গল্পঃ #পরের_মেয়ে
লেখিকাঃ #মিশু
পর্বঃ (১)
বিয়ের ১ মাসের মাথায় স্বামী পাড়ি জমায় প্রবাসে। বয়স আমার তখন সবে ষোল। নবম শ্রেনিতে পড়ি। ওই যে কথায় বলে না নাইনে লাইন হয়… কিন্তুু আমার জীবনে লাইন হওয়ার আগেই শশুরবাড়ির রাস্তা দেখিয়ে দিয়েছিল বাবা-মা। অবশ্য বিয়ের ১ম একমাস স্বপ্নের মতোই কেটেছিল। কিন্তুু স্বপ্ন থেকে বাস্তবতার মাটিতেই পা দিয়েছিলাম স্বামীর চলে যাওয়ার সাতদিনের মাথায়।
দিনটা ছিল শুক্রবার। আমার শ্বশুর বাড়ির সামনে ছিল বিশাল বড় উঠান। শীতকালে পাড়ার ছেলেরা সারাদিন খেলে সেখানে। আমি অনেক সময় তাকিয়ে থাকতাম সেদিকে। বলে রাখি আমার দুই দেবর। ওরাও খেলতো। সেইদিন উঠান টা ফাকা ছিল। বাড়িতেও কেউ ছিলোনা ছোট দেবর বাদে। সময়টা ছিলো মাগরিবের একটু আগমুহূর্ত।
তো হঠাৎ কি মনেকরে মেঝো দেবরের রেকেট হাতে নিয়ে ছোট দেবরকে বললাম আয় রেকেট খেলি। আমার ছোট দেবর অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলো আপনি রেকেট খেলতে পারেন?
আমি হেসে বললাম, পারবো তুই চল।
ছোট দেবরের নাম রাফি। তখন ও ফাইবে পড়ে। বয়স ১০ বছর। খেলতে তেমন পারেনা।
এইদিকে বিয়ের আগে আমি ক্যারাম,লুডু আর ব্যাডমিন্টন খেলায় খুব ভালো ছিলাম। যদিও এই প্রতিভাগুলো বিয়ের পর লুকানোই ছিল।
তো খেলার একটা পর্যায়ে ধাম করে আমার শশুর সামনে এসে পড়ে।
শশুরকে দেখামাত্র আমি লজ্জা আর ভয়ে দৌড় দিতে গিয়ে পাশের ইঁদু’রের গর্তে পা গিয়ে পরে যাই।
মুহুর্তে যেনো চারিদিক অন্ধকার হয়ে যায়। ভীষণ ব্যথা, লজ্জা ভয় একসাথে আমাকে গ্রাস করে।শ্বশুরমশাই ও হয়তো বুঝতে পারে তাই কিছু না বলে শ্বাশুড়িকে ডাকতে বের হয়। আমি কোনোমতে উঠে কলপাড়ে গিয়ে পানি দিতে থাকি পায়ে।
এরমধ্যে শ্বাশুড়ি, ফুপু শ্বাশুড়ি, ফুপাতো ননদ, পাশের বাড়ির কয়েকজন, দাদি শ্বাশুড়ি সব চলে আসে। একেকজন একেক রকম মুখ বানিয়ে হাজারটা কথা বলে। যেন মনে হয় আমি বিশাল বড় অপরাধ করে ফেলেছি। সবার কথায় আমি ভয় পেয়ে কেঁদেই ফেলি। তখনি আমার মেঝো দেবর আসে৷ ও আমার চেয়ে বয়সে ছয়সাত বছরের বড় হবে । ও এসেই দেখে এই পরিস্থিতি। সবকিছু বুঝে সবাইকে বকা দিয়ে সরিয়ে দেয়।আর চিৎকার দিয়ে বলে একটা মানুষ মরে যাচ্ছে আল্লাহ জানে ভে/ঙে গেছে নাকি আর তোরা ওকেই কথা শুনাচ্ছিস। আগে ঠিক হোক পরে কথা বলিস।দেবরের কথা শুনে সবাই থেমে যায় কারণ সবাই জানে ও কি রাগী। একটুপর আমার শ্বাশুড়ি দেখে আমার পা অনেক খানি ফুলে গেছে।কোনোভাবে পা মাটিতে ফেলতে পারছিনা।তখন আমাকে ডাক্তার এর কাছে নিয়ে গেলো। এক্সরে করে দেখা গেলো ভেঙে যায় নি কিন্তুু হার ফেটে গেছে। ডাক্তার প্লাস্টার করে দিলো এবং পনেরোদিনের রেস্ট দিলো।
বাড়ি আসার পর আমার হাসবেন্ড কে জানানো হলো৷ আমার নানি শ্বাশুড়ি কল দিয়ে আমার সামনে স্বামী কে বললো, আল্লাহ বিচার করছে। কোন ঘর থেকে আনছিস এই মেয়েকে? মা- বাপ শিক্ষা দেয় নি বেডা মানুষের সাথে লাফালাফি করে খেলে?
