#আম্মাজান (০২) শেষ পার্ট
#সানা_শেখ
কথা বলার এই পর্যায়ে এসে পরের কথাগুলো বলতে দীর্ঘ বিরতি নেয় বাদশা। বাদশার ফরসা চেহারা লাল হয়ে আছে। চোখ দু’টোতে জমে আছে র’ক্ত। চোয়াল শক্ত, চোখ দুটো পানিতে টুইটুম্বর। কথাগুলো বলতে গিয়ে অনেকবার কন্ঠস্বর কেঁপে কেঁপে উঠেছে।
টিস্যু পেপার দিয়ে চোখের পানি মুছে সামনে আর আশেপাশে বসে থাকা সকলের দিকে তাকায়। সবাই ওর মুখের দিকে তাকিয়ে আছে পরের কথাগুলো শোনার আগ্রহে শুধু একজন বাদে। সে মাথা নিচু করে বসে আছে সকলের মধ্যে।
বাদশা কিছুক্ষণ পলকহীন তাকিয়ে থাকে মাথা নিচু করে বসে থাকা রমণীর দিকে। যেই রমণীকে বাদশা জায়গা দিয়েছিল নিজের জীবনে, মায়ের পর ভালোবেসেছিল এই নারীকে। যার হাত ধরে পার করতে চেয়েছিল পুরোটা জীবন। যার সঙ্গ চেয়েছিল মৃত্যুর আগ মুহূর্ত পর্যন্ত।
বাদশা শ্বশুরের দিকে তাকায়। ধীর স্বরে বলে,
“আমি যেই মায়ের র’ক্ত পানি করে ইনকাম করা টাকায় খেয়ে পরে এত বড়ো হয়েছি এখন আমি সেই মায়ের বুকে কীভাবে লাথি দেব? এটা সম্ভব? আপনারাই বলুন।”
সবাই চুপ করে থাকে। বাদশা ওর স্ত্রী রিনির দিকে তাকিয়ে বলে,
“রিনিকে আমি ভালোবেসে বিয়ে করেছিলাম। ওর সঙ্গে সম্পর্কে জড়ানোর আগেই আমি আমার আম্মার সম্পর্কে ওকে বলেছিলাম। আমি আমার আম্মাকে কোনোদিন আমার কাছ ছাড়া করবো না। আম্মা যতদিন দুনিয়ায় আছেন আমার সঙ্গেই থাকবেন। ও বলেছিল আম্মাকে নিয়ে ওর কোনো সমস্যা নেই কিন্তু বিয়ের বছর পেরোনোর আগেই আম্মাকে নিয়ে ওর হাজারটা সমস্যা তৈরি হয়ে যায়। আমি আপনাদের বলেছিলাম ওকে বোঝানোর জন্য আপনারা কী বুঝিয়েছেন আমি জানিনা। ওকে আমি ছোটো একটা বাচ্চার মতো করে বুঝিয়েছি। হাত ধরে, মাথায় হাত বুলিয়ে কতভাবে বুঝিয়েছি হিসেব নেই। ও কোনো বুঝ মানেনি, ওর একটাই কথা তোমার মাকে বৃদ্ধাশ্রমে রেখে আসো নয়তো অন্য কোথাও রেখে আসো, আমি ওনার সঙ্গে থাকতে পারবো না।
ও কতবার আমার আম্মাকে অপমান করেছে হিসেব নেই। আম্মা কোনোদিন আমাকে ওর নামে কিছু বলেনি। আমার আম্মাজান বরাবর সহজ সরল মানুষ। আমাকে খাওয়ানো, পরানো, ভালো রাখা আর বড়ো করা ছাড়া ওনার কোনো স্বপ্ন ছিল না। রিনি প্রায় সময় আমার আম্মাজানের ত্বক আর গায়ের রঙ নিয়ে কথা বলে, নাক সিটকায়, ওর ফ্রেন্ডদের সামনে ছোটো করে কথা বলে। আমার আম্মাজান যদি ওর মতো মাসে মাসে পার্লারে যেতেন নিয়মিত রূপ চর্চা করতেন কোনো কাজ না করে পায়ের উপর পা তুলে বসে থাকতেন তাহলে ওর চেয়ে শত গুণ সুন্দরী থাকতেন এখনও। আমার আম্মা বয়সের ভারে নুয়ে পড়েননি, খেয়ে না খেয়ে কাজ করতে করতে এমন হয়েছেন।
