলে ওষুধের সময় ভুলিনি।
দাদীশাশুড়ির পা ব্যথা করলে আমিই মালিশ করেছি, সময়মতো খাবার দিয়েছি।
এর মাঝেই আশেপাশের অনেকেই বলতো—
— “এতো কিছু করো কেন? ওরা তো তোমাকে আপন করে নেয় নি।”
আমি চুপচাপ থাকতাম। মনে মনে ভাবতাম—
সব কাজ তো আপন হবার জন্য নয়,
কিছু কাজ দায়িত্ব থেকেও করা দরকার।
একবার শাশুড়ি খুব অসুস্থ হয়ে পড়লেন। তীব্র শ্বাসকষ্টে অবস্থা এমন হয়ে গেল, মনে হচ্ছিল হয়তো তাকে বাঁচানোই যাবে না। সবাই ঘাবড়ে গিয়েছিল। সেদিন আমি একাই মাথা ঠান্ডা রেখে সব ব্যবস্থা করে হাসপাতালে নিয়ে যাই। যাওয়ার সময় তার মাথায় হাত বুলিয়ে বলেছিলাম—
— “মা, ভয় পাবেন না। আমি আছি।”
সেই রাতে তিনি প্রথমবার আমার হাত শক্ত করে ধরেছিলেন। অসুস্থতার মাঝেও তার চোখে আমি নিজের মানুষদের থেকেও বেশি বিশ্বাস দেখেছিলাম আমার প্রতি। আল্লাহর রহমতে সেবার তিনি সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরলেন।
সেদিন নানীশাশুড়ী আমার হাত ধরে কেঁদে বলেছিলেন,
— “ঋতু, দেখিস তোর অনেক ভালো হবে। মন থেকে দোয়া করি। আল্লাহ তোকে সব বালা-মুসিবত থেকে দূরে রাখুক।”
আমি মুচকি হেসে তার চোখ মুছিয়ে জড়িয়ে ধরেছিলাম। সেদিন বুঝেছিলাম—তার কাছে এখন আমি তার অনেক আপন মানুষের থেকেও বেশি আপন।
সময় আবার চলতে শুরু করলো।
কয়েক বছর পর স্বামী দেশে ফিরলো। আমাকে সবকিছু দক্ষতার সাথে সামলাতে দেখে উঠানে দাঁড়িয়ে হেসে বলেছিল—
— “ঋতু, জানো আমার জীবনের সবচেয়ে বড় পাওয়া কী?”
আমি সহজভাবে বলেছিলাম—
— “কী?”
সে বলেছিল—
— “তোমাকে আমার সহধর্মিণী হিসেবে পাওয়া।”
সেদিন তার চোখে এমন বিশ্বাস আর ভালোবাসা দেখেছিলাম, যা আর কারো জন্য দেখিনি। এর চেয়ে বড় পাওয়া একটি মেয়ের জীবনে আর কী হতে পারে?
এরপরও আমাদের ঝগড়া হয়েছে, অভিমান হয়েছে, কখনো কয়েকদিন কথা বন্ধ থেকেছে।
কিন্তু একটি কাজ আমি কখনো করিনি—
এই সংসার ছেড়ে যাওয়ার কথা ভাবিনি।
কারণ আমি জানতাম, পালিয়ে গেলে দোষটাই আমার ঘাড়ে চাপবে—
“পরের মেয়ে তো তাই পারে।”
কিন্তু সময় প্রমাণ করেছে, দায়িত্ব আর ভালোবাসা আলাদা করে বলে কিছু হয় না—
দুটো একসাথেই মানুষকে আপন করে তোলে।
আজ আমি দুই বাচ্চার মা।
এই উঠানেই আমার সন্তানেরা খেলে,
এই ঘরেই আমার হাসি-কান্না জমে থাকে।
এই সংসারের সুখ–দুঃখে আমার নাম জড়িয়ে গেছে অদৃশ্য সুতোয়।
আজ আর কেউ আমাকে আলাদা করে পরিচয় দেয় না।
কেউ বলে না— “পরের মেয়ে”।
কারণ আমি জায়গা নিয়েছি ছাড় দিয়ে নয়,
নিজের দায়িত্ব, ধৈর্য আর নীরব ভালোবাসা দিয়ে।
আজ আমি জানি—
আমি কারো পরের নই।
আমি এই সংসারেরই একজন।
পরের বলে ডেকেছিল সবাই একদিন যারে, আজ সেই মেয়েই শেকড় হয়ে জড়িয়ে আছে ঘরে।
~ সমাপ্ত ~
