#আম্মাজান (০১)
#সানা_শেখ
“আমার যেদিন জন্ম হয় তার ঠিক আগের দিন আমার আব্বা মা’রা যান। সময়টা ১৯৯৮ সাল। আমার আম্মার বয়স তখন মাত্র পনেরো। যেই বয়সে জীবন রঙিন স্বপ্ন দেখে, মন আর দেহ রঙিন পোশাকে সাজে সেই বয়সে আমার আম্মা গায়ে জড়িয়েছিল সাদা শাড়ি। বিয়ের এক বছরের মাথায় হয়েছিল বিধবা। স্বামী হারিয়ে সন্তানকে আঁকড়ে ধরে বাঁচতে শেখে নতুন করে।
আমাকে নিয়ে আমার আম্মা অনেক কষ্টে দিন পার করেছেন। স্বামী বেঁচে নেই, দেখভাল করার জন্য বড়ো ভাই বা বাবাও ছিল না। বাধ্য হয়েই ছেলেকে নিয়ে শ্বশুরবাড়িতে থাকতে হয়েছে। শ্বশুরবাড়ি ছাড়া মাথা গোঁজার কোনো ঠাঁই ছিল না। আমার দাদার বাড়িতে ছিল যৌথ পরিবার। সংসারে রোজগার করার মতো ছিল দুই কাকা।
আমার আম্মা দ্বিতীয় বিয়ে করার কথা স্বপ্নেও ভাবেননি। আমার আম্মার মামা আর কাকারা আম্মাকে দ্বিতীয় বিয়ে দেওয়ার অনেক চেষ্টাই করেছিলেন কিন্তু আম্মা রাজী হননি। আমাকে নিয়ে স্বামীর বাড়িতে এক জীবন কাটিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্তে অটল ছিলেন বরাবর।
আমার আম্মা বাড়ির সব কাজ একা হাতেই করতেন। আমাকে দুটো ভালোমন্দ খাবার খাওয়াতে আম্মা অনেক পরিশ্রম করতেন। সংসারে রোজগার করার জন্য যেহেতু আমার আব্বা ছিলেন না তাই মাছ মাংস রান্না হলে আমাদের দু’জনের মধ্যে যেকোনো একজন খেতে পেতাম। আমাকে মাছ দিলে আমার আম্মাকে দিতো না আর আম্মারা তো সন্তানদের না খাইয়ে জীবনেও খায় না এটা সবারই জানা। আমার আম্মাও আমাকে না খাইয়ে নিজে খেতেন না কোনোদিন।
আম্মা মাঝে মধ্যেই সবাইকে লুকিয়ে আমাকে দুধ ডিম খাওয়াতেন। বলতেন, “বাদশা, কাউরে কইও না তুমি দুদ ডিম খাইছাও।” আমিও আম্মার বাধ্য ছেলে ছিলাম। কাউকেই বলতাম না আম্মা লুকিয়ে লুকিয়ে আমাকে দুধ ডিম খাওয়ান।
জ্যৈষ্ঠ মাসের কাঠফাটা রোদে একা একা ধান শুকাতেন আমার আম্মা। আমার দুই কাকি, দাদি, ফুফু ছায়ায় বসে থাকতেন।। ধানের সিজন আসলে আমার আম্মার চেহারার দিকে তাকানো যেতো না। কাজ করতে করতে রোদে পুড়ে আর খাওয়ায় শুকিয়ে যেতেন। তখন আমি ছোটো থাকলেও চোখে দেখা ঘটনাগুলো স্পষ্ট মনে আছে এখনও।