আমি যেদিন আম্মাকে বলেছিলাম আমি একটা মেয়েকে ভালোবাসি ওকে বিয়ে করতে চাই আম্মা বলেছিলেন তুমি সংসার করবা, তুমি যারে পছন্দ করো তারেই বিয়া করো আমার কোনো আপত্তি নাই।
যেদিন বিয়ের ডেট ফিক্সড করতে এসেছিলাম আম্মা রিনিকে দেখে টু শব্দও করেননি। একবারও বলেননি তুমি উজ্জ্বল ফরসা হয়ে কেন এক শ্যামবর্ণের মেয়েকে বিয়ে করবে। আমি যখন আম্মাকে জিজ্ঞেস করেছিলাম মেয়ে পছন্দ হয়েছে কি-না আম্মা বলেছিলেন তুমি যারে পছন্দ করো আমার তারেই পছন্দ।
বিয়ের পর থেকেই রিনির অভিযোগ শুরু। তোমার মা অশুদ্ধ ভাষায় কথা বলে। ক্লাস চেনে না। ফ্যাশন সেন্স নেই। কেমন সেজে থাকে। স্কিন কেমন। গাইয়া স্বভাব রয়ে গেছে এখনও। তোমার মাকে আমি আমার বন্ধুদের সামনে পরিচয় দিতে লজ্জা পাই। আমার রিলেটিভরা দেখলে হাসাহাসি করে ব্লা ব্লা আরও কত কিছু বলে শেষ করা যাবে না।
রিনিকে বিয়ে করেছি দুই বছর। দুই বছরে আমি দু’বারও রিনির হাতের রান্না খাইনি। আমি জানিই না ওর হাতের রান্নার স্বাদ কেমন। ও আমাকে এখন অব্দি এক কাপ চা কফি বানিয়ে খাওয়ায়নি। বললেও কখনও করে দেয়নি। আমার আম্মা এখনও তিন বেলা রান্না করে আমাদের খাওয়ান। আমি তো সকালে খেয়ে বেরিয়ে যাই আবার রাতে ফিরে এসে খাই। রিনি দুপুরে ঠান্ডা খাবার খায় না, গরম করে দিলে পছন্দ করে না তাই ওর জন্য আম্মা দুপুরে রান্না করে দেন। আম্মা দুই বছরে একবারও অভিযোগ করেননি রিনি কেন কোনো কাজ করে না?
খাওয়া ঘুম আর ঘুরা ফেরা ছাড়া রিনি একটা কাজেও কোনোদিন হাত লাগায়নি, তাতে আমার বা আম্মার কোনো অভিযোগ নেই। আমি ওকে কাজ করানোর জন্য বিয়ে করিনি। বুয়া রাখা হয়েছে, বুয়া ধোয়া মোছার কাজ করে দেয় বাকি সব আম্মা করেন। কাজ করার অভ্যাস তো, কাজ না করে বসে থাকতে পারেন না।
রিনি প্রতিনিয়ত আমার সঙ্গে রাগারাগি করতো আম্মাকে বৃদ্ধাশ্রমে রেখে আসার জন্য। ও আম্মার সঙ্গে কিছুতেই থাকবে না। ওর জন্য আমার আম্মা কতবার কেঁদেছেন হিসেব নেই। ওকে এত এত বুঝিয়েছি যে বোঝাতে বোঝাতে আমি নিজেই ক্লান্ত হয়ে গিয়েছি। আম্মা তো কোনোদিন ওকে কিছু বলেননা। কী করলো না করলো দেখেনও না, কোনোদিন কোনো কিছু নিয়ে প্রশ্নও করেননি ওকে।
আমি তবুও সব কিছু মানিয়ে নিয়ে থেকেছি ওর সঙ্গে যেহেতু বিয়ে করেছি ফেলে তো দিতে পারিনা। মা মায়ের জায়গায় বউ বউয়ের জায়গায়। আম্মা ওর সামনেই আসা বন্ধ করে দিয়েছিলেন ও আম্মাকে পছন্দ করে না বলে।