কথাটা শুনে আমার মনে হয় আমি লজ্জায় ম/রে যাই।
পরে আমার হাসবেন্ড আমার বাবাকে বলে আমাকে নিয়ে যেতে। পরেরদিন বাবা আমাকে নিয়ে যায়। কিন্তু আমি মনেমনে ভাবী আচ্ছা শ্বাশুড়ি মা তো চাইলেই ব্যাপারটা নরমাল করতে পারতো। কিন্তু কিছুই করলেন না। উনি ওনার মা ও শ্বাশুড়ির ওপর কথাই বললেন না।। যদি আমার জায়গায় ওনার মেয়ে থাকতো? মনের প্রশ্ন মনেই থাকলো। সেদিন সারারাত যে কিভাবে কাটালাম আল্লাহ মাবুদ জানে। হাসবেন্ড অবশ্য বার বার মেসেজ দিয়ে বলছিলো ধৈর্য ধরো সকালে আব্বা তোমাক নিয়ে যাবে।তারপর পরেরদিন সকালে আব্বা আমাকে নিয়ে যায়। আল্লাহর রহমতে আমি ঠিক হয়ে যাই। প্রায় একমাস পর আবার শ্বশুর বাড়ি ফিরি।কিন্তুু এইখানে কিছুই বদলাই নি। সবাই এখনো একমাস আগেই পরে আছে। সবাই সুযোগ পেলেই ঘটনাটা তুলে আমাকে লজ্জায় ফেলে। এরই মধ্যো একদিন নানী শাশুড়ী আসেন বেড়াতে। আমাকে দেখেই বলে, কি রে নাতি বউ তা মেয়েছেলের মতো খেলাধুলার ভূত মাথা থেকে নেমেছে তো? শুনো বাপু বড় তো কম হও নি এখন সংসারে মনোযোগ দাও। বাড়ির বউ তুমি। বউয়ের মতো থাকতে হবে তো?
আমি চুপচাপ মাথা নিচু করে শুনছিলাম। দাদীশাশুড়ী ও নানীশাশুড়ীর সাথে সাথ দিচ্ছিলো। দুইজনেই নানা ভাবে কথা শুনাচ্ছিল… এরমধ্যে হঠাৎ আমার শ্বশুর বলে ওঠে, ও মা ঋতু রেকেট টা নিয়ে আসো তো। আজকে আমি ও রেকেট খেলবো তোমার সাথে।
শশুরমশাইয়ের কথা শুনে আমার চোখে পানি চলে আসলো। আমি বসা থেকে ওঠতে পারলাম না। বাবা আবারো বলে উঠলো, ঋতু আমার পুতের বউ না ও আমার মেয়ে। আর মেয়ে বাপের বাড়ি খেলবে, খাবে, ঘুমাবে, কারো সমস্যা থাকলে সে যেনো চোখ বন্ধ করে থাকে।আমার বউমা কি বুড়ি নাকি যে সবসময় বসে থাকবে? মা ঋতু আজকে থেকে তোমার যখন মন চইবে তখন খেলবে কোনো সমস্যা নেই। যার সমস্যা হবে তাই চলে যেতে পারে।
এই বলেই বাবা হনহন করে বের হয়ে যায়। নানী শাশুড়ী বিরবির করে বলে, দেখবো কতদিন এই জোড় থাকে। এক গাছের ছাল আরেক গাছে লাগে না পরের মেয়ে ও কখনো আপন হয় না বুঝছো?
চলবে……….