ওই দিনটা শনিবার ছিল। আমি তখন ক্লাস ওয়ানে পড়ি, ছয় বছর বয়স। শীতের সকালে একটা গমের আটার রুটি আর বিচি কলা খেয়ে স্কুলে গিয়েছিলাম।
স্কুল থেকে ফিরে এসে দেখি আমার আম্মা উঠোনে পড়ে আছেন। চোখেমুখে আঘাতের চিহ্ন। চু’রি’র দায়ে আমার দুই কাকা আম্মাকে মা’রধ’র করেছেন। আমার আম্মা নাকী ছোটো কাকার ঘর থেকে পাঁচ হাজার টাকা চুরি করেছেন। তখন পাঁচ হাজার টাকার অনেক মূল্য।
আমার আম্মা চুরির দায় স্বীকার করেননি, টাকা ফেরত দেননি এই কারণেই মে’রে’ছিলেন ওনারা।
বিকেলেই বাড়িতে সালিশ ডাকা হয়। আম্মার মামা কাকাদের সালিশে ডাকলেও ওনারা কেউ আসেননি।
আম্মা কেঁদে কেঁদে অনেক বলেছিলেন তিনি চুরি করেননি, কাকার ঘরে প্রবেশ করেননি, কোনো টাকা ধরেননি, দেখেনওনি। কেউ বিশ্বাস করেনি আমার আম্মার কথা। অনেকেই আমাকে চোরের ছেলে বলে উপহাস করেছিল সেদিন। দাদি তো মে’রে ছিলেনোই। সবাই কেমন করছিল আমার আর আম্মার সঙ্গে। দুধ কলা দিয়ে নাকী এতদিন কালসাপ পুষেছিলেন ওনারা নিজ বাড়িতে।
প্রতিবেশীরা মিলে আবারও তল্লাশি চালায় ছোটো কাকার ঘরে। তখন সন্ধ্যার দিকে কাকার ঘর থেকেই সেই টাকা পাওয়া যায়। কাকি নিজেই টাকা লুকিয়ে রেখে আমার আম্মার উপর দোষ চাপিয়েছিলেন।
আমি ছোটো থাকলেও বুঝতে পারতাম বাড়ির কেউ আম্মাকে পছন্দ করে না। ছোটো জা-রা আম্মাকে একদমই সহ্য করতে পারতেন না, আমাকেও না। প্রায়শই আমাদের দু’জনকে ম’রে যেতে বলতেন।
ছোটো কাকি আম্মাকে চোর প্রমাণ করে গ্রাম ছাড়া করতে চেয়েছিলেন। আব্বা না থাকায় আমাদের কোনো মূল্যই ছিল না বাড়িতে। সবাই দুচ্ছাই করতো সবসময়।
আম্মা নিজে থেকেই সেদিন স্বামীর বাড়ির মায়া ছেড়ে আমাকে নিয়ে বাড়ি থেকে বেরিয়ে এসেছিলেন রাতেই।
পৌষ মাসের কনকনে শীত তখন প্রকৃতিতে।
শীতের কারণে আমার হাঁটতে ইচ্ছে করছিল না। পা জোড়া জমে যাচ্ছিল ঠান্ডায়।
একজন পরিচিত মানুষের সাহায্যে আম্মা আমাকে নিয়ে রাতেই ঢাকার উদ্দেশ্যে রওনা হন। তখন আম্মা একুশ বছরের তরুণী। ছয় বছরের ছেলেকে নিয়ে অচেনা অজানা শহরের উদ্যেশ্যে রওনা দিয়েছিলেন। কোথায় থাকবেন, কী খাবেন কোনো চিন্তাই যেন আম্মাকে সেদিন দমাতে পারেনি।
ঢাকায় পৌঁছানোর পর আম্মা হয়তো একটু একটু ভয় পাচ্ছিলেন। আমি বারবার জিজ্ঞেস করছিলাম, “আম্মা আমরা কোথায় থাকবো?”