আম্মা আমাকে অনেকদিন বলেছিলেন ওনাকে বৃদ্ধাশ্রমে রেখে আসার জন্য। ওনার ওখানে থাকতে কোনো কষ্ট হবে না।
মিথ্যে বলবো না, রাগের মাথায় একদিন রিনির গায়ে হাত তুলে ফেলেছিলাম, নিজের ভুল বুঝতে পেরে তখনই আবার ওর কাছে মাফ চেয়েছিলাম।
আমার জীবনের সবচেয়ে বড়ো ভুল আপনার মেয়েকে বিয়ে করা। আমি জীবনে প্রথম কোনো ভুল করে থাকলে সেটা করেছি রিনিকে আমার জীবন সঙ্গিনী হিসেবে বেছে নিয়ে।
ওর জন্য আমার আম্মাজান কষ্ট পেয়েছে। ও আমাকে ঠকিয়েছে, আমার বিশ্বাস ভেঙেছে। যাক সেসব কথা। ও আমার সঙ্গে থাকতে চাইছে না, আমারও থাকার ইচ্ছে নেই। ও অন্য কারো প্রেমে পড়েছে, অন্য কাউকে ভালোবাসে, অন্য কাউকে বিয়ে করতে চাইছে। আমি ওকে আপনাদের কাছ থেকে নিয়ে গিয়েছিলাম, আজকে ওকে আপনাদের কাছেই ফিরিয়ে দিয়ে যাচ্ছি। আরও আগেই দিয়ে যেতাম ডিভোর্স পেপারের জন্য দেরি হয়েছে এতদিন। ওর প্রতি আমার আর কোনো মায়া নেই, ও আমার মন থেকে উঠে গেছে চিরতরে। আমার এই সিদ্ধান্ত হঠাৎ নয়, ধীরে ধীরে জমে ওঠা যন্ত্রণার স্বাভাবিক বিস্ফোরণ।”
বাদশা একটু থামে আবার। শ্বশুরের দিকে তাকিয়ে বলে,
“আপনি জিজ্ঞেস করলেন না, আমি আপনার মেয়েকে কেন তালাক দিতে চাইছি, এই সবই ওকে তালাক দেওয়ার কারণ। আরও অনেক কথা ঘটনা আছে সেসব নাই বললাম। রিনি প্রথম যেদিন আমার আম্মাজানকে বৃদ্ধাশ্রমে রেখে আসতে বলেছিল সেদিন থেকেই ও একটু একটু করে আমার মন থেকে উঠে যেতে শুরু করেছিল। আমার আম্মাজানের অসম্মান মানেই নিজের শিকড় উপড়ে ফেলা।
আমি সুস্থ মস্তিষ্কে আপনাদের সাক্ষী রেখে রিনিকে তালাক দিচ্ছি, এক তালাক, দুই তালাক, তিন তালাক।”
বাক্য হারা হয়ে সবাই তাকিয়ে আছে বাদশার দিকে। বাদশা নিজের সঙ্গে আনা ছোটো ব্যাগের ভেতর থেকে এক হাজার টাকার পাঁচটা বান্ডিল বের করে টি টেবিলের ওপর রেখে বলে,
“এই যে দেনমোহরের টাকা।”
ডিভোর্স পেপার বের করে রিনির দিকে এগিয়ে দিয়ে বলে,
“নিন, সাইন করে দিন।”
রিনি এতক্ষণে এসে মুখ তুলে তাকায় বাদশার দিকে। বাদশা নিচের দিকে তাকিয়ে আছে।
রিনি ডিভোর্স পেপার হাতে নিয়ে চুপচাপ সাইন করে দেয়। বাদশা নিজেও সাইন করে বসা থেকে উঠে দাঁড়ায়।
বাইরের দিকে পা বাড়িয়ে বলে,
“আসছি, ভালো থাকবেন সবাই।”
সবাই পেছন থেকে তাকিয়ে দেখে বাদশার চলে যাওয়া।