খিদেও পেয়েছিল, বারবার বলছিলাম, “আম্মা খিদে পেয়েছে।”
আম্মা আমাকে কোলে নিয়ে রাতের রাস্তায় হাঁটতে থাকেন উদ্দেশ্যহীন। শীতের কারণে আম্মাও ঠিকভাবে হাঁটতে পারছিলেন না। বেশ কিছুদূর হাঁটার পর রাস্তার পাশে অনেক মানুষকে ঘুমিয়ে থাকতে দেখতে পাই আমরা। ওখানে নারী পুরুষ আর বাচ্চা উভয়ই ছিল, কিছু কু’কুরও ছিল ঘুমিয়ে। আম্মা কু’কুর ভয় পেতেন অনেক কিন্তু সেদিন পাননি, আমাকে নিয়ে কু’কুরের পাশে খালি জায়গায় বসেন। আম্মাও হয়তো হাঁটতে হাঁটতে ক্লান্ত হয়ে পড়েছিলেন, আমাদের তো দুপুরে আর রাতে খাওয়াও হয়নি।
কাপড়ের ব্যাগটা পাশে রেখে আমাকে জড়িয়ে ধরে কোলের ওপর আগলে নিয়ে চাদর দিয়ে ভালোভাবে ঢেকে দেন। মাথায় চুমু খেয়ে বলেন, “বাদশা, তুমি গুমাও। সকালে খাওন কিনা দিমু।”
ক্লান্ত আমি আম্মার বুকে মুখ গুঁজে ঘুমিয়ে যাই। আম্মা যখন বলেছেন সকালে খাবার কিনে দেবেনোই।
রাতেই একবার ঘুম হালকা হয়ে এসেছিল তখন আম্মা ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছিলেন। আমি কোনো প্রশ্ন করতে পারিনি আম্মা কেন কাদঁছে। আল্লাহ তা’আলা আমাকে সেই বয়সেই অনেক কিছু বোঝার ক্ষমতা দিয়েছিলেন। আমার আম্মাজান কত কষ্ট করেছিলেন শ্বশুরবাড়ির মানুষদের জন্য, আমার কথা ভেবে আর স্বামীর বাড়িতে থাকার জন্য মুখ বুজে সহ্য করেছেন সব।
ছোটো দুই জা কাজের লোকের মতো ব্যবহার করেছে আমার আম্মার সঙ্গে। তারা কখনও ভাবেইনি আমার আম্মা তাদের বড়ো জা।
আমার আম্মাজান আমাকে খাওয়াতে, পড়াতে, বড়ো করতে লোকের বাড়িতে বুয়ার কাজ করেছেন, ইট ভেঙেছেন, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে পরিচ্ছন্ন ক/র্মী/র কাজ করেছেন। অসুস্থ অবস্থায় বিশ্রাম নেননি কোনোদিন, তীব্র জ্বর নিয়েও কাজ করেছেন। রোদ, বৃষ্টি, ঝড়, অসুস্থতা কোনো কিছুই আমার আম্মাজানকে কাবু করতে সক্ষম হয়নি কোনোদিন।
আমি শত শত রাতে ঘুম থেকে জেগে আশেপাশে আম্মাকে খুঁজলে দেখেছি, আম্মাজান তাহাজ্জুদের নামাজ আদায় করছেন বা আদায় করে উবু হয়ে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাদঁছেন। আমি আম্মাকে ডাকলে আম্মা উঠে এসে আমাকে জড়িয়ে ধরে ঘুম পাড়ানোর চেষ্টা করতেন।
আম্মা মাঝে মধ্যেই আমাকে বলতেন, “বাদশা, কোনোদিন মিছা কতা কইও না, কাউরে মিছা অপবাদ দিও না। সবসময় সত্যি কতা কইবা, সৎ পথে চলবা।”
ঢাকায় যাওয়ার পরেও অনেক মানুষ আম্মাকে বিয়ের প্রস্তাব দিয়েছে আমার আম্মাজান কোনোদিন রাজি হয়নি দ্বিতীয় বিয়ে করতে।
আম্মাজান আমার মুখের দিকে তাকিয়ে সব দুঃখ কষ্ট ভুলে যেতেন। সারাদিনের পরিশ্রম শেষে আমাকে দেখে আমার মুখের দিকে তাকিয়ে হাসতেন। আমাকে জড়িয়ে ধরে নিজের ক্লান্তি দূর করতেন। আমি বলতাম “আম্মা, এত কাজ করতে তোমার কষ্ট হয় না?”
আম্মাজান হাসতেন, বলতেন, “না, কষ্ট হয় না।”
সন্তানরা যখন ছোটো থাকে তখন আম্মাদের কষ্ট হয় না, কষ্ট হয় সন্তানরা বড়ো হয়ে যখন আম্মাদের ভুলে যায়।”
চলবে………..