বাদশা দৃষ্টি সীমানার বাইরে চলে যেতেই রিনির বাবা প্রচণ্ড রাগে হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে ঠাস করে চড় বসিয়ে দেন রিনির গালে। চড় খেয়ে একদিকে হেলে পড়ে রিনির মাথা।
“বের হ আমার বাড়ি থেকে, তোর মুখ আমি আর কোনোদিন দেখতে চাই না। জীবনে আর কোনোদিন আমার সামনে আসবি না তুই। তোর মতো মেয়ের প্রয়োজন নেই আমার। আজকে থেকে আমার মেয়ে ম’রে গেছে। যা বের হ।”
রিনির বড়ো ভাই বলে,
“বাদশার মতো ছেলে হাজারে একটা হয়। বাদশার মা মাটির একজন মানুষ। ওই বাড়িতে গেলে আন্টি বাবা ছাড়া একটা ডাক দিতেন না। কথায় আছে কু’ত্তা’র পেটে ঘি হজম হয় না, ওর বেলায়ও তেমনই হয়েছে। বেশি সুখ পেয়ে হজম হয়নি।”
রিনির বাবা কাপড়ের স্যুটকেস আর দেনমোহরের টাকা রিনির হাতে ধরিয়ে দিয়ে দরজার দিকে ঠেলে দেন ঘাড় ধরে। রাগে চিৎকার করে বলেন,
“জীবনে আর কোনোদিন এই বাড়িতে ফিরে আসলে জ’বা’ই করবো তোকে।”
______________
বাদশা নিজের ফ্ল্যাটে ফিরে আসে। জব হওয়ার পর মাকে নিয়ে ফ্ল্যাটে উঠেছিল। বিয়ে করার পর রিনিকে এনেছিল দু’জনের ছোট্টো সংসারে।
ভেতরে এসে ড্রয়িং রুম ফাঁকা দেখতে পায়। পা বাড়ায় মায়ের রুমের দিকে। রুমে এসে দেখে ওর মা বিছানায় বসে জানালা দিয়ে বাইরের দিকে তাকিয়ে তাসবীহ পাঠ করছেন।
বাদশা ধীর পায়ে হেঁটে এসে মায়ের পাশে লম্বা হয়ে শুয়ে পড়ে। মৃদু স্বরে ডাকে,
“আম্মাজান।”
বাদশার আম্মা বাদশার চুলের ভাঁজে হাত গলিয়ে বলেন,
“আইয়া পড়লা কেন, বাদশা?”
“আম্মাজান।”
“আব্বাজান, তোমার কী মন খারাপ? কী ওইছে? বউরে রাইখা আইলা কেন?”
“ওকে সারা জীবনের জন্য রেখে এসেছি, আম্মাজান।”
আতকে ওঠেন বাদশার আম্মা। অবাক হয়ে বলেন,
“কেন, বাবা? বউরে রাইখা আইছ কেন?”
“তালাক দিয়ে দিয়েছি ওকে।”
“আল্লাহ গো, কী কও এইসব, বাজান? তালাক দিলা কেন?”
বাদশা চুপ করে থাকে। কিছুক্ষণ পর উঠে বসে মায়ের কাঁধে মাথা রেখে মায়ের এক হাত মুঠো করে ধরে বাইরের দিকে তাকিয়ে বলে,
“সরি, আম্মাজান। আমার জন্য তুমি অনেক কষ্ট পেয়েছ। আমি ভুল মানুষকে এনেছিলাম।”
“এই জন্যে তুমি বউরে তালাক দিবা?”
“আরও একটা কারণ আছে, আম্মাজান।”
“কী কারণ, বাজান?”
“রিনি পর’কী’য়ায় জড়িয়ে গিয়েছিল। তুমি আমি বুঝতেই পারিনি কিছু। এমনিতেই ওর উপর থেকে মন উঠে গিয়েছিল তোমার সঙ্গে বাজে ব্যবহার করায়, তারপর আবার এই কথা জানার পর যা একটু ছিল সেটুকুও উঠে গেছে।”
বাদশার মা কী বলে ছেলেকে সান্তনা দেবেন বুঝতে পারলেন না। বাদশা এক হাতে মাকে জড়িয়ে ধরে বলে,
“আম্মাজান, ভালোবাসি তোমায়।”
(সমাপ্ত)
